thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬,  ১৪ জিলকদ  ১৪৪০

পদ্মা সেতুর 'কাটা মাথা' গুজব ছড়ালো যেভাবে

২০১৯ জুলাই ১২ ১৮:৫৮:৪৯
পদ্মা সেতুর 'কাটা মাথা' গুজব ছড়ালো যেভাবে

দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক: পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজে মানুষের কাটা মাথা লাগবে বলে সারাদেশে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। এই গুজবকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ‘ছেলে ধরা’ সন্দেহে মানুষকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটছে। এরইমধ্যে গুজব প্রতিরোধে মাঠে নেমেছে পুলিশ। এধরনের গুজবে কাউকে বিভ্রান্ত না হতে অনুরোধ করেছে পুলিশ সদর দফতর। গুজব প্রতিরোধ ও রটনাকারীদের গ্রেফতার করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাজ করছেন পুলিশের সাইবার গোয়েন্দারা।

পুলিশ সদর দফতর, সমাজকর্মী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, কুচক্রীমহল সব সময় ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। এই চক্রের কোনও কিছুই বিশ্বাস করা যাবে না।

গুজবকে কেন্দ্র করে পিটিয়ে হত্যা
ছেলে ধরা সন্দেহে ঢাকার মোহাম্মদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে এলাকাবাসী। মোহাম্মাদপুরে এক নারীকে একই সন্দেহে বেদম মারধর করা হয়। পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। এছাড়া, লক্ষ্মীপুর জেলার দালাল বাজারে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে পুলিশে দেয় জনতা। ঘটনার আগে ওই ব্যক্তি রায়পুর-লক্ষ্মীপুর সড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। ছেলে ধরা সন্দেহে মারধরের এরকম আরও খবর পাওয়া যাচ্ছে।

যেভাবে গুজব ছড়ালো
২০১৫ সালের ১ মার্চ নদীতে পশুর রক্ত ঢেলে পদ্মা সেতুর ভিত্তি স্থাপন কাজের উদ্বোধন করে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় মূল সেতুর পরীক্ষামূলক ভিত্তি স্থাপনের সময় নদীতে গরু ও খাসির রক্ত ঢালতে দেখা যায় চাইনিজ ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের। ভাসিয়ে দেওয়া হয় কয়েকটি মুরগিও। তাদের বিশ্বাস, বড় কাজের শুরুতে পশু উৎসর্গের মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, এড়ানো যায় বড় দুর্ঘটনা। তখন গণমাধ্যমেও এনিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সময়ের রক্তের ছবি এখন ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়েছে একটি মহল। অসাধু ফেসবুক ব্যবহারকারীরা মূল তথ্য আড়াল করে পুরনো সেই ছবিকে মানুষের রক্তের ছবি বলে চালাতে থাকে।

পুলিশের সূত্র বলছে, ২০১৬- ২০১৭ সালে এই চক্রটি চুপচাপ ছিল। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম এই গুজবের সূত্রপাত হয় । এরপর গত কয়েক মাস চুপচাপ থাকার এবছরের মার্চ মাস থেকে ফের শুরু হয় গুজব। বলা হয়, পদ্মা সেতু তৈরিতে মানুষের মাথা লাগবে। একটি চক্র এ ধরনের মনগড়া বক্তব্য দিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছে। পুলিশ সদর দফতর এই ব্যক্তিদের গ্রেফতারের চেষ্টা করছে।

গুজব ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেফতার ৫
এরইমধ্যে পদ্মা সেতুর নির্মাণ নিয়ে ফেসবুকে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঁচ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব।

শুক্রবার (১২ জুলাই) দুপুরে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক এএসপি মিজানুর রহমান ভূঁইয়া জানান, পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে গুজব ছড়ানোর দায়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) রাত পর্যন্ত পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরমধ্যে শহীদুল ইসলাম (২৫) নামে এক তরুণকে নড়াইল থেকে র‌্যাব-৬, আরমান হোসাইনকে (২০) চট্টগ্রাম থেকে র‌্যাব-৭, ফারুককে (৫০) মৌলভিবাজার থেকে র‌্যাব-১১ এবং রাজবাড়ীর পাংশা থেকে পার্থ আল হাসান (১৬) নামে এক কিশোরকে গ্রেফতার করেন র‌্যাব-৮ এর সদস্যরা।

গুজব প্রতিরোধে করণীয়
গুজব প্রতিরোধে সচেতন নাগরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পাল্টা সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর সুপারিশ করেছেন মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান। পাশাপাশি গুজবকারীদের বিষয়ে কঠোর হয়ে দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের আওতায় আনতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের গুজব মানুষ হত্যার হাতিয়ার। গুজব ছড়িয়ে মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটছে। এর আগে আমরা ধর্মসহ বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে মানুষ হত্যা করতে দেখেছি। কিন্তু এধরনের গুজব এই প্রথম। গুজবকারীদের যেভাবেই হোক ধরে আইনের আওতায় আনতে হবে। তার আগে তাদের সতর্ক করতে হবে। আমাদের ডিজিটাল আইনেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।’

এলিনা খান বলেন, ‘অভিভাবকদেরও মনে রাখতে হবে, এধরনের ভীতি যেন শিশুদের মনে না দেওয়া হয়। তাহলে শিশুরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ এটা সম্পূর্ণ গুজব বলেও মনে করেন তিনি।

পুলিশের হুঁশিয়ারি
পুলিশ সদর দফতর এ নিয়ে নাগরিকদের উদ্দেশে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘গুজবে বিভ্রান্ত হবেন না। পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা ও রক্ত লাগবে, এটা গুজব।’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা এধরনের গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও জানিয়েছে পুলিশ।

এছাড়া, পুলিশ এই গুজবের বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই বিকাল থেকে ফেসবুকে প্রচারণা শুরু করেছে। পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ ও গণমাধ্যম শাখার এআইজি সোহেল রানা বলেন, ‘কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা ও রক্ত লাগবে বলে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে। এটি পুরোপুরি মিথ্যা ও গুজব। এসব গুজবে কান না দেওয়ার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ জানানো হচ্ছে। এবিষয়ে গত ৯ জুলাই বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষও একটি নোটিশ জারি করেছে।’

পুলিশ সদর দফতর জানিয়েছে, পদ্মা সেতু দেশের সর্ববৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প। এ প্রকল্পের সঙ্গে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি জড়িত। একটি মহল এই উন্নয়ন ব্যাহত করতে এ ধরনের গুজব রটিয়ে দেশবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে, যা গুরুতর অপরাধ। অনেকে না বুঝেই এটি শেয়ার করে অপরাধের অংশীদার হচ্ছেন।

পুরো বিষয়টি নজরদারিতে রয়েছে উল্লেখ করে পুলিশের তরফে বলা হয়েছে— লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কিছু মানুষ এ গুজবের বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে, যাদের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত শত্রুতা আছে, তাদের নাম ও ছবি ব্যবহার করে, গুজব ছড়ানোর জন্য তাদেরকে দায়ী করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। যারা এবিষয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর গুজব ছড়াচ্ছেন, তাদের খুঁজে বের করতে এবং আইনের আওতায় আনতে পুলিশের বেশ কয়েকটি বিশেষ সাইবার গোয়েন্দা দল অনুসন্ধান তৎপরতা শুরু করেছে বলে জানান এআইজি সোহেল রানা।

তিনি বলেন, ‘দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির লক্ষ্যে এমন গুজব ছড়ানো একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই এধরনের গুজব না ছড়াতে এবং তাতে কান না দেওয়ার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ।’

পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচারণাকে ‘কুচক্রী মহলের গুজব’ বলে জানিয়েছে পদ্মা সেতু প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

এই গুজবের বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে মঙ্গলবার (৯ জুলাই) পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তার কাছে লেখা চিঠিতে এ তথ্য জানান।

ওই চিঠিতে বলা হয়, পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ পরিচালনায় মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি কুচক্রী মহল বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে অপপ্রচার চালাচ্ছে, তা প্রকল্প কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে।

আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এটি একটি গুজব। এর কোনও সত্যতা নেই। এমন অপপ্রচার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ জানাচ্ছি।

প্রকল্প পরিচালক চিঠিতে আরও জানান, গত ৩০ জুন পর্যন্ত মূল সেতুর বাস্তব কাজের অগ্রগতি ৮১ শতাংশ, নদীশাসন কাজের অগ্রগতি ৫৯ শতাংশ। এ প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৭১ শতাংশ।

(দ্য রিপোর্ট/আরজেড/জুলাই ১২,২০১৯)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর