thereport24.com
ঢাকা, সোমবার, ৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬,  ১০ রবিউস সানি 1441

সালমান শাহর ওপর যত সন্ত্রাসী হামলা

২০১৯ সেপ্টেম্বর ০৬ ১৯:৩৬:০৯
সালমান শাহর ওপর যত সন্ত্রাসী হামলা

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক: ১৯৯৫ এর ২৯ জুলাই তখনকার সময়ের বহুল পঠিত একটি দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ ছাপা হয় যার শিরোনাম ছিল, নায়ক সালমান শাহ’র প্রাণনাশের চেষ্টা: অভিনয় থেকে বিদায় নিতে পারেন।

ঢাকার তেজতুরী বাজার এলাকায় একটি প্যাকেজ নাটকের শুটিং চলাকালে মাসুম নামের এক যুবক সালমান শাহকে ছুরিকাঘাতের চেষ্টা চালায়। শুটিং ইউনিটের লোকজন ও আশেপাশের লোকজন সেখানে দ্রুত ছুটে আসে এবং ছুরিসহ ছেলেটিকে আটক করে। পরবর্তীতে তাকে ছুরিসহ তেজগাঁও থানায় সোপর্দ করা হয়। থানায় একটি মামলাও হয়। যুবকটি শাসিয়ে গেছে, তাকে কেউ আটকিয়ে রাখতে পারবে না। রাজনীতি করে। দলের নেতারাই তাকে ছাড়িয়ে আনবে। তারপর সে দেখে নিবে সালমান শাহকে। এই ঘটনার পর ১ আগস্ট ১৯৯৫ সালমান শাহপ্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করে সরকার, প্রশাসন ও দেশবাসীর কাছে নিজের জীবনের নিরাপত্তার দাবি জানান। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলে সালমান শাহ অভিনয় থেকে সরে দাঁড়াবে বলে হুশিয়ারিও দেন।

একরাতে সালমান শাহকে ফোন করে ধানমণ্ডি ঈদগাঁ মাঠের কাছে ডেকে এনে একদল সন্ত্রাসী ক্যাডার বাহিনী সালমানের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। তাদের একজন সালমান শাহকে ছুরি মারতে এগিয়ে এলে সেই ছুরি ঠেকাতে গিয়ে সালমানের হাতের তালু কেটে যায়। সেইসময় কয়েকটা গাড়ি নির্জন রাস্তায় মোড় ঘুরে। গাড়ির হেডলাইটের আলো দেখে সন্ত্রাসীরা দ্রুত সটকে পড়ে বলে সে যাত্রায় সালমান শাহ প্রাণে রক্ষা পায়।

২৩ আগস্ট সামিরার জন্মদিন। স্ত্রী সামিরার জন্মদিনে তাকে চমক দেয়ার জন্য সালমান ২২ আগস্ট রাতে চট্টগ্রাম শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার সময় সামিরাদের বাড়ির কাছাকাছি এলে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন। তবে সেখানে হৈচৈ শুনে দ্রুত লোকজন উপস্থিত হতেই সন্ত্রাসীরা কেটে পড়েন।

অল্পতেই সালমান শাহ সফলতার মুখ দেখেছেন, ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছেন ও প্রচুর টাকা, সম্পদের মালিক হয়েছেন। আর তাই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির কেউ কেউ সালমান শাহ’র সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে ঘিরে নানা নোংরা রাজনীতির নোংরা খেলায় মেতে উঠেছিলেন। নায়িকা মৌসুমীর সাথে সিনেমায় অভিনয় না করার ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই সালমান শাহ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আনন্দ মেলার কর্তাব্যক্তিদের নানা আক্রোশের শিকার হতে থাকেন বলে তখনকার পত্র পত্রিকায় এসেছে। সেই সময় তাদের প্ররোচনায় সালমানের বিরুদ্ধে নানা মনগড়া, বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করে কয়েকটি সিনে পত্রিকা বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি সিনে পত্রিকা তো সালমান শাহ-শাবনুরের বিয়ের খবরও ছাপে।

কোনোভাবেই এই চক্রান্তকারীরা সালমান শাহকে দমাতে না পেরে তার সাজানো সংসারে বিষদৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিল। সালমান শাহ জীবিত থাকতে প্রায়ই কাছের মানুষদেরকে বলতেন, ‘চক্রান্তকারীরা বুঝতে পেরেছে আমার একমাত্র সুখের জায়গা, একমাত্র শান্তির জায়গা আমার ঘর, আমার সংসার, আমার স্ত্রী। আমার সংসার শেষ করা গেলেই আমাকে শেষ করা যাবে। সব চক্রান্ত ব্যর্থ হবার পর এবার তারা আমার সংসারের দিকে বিষদৃষ্টি নিক্ষেপ করেছে।’

সালমান শাহ-মৌসুমী জুটির পর সালমান শাহ-শাবনুর জুটি ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পায় বলেই নির্মাতারা এই জুটিকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণে বেশ আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এই সুযোগে চক্রান্তকারীরা সালমান শাহ-শাবনুরকে নিয়ে নানা মুখরোচক গল্প তৈরি করে তা প্রচার করতে থাকেন। সালমান শাহকে জব্দ করতে, তার ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে একটি চক্র যে উঠেপড়ে তার পেছনে লেগেছিল তার বড় প্রমাণ মিলবে তার মৃত্যুর কয়েকমাস আগে নানা পত্রিকা, ম্যাগাজিনে প্রকাশিত সেই মুখরোচক সংবাদ দেখলে।

শুটিং শেষে সালমান শাহ কখন কোথায় ঘুরতে যেতেন বা শাবনুরের সাথে কয় টেকে একটি রোমান্টিক দৃশ্য শুট হত তার বিস্তারিত সামিরার কানে পৌঁছে দিয়ে তার কানভারী করা হত। আর এই কাজটি চক্রান্তকারীদের হয়ে খুব কৌশলে করতেন একটি নারী কণ্ঠ। যাতে সালমানের সুখের সংসারে দুঃখের আগুন জ্বালিয়ে ফাটল ধরানো যায় ও তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা যায়।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিষয়ে সালমান শাহ’র এক মন্তব্যকে অতিরঞ্জিত করে পত্রিকায় প্রকাশ করে দেয় আনন্দমেলার পোষা সাংবাদিক। ঐ মন্তব্যকে ঘিরে শিল্পী সমিতির তৎকালীন সভাপতি আহমেদ শরীফ খুব হৈচৈ শুরু করেন। সমিতির কার্যালয়ে এসে সালমান শাহকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে এমন হুশিয়ারিও দেন। নইলে তাকে বয়কট করা হবে। সালমান শাহ বলেন, ‘পত্রিকায় যেভাবে অতিরঞ্জিত করে ছাপা হয়েছে আমি সেভাবে বলিনি, তাই ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসেনা।’ এরপর তুচ্ছ এই কারণ দেখিয়ে শিল্পী সমিতি চরম ব্যস্ততম নায়ক সালমান শাহকে দুই সপ্তাহের জন্য বয়কট করেন। অথচ যাকে ঘিরে এই মন্তব্য সেই অভিনেতা আলমগীর সাহেব সালমানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই করেনি। এভাবেই একজন দর্শকপ্রিয় নায়কের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে কোণঠাসা করার নানা আয়োজনে লিপ্ত ছিলেন চক্রান্তকারীরা।

যে নায়ককে ঘিরে ইন্ডাস্ট্রি সংশ্লিষ্ট কিছু মানুষ এত এত নোংরা রাজনীতিতে লিপ্ত ছিলেন। যাকে হত্যা করার জন্য তিনবার তার উপর সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছিলেন, সেই নায়ক জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থেকেও নিজ ঘরে সিলিং ফ্যানের সাথে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন কেউ কেউ কোন যুক্তিতে এমন কথা বলেন!

সালমান শাহকে সিলিং ফ্যানের সাথে গলায় দড়ি দেয়া অবস্থায় ঝুলন্ত পাওয়া গেছে এমন কথা বলেছেন তার ব্যক্তিগত সহকারী আবুল, বাসার কাজের লোক ডলি, মনোয়ারা ও সালমান শাহ পত্নী সামিরা। তারাই ঝুলে থাকা সালমানের বডি বটি দিয়ে দড়ি কেটে নিচে নামিয়ে এনেছিলেন। অথচ সালমানের বাবা-মা, ছোটভাই, স্বজন বা ইস্কাটন প্লাজায় বসবাস করা প্রতিবেশীদের কেউ এমনকি প্রশাসনের কেউই সিলিং ফ্যানের সাথে বডি ঝুলতে দেখেনি। এখন বলুন, এরা যে সত্যি কথা বলছে তার কি প্রমাণ আছে?

সালমান শাহ’র ফ্ল্যাট থেকে পুলিশ ফাঁস নেয়ার দড়ি, একটি বটিদা, একটি এন্টি কাটার, একটি বালিশ ও একটি বালতি আলামত হিসেবে উদ্ধার করেছিলেন। অথচ যেই সিলিং ফ্যানের সাথে সালমান শাহকে ঝুলন্ত পাওয়া গেছে বলা হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত সেই সিলিং ফ্যানটি পুলিশ জব্দ করেনি! সেই সিলিং ফ্যানটি এখনো সালমান শাহ পরিবারের হেফাজতেই আছে। গুরুত্বপূর্ণ এই আলামত কি সালমান শাহ পরিবারের কাছে থাকার কথা ছিল?

সালমান শাহকে নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে যে কত ধরণের গুজব রটানো হয়েছে, মনগড়া ও বানোয়াট সংবাদ ছাপা হয়েছে তার প্রমাণ মিলবে সালমানের মৃত্যুর কয়েক মাস (জুন, জুলাই, আগস্ট) আগের কয়েকটি সিনে ম্যাগাজিন, পত্রিকার পাতা উল্টালেই।

(দ্য রিপোর্ট/আরজেড/সেপ্টেম্বর ০৬,২০১৯)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জলসা ঘর এর সর্বশেষ খবর

জলসা ঘর - এর সব খবর