thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২০, ২২ শ্রাবণ ১৪২৭,  ১৭ জিলহজ ১৪৪১
শফিউল আজম মাহফুজ

কবি ও অনুবাদক

গ্রন্থ আলোচনা

দ্বিপায়ন মল্লিকের 'পাথরে সাজিয়ে তুলিস'

২০২০ মে ০৭ ১৭:০৮:৪৭
দ্বিপায়ন মল্লিকের 'পাথরে সাজিয়ে তুলিস'

কবিতাকে বলা হয় শুদ্ধতম শব্দের সুন্দরতম বিন্যাস। হৃদয়ের উপচে পড়া ভাবাবেগ নিয়ে অনেক তরুন-ই ভাষার সৌকর্যে সাজাতে চায় তার নিজস্ব কথামালা। তেমন-ই এক অনবদ্য প্রয়াস দ্বিপায়ন মল্লিকের 'পাথরে সাজিয়ে তুলিস'।

সদ্য সমাপ্ত একুশের বইমেলাকে সামনে রেখে খড়িমাটি প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয় এই কবিতার বই। এটি কবি দ্বিপায়ন মল্লিকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। প্রতিবছরই নতুন নতুন কবিতার বই নিয়ে হাজির হয় অনেক নতুন নতুন মুখ। সেসব বইয়ের কোন আলোচনা হয়না, পর্যালোচনা হয়না। কবির হৃদয়ের পাশাপাশি সেইসব কবিতার বই স্থান করে নেয় তার ব্যাক্তিগত শেলফে অথবা অনাদরে পড়ে থাকে প্রকাশকের গোডাউনে। বন্ধু প্রতিম যে দু' একজন কিনে নেয় বইটি তারাও প্রায়শঃই অপঠিত অবস্থায় সাজিয়ে রাখে তাদের 'বুক-শেলফে'। 'পাথরে সাজিয়ে তুলিস' কাব্যগ্রন্থটির ভাগ্যে কী ঘটে তা সময়ের বিচার্য।

কবি দ্বিপায়ন মল্লিক আমার বন্ধু, সহপাঠী এবং সমবয়সী। অনেকটা সমান্তরাল জীবন-যাপন আমাদের। দ্বিপায়ন ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে পড়েছেন দীনবন্ধু এন্ড্রুজ কলেজ কলকাতায়, আমিও ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে পড়েছি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। দু'জনের কৈশোর-ই কেটেছে বন্দর এলাকার পোর্ট কলোনীর মনোরম পরিবেশে। এতকিছুর পরও দু'জনকে সমমনা হয়তো বলা চলেনা, ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে পড়ার সময় আমি বেশ তাড়িত হই পশ্চিমী দর্শন, পোস্ট মডার্ন থিউরিজ এবং নানা 'ইজম' দ্বারা। সে তুলনায় কবি দ্বিপায়ন মল্লিককে আমরা পাই অনেক বেশি শেকড় সন্ধানী, অনেক বেশি ধ্রুপদী হিসেবে।

কথা না বাড়িয়ে, আমরা আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করি কবিতার 'টেক্সটের' উপর। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের মতন ছাপ্পান্নটি কবিতা দিয়ে পসরা সাজিয়েছেন কবি। যে কবিতাটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে এবং যে কবিতাটির সাথে আমি সবচাইতে বেশি সম্পৃক্ত হতে পেরেছি তা হলো 'অচেনা শহর' কবিতাটি। নিজেই পরখ করে দেখুননা খানিকটা-

"স্মৃতির প্রতিটি মোড়ে

পৌরসভা শাবল চালাচ্ছে প্রিয়তম,

এ শহর মুছে দিচ্ছে আমাদের

গল্পের প্রতিটি দাঁড়ি, কমা

আর টুকরো টুকরো সেমিকোলন,

অন্তত কিছু পুরনো সাইনবোর্ডে

লেখা থাকুক কোনো মৃত রোদের স্বরলিপি,

অন্তত কিছু ইতিহাস ঘিরে থাকুক

নভেম্বরের শীতের মতো।"

এই কবিতায় আমাদের দেখা পুরনো চট্টলা শহরের জন্য গভীর আবেগ রয়েছে। গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে আমরা চট্টলাকে দেখছি, চট্টলা বলতে চট্টগ্রাম শহরকেই বোঝাচ্ছি। আহা কত স্মৃতি এ শহরের অলিতে গলিতে। সেই অসাধারণ স্মৃতিগুলো আমাদের খুব গভীরে প্রোথিত, আমাদের যাপিত জীবনের স্মারক, আমাদের হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ এবং তুমুল বন্ধুত্বের স্মৃতিসৌধ। সেই স্মৃতিতে যখন উন্নয়নের শাবল পড়ছে তখন আমাদের হৃদয় মথিত হচ্ছে, আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। যেনোবা ভেংগে দেওয়া হচ্ছে আমাদের স্মৃতির মাজার, যেই মাজারের একনিষ্ঠ খাদেম আমরা।

এই কবিতা আমাকে নিশ্চিত ভাবেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছে সৈয়দ শামসুল হকের সেই অবিস্মরণীয় দীর্ঘ কবিতা 'আমার শহর' কে। কী অসাধারণ সেই মহাকাব্যিক বয়ান! কবিতার লাইনে লাইনে আমিও স্বাপ্নিক ভ্রমনে নেমেছিলাম আর আবিষ্কার করেছি ঢাকা শহরের ইতিহাস-ঐতিহ্য। কবির সাথে আমিও আবেগে আপ্লুত হয়েছিলাম, বেদনায় কুঁকড়ে গিয়েছিলাম সেই পুরনো ঢাকার জন্য। আজ আবার তুমুলভাবে আলোড়িত হলাম দ্বিপায়ন মল্লিকের 'অচেনা শহর' কবিতাটি পড়ে। জানি গভীরতা কিংবা ব্যাপ্তি কোনভাবেই হয়তো 'অচেনা শহর' 'আমার শহর' এর সাথে তুলনীয় নয়, তবু আমার মনে এই ছোট্ট কবিতাটি গভীর দাগ ফেলেছে।

বুকে গ্রামের স্মৃতি নিয়েও দ্বিপায়ন-কে বলা যায় নাগরিক কবি, নগর জীবনের ছলা-কলা, মেকিভাবের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ছবক আছে 'স্বরলিপি' কবিতাটিতে।

"এটাই তো সিনেমা, ডিয়ার

মিথ্যা তুমি শুনতে চাচ্ছ না

সত্যি আমি বলতে চাচ্ছি না

চলো মাঝখানে কোনো সন্ধিতে

ঝুলে পড়ি, সাথে ধিন তাক ধিন তাক,

ভালোবাসা নাই থাক, থাকুক কিছু

কাগজের বোঝাপড়া যেমন সকালে

অফিসে ঠেলে দেবে, ব্যাগে দেবে টিফিন

ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দেবে আধা ইঞ্চি হাসি

দুপুরে নিয়ম মেনে কল, বিকালে সূর্যটা

ডেস্ক ছেড়ে ঘরে ফিরলে দিও

কোয়ার্টার কাপ চা প্লাস দুইটা

মন ভেজানো বিস্কুট যাতে

প্রতিবেশী বুঝে নেয়, এরা বিবাহের

স্বরলিপি জানে।"-সামাজিক যোগাযোগের এই সময়ে আমরা দিনে দিনে বেশ পটু হয়ে উঠেছি আমাদের প্রকৃত আনন্দ-বেদনাকে লুকানোয়। পাঁজর ভাংগা দুঃখ বুকে নিয়েও নিঁখুত জীবনের অভিনয় করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত, অসাধারণ গানিতিক দক্ষতায়। তারই এক মনোমুগ্ধকর বয়ান 'স্বরলিপি' কবিতাটি।

শেষ করবো গ্রন্থের শেষ কবিতাটি দিয়ে যা এই কাব্য গ্রন্থের নাম কবিতাও বটে, 'পাথরে সাজিয়ে তুলিস'।

"তোর সাথে এত ঘোরতর

বন্ধুত্ব বেঁধে যাবে বুঝিনি।

একদিন না দেখলে

চোয়াল ঝুলে যায়

পাকস্থলী চমকায়।"

জানি এই কবিতা আমাকে নিয়ে লেখা নয় কিন্তু বন্ধুত্ব আর আড্ডা এই দু'ই হচ্ছে আমার জীবনের অন্যতম অনুসংগ। কবিতাটি শেষ হয়েছে আরও অসাধারণ ভাবে!

" যে কয়টি গল্প এনেছিলাম বুকপকেটে,

সব গুনে নিতে চাই গোল করে বসা

সবুজ আড্ডায়।

যে কয়টি ডানপিটে দিন বর্শা শেখাল,

যে কয়টি প্রবল রাগ মৌনমিছিল

সব যুদ্বের লুট তোকে এনে দেবো।

তুই শুধু পাথরে সাজিয়ে তুলিস

আমার খোদাই।"

দিনশেষে আড্ডা আর চিরকালীন বন্ধুত্বই যেনো শেষকথা। কবি জীবনানন্দের যেমন বনলতা সেন তেমনি কবি দ্বিপায়ন মল্লিকের শেষ আশ্রয়স্থল প্রিয় বন্ধুরাই। বন্ধুত্বের জয় হোক, জয় হোক কবিতার। পাথরে সাজিয়ে তুলিস কাব্যগ্রন্থটি টিকে যাক। বুক-শেলফের অনালোকিত কোনায় নয়, থেকে যাক পাঠকের ভালোলাগায়; পাঠকের ভালোবাসায়।

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/ মে ০৭,২০২০)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর