thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫,  ১০ মহররম ১৪৪০
কাওসার আজম

দ্য রিপোর্ট

ওদের চোখে স্বাধীনতা দিবস

২০১৪ মার্চ ২৬ ১৭:০৫:২৬
ওদের চোখে স্বাধীনতা দিবস

বুধবার সকাল পৌনে ৯টা। জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডের দিকে তখন মানুষের স্রোত। ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের ৪৩তম বছর পূর্তির এই দিনে লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গেয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়ার লক্ষে ছাত্র-শিক্ষক, শ্রমিক-জনতাসহ সব পেশার মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ড। সবার চোখে মুখে আলোর ঝিলিক। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাড়তি উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা।

চারিদিকে এতো হাসি; এতো আনন্দের মাঝে প্যারেড গ্রাউন্ডের দক্ষিণ দিকে সামরিক যাদুঘরের সামনের সড়ক ডিভাইডারের উপর ৩ শিশু ও কিশোর পরিত্যক্ত খাবারের প্যাকেট ও পানির বোতল নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। কথা বলে জানা গেল তাদের নাম রাকিব, শাকিল ও রাব্বি। তারা সবাই তেজগাঁও তেজকুনিপাড়া বস্তিতে থাকে। রাকিবের বয়স ৭ বছর, শাকিলের ৪-৫ বছর হবে। সম্পর্কে তারা দুই ভাই। অন্যজন রাব্বির বয়স আনুমানিক ৮ বছর। রাকিব ও শাকিলের বাবার নাম মো. হানিফ। তিনি আগে তেজগাঁও ফ্লাইওভারের নিচে পিঠা বিক্রি করতেন। কিন্তু এখন কিছু করেন না। অন্যদিকে রাব্বির বাবার নাম মিন্টু। তিনি রিক্সাচালক।

তিনজনের মধ্যে রাকিব বয়স ও শারীরিক গড়নে দেখতে বড় ও চটপটে। ‘তোমরা এখানে কেন এসেছো’-জিজ্ঞেস করতেই রাকিব বলে, ‘কেন ২৬শে মার্চ দেখতে আইছি।’ ‘ভেতরে কি হচ্ছে জানো?’ মাথা বাঁকিয়ে উত্তর দেয়-‘হু জানি, ভেতরে গান হচ্ছে।’ ‘ছবি উঠাবে তোমরা?’-বলতেই মুচকি হেসে তিনজন পোজ দেয় একসঙ্গে। কয়েকটা ছবি নেওয়া হলো তাদের। শাকিল বলল স্যার ‘ছবি তো তুললেন দুইডা ট্যাহা দেন।’ ওদের চাহিদার চেয়ে তিন টাকা বেশি দিলাম।

চন্দ্রিমা উদ্যানের পাশে অর্থাৎ রোকেয়া সরণির ফুটপাতে দুই শিশুকে নিয়ে জীর্ণশীর্ণ কাপড়ে বসে আছেন মো. হারুন ও তার স্ত্রী শারমিন আক্তার। তাদের সামনে দিয়ে হাজার হাজার মানুষ ছুটছে প্যারেড গ্রাউন্ডের ভেতরে। হারুন ও শারমীনের হাতে বস্তা। আর ছোট দুই শিশু বিথি (৭) ও সোহেলের (৩) হাতে থালা। হারুন ও শারমীন বোতল কুড়ায় আর দুই শিশু মিলে রাস্তায় চকলেট বিক্রি করে।

হারুনের বাড়ি নারায়নগঞ্জের আড়াইহাজারে। ৪-৫ বছর ধরে থাকেন খামাবাড়ি গোলচত্বরে। কী করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বোতল কুড়াইয়ে খাই।’ ‘আগে কোথায় থাকতেন?’-প্রশ্নে হারুন বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থাকতাম। গাঞ্জার গন্ধে সেখানে থাইকতে পারি নাই। বউ পোলাপান নিয়া এইহানে চইলা আইছি।’আজকের দিনটি সম্পর্কে কিছু জানেন? মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হারুন বলেন, ‘আজকে তো ২৬শে মার্চ। হুনছি ওই ভেতরে নাহি জাতীয় বাজনা অইবো। আজকের দিনে দেশ স্বাধীন অইছে তাই না?’

বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটারের পাশের সড়ক ডিভাইডারে সকাল পৌনে ১০টার দিকে টাকা গুনতে দেখা যায় দুইজনকে। জানা গেল তাদের একজনের নাম সুমন অন্যজনের নাম দুলাল। সম্পর্কে খালাতো ভাই। বাড়ি শেরপুরে। থাকেন বাসাবোতে।

সুমন জানান, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর ও ২১ ফেব্রুয়ারিসহ বিভিন্ন দিবসে জাতীয় পতাকা বিক্রি করেন তারা। অন্য সময় সুমন রঙের কাজ আর দুলাল স্কুলভ্যান চালিয়ে সংসার চালান। দুইজন মিলে তারা আজ মোট তিন’শ জাতীয় পতাকা এনেছিলেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সব বিক্রি হয়ে গেছে।

ভেতরে কী হয় জানেন আপনারা? দুইজনের মুখ চাওয়া চাহি করেন। দুলাল বলেন, ‘ভেতরে ২৬শে মার্চের অনুষ্ঠান অইতাছে। দেশের গান হইব; আর কী।’

সুমন ও দুলালের পাশেই ফুটপাতের উপর সন্দেশ বিক্রি করছিলেন এক বৃদ্ধ। কাছে গিয়ে নাম পরিচয় জানতে চাই। তার নাম আবুল হোসেন, বাড়ি বগুড়ার ধুনটে। থাকেন রাজধানীর নাখালপাড়াতে মেয়ের বাসায়। বয়স ষাট-পয়ষট্টি হবে। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়েটাই বড়। নাম নাজমা। বিয়ে দিয়েছিলেন তার ভাগ্নের সঙ্গে। কিন্তু সে আরেকটা বিয়ে করে নাজমাকে তাড়িয়ে দেয়। সে ঘটনা ১৫-১৬ বছর আগের। এরপর নাজমা ঢাকাতে চলে আসেন। চাকরি নেন গার্মেন্টসে। তার একটি মেয়ে। সম্প্রতি তাকে বিয়ে দিয়েছেন তারা। আবুল হোসেনের দুই ছেলে গ্রামেই থাকেন। দুইজনই বিয়ে করেছেন। তবে তারা বাবা মায়ের ভরণপোষন দেন না। তাই আবুল হোসেন চলে আসেন মেয়ের বাসাতে। তাও ৭-৮ বছর আগের ঘটনা।

আবুল হোসেন বলেন, ‘আমি কয়েক বছর ধরে ফুটপাতে সন্দেশ বিক্রি করি। মাইয়াডা গার্মেন্টসে চাকরি করে। সব মিলে ভাল চলছে দিন। আমরা প্রত্যেক মাসে বাড়িতে টাকা পাঠাই, সে টাকা দিয়ে আমার বউয়ের দিন ভালই যাচ্ছে।’

এতো মানুষ যাচ্ছে কোথায় বলতে পারেন চাচা? আবুল হোসেন প্যারেড গ্রাউন্ড দেখিয়ে বলেন ‘ওই ভেতরে যাচ্ছে সবাই।’ ভেতরে কী হচ্ছে জানেন-প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নাতো?’

‘আপনি কি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন?’ এমন প্রশ্নের উত্তরে আবুল হোসেন বলেন, ‘দেহি নাই মানে? যুদ্ধের আগে আমি বিয়ে করেছি না? আমার চোহের হামনে (চোখের সামনে) কত মানুষরে মরতে দেখলাম। গুলি করে পাক মিলিটারিরা কত জনরে মারছে।’ ‘মুক্তিযুদ্ধ করেননি?’ এমন প্রশ্নের উত্তরে আবুল হোসেন বলেন, ‘জান বাঁচাইয়া পালাইছি। আমার বউ তো ভয়ে আমারে টাইন্যা (টেনে) নিয়া তিল খেতে পালাইল। আর্মিরা সেখানেও গুলি চালিয়েছিল। অনেকে আমাদের কাছে মরে পড়েছিল। ভাগ্য বাহে-ভাগ্য, আমরা এহনো (এখনও) বেঁচে আছি।’

জাতীয় সংসদ ভবন ও চন্দ্রিমা উদ্যানের সড়কের মাঝামাঝিতে কথা হয় ছোট্ট শিশু সুমাইয়া আক্তার সেঁজুতির সঙ্গে। ছোট হলেও অনেক কিছুই জানে সে। যেমনটি জানেন না সুমন, দুলাল আর আবুল হোসেনের মতো লোকেরা। সেঁজুতি পড়ে তেজগাঁও গার্লস প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে।

ব্যবসায়ী বাবা ইলিয়াস হোসেনের হাত ধরে এসেছে লাখো কন্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে।

হাতে, কপালে লাল সবুজের পতাকার আল্পনা। ‘তুমি কী জন্য এসেছো?’ সেঁজুতির উত্তর, ‘কেন, জাতীয় সঙ্গীত গাইতে।’স্বাধীনতার ৪৩তম বছর পূর্তির দিনে ২৬ মার্চ বেলা ১১টা ২০ মিনিটে একসঙ্গে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৬৮১জন মানুষ জাতীয় সঙ্গীত-‘আমার সোনার বাংলা-আমি তোমায় ভালবাসি’-গেয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ল।

দিনটি ‍উপলক্ষ্যে বর্ণিল সাজে সাজানো হয় রাজধানী ঢাকাকে। সেজে ছিলেন নানা বয়সী মানুষও।

(দ্য রিপোর্ট/কেএ/এইচএসএম/মার্চ ২৬, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ সংবাদ এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ সংবাদ - এর সব খবর



রে