thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬,  ১৫ জিলকদ  ১৪৪০

'প্রশাসন ঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিলে নুসরাত হত্যাকাণ্ড এড়ানো যেত'

২০১৯ এপ্রিল ১৬ ২০:৪৪:০৬
'প্রশাসন ঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিলে নুসরাত হত্যাকাণ্ড এড়ানো যেত'

দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক : ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির হত্যকারীদের দ্রুত সময়ের মধ্যে শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক।

তিনি বলেন, নুসরাত হত্যাকাণ্ড মানবতার ইতিহাসে জঘন্যতম অপরাধ। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করে দৃশ্যমাণ শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে সমাজ থেকে আমরা কেউই রক্ষা পাবো না। সমাজটা বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে পরিণত হবে।

মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ানবাজার কমিশন কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কর্তৃক নুসরাত জাহান রাফি হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করে তিনি এসব কথা বলেন।

নুসরাত হত্যার পর ১১ এপ্রিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নির্দেশে পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) আল-মাহমুদ ফায়জুল কবীর এবং উপ-পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) এম রবিউল ইসলাম এ তদন্ত করেন। পরদিন তদন্ত কমিটি সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসায় যান। সেখানে ঘটনাস্থল, নুসরাতের পরীক্ষার হল, অধ্যক্ষের দফতর, শ্রেনীকক্ষসহ বিভিনন স্থান পরিদর্শন করেন। এরপর তদন্ত কমিটি নুসরাতের পরিবারের সদস্য, থানা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, কর্মচারি, স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

সংবাদ সম্মেলনে নুসরাত জাহান রাফি হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বলা হয়, স্থানীয় প্রশাসন ও মাদরাসার গভনিং বডি যথাসময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির নৃশংস হত্যাকাণ্ড এড়ানো যেত।

কমিশন মনে করে, এ ঘটনায় পুলিশের সংশ্নিষ্ঠ কর্মকর্তারা অবহেলা ও অপরাধ করেছেন। জেলা প্রসাশনেরও অবহেলা ছিল। তারা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। কমিশন এসব কর্মকর্তাদের অপরাধ ও অবহেলার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের সুপারিশ করেছে।

এ সময় কমিশনের সদস্য নুরুন্নাহার ওসমানী, বাঞ্চিতা চাকমা, নজরুল ইসলাম, উপপরিচালক সুস্মিতা পাইক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিবেদনে সাত দফা সুপারিশ করা হয়। দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা, দ্রুত এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার দ্রুত সাক্ষ্য গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। এ ছা্ড়া পুলিশ ও প্রশাসনের সংশ্নিষ্ঠ কর্মকর্তা যারা দায়িত্বে অবহেলা ও অপরাধ করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সংশ্নিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। মাদরাসায় সিরাজ উদ দৌলাকে যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। মাদরাসার গভর্নিং বডি পুনর্গঠনেরও সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া নিহত নুসরাতের পরিবারের সব সদস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতেরও সুপারিশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত প্রতিবেদন তুলে ধরে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা একটি বাহাদুরি নাম। নুসরাতের সঙ্গে যে ধরনের অমানবিক আচারণ করা হয়েছে, তা আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। সোনাগাজী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা এটা কোন শাস্তি হতে পারে না।

তিনি বলেন, নুসরাতের মতো অনেক নারী-শিশু-কন্যা প্রতিনিয়ত হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করে এক মাসের মধ্যে দৃশ্যমান শাস্তি দিতে হবে। নুসরাতের মতো নির্যাতনের শিকার অনেক পরিবার বিচারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছে।

তিনি বলেন, শুধু আইন প্রনয়ন করলে হবে না, আইনের যথাযথ প্রয়োগ থাকতে হবে। যদি অপরাধীদের যথাযথ বিচার হয় তবেই নুসরাতের আত্মা শান্তি পাবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সিরাজ উদ দৌলা নিজ অফিস কক্ষে নুসরাত জাহান রাফির শ্নীলতাহানি করেন। তার নির্দেশেই তার ঘনিষ্ঠ সহচরেরা নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর ফলে তার মৃত্যু হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর থানা পুলিশ নুসরাতকে বিভিন্ন অশালীন প্রশ্ন করে। তারা বিষয়টিতে হালকাভাবে দেখানোর চেষ্টা করে। পুলিশের সঙ্গে সাক্ষাতের ভিডিও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এতে সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। এটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিপন্থি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সিরাজ উদ দৌলা ১৯৯৫ সালে দৌলতপুর মাদরাসার সুপার ছিলেন। তখন ওই মাদরাসার ছাত্রদের সঙ্গে তার সমকামিতার অভিযোগ ছিল। তার বিরুদ্ধে আদালতে একাধিক প্রতারণার মামলা চলমান আছে। প্রতারণার মামলায় তিনি এর আগে জেলও খেটেছেন।

এতে বলা হয়, সিরাজ উদ দৌলা ২০০১ সাল থেকে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায় অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি নিয়মিত তার অফিসে মেয়েদের ডাকতেন। তার কক্ষে একই সময় একজনের বেশি ছাত্রীর প্রবেশ নিষেধ ছিল।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ছাত্রী ও অভিভাবকেরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, মাদরাসার গভর্নিং বডি ও থানায় অভিযোগ করে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থগ্র গ্রহণ করেনি।

এ সময় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে এত অভিযোগ তিনি একটি মাদরাসার অধ্যক্ষ হিসেবে কীভাবে নিয়োগ পান তা অবিশ্বাস্য। কারা তাকে নিয়োগ দিলো, এসব বিষয়গুলো যথাযথভাবে তদন্ত হওয়া উচিত।

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/এপ্রিল ১৬,২০১৯)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর