thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৬,  ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

প্রবন্ধ

বাংলা সাহিত্যে রমজান ও ঈদ উৎসব

২০১৯ জুন ০৫ ১৯:০৫:২৭
বাংলা সাহিত্যে রমজান ও ঈদ উৎসব

সালেহ ফুয়াদ

সাহিত্য বাস্তব জীবনের প্রতিরূপ। শৈল্পিকভাবে বাস্তবতা চিত্রিত করাই সাহিত্যের কাজ। সমাজের অতি সাধারণ বিষয় সাহিত্যের ছোঁয়ায় বহুমূল্যের হয়ে উঠতে পারে। সাহিত্যে যদি উপযুক্তভাবে বেদনাকেও ফুটিয়ে তোলা যায় তবে তাই হয়ে উঠে পরম আনন্দের বিষয়। রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত ‘হৈমন্তী’ ছোটগল্পটি পড়ে হৈমন্তীর জন্য পাঠকের মন হু হু করে ওঠে। আবার এ কান্নার মধ্যেও কী এক অতল আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে পাঠকের মনে। একই কথা বলতে পারি আরেক বিখ্যাত ছোটগল্প শরৎচন্দ্রের ‘বিলাসী’র ক্ষেত্রেও। বিলাসীর দুঃখে একদিকে পাঠকের হৃদয় ফেটে যায় অন্যদিকে গল্পপাঠ শেষে পাঠক বুঝতে পারে এর মতো আনন্দ আর হয় না। ‘হৈমন্তী’ ও ‘বিলাসী’ বাঙালি সমাজের দুটি বাস্তব ও সাধারণ নারী চরিত্র। লেখকদ্বয়ের মুনশিয়ানায় চরিত্র দু’টি হয়ে উঠেছে অসাধারণ। লেখকদ্বয়কে বাঙালি নারী সমাজ ভাবিয়েছে বলেই তারা একে সাহিত্যের উপাদান বানিয়েছেন। ফলে গল্প দুটিতে তৎকালীন নারীসমাজের দুটি উজ্জ্বল ছবি আমরা পেয়ে যাই। প্রকৃত অর্থে এর নামই সাহিত্য। সমাজবাস্তবতারিক্ত ‘সাহিত্য’ সাহিত্য হয়ে উঠে না। শিল্পগুণে ক্ষেত্রবিশেষে আদৃত হলেও তাকে পণ্ডিতজন সাহিত্য বলে মানেন না।

‘বাংলা সাহিত্যে রমজান ও ঈদ উৎসব’ মানে বাংলা সাহিত্যে কোথায় কোথায় রমজান ও ঈদের উল্লেখ আছে স্রেফ তার সঙ্কলন নয়। তা হলে শুধু আজকের দিনে বাংলাদেশে রমজান ও ঈদ নিয়ে যে কাগজ খরচ করা হচ্ছে তা দিয়েই রামায়নসম ঢাউস কেতাব নামানো সম্ভব হতো। আমরা দেখতে চাই বাংলা সাহিত্যে রমজান এবং ঈদ কতটুকু প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। আমাদের লেখকরা রমজান ও ঈদ নিয়ে আদৌ ভাবছেন কীনা। ভাবলে কতটুকু। সে ভাবনার ফসল কতটুকু। এ জন্য সমাজে রোজা বা ঈদের প্রভাব সম্পর্কে একটা ধারণা নিতে হবে বৈ কি!

রমজান ও ঈদ দুটোই মুসলমানদের ইবাদত এবং উৎসব। এ দুটোর প্রভাব খুব সহজেই অনুমেয়। আমাদের আশেপাশে দু’চারজন ‘রমজান আলি’ হরহামেশাই ঘোরাফেরা করেন। এদের কাউকে জিজ্ঞেস করলে জানা যাবে রমজান মাসে জন্ম বলে পবিত্র মাসের সম্মানে তাদের এই নামকরণ হয়েছে। এ দেশে কুরবানির ঈদে জন্ম নিলে শিশুর নাম হয় ‘কুরবান আলি’। এ নামের শিশুর সংখ্যা অন্য নামের তুলনায় ঢের বেশি। আল মাহমুদ লিখেছেন,“কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার”। ধারণা করি কবি মেয়ে শিশুর নাম না নিয়ে ছেলে শিশুর নাম নিলে রমজান বা কুরবান আলি অগ্রাধিকার পেত। গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঘরে যেভাবে ‘চুলখোলা আয়েশা আক্তার’ আছে তেমনি বুকখোলা রমজানদেরও এখানে বসবাস। এরা সকলেই বাংলা কবিতার প্রতীক হতে পারে।

লক্ষণীয় হলো, দুনিয়ায় এত নাম থাকতে বাঙালিদের এ নাম দু’টির প্রতি বিশেষ ঝোঁক। আরবি মাস বা উৎসবের সাথে মিল না রেখে ধরা যাক ইংরেজি মাসের নামও তো নেওয়া যেত। নাম নিয়ে প্যাঁচাল বেশি হয়ে যাচ্ছে, পাঠক বিরক্ত হচ্ছেন নিশ্চয়। আসলে নাম দুটোর দিকে ইশারা করে বলতে চাইছি, রমজান বা ঈদ বাঙালি মুসলমানের কাছে ধর্মীয় ইবাদতের চেয়েও বেশি। এর প্রভাব বাঙালি মুসলমান সমাজের গভীরে প্রোথিত। নামের বাইরে এই প্রভাব আরো বিস্তৃত। আত্মিক কি শারীরিক, সামাজিক কি পারিবারিক, সব ক্ষেত্রেই রমজান এক বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসে। রমজান, ইফতার, তারাবিহ, সেহরি বা ঈদ প্রতিটি ইবাদত তার ধর্মীয় গুরুত্ব যথাযথ বজায় রেখেও বাঙালি সমাজে তৈরি করেছে নতুন ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এই অঞ্চলে বছরে মাত্র দু’দিনের ঈদের জামাতের জন্য তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন ঈদগাহ।

সিদ্ধান্তে আসা যাক, সমাজ যেহেতু সাহিত্যের বীজ বা মূল উপাদান আর রমজান ও ঈদের বাস যেহেতু সমাজের গভীরে প্রোথিত সেহেতু সাহিত্যে সমাজ এলে রমজান ও ঈদ আসাটা অনিবার্য। বাঙালি মুসলমান লেখকদের ঠাহর করার সহজ পথ হতে পারে এগুলো।
কিন্তু ভেবে কুল পাইনে, যা হওয়ার তা তা হলোই না। ভবিষ্যতে হবে বলেও জোর দিয়ে বলা যায় না। ঈদ নিয়ে কিছু কবিতা-সঙ্গীত-প্রবন্ধ পাওয়া গেলেও রোজা নিয়ে বলতে গেলে প্রায় কিছুই নেই। হাতেগোনা দু’চারজনের লেখাজোখা যা পাওয়া যায় তাও তেমন উল্লেখ করার মতো নয়। কবি শাহাদাৎ হোসেন‘রমযান’ কবিতায় লিখেছেন,

তেমারে সালাম করি নিখিলের হে চিরকল্যাণ,
জান্নাতের পুণ্য অবদান।
যুগযুগান্তর ধরি বর্ষে আসিয়াছ তুমি
দিনান্ত কিরণে চুমি
ধরণীর বনান্ত বেলায়।
অস্তসিন্ধুকূলে দূর প্রতীচীর নীলিমার গায়
দ্বিতীয়ার পুণ্য তিথি প্রতি বর্ষে আঁকিয়াছে তোমার আভাস
দিক হতে দিগন্তরে জাগিয়াছে পুলকের গোপন উচ্ছ্বাস।
দিক হতে দিগন্তরে ধরণীর মর্মকেন্দ্র ঘন মুখরিয়া
“স্বাগতম রমজান” গীতি কণ্ঠে উঠুক রণিয়া।

শাহাদাৎ হোসেনের এ কথাগুলোই বাঙালি মুসলিম কবিদের হাত দিয়ে বারবার লিখিত হয়েছে। সবগুলো কবিতা পড়লে বড্ড একঘেয়ে ঠেকে। কারো কবিতাতেই তেমন একটা ভার মেলে না। কেমন যেন সস্তা ও চটুল মনে হয়। জসীমউদ্দীন ‘তারাবীহর জামাত’ কবিতায় গাঁয়ের কৃষকদের রীতি বদলানোর আলোচনা করেছেন। আগের দিন খেতের আইল ঠেলা, গরু দিয়ে ধান খাওয়ানো প্রভৃতি অন্যায় কর্মের প্রতিশোধরীতি ভুলে ‘সলিমুদ্দি’ ‘রহিমুদ্দি’ এক কাতারে তারাবীহর জামাতে দাঁড়িয়ে যায়। টুঁটি চেপে ধরতে ইচ্ছে করলেও সে কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে ঈদের আনন্দে কোলাকুলি করে সবাই। সেহরি নিয়েও আছে কিছু গতানুগতিক কবিতা।
তবে এ ধারা উল্টে দিয়ে উল্কার মতো যিনি আবির্ভূত হন তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। রমজানে তিনি মাখিয়েছেন বিপ্লবী আমেজ। তার ‘কেন জাগাইলি তোরা’ থেকে চারটে লাইন তুলে নেওয়া যাক:
মাহে রমজান এসেছে যখন, আসিবে ‘শবে কদর’,
নামিবে তাঁহার রহমত এই ধূলির ধরার পর।
এই উপবাসী আত্মা, এই যে উপবাসী জনগণ,
চিরকাল রোজা রাখিবে না-আসে শুভ ‘এফতার’ ক্ষণ।

আবার রমজানকে বিশেষ সুযোগ মনে করে পাথেয় সংগ্রহের জন্য উৎসাহ দেন নজরুল।
এল রমজানেরই চাঁদ এবার দুনিয়াদারী ভোল
সারাবরষ ছিলি গাফেল এবার আঁখি খোল।।
এই এক মাস রোজা রেখে, পরহেজ থাক গোনাহ থেকে
কিয়ামতের নিয়ামত তোর ঝুলি ভরে তোল।।

আবুল মনসুর আহমদ ‘রোযা ও ঈদ’ নামক নিবন্ধে মাহে রমযানের রোজার বিশেষ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। তবে নিজস্ব ভঙ্গিতে। “কি কঠোর কৃচ্ছ সংযম সাধনা তা। একটানা তিরিশ দিনের নিরম্বুুুু উপবাস। দিনে রোযা ও রাতে এবাদত। ইন্দ্রিয়েরা সবাই শৃঙ্খলিত, বন্দী।... রোযার আধ্যাত্মিক দিক নিশ্চয় আছে। রমযানের রোযার আরো বেশি আছে। রোযা সংযম। রমযানের রোযা সমবেত সামাজিক সংযম। এর শিক্ষা ও কল্যাণের একাদিক দিক আছে।”
পরপর আরো কয়েকটা লেখার গুরুত্বপূর্ণ অংশের উদ্ধৃতি দেওয়া যাক। ‘রমযানের শিক্ষা’ প্রবন্ধে শাহেদ আলী রমজানকে উপস্থাপন করছেন,“আল্লাহর অস্তিত্বকে জীবনে সত্য ও বাস্তব করিয়া তোলার সঙ্গে সঙ্গে রমযান সামগ্রিক দায়িত্বের প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে তোলে। রমযানের রোযা রাখিয়া ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর মুসলমান প্রত্যক্ষভাবে বুঝিতে পারে অভাবের দরুণ যারা উপবাস করে তাদের কী কষ্ট।...বছরে বছরে রমযান আমাদের চাপা পড়া মুমূর্ষু রুহকে জিন্দা হইয়া উঠিবার জন্য ডাক দিয়া যায়।”

জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ‘সিয়ামের তাৎপর্য’ নামক প্রবন্ধে লিখেছেন,“কাম-প্রবৃত্তির অসংযত সন্তোষ বিধানের ফলে মানুষ পশুত্বের চরম স্তরে নেমে যায়। ক্রোধ মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে তোলে। লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য সামাজিক জীবনে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। এ জন্যে এগুলোর দাহনের জন্যে এ দুনিয়ায় আল্লাহ সিয়াম প্রবর্তন করেছেন। যাতে এ দাহনের ফলে মানুষ এ বিশে^ তার প্রকৃত স্থান নির্দিষ্ট করতে পারে, সে যাতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে।” দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ তার ‘মাহে রমজান’ প্রবন্ধে আরো মূল্যবান আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন,“মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হযরত মুহম্মদ (সা.) ঘোষণা করেছেন ‘তাখাল্লাকু বিআখলাকিল্লাহ’, আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও। আল্লাহর রয়েছে নিরানব্বইটি গুণ। কিন্তু কিভাবে মানুষ এসব গুণ আয়ত্ব করবে? একদিকে ষড়রিপুকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, অন্যদিকে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হওয়ার সাধনা এজন্য রমজান মাসের মত উপযুক্ত মাস আর নেই।...প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর গুণগুলোর সব ক’টি গুণ কোন মানুষের পক্ষেই একীভূত করা সম্ভবপর না হলেও কতকগুলো মানুষ আয়ত্ত করে ইনসান-ই-কামিল হতে পারে।...আল্লাহর শ্রেষ্ঠ গুণাবলীর মধ্যে রব্ব ও মালিক নামক সার্বভৌম দু’টো গুণ বর্তমান।...সৃষ্টিকর্তার গুণ তার জীবনে একীভূত হলে তার পক্ষেও নতুন সৃষ্টিতে এ পৃথিবীকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব হবে। যেহেতু তিনিই একমাত্র সার্বভৌম শক্তির উৎস, এ জন্য দুনিয়ার সকল মানুষকে তাঁরই একমাত্র সার্বভৌমত্ত স্বীকার করে এ দুনিয়ার সকল সম্পদ সমানভাবে ভাগ করে ভোগ করতে হবে। এতে কোন ব্যক্তি, দল বা জাতির আধিপত্য থাকবে না। এতে এক ভাষাভাষী, একই রক্ত, বর্ণ বা একই ভৌগোলিক অঞ্চলের অধিবাসী কারো সামগ্রিক ভোগদখল করার অধিকার থাকবে না। এভাবে যদি আল্লাহর প্রতিনিধিদের দ্বারা এ দুনিয়া শাসিত হয় তাহলে এ দুনিয়ায় শান্তির রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবে।...সে মর্মে মুমিন হলেই ইনসানে কামিল হয়ে আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়া সম্ভবপর। রমজানের এ সওম হচ্ছে সে মর্দে মুমিন হওয়ার এক অনুশীলন। তাই তার আগমনে এ দুনিয়ায় সত্যিকার মুমিনদের জীবনে দেখা দিয়েছে আনন্দ উল্লাসের জোয়ার। (মাহে রমযান, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, আল-মুনীর সিয়াম স্মারকগ্রন্থ)
রমযান নিয়ে আরো তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন কবি সৈয়দ আলী আহসান। তার ‘ইসলামে সিয়াম ও তার তাৎপর্য’ (অগ্রপথিক, ১৪ বর্ষ: ১ম সংখ্যা, জানুয়ারি ১৯৯৯) এবং ‘সিয়াম এবং তার তাৎপর্য’ (আল-মুনীর সিয়াম স্মারকগ্রন্থ ১৯৯৯) নামক প্রবন্ধ দু’টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

দেখা যাচ্ছে,সিয়াম বাঙালি মুসলমান সমাজে প্রভাব বিস্তার করলেও বাঙালি মুসলিম সাহিত্যিকগণ রমযানকে ঠিক তুলে ধরতে পারেননি। অথবা ইচ্ছে করেই কেউ কেউ ধর্মের বিধান হেতু একে এড়িয়ে গেছেন। কয়েকজন অধ্যাপক ছাড়া সিয়াম বা রমজানকে যেন আর কোনো লেখকই হজম করতে পারেননি। নজরুল লিখেছেন খুবই কম। প্রকৃত অর্থে বাংলাসাহিত্যে ঈদুল ফিতর, মুহররম ইত্যাদি বিষয়ক যত লেখা হয়েছে তুলনামূলকভাবে রমজান সম্পর্কে তত লেখা হয়নি। এটা কি রমজানের ব্যর্থতা নাকি সাহিত্যিকদের উপেক্ষা বা অমনোযোগ?

ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা এ দু’টি ঈদকে নিয়েই অসংখ্য কবিতা, প্রবন্ধ, কথাসাহিত্য এমনকি নাটিকাও রচিত হয়েছে। সেই ১৯০৩ সাল থেকে নিয়ে আজ অবধি ঈদের কবিতা রচিত হচ্ছে। বাংলাসাহিত্যে সর্বপ্রথম ঈদের কবিতা লিখেন কবি সৈয়দ এমদাদ আলী। তার কবিতাগ্রন্থ ‘ডালি’তে ঈদ নিয়ে দুটো কবিতা রয়েছে। দুটোর নামই ‘ঈদ’। তন্মধ্যে একটি কবিতার নিচে কবি নিজেই টীকায় লিখেছেন,“১৯০৩ সনের ডিসেম্বর মাসে প্রথম নবনূরের ঈদ-সংখ্যায় প্রকাশিত। ইহাই মুসলিম বাংলার প্রথম ঈদ কবিতা।” এখান থেকে আরো একটি তথ্য জানা গেল, আজকে যে বাজারে মোটা মোটা ‘ঈদ সংখ্যা’ পাওয়া যাচ্ছে সেটিরও সূচনা হয়েছিল ১৯০৩ সালে সৈয়দ এমদাদ আলী সম্পাদিত নবনূরের ঈদ সংখ্যা দিয়ে। ১৯০৩, ১৯০৪, ১৯০৫ পরপর এই তিন বছরই ‘নবনূর’ ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করে। ‘নবনূর’ এর পৌষ ১৩১২ সংখ্যায় একই সঙ্গে ঈদ সম্পর্কিত তিনটি লেখা প্রকাশিত হয়। সৈয়দ এমদাদ আলীর ‘ঈদ’ কবিতা, জীবেন্দুকুমার দত্তের ‘ঈদ সম্মিলন’ কবিতা এবং বেগম রোকেয়ার ‘ঈদ সম্মিলন’ প্রবন্ধ। তখনো ঈদ সংখ্যা বেরুতো। এখনো বেরোয়।ফারাক হলো তখন ঈদ সংখ্যায় সবচে’ বেশি গুরুত্ব পেত ঈদ। আজকাল পাঁচ শ’ পৃষ্ঠার ঈদ সংখ্যায় আধপাতা ঈদ নিয়ে রচনা মেলে না। রান্নার রেসিপি আর সুন্দরীদের বাহারি পোশাকের ছবি দিয়ে চার শ’ পৃষ্ঠাই ঠাসা। ‘ঈদ আবাহন’ নামে কায়কোবাদ দু’টি কবিতা লিখেছিলেন। কবিতা দু’টিতে ঈদ উপলক্ষ্যে মুসলমানদের জাগরণ কামনা করেছেন। ঈদ নিয়ে গোলাম মোস্তফা লিখেছেন ‘ঈদ উৎসব’ কবিতা। কবি শাহাদাৎ হোসেন ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা নিয়ে লিখেছেন ‘ঈদ-বোধন’। দু’টি কবিতাই ১৯২৪ সালে রচিত।

সেই যে ১৯০৩ সাল থেকে ঈদ নিয়ে কবিতা লেখা শুরু হয়েছিল এ ধারার কোনো ছন্দপতন ঘটেনি। ঈদ বিষয়ক কবিতার পুরো কাঠামোই বদলে ফেলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯২০ সালে তিনি লিখেন বিখ্যাত ‘কোরবানি’ কবিতাটি। এতে নবজাগরণের মন্ত্র তুলে দেন মুসলমানদের কানে। দৃপ্তকণ্ঠে উচ্চারণ করেন,‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্য-গ্রহ শক্তির উদ্বোধন।’ এরপর একের পর এক ঈদ বিষয়ক কবিতা লিখতে থাকেন। কৃষকের ঈদ, ঈদ মোবারক, জাকাত লইতে এসেছে ডাকাত চাঁদ, ঈদের চাঁদ, সর্বহারা, বকরীদ, শহীদী ঈদ ও আজাদ কবিতা রচনার মধ্য দিয়ে পূর্বের কবিদের চে’ ভাষা ও চিন্তাকে যোজন যোজন দূরত্বে এগিয়ে নিয়ে যান। রচনা করেন ঈদ বিষয়ক অমর সব গান।

আবদুল মান্নান সৈয়দের ভাষায়, নজরুল আসলে বিশ্বকাব্যলক্ষ্মীর একটি মুসলমানী ঢং খুঁজে পেয়েছিলেন। ইসলাম নিয়ে প্রচুর কবিতা-গজল-গান তার হাতে জন্মেছে। ইসলামের আর সব বিষয়ের মতো ঈদ নিয়েও প্রচুর লিখেছেন। তবে সেই তিরিশের দশকে রচিত তার কালজয়ী গান ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ আজও অমর ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বাঙালি মুসলমানের ঈদুল ফিতরের অর্ধেক আনন্দই এ গানে বাঁধা পড়েছে। এ গানে যেমন আনন্দময়তা তেমন সাম্যবোধ আর অত্মার জাগরণের অপূর্ব মিলন ঘটেছে। এ সাম্যবোধ আর আত্মার জেগে ওঠার মিলনে ফুটে উঠেছে দরদ ও মায়া। আত্মার গহীন কোঠা থেকে গানের প্রতিটা শব্দ, ছন্দ কারখানাজাত হয়ে এক অপার আনন্দের সৃষ্টি করেছে। এ আনন্দ খ-িত নয়। সকল মানুষের আনন্দ। এ আনন্দ বাংলাসাহিত্যেরও। মূলত মুসলমানদের ঈদকে কেন্দ্র করে রচিত এ গানের মধ্য দিয়েই বাংলাসাহিত্যে রাজকীয়ভাবে আসন দখল করে এক নতুন সৃষ্টি। রমজান আর ঈদ নিয়ে রচিত নজরুলের সকল লেখাজোখা এক করলে যা পাওয়া যায় তার সবই এ গানে হাজির। নজরুল যদি এ বিষয়ে এ গানটি ছাড়া আর কিছু নাও লিখতেন তাও ক্ষতি হতো না।

নজরুল ইসলামের পর সমকালে ও পরবর্তীতে ঈদ বিষয়ে কবিতা ও গদ্যের ধারা অব্যাহত থাকে। বিশ শতকের প্রথম দশকে বেগম রোকেয়া, সৈয়দ এমদাদ আলী, এয়াকুব আলী চৌধুরী, ডা. লুৎফর রহমান, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর চিন্তাশক্তিকে আরো সামর্থবান করে তোলেন তৃতীয় দশকের কয়েকজন চিন্তক। কাজী আবদুল ওয়াদুদ ও মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর নাম এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এরা দু’জনই ঈদ নিয়ে লিখেছেন। তিরিশের কবিদের কেউ কেউও লিখেছেন। বেগম সুফিয়া কামাল এদের অন্যতম। পরবর্তীকালে সিকান্দার আবু জাফর, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন, তালিম হোসেন, আহসান হাবীব, সানাউল হক, আজিজুর রহমান, মনমোহন বর্মনসহ আরো অনেকেই ঈদের কবিতা লিখেছেন। ‘ঈদের স্বপ্ন’ কবিতায় ফররুখ তার স্বপ্নের জগতেই বিচরণ করেছেন:

আকাশের বাঁক ঘুরে চাঁদ এলো ছবির মতন,
নতুন কিশতি বুঝি এলো ঘুরে অজানা সাগর
নাবিকের শ্রান্ত মনে পৃথিবী কি পাঠাল খবর
আজ এ স্বপ্নের মাঠে রাঙা মেঘ হল ঘন বন।
নিবিড় সন্ধ্যার পথে শাহজাদি উতলা উন্মন
কার প্রতীক্ষায় যেন পাঠায়েছে আলোর ইশারা,
পুষ্পিত গোলাবশাখে বুলবুল ডেকে হল সারা;
আতরের ঘন গন্ধে মাটি চায় হাওয়ার বাঁধন।

এরপর শামসুর রাহমান থেকে শহীদ কাদরী সবাই এ ঈদগাহে একবার উঁকি মেরে গেছেন। ঈদের আনন্দ-চেতনা সবই মূর্ত হয়েছে সৈয়দ এমদাদ আলী থেকে নিয়ে আজকের নবীন কবি পর্যন্ত।

কবিতায় আর প্রবন্ধে ঈদ পাওয়া গেলেও কথাসাহিত্যে ঈদ কি রমজান দুটোই উপেক্ষিত আজও। সমাজে দারুণভাবে প্রভাব রাখলেও বিষয় দু’টি আমাদের ‘সমাজবাদী’ কথাসাহিত্যিকদের ওপর যেন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। কমলকুমার মজুমদার একটি উপন্যাসের আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, সমাজবাদী লেখকরা নাকি জল ঘুলিয়ে খেতে ভালোবাসেন। এরা নিজেদের আশাবাদী বলে দাবি করেন কিন্তু সর্বত্র দেখেন অবক্ষয়।
আলোচনা শেষ করব আবদুল মান্নান সৈয়দের একটি লেখার অংশ উদ্ধৃত করে। ‘বাংলা সাহিত্যে বিদেশী প্রভাব’ শিরোনামের এ লেখায় মান্নান সৈয়দ লেখকদের প্রতি কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করছেন বিবেচনার জন্য। এখানে তার একটি তুলে দিলাম:

‘শতকরা আশি বা নব্বইভাগ বাঙালি-মুসলমানের দেশের সাহিত্যে ইসলাম কি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে? কাজী নজরুল ইসলাম এবং ফররুখ আহমদ দুই যুগের এই দুই প্রধান কবি ইসলামের অসাধারণ কাব্যরূপ দিয়েছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সাহিত্য চিরকাল নজরুল বা ফররুখের তাঁবে চলতে পারে না। নজরুল ও ফররুখ দু’জনকেই প্রধানত মুগ্ধ করেছিল ইসলামের সাম্য-নীতি। ইসলামের সৌন্দর্য, প্রেম, কল্যাণ, বন্দনা ইত্যাদি এক কথায় ইসলামের সার্বিক রূপ অব্যবহৃত রয়ে গেছে আজও। কবিতায়, গল্পে, নাটকে, উপন্যাসে তাঁর নিজের স্বভাবী আগ্রহে উপচার ব্যবহার করবেন একজন লেখক। সবচেয়ে অবাক হই তথাকথিত বাস্তববাদী লেখকদের কারামতিতে-শতকরা আশি-নব্বই ভাগ মানুষের জীবন যাপনের ছবিকে অগ্রাহ্য করে যারা বাস্তববাদী।’

লেখক : অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/ জুন ০৫,২০১৯)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর