thereport24.com
ঢাকা, সোমবার, ১৫ জুলাই ২০১৯, ৩১ আষাঢ় ১৪২৬,  ১১ জিলকদ  ১৪৪০

গল্প

গুজব

২০১৯ জুন ৩০ ০৯:২৪:০৩
গুজব

মুহাম্মদ শরীফ উল ইসলাম

আজ ১৬ই আগস্ট। বাড়িওয়ালা পর পর তিন দিন ভাড়ার জন্য এসে দেখে দরজায় তালা ঝুলছে । শাহনাজ বেগম তার এই বাড়িতে ভাড়া আছে প্রায় ৫ বছরের মত। ভাড়া দিতে কোন মাসেই দেরি করে নি।মাসের প্রথম সপ্তাহেই ভাড়া পরিশোধ করে দেয়। গত মাসে দুই দুইটা দুর্ঘটনা শাহনাজ বেগমের জীবনে ঘটে গেল। হয়তো বিপদে আছে, তাই ভাড়া দিতে দেরি করলেও বাড়িওয়ালা কোন তাগাদা দেয় নি। কিন্তু মাসের অর্ধেক হয়ে গেল এখনও ভাড়া দিল না , দেখা সাক্ষাৎ করল না, বাড়িওয়ালা হিসাবে একটা খবর নেওয়া উচিত মনে করে পর পর তিন দিন সে আসল। এদিকে সে শাহনাজ বেগমকে নিয়ে নানান গুজব শুনছে। অন্যনা ভাড়াটিয়ারা ও কোন কিছু বলতে পারছে না।

৫ই আগস্ট শাহনাজ বেগম সারাদিন অত্যাধিক পরিশ্রম করে ক্লান্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। রাত ১টা বাজে , ঘুম আসছে না। অত বড় শোকের পরে ঘুম আসে কিভাবে? এক মাত্র সন্তান স্কুলে যাওয়ার পথে বাস চাপা পড়ে মারা গেছে। সারা দেশের ছাত্র ছাত্রীরা বিশেষ করে তার প্রয়াত সন্তানের সহপাঠীরা নিরাপদ সড়ক চাই বলে আন্দোলন করছে। সে সারাদিন এইসব বাচ্চাদের পানি খাইয়েছে।

বিছানায় শুয়ে সে তার অতীত জীবন নিয়ে ভাবতে ছিল। সে জানে না কে তার বাবা। তার কোন নিকট আত্মীয় স্বজন আছে কিনা? স্বামী সন্তান হারিয়ে এ দুনিয়ায় সে একা। বস্তিতে বেড়ে ওঠা শাহনাজ তার মাকে কতবার বাবার কথা জিজ্ঞাসা করেছে , মা কোন উত্তর দেয় নি। সে যখন বি এ পাস করল তখন পত্র পত্রিকায় খবর হল”বস্তির মেয়ে পরের বাড়িতে কাজ করেও বি এ উত্তীর্ণ”তখন থেকে সাংবাদিক সিরাজের সাথে তার পরিচয়। এক সময় তার সাথে ভালবাসা হয়ে যায়। সাংবাদিক সিরাজ তাকে বিয়ে করতে চায়। বিয়ের জন্য সিরাজের পীড়াপিড়ির কারণে শাহনাজ তার মাকে বাবার কথা বলতে জোর করে ধরল। মার কথা শূনে শাহনাজ পাথর হয়ে গেল।

সেপ্টেম্বর ৫, ১৯৭১ আমদের গ্রামে মেলেটারী ঢুকল। আমার বাবা মা আমাকে খাটের নিচে লুকাল।আমার বয়স তখন ১৫ , বিয়ে হয় নি। শোনা যায় পাক সেনারা যুবতী মেয়েদের ধর্ষণ করে। বাবা মা উঠানে জোরে জোরে কলেমা পড়তে ছিল। কারা যেন পাক সেনাদের বলেছে আমার দুই ভাই মুক্তি হয়েছে। পাক সেনারা আমার বাবা-মাকে জিজ্ঞাসা করল- ‌’তোমাদের জোয়ান দুই বেটা কাহা?’ বাবা মা কোন উত্তর দিতে পারল না। তারা এমন ভয় পেয়েছিল যে কথা বলতে পারছিল না। পাক আর্মিরা উঠানে বাবা মাকে গুলি করে মেরে ফেলল এবং ঘরে আগুন ধরিয়ে দিল। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। খাটের নিচে লুকিয়ে থাকা সম্ভব হল না। আমি ঘর থেকে বের হয়ে এলাম। আমাকে দেখে আর্মিরা উল্লাসে মেতে উঠল। আমার বাবা মায়ের লাশের সামনে তিনজন আর্মি আমাকে ভোগ করল। আমাকে তারা মারল না। তাদের সাথে নিয়ে গেল। গ্রাম থেকে আরও ৮জন মেয়েকে তাদের সাথে নিল। কাম্পের একটা টিনের ঘরে আরও ১০/১২ টা মেয়ের সাথে আমাদের রাখল। পাক আর্মিদের যখনই ইচ্ছা হত তখনই সবার সামনে যাকে ইচ্ছা তাকে ভোগ করত। তিনটা মেয়ে গলায় শাড়ি পেচিয়ে আত্মহত্যা করল। তাদের আত্মহত্যার পর আমাদের উপর অত্যাচার আরও বেড়ে গেল। খাওয়া দাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। পরনে কোণ কাপড় রাখা হল না। অতগুলো যুবতি মেয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ একই ঘরে থাকতে হত। আমরা আর মানুষ সন্তান নই সম্পূর্ণ পশুর জীবন পেলাম। ১৬ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে আমরা মুক্তি পেলাম।

গ্রামের বাড়িতে আসলাম। বাবা-মা তো মারা গিয়েছিল, দুইটা ভাই মুক্তিতে গিয়েছিল, সকলের ভাই ফিরে আসলেও আমার ভাইয়েরা ফিরে আসল না। আমাদের জমি জমা দূরের এক চাচা দখল দিল। তিনি আমাকে জায়গা দিয়েছিলেন কিন্তু আমি গর্ভবতী হওয়াতে তিনি আমাকে জানুয়ারি মাসে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। গ্রামের কেউ আমাকে জায়গা দিল না। আমি ঢাকাতে চলে আসলাম। এক বস্তিতে জুলাই মাসে তোর জন্ম হল। এরপর কত কষ্ট করতে হয়েছে। তিন মাসে ক্যাম্পের সব আর্মিরাই আমাকে উল্লাসে ভোগ করেছে, কি করে বলব কে তোর বাপ? অত্যাচারিত সব মেয়েদের বাপের নাম শেখ মুজিবুর রহমান লিখতে বলা হয়েছে কিন্তু তাদের পেটের বাচাদের বাবার নাম কী লেখা হবে তা বলা হয় নি। সিরাজকে সব খুলে বল , সব কিছু জেনে সে যদি তোমাকে বিয়ে করতে চায় তবে ভেবে দেখ কি করবে। তুমি বড় হয়েছ। সব কিছু জানার পরও সিরাজ আমাকে বিয়ে করতে চাইল। দেখ তোমার বন্ধু পরিচিত জনেরা তোমাকে আমাকে নিয়ে তামাশা করবে। শাহনাজ তোমাকে নিয়ে তামাশা করার কিছু নাই। তুমি বীরঙ্গনার সন্তান। তুমিই আমার জন্মভূমি রক্তাক্ত বাংলাদেশ।

সে আমাকে বিয়ে করল ঠিকই তবে সে তার বাবা মার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেয় নি। আমাকে নিয়ে আলাদা বাসায় থাকত। তবে আমরা সুখেই ছিলাম। সে ছিল একজন আদর্শ সাংবাদিক । যা সে সত্য বলে জানত তা থেকে কিছুতেই পিছপা হত না। এ নিয়ে অনেক হুমকি অনেক বিপদে গেছে। দেশের বিষয় নিয়ে রাতে সে আমার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার সাথে আলোচনা করত। ইদানিং সে বলত দেশের অবস্থা বিশেষ একটা ভাল নয়। গুপ্ত হত্যা গুম রাহাজানি বেড়েই চলেছে। গত জুলাই মাসের ১২ তারিখে রাত ১টার দিকে কলিং বেলের শব্দে দরজা খুললাম। পুলিশের পোশাক পরা ৪ জন বলল, তারা থানা থেকে এসেছে। একটা জরুরী বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিরাজকে তারা থানায় নিয়ে যাচ্ছে, সকালেই ফিরে আসবে। সকালে থানায় গেলাম, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানে না।সিরাজ নামের কোন সাংবাদিকের নাম তাদের জানা নাই।

আমি আমার স্বামীর নিখোঁজের বিষয়ে জি ডি করতে চাইলাম, তারা আমাকে কোনোরূপ সহযোগিতা করল না। একটা লোককে বাসা থেকে তুলে নিয়ে নিখোঁজ করা হল, একটা স্বাধীন দেশের পুলিশ কোন ভূমিকাই নিল না। শুনেছি ১৯৭১ সালে ১৪ ই ডিসেম্বরে পাক আর্মি ঢাকা শহরের বাসা থেকে বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে রায়ের বাজারে গুলি করে মারে। সিরাজকেও একইভাবে নিখোঁজ করা হল।একই ভাবে কলিং বেল বাজছে। শাহনাজ ভাবল আজ বুঝি তার পালা, তা না হলে এত রাতে কে আসবে। সে দরজা খুলতেই ৪/৫ জন কাপড়ে মুখ ঢাকা লোক তারউপর ঝাপিয়ে পড়ল এবংতাকে বেঁধে ফেলল। রাগে গদ গদ করতে করতে বলতে লাগল মাগী আন্দোলন করিস, চল আমাদের সাথে আন্দোলন ঢুকাই দিব। জোর করে তাকে তুলে নিয়েগেল। অত রাতে কি হল প্রতিবেশীরা কেও কিছু জানতে পারল না। বাড়িওয়ালা তিনদিন ধরে দরজায় তালা ঝুলতে দেখছে। উড়ো উড়ো গুজব শুনছে যে মহিলা শিক্ষিকা ছাত্র ছাত্রীদের আন্দোলনে সাহায্য করেছিল ধানমণ্ডির লেকে তার লাশ ভাসছে। সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বাড়িওয়ালা সাহস করে লাশটা দেখতে যায় নি। অজানা আতঙ্ক তাকে গ্রাস করে ফেলল । সে ধারণা করে নিল তিন তিন দিন ঘর তালাবদ্ধ তাহলে গুজবটা সত্য।

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/জুন ৩০,২০১৯)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর