thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২ আশ্বিন ১৪২৮,  ৯ সফর 1443

বেকায়দায় পড়ে এখন হাঁটা ছাড়া গতি নেই তাদের!

২০২১ জুলাই ২৩ ১৩:০১:১০
বেকায়দায় পড়ে এখন হাঁটা ছাড়া গতি নেই তাদের!

দক্ষিণবঙ্গের লঞ্চগুলো ভোর ৬ টার পর ঢাকা পৌঁছাবে জেনেও প্রশাসন কেনো সেগুলো ছাড়ার আগে বন্ধ করলো না? যদি সেগুলো বন্ধ করে দিতো, তাহলে আমরা লকডাউনে ঢাকায় আসতাম না এবং এই ভোগান্তির মধ্যে পড়তাম না! আমি বরিশাল থেকে এসেছি, আমার বাসা গাজীপুরে। এখন আমি কেমন করে স্ত্রী আর ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে বাসায় যাবো! হাঁটা ছাড়া গতি দেখছি না। এভাবেই ক্ষোভ ঝাড়ছিলেন বরিশাল থেকে আসা যাত্রী জাহাঙ্গীর আলম।

কেবল এই জাহাঙ্গীর আলম নয়, রাজধানীর রাজপথ ধরে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ সময়ব্যাপী হাঁটতে থাকা তার মতো হাজার হাজার যাত্রী দক্ষিণবঙ্গ থেকে লঞ্চে এসে বেকায়দায় পড়েছেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর সড়কে সড়কে নারী পুরুষ এমনকি শিশুরাও ভারি ভারি ব্যাগ ও বোঝা নিয়ে মাথায় কিংবা কাঁধে নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে চলছেন।

এমনও দেখা গেছে- ভারি ভারি ৬/৭ টি বোঝা বাঁশের করে নিয়ে গন্তব্যের হেঁটেই ছুটে চলছেন ঢাকায় ফেরত যাত্রীরা। গতকাল জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের হুঁশিয়ারির প্রেক্ষিতে সড়কে কোনো ধরণের গণপরিহন দেখা যাচ্ছে না আজ। মাঝে মাঝে দু’একটা রিকশা দেখতে পাওয়া গেছে। তবুও সেগুলো স্বল্প দূরত্বে ভাড়া টানছে। পথচারীদের কেউ কেউ রিকশা পরিবর্তন করে ভেঙ্গে ভেঙ্গে দুরের গন্তব্যে যাচ্ছেন।

সরকার ঘোষিত কঠোর লকডাউন শিথিল থাকার সুযোগে ঈদ উদযাপন করতে রাজধানীর ঢাকার অনেকেই গিয়েছিলেন গ্রামের বাড়িতে। তাদের মধ্যে একটা ধারণা ছিল সরকার হয়তো এই শিথিল থাকার সময় কিছুটা বাড়াবে তবে তা করেনি সরকার। উল্টো কেবল কঠোর লকডাউন নয়, ‘সবচেয়ে কঠোর লকডাউন’ ঘোষণা এসেছে।

সেই ঘোষণা অনুযায়ী ঈদের ছুটি শেষে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আজ শুক্রবার থেকেই দেশজুড়ে আবার দুই সপ্তাহের লকডাউন শুরু হয়েছে। মানুষের অবাধ চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে এবারের বিধিনিষেধ ‘সবচেয়ে কঠোর’ হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন।

প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, শুক্রবার (২৩ জুলাই) ভোর ৬টা থেকে ৫ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) রাত ১২টা পর্যন্ত চলমান থাকবে এই কঠোর অবস্থা। এর আগেও বিষয়টি গত ১৩ জুলাই মন্ত্রিপরিষদের প্রজ্ঞাপনে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল।

ঢাকায় ফিরে গাড়ি না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বেসরকারি চাকরিজীবী সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, ‘সদরঘাট থেকে এসেছি। আমার গ্রামের বাড়ি ভোলা। আমার কথা হচ্ছে- দেশের প্রয়োজনে লকডাউন দিচ্ছে সরকার। নিশ্চয়ই এটা আমাদের ভালোর জন্য। আসলে সিস্টেমটা হওয়া উচিত ছিল পজিটিভলি। আমার অফিস খোলা। কোম্পানি আমাকে ছুটি দিচ্ছে না। চাকরি চলে যাবে আমি যদি ঢাকায় না আসি। আমাকে তো অফিসে আসতেই হবে। যদি সাধারণ সিটি থেকে সবকিছু বন্ধ করে দিত তাহলে আমরা আসতে পারতাম না। মন্ত্রী-এমপিরা তো আরামে আছেন। আমরা যারা খেটে খাওয়া মানুষ, আমরা আছি বিপাকে। আমরা তো কেউ ঢাকায় পিকনিক করতে আসি নাই। যা করবে একটা নিয়মের মধ্যে রেখে করা উচিত।’

উল্লেখ্য, বিধিনিষেধ চলাকালে ‘অতি জরুরি’ প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বের হওয়া যাবে না। বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বুজিবি ও আনসার বাহিনী মাঠে তৎপর রয়েছে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আগের বিধিনিষেধের মতোই এবারের বিধিনিষেধে সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস, সড়ক, রেল ও নৌপথে গণপরিবহন, অভ্যন্তরীণ উড়োজাহাজসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। সরকারি কর্মচারীরা নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করবেন। দাপ্তরিক কাজ ভার্চ্যুয়ালি সম্পন্ন করবেন।

শপিং মল, মার্কেটসহ সব দোকানপাট, সব পর্যটনকেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার ও বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ থাকবে। বিধিনিষেধে সব ধরনের শিল্পকারখানা বন্ধ থাকবে। তবে, আগের বিধিনিষেধের সময় শিল্পকারখানা খোলা ছিলো।

আইনশৃঙ্খলা ও জরুরি পরিষেবা যেমন, কৃষিপণ্য-উপকরণ, খাদ্যশস্য-খাদ্যদ্রব্য পরিবহন বা বিক্রি, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, করোনার টিকাদান, ফায়ার সার্ভিস, টেলিফোন, ইন্টারনেট (সরকারি-বেসরকারি), গণমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া), বেসরকারি নিরাপত্তাব্যবস্থা, ডাকসেবা, ব্যাংক, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ অন্যান্য জরুরি বা অত্যাবশ্যকীয় পণ্য-সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মচারী ও যানবাহন প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে যাতায়াত করতে পারবে। কাঁচাবাজার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে।টিকা কার্ড প্রদর্শন সাপেক্ষে টিকা গ্রহণের জন্য যাতায়াত করা যাবে। খাবারের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খাবার বিক্রি (অনলাইনে কেনা বা খাবার নিয়ে যাওয়া) করতে পারবে।

আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু থাকবে। বিদেশগামী যাত্রীরা তাদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণের টিকিট বা প্রমাণ দেখিয়ে গাড়িতে যাতায়াত করতে পারবেন।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ঘোষণায় বলা হয়, বিধিনিষেধ চলাকালে ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সেবা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করবে। যা ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে।

বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয় খোলার বিষয়ে অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আদালতসমূহের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করবেন।

কোরবানির পশুর চামড়া পরিবহন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কঠোর বিধিনিষেধের আওতার বাইরে থাকবে। খাদ্য ও খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণ মিল-কারখানা এবং ওষুধ, অক্সিজেন ও কোভিড-১৯ প্রতিরোধে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদনকারী শিল্পও এই বিধিনিষেধের আওতার বাইরে থাকবে।

কঠোরতম বিধিনিষেধ চলাকালে ব্যাংক খোলা থাকবে। তবে লেনদেন চলবে সীমিত সময়ের জন্য। ঈদের ছুটি শেষে ব্যাংকগুলো আগামী রোববার থেকে গ্রাহক চাহিদামতো শাখা খোলা রাখবে। আর লেনদেন হবে সকাল ১০টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত। কঠোরতম বিধিনিষেধের মধ্যে ব্যাংকিং সেবা চালু রাখা নিয়ে ১৩ জুলাই এক প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারা জানায়, সাপ্তাহিক ছুটির দিন ব্যতীত বিধিনিষেধ চলাকালে সীমিত পরিসরে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

আজ সকাল থেকে ফেরিতে যাত্রীবাহী সব ধরনের গাড়ি ও যাত্রী পরিবহন বন্ধ থাকবে। তবে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে শুধু জরুরি পণ্যবাহী গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স পারাপার করা হবে। বিআইডব্লিউটিসি এ-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ২৩ জুলাই সকাল ৬টা থেকে ৫ আগস্ট দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ নৌপথে সব ধরনের যাত্রীবাহী নৌযান (লঞ্চ, স্পিডবোট, ট্রলার ও অন্যান্য) চলাচল বন্ধ থাকবে।

করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণে সরকার চলতি বছরের ৫ এপ্রিল থেকে ধাপে ধাপে বিধিনিষেধ দিয়ে আসছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনও বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ বিধিনিষেধ জারি করে। তবে এখন পর্যন্ত করোনা নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

(দ্য রিপোর্ট/আরজেড/২৩জুলাই, ২০২১)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর