thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৬ কার্তিক ১৪২৬,  ২১ সফর 1441

কাশ্মীরের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ছিনিয়ে নেয়া কতটা যৌক্তিক?

২০১৯ আগস্ট ০৭ ১২:২৭:২৬
কাশ্মীরের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ছিনিয়ে নেয়া কতটা যৌক্তিক?

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক: ভারতের মতো বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশে কট্টর হিন্দুত্ববাদী সরকারের দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসীন হওয়াটা যেমন অবাক করা বিষয় ছিল, কাশ্মীর প্রশ্নে তাদের বর্তমান সিদ্ধান্তও বিশ্ববাসীকে হতবাক করেছে। কাশ্মীর নিয়ে উপমহাদেশের রাজনীতি, ভূ-রাজনীতির টালমাটাল অবস্থা ১৯৪৭ সালের পর থেকেই। ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হওয়ার একেবারে ঊষালগ্নে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ হয়েছিল এই কাশ্মীর নিয়ে।

পাকিস্তানশাসিত ও ভারতশাসিত কাশ্মীরের বর্তমান যে মানচিত্র আমরা দেখতে পাই তা সেই যুদ্ধেরই ফল। ভারত বিভক্তির সময় ‘শেরে কাশ্মীর’ হিসেবে খ্যাত শেখ আবদুল্লাহ কাশ্মীরবাসীর জন্য পূর্ণ স্বাধীনতা চেয়েছিলেন। পরে বিশেষ মর্যাদায় স্বায়ত্তশাসন মেনে নিয়েছিলেন। তাই কাশ্মীর পেয়েছিল আলাদা পতাকা। আর কাশ্মীর সরকারের প্রধানকে বলা হতো ‘প্রধানমন্ত্রী’, ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলোর সরকার প্রধানদের মতো ‘মুখ্যমন্ত্রী’ বলা হতো না। জওহরলাল নেহেরু, বল্লবভাই প্যাটেলসহ ভারতীয় সংবিধান প্রণেতারা অখণ্ডতার স্বার্থেই এসব মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ৭০ বছরের ইতিহাস বদলে দিলো হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার।

ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ করে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ‘বিশেষ মর্যাদা’ বাতিল করা হয়েছে এবং কাশ্মীরকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ হবে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। উপত্যকায় থাকবে না আলাদা সংবিধান ও পতাকা। বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করা। লোকসভা ভোটে এই দাবি মেটানোর অঙ্গীকার ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, ভারতের অবৈধ সিদ্ধান্তে আঞ্চলিক শান্তি, সম্প্রীতি ও নিরাপত্তা নষ্ট হবে। কাশ্মীরবাসী হতবাক হয়েছেন কারণ তাদের কথা হচ্ছে- কাশ্মীরের বিশেষ সুবিধা তাদের অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। এটি বাদ দেয়ার অর্থ হলো রাজ্যটি তার স্বকীয়তা হারাবে, পতাকা হারাবে, যা কোনো জাতি প্রত্যাশা করে না। কেন্দ্রের সঙ্গে সমঝোতা করে গত ৭০ বছরে এই অনুচ্ছেদটি কেবল একটি কঙ্কাল হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়ে আসছে। তারপরও এই সাংবিধানিক অধিকার বাতিলের বিষয়টি জনগণকে ক্ষুব্ধ করবেই।

কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম জানান, সরকার যা করেছে তা দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য চরম বিপজ্জনক। এই সিদ্ধান্ত দেশকে টুকরো টুকরো করে দেয়ার প্রথম পদক্ষেপ। ইচ্ছে করলেই সরকার এখন যে কোনো রাজ্যকে তার ইচ্ছেমতো ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিতে পারে যা দেশের পক্ষে প্রকৃত ‘কালো দিন’। ভারতের অন্য রাজনৈতিক দল থেকে বিজেপি নিজেদের আলাদা দাবি করে এসেছে বরাবর। তিনটি বিষয়ে তারা কখনো তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সরেনি। ৩৭০ ধারা বাতিল, সারা দেশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রচলন ও অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির প্রতিষ্ঠা। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ অধিকার বাতিল করে তিনটি লক্ষ্যের একটি পূরণ করলো বিজেপি। বিরোধী শিবিরের ওমর আবদুল্লাহ, মেহবুবা মুফতি থেকে গুলাম নবি আজাদ এবং পি চিদাম্বরম থেকে ডেরেক ও ব্রায়েনরা বলেছেন, গণতন্ত্রকে হত্যা করলো সরকার এবং এই সিদ্ধান্ত অসাংবিধানিক।

গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অমরনাথের তীর্থযাত্রী এবং পর্যটকদের কাশ্মীর ছাড়ার নির্দেশ, অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের জেরে নানা জল্পনা কল্পনা চলছিল উপত্যকাজুড়ে। সব জল্পনার অবসান ঘটলো ৫ আগস্ট। প্রধানমন্ত্রী মোদির বাসভবনে মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশ বলে জম্মু-কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ ঘটানো হয় সেদিন। ফলে প্রত্যাহার করা হয় ওই ধারার অধীন ৩৫ ধারাও। ৩৭০ ধারারই একটি অংশ হাতিয়ার করে পার্লামেন্ট এড়িয়ে এমন সংস্থান করল শাসক দল, যাতে পদ্ধতিগত ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ না থাকে বিরোধীদের। ১৯৫০সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় ৩৭০ ধারায় জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হলেও সেই মর্যাদা স্থায়ী ছিল না, বরং সেটি ছিল ‘টেম্পোরারি প্রভিশন’ বা অস্থায়ী সংস্থান। এই ধারারই ৩ নম্বর উপ-ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি ইচ্ছা করলে এই ‘বিশেষ মর্যাদা’ তুলে নিতে পারেন। রাষ্ট্রপতির ওই ক্ষমতাকে ব্যবহার করেই কাজ হাসিল করলেন নরেন্দ্র মোদি। পার্লামেন্টে বিরোধীরা তুমুল হট্টগোল করেন কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এই বিরোধীতার মধ্যেই জম্মু-কাশ্মীর পুনর্গঠন সংক্রান্ত বিল-২০১৯ পাশ করা হয়। এর পক্ষে ভোট পড়ে ১২৫ আর বিপক্ষে ৬১।

জম্মু-কাশ্মীর দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত হবে। একটি লাদাখ ও অন্যটি কাশ্মীর। এর মধ্যে কাশ্মীরে আইনসভা থাকলেও লাদাখে থাকবে না। গত সাত দশক ধরে ৩৭০ অনুচ্ছেদের সুবাদে এই রাজ্যটি ভারতের অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে বেশি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত। ভারতের সংবিধান বিশেষজ্ঞ কুমার মিহির বলেন, কাশ্মীরের পুর্নগঠনের প্রস্তাবগুলো এখন পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের সুবাদে জম্মু-কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারাই এখানে জমির মালিক হতে পারতেন। এখন যে কেউ ঐ রাজ্যের জমি কিনতে পারবেন। কাশ্মীরে চাকরির জন্য এখন অন্য রাজ্যের বাসিন্দারাও আবেদন করতে পারবেন। পররাষ্ট্র, অর্থ ও প্রতিরক্ষার বিষয়টি আগের মতোই কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব এতদিন ছিল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর হাতে। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় রাজ্যটিতে কেন্দ্র থেকে সরাসরি নিয়ন্ত্রিত হবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের বিষয়গুলো। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে রাজ্যটি পারিচালনা করবেন একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর। ভারতের দলবিধি কিংবা স্থানীয় পেনাল কোড-এর ভবিষ্যত নিয়েও কেন্দ্রীয় সরকার কিংবা পার্লামেন্টকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রথা থাকবে কিনা সেটির প্রশ্নেও সিদ্ধান্ত নেবে ঐ দুটি প্রতিষ্ঠান। কাশ্মীরিদের দ্বৈত নয় একক নাগরিকত্ব থাকবে, অর্থনৈতিক ও সাধারণ জরুরি অবস্থা কার্যকর হবে, সংখ্যালঘুরা সংরক্ষণের আওতায় আসবেন এবং তথ্য অধিকার আইন কার্যকর হবে।

কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি এবং ওমর আবদুল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কাশ্মীরস পিপলস কনফারেন্সের দুই নেতা সাজ্জাদ লোন এবং ইমরান আনসারিকেও বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু কোথায় তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে জানা যায়নি। সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কোথাও কারফিউ, আবার কোথাও ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। জনগণকে রাস্তায় বের হতে দেয়া হচ্ছে না। রাস্তায় শুধু সেনাবাহিনী আর পুলিশ টহল চলছে আর জায়গায় জায়গায় জনগণ রাস্তায় নামলেই বেদম পেটানো হচ্ছে। ২৯ জুলাই জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের পক্ষ থেকে রাজ্যের সব মসজিদ ও তাদের পরিচালন সমিতি সম্পর্কে রিপোর্ট তলবা করা হয়। সেদিন থেকেই সবাই বুঝতে শুরু করে যে ৩৭০ ও ৩৫(ক) ধারা বাতিল করার রাস্তায় হাঁটছে বিজেপি সরকার।

কাশ্মীরের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এমন যে দেশটির তিনদিকেই রয়েছে পরমাণু শক্তিধর তিনটি দেশ- ভারত, পাকিস্তান ও চীন। আর কাশ্মীর প্রকৃত অর্থে এই তিন দেশের মধ্যেই বিভক্ত। ফলে কাশ্মীর এখন কেবল ভারত ও পাকিস্তানের ইস্যু নয়, চীনের কাছেও বিরাট বিষয়। কাশ্মীরের এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্যও চিন্তার বিষয়। তারা বহুদিন ধরে আসামের বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীকে ‘বাংলাদেশী’ আখ্যা দিয়ে আসছে। তাদের যদি জোর করে ঠেলে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়, সেটি বাংলাদেশের জন্য বিরাট হুমকি। আর কাশ্মীর পরিস্থিতি ঘিরে উপমহাদেশে যে উত্তেজনা দেখা দিবে তার ঢেউ বাংলাদেশেও আসতে পারে।

আমাদের স্বাধীনতা লাভের পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শুরু হয় ‘পারমাণবিক শক্তি পরীক্ষার খেলা’। দুটি দেশেরই বৃহৎ এক জনগোষ্ঠী অপুষ্টির শিকার, দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে। ভারতের প্রায় ষাট শতাংশ জনগণ রাস্তার পাশে মল ত্যাগ করে। পাকিস্তানের বহু মানুষ এখনও একবেলা, দুবেলা আহার করে। অথচ দুটি দেশই এই কাশ্মীরের জন্য কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে প্রতিরক্ষাখাতে। জনগণকে তাদের মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত রেখে শাসকগোষ্ঠী জুজুর ভয় দেখিয়ে তাদের অমিত্ব ও অহমিকা পুষে রাখার জন্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে অর্থ ব্যয় করে সামরিক খাতে। আর সেই সুবাদে পাকিস্তানের সারাজীবনই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সেনাবাহিনী দেশের ক্ষমতা দখল করে রেখেছে। ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক জনগণকে বঞ্চিত রেখে সামরিক খাতকে দিনকে দিন শক্তিশালী তারা করেছে।

১৯৬৫ সালেও ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এই কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ হয় এবং তার ফল ‘জিরো সাম’। সর্বশেষ নাটকটি হয়েছিল ভারতীয় অংশের পুলওয়ামায় আত্মঘাতী হামলার মধ্য দিয়ে। তারপর পাকিস্তানের বালাকোটে ভারতীয় বিমানবাহিনীর হামলা, বৈমানিক আটক। এখন কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদ রদ করা হলো। ধীরে ধীরে স্বাতন্ত্র্য হারাতে হচ্ছে কাশ্মীরকে। কাশ্মীরের এই পরিস্থিতি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আরেকটি যুদ্ধের আশঙ্কও তৈরি করেছে। আবার ১৯৬২ সালে চীন ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধেও কাশ্মীরের মানচিত্র আরেক দফা বদল হয়। লাদাখের কিছু অংশ চীনের দখলে, তারা সেটিকে বলে আকসাই চীন। বর্তমানে লাদাখের যে সীমানা রয়েছে, বেইজিং সেটি মানে না। তারা মনে করে লাদাখ হচ্ছে তিব্বতের অংশ। অর্থাৎ কাশ্মীরসংকট ত্রিমুখী। এই সংকট শুধু ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এতে জড়াবে আর এক পারমাণবিক শক্তি চীন। তাই প্রশ্ন উঠেছে ভূ-স্বর্গখ্যাত কাশ্মীরের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে উপমহাদেশকে অস্থিতিশীল করে সেটি সামাল দেয়ার সামর্থ্য বিজেপির থাকবে কিনা।

(দ্য রিপোর্ট/আরজেড/আগস্ট ০৭, ২০১৯)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশ্ব এর সর্বশেষ খবর

বিশ্ব - এর সব খবর