thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯,  ২৪ শাওয়াল ১৪৪৩

আল্লাহর নৈকট্য লাভে ইতেকাফ ও লাইলাতুল কদর

২০২২ এপ্রিল ২৩ ২১:২৬:০৭
আল্লাহর নৈকট্য লাভে ইতেকাফ ও লাইলাতুল কদর

মো: জিহাদুজ্জামান: মোমিন হৃদয় আল্লাহর প্রেমে বিভোর হয়ে তার একান্ত ভালবাসা ও নৈকট্য লাভের আশায় বছরের এগারোটি মাস অপেক্ষায় থাকে- এই একটি মাসের জন্য। কখন আসবে সেই কাংখিত বরকতের মাস, মওলার রহমতে সিক্ত হওয়ার মাস। অপেক্ষার শেষ প্রহরে রজব মাস পড়লেই শুরু হয় পূর্ণ প্রস্তুতি। দোয়া করতে থাকে- হে আল্লাহ! আমার হায়াতটা রমজান পর্যন্ত দীর্ঘ করো। জীবনে আরো একট রমজান, আরো একটি ইতেকাফ এর মাধ্যমে মহিমান্নিত লাইলাতুল কদর পেয়ে তোমার প্রিয় বান্দাদের কাতারে শামিল হওয়ার প্রচেষ্টায় এ নগন্য বান্দাকে আরো একবার সুযোগ করে দাও। প্রিয় রাসুলের শেখানো দোয়াটি বার বার মুখে আওড়াতে থাকে- “আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শা’বান ওয়া বাল্লিগনা রমাজান”

রমজানের পুরো মাসটিই মোমিন মুসলমানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বেশী বেশী সওয়াব অর্জন ও আল কুরআন অধ্যয়নের মাধ্যমে জীবন গঠনের মাস। বিশেষ করে রমজানের শেষ দশ দিন, যার বিজোড় রাত গুলোর মধ্যে এমন
একটি রাত আছে, যার মর্যাদা ১০০০ মাসের চেয়েও উত্তম। আর এ রাত অনুসন্ধান করার জন্য রাসুল সা. নির্দেশ দিয়েছেন, বলেছেন শেষ দশদিন ইতেকাফ করার জন্য।

ইতেকাফ
ইতেকাফ শব্দটি আরবি আকাফুন মূল ধাতু থেকে নির্গত। শাব্দিক অর্থ; অবস্থান করা, কোন স্থানে আটকে যাওয়া, আবদ্ধ হয়ে থাকা। পরিভাষায়; জাগতকি কাজ কর্ম ও পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধুমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়া’লাকে রাজি খুশি করার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে নিজেকে আবদ্ধ করা। যিনি ইতেকাফ করেন তাকে বলা হয় মু’তাকিফ।

ইতিকাফের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (রহ.) বলেন, ‘মসজিদে ইতিকাফ হচ্ছে হৃদয়ের প্রশান্তি, আত্মার পবিত্রতা ও চিত্তের নিষ্কলুষতা; চিন্তার পরিচ্ছন্নতা ও বিশুদ্ধতা।

আল কুরআনে ইতেকাফ এর নির্দেশ
সুরা বাকারার ১২৫ নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেনঃ “এবং (সেই সময়কে স্মরণ কর) যখন আমি
বাইতুল্লাহকে পরিণত করি মানুষের বারবার ফিরে আসার জায়গা এবং পরিপূর্ণ নিরাপত্তার স্থানে। তোমরা মাকামে ইবরাহীম কে সালাতের স্থান বানিয়ে নাও। এবং আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে হুকুম করি, তোমরা আমার ঘরকে সেই সকল লোকের জন্য পবিত্র কর, যারা (এখানে) তাওয়াফ করবে, ইতিকাফ করবে এবং রুকু ও সিজদা আদায় করবে।’’ এ আয়াতের মাধ্যমে আরও একটা বিষয় স্পষ্ট হলো যে, ইতিকাফ শুধু মুহাম্মাদ সা. এর সময় থেকে চালু হয়নি, বরং পূর্ববর্তী নবী রাসুলদের আমলেও এটি একটি মহৎ ইবাদাত হিসেবে প্রচলিত ছিল। সুরা বাকারার ১৮৭ নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেনঃ “আর তাদের সাথে (স্ত্রীদের সাথে) সহবাস করোনা, যখন তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত থাক। এসব আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমা। সুতরাং তোমরা এগুলোর নিকটে যেও না। এভাবে আল্লাহ মানুষের সামনে স্বীয় নিদর্শনাবলী স্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে।”

আল হাদীসে ইতেকাফ
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অসংখ্য হাদিস ইতিকাফ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। কয়েকটি হাদিস এখানে উল্লেখ করা হলো-হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণীত তিনি বলেন, যখন রমজানের শেষ দশদিন আসতো তখন নবীজি সা. কোমর বেধে ইবাদাতে নামতেন। বেশী বেশী ইবাদাত করতেন, আর পরিবার পরিজনকে রাতে ইবাদাতের জন্য জাগিয়ে দিতেন।(বুখারি শরিফ, হাদিস : ১০৫৩)।

শেষ দশকের ইতিকাফের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইতিকাফ করেছেন, সাহাবায়ে কেরামও করেছেন, তাই আমাদের জন্যও ইতিকাফ করা সুন্নাত। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘ইন্তেকাল পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন, এরপর তাঁর স্ত্রীরাও ইতিকাফ করেছেন। ’ (বুখারি, হাদিস : ১৮৬৮; মুসলিম, হাদিস : ২০০৬) রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘আমি কদরের রাতের সন্ধানে প্রথম ১০ দিন ইতিকাফ করলাম। এরপর ইতিকাফ করলাম মধ্যবর্তী ১০ দিন। অতঃপর ওহি প্রেরণ করে আমাকে জানানো হলো যে তা শেষ ১০ দিনে। সুতরাং তোমাদের যে ইতিকাফ পছন্দ করবে, সে যেন ইতিকাফ করে। ’ এরপর মানুষ তাঁর সঙ্গে ইতিকাফে শরিক হয়। (মুসলিম, হাদিস : ১৯৯৪) ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। ’ (মুসলিম, হাদিস নম্বর ১১৭১)। মদিনায় অবস্থানকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিবছরই ইতিকাফ পালন করেছেন। শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও রমজানে তিনি ইতিকাফ ছাড়েননি।

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) প্রতি রমজানে ১০ দিন ইতিকাফ করতেন, তবে যে বছর তিনি
ইন্তেকাল করেন, সে বছর তিনি ২০ দিন ইতিকাফে কাটান। ’ (বুখারি, হাদিস : ১৯০৩)।

ইতিকাফের প্রকারভেদ
ইতিকাফ তিন প্রকার, যথাঃ ১. ওয়াজিব ইতিকাফঃ ওলামায়ে কেরামের ঐকমত্যে ওয়াজিব ইতিকাফ হলো মানতের ইতিকাফ ২.সুন্নত ইতিকাফঃ রমযানের শেষ ১০ দিনের ই‘তিকাফ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। যেমনঃ হাদিসের বানী; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানে শেষ দশদিন ইতিকাফ করতেন।’ (বুখারী : ২০২৫; মুসলিম : ১১৭২) ৩. মুস্তাহাব ই‘তিকাফ : উল্লেখিত দু’প্রকার ব্যতীত বছরের যে কোন সময়ে ইতেকাফ করা মুস্তাহাব।

ইতিকাফের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
ক. ইতিকাফের প্রধান উদ্দেশ্য মহান আল্লাহর সাথে গভীর ভালবাসার সম্পর্ক সৃষ্টি করা। ইতিকাফ হলো এমন একটি ইবাদাত, যার মাধ্যমে বান্দা সমস্ত সৃস্টি-জীব থেকে আলাদা হয়ে যথাসম্ভব প্রভুর সান্নিধ্যে চলে আসে। এসময় বান্দার একমাত্র ধ্যান থাকে তাকে স্মরণ করা, তাকে ভালবাসা ও তার ইবাদাত করা। সর্বদা তার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে এবং এরই মাধ্যমে আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক দৃঢ় ও মজবুত হয়।

খ. ইতিকাফের বিধানের মাধ্যমে আল্লাহ তার বান্দাদেরকে অশ্লীলতা, অহেতুক কথা-বার্তা মন্দ স্পর্শ ও অধিক ঘুমসহ গুনাহের কাজ থেকে বাচিয়ে রাখেন।

গ. ইতিকাফের মাধ্যমে বান্দার অন্তর মসজিদের সাথে জুড়ে যায়। যেমন হাদিসে এসেছে- কিছু লোক মসজিদের জন্য খুটি হয়ে যায়। সর্বদাই মসজিদে অবস্থান করেন। ফেরেশতারা এমন লোকের মসজিদে সঙ্গী হয়ে যান। যদি কখনও তারা মসজিদে অনুপস্থিত থাকেন, ফেরেশতারা তাদের খোঁজ করেন। তারা অসুস্থ হলে দেখতে যান, প্রয়োজনে তাদের সাহায্য করেন। অন্য একটি হাদিসে এসছে- আল্লাহ সাত ব্যক্তিকে তাঁর নিজের ছায়ার নিচে ছায়া দান করবেন তাদের মধ্যে একজন হলো ঔ ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সঙ্গে বাঁধা। (বুখারী-৬২০) ঘ. ইতিকাফকারী দুনিয়ার বিলাসি জীবন ছেড়ে নিজেকে মসজিদের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে। সে দুনিয়া ও দুনিয়ার স্বাদ- এমনকি হালাল অনেক কাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

ঙ. ইতিকাফের মাধ্যমে লাইলাতুল কদর খোঁজ করা এবং এর ফজিলত হাসিল করা রাসুল সা. এর মূল উদ্দেশ্য ছিল। আবু সায়ীদ খুদরি রা. থেকে বর্ণীত, রাসুল সা. বলেছেন, আমি প্রথম দশকে ইতিকাফ করেছি এই (কদর) রজনি খোঁজ করার উদ্দেশ্যে। অতঃপর ইতিকাফ করেছি মাঝের দশকে। অতঃপর মাঝ দশক পেরিয়ে এলাম। অতঃপর আমাকে বলা হলো, (কদর) তো শেষ দশকে। তোমাদের মধ্যে যদি কেউ ইতিকাফ করতে চায় সে যেন (এই দশকে) ইতিকাফ করে। অতপর লোকেরা তাঁর সাথে ইতিকাফ করল। যাতে কোনভাবেই এই মহিমান্বিত রাত হাতছাড়া না হয়ে যায়।

ইতিকাফের স্থান
ইতিকাফের স্থান মসজিদ। জুম্মার মসজিদ হলে উত্তম, তবে কমপক্ষে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হওয়া জরুরী।উৎকৃষ্ট স্থান হলো- মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববী অতঃপর মসজিদে আকসা। মহিলাদের জন্য ঘরের একটি নির্দিষ্ট নির্জন স্থান, যেখানে থেকে মসজিদে ইতিকাফের মতো করে নিজেকে পরিবার ও সমাজ থেকে আলাদা করা যায়।

ইতিকাফে করনীয় ও বর্জনীয়
ইতিকাফে রাসুল সা. আল্লাহর ইবাদতে মসজিদে নির্জন বাস করতেন। দুনিয়াবি সব ধরনের সম্পৃক্ততা থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করতেন, ইবাদতে মশগুল থাকতেন। তাঁর ইতিকাফের জন্য মসজিদে একটি তাঁবু পাতা হতো। ইতিকাফকালীন তিনি রোগী দেখতে বের হতেন না, জানাজায় যেতেন না এবং নারীদের সংশ্রব ত্যাগ করতেন। প্রাকৃতিক প্রয়োজনের মতো জরুরি কিছু ছাড়া তিনি তাঁর ইতিকাফস্থল ত্যাগ করতেন না। করনীয়ঃ বেশী বেশী নফল ইবাদাত যেমন কুরআন তেলাওয়াত, নফল সালাত, তাহাজ্জুদ ও যিকিরের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখা। দ্বীনি আলোচনা করা বা শোনা, মাসআলা-মাসায়েল বা ধর্মীয় বই অধ্যয়ন করা এবং বেশী বেশী দোয়া ও ইস্তেগফার করা।

বর্জনীয়ঃ. অপ্রয়োজনীয় কথা ও কাজ বা ঝগড়া-ঝাটি করা, একেবারেই চুপচাপ থাকা, অধিকপরিমানে ঘুমানো, গীবত করা, ইতিকাফের স্থানকে ব্যবসার কেন্দ্র বানানো।

মহিলাদের ইতিকাফঃ পুরুষের ন্যায় মহিলাদেরও ইতিকাফের সুযোগ রয়েছে। তবে তার জন্য কিছু শর্ত মেনে চলা আবশ্যক- ক. ঘরের একটি নির্জন স্থানে বা নামাজের যায়গায় নিজেকে আবদ্ধ করতে হবে। খ. স্বামী থাকলে অবশ্যেই তার অনুমতি নিতে হবে। গ. হায়েজ-নেফাছ থেকে পবিত্র হতে হবে। ঘ. পুরুষদের যে সব কাজে ইতিকাফ নষ্ট হয় মহিলাদেরও সে কাজে নষ্ট হয়ে যাবে।

ইতিকাফের ফজিলত

ইতিকাফের ফজিলত সম্পর্কে রাসুল সা. এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি মাহে রমজানরে শেষ দশদিন ইতিকাফ করবে, সে ব্যক্তি দু’টি পবিত্র হজ্জ ও দু’টি পবিত্র উমরার সমপরিমান সওয়াব লাভ করবে’।

অন্য একটি হাদিসে ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত- রাসুল সা. এরশাদ করেন, ইতিকাফকারী মূলত গুনাহ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে। তাকে ইতিকাফের বিনিময়ে এত পরিমান সওয়াব দেয়া হবে, যেন সে সমস্ত সওয়াব অর্জনকারী। (ইবনে মাজাহ)

ইতিকাফে দোয়া কবুল হয়। যে সকল সময়ে দোয়া কবুল হয়, একজন ইতিকাফ কারী খুব সহজেই এই সময়ে মুক্ত মনে আল্লাহর নিকট দোয়া করতে পারেন। ক) ফরজ সালাতের পর খ) সিজদারত অবস্থায় গ) আযান ও ইকামাতের মধ্যবর্তী সময় ঘ) সিয়ামরত অবস্থায় ঙ) ইফতারের পূর্ব মুহুর্তে চ) লাইলাতুল ক্বদরে ছ) জুম্মার দিন।

টাকা দিয়ে ইতেকাফ করানো

ইতিকাফ একটি মহৎ ইবাদত। এ ইবাদত স্বেচ্ছায় পালনীয়। ইসলামী শরিয়তে বিনিময় দিয়ে ভাড়া করে ইবাদত করানোর সুযোগ নেই। টাকার বিনিময়ে ইতিকাফ করা ও করানো সম্পূর্ণ নাজায়েজ। এভাবে ইতিকাফ করানোর মাধ্যমে মহল্লাবাসী দায়মুক্ত হয় না। (রদ্দুল মুহতার : ২/৫৯৫, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া : ১৭/১৭১)। যেহেতু ইতিকাফ সুন্নতে কেফায়া, অর্থাৎ মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে একজন আদায় করলে হক আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু কেহই আদায় না করলে সকলেই গুনাহার হবে। সুতরাং কোথাও কোথাও দেখা যায় মহল্লাবাসীরা কোন একজনকে টাকার বিনিময়ে অথবা সাহরী ও ইফতারীর বিনিময়ে ইতিকাফ বসিয়ে দেয়া হয়েছে। এটা সম্পূর্ণ গর্হীত এবং গুনাহের কাজ।

লাইলাতুল কদর

আরবী লাইলুন বা লাইলাতুন অর্থ রাত, আর কদর অর্থ সম্মানিত, মহিমান্নিত আবার কদর অর্থ তাকদির বা ভাগ্য ও হয়। সুতরাং লাইলাতুল কদর অর্থ মহিমান্নিত রজনি ও ভাগ্য রজনি।
লাইলাতুল কদরের ব্যাপারে সুপ্রশিদ্ধ প্রতিষ্ঠিত মতামত হলো- রমজান মাসের মধ্যে অবস্থিত এমন একটি রাত, যে রাতে আল কুরআন অবতীর্ণ হয়, এ রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যেমন সূরা আল কাদর এ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেনঃ
১. নিঃসন্দেহ আমি এটি অবতারণ করেছি মহিমান্বিত রজনীতে। ২. শবে-কদর (মহিমান্বিত রাত) সমন্ধে আপনি কি জানেন? ৩. শবে-কদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। ৪. এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। ৫. এটা নিরাপত্তা, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
৬১০ সালে এই রাতে (লাইলাতুল কদর) জাবালে নুরের হেরা গুহায় মুহাম্মাদ সা. এর উপর সূরা আলাক এর প্রথম পাঁচটি আয়াত নাযিল হওয়ার মাধ্যমে পবিত্র কুরআন নাযিলের সুচনা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে শবে কদর সন্ধান করো।’ (মুসলিম)। এ রাতগুলো হলো রমজানের ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯। আরবিতে দিনের আগে রাত গণনা করা হয়। অর্থাৎ ২০, ২২, ২৪, ২৬ ও ২৮ রমজান দিবাগত রাত্রসমূহ।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের নিয়তে কদরের রাতে ইবাদত করবে; তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি শরিফ, ইমান অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ২৫, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৯-৩০, হাদিস: ৩৪; ই. ফা.)।
কোনো কোনো তাফসীরকার কদরকে তকদীর অর্থে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ এই রাতে আল্লাহ তকদীরের ফায়সালা জারী করার জন্য তা ফেরেশতাদের হাতে তুলে দেন। সূরা দুখানের এ আয়াতটি এই বক্তব্য সমর্থন করেঃ
এই রাতে সব ব্যাপারে জ্ঞানগর্ভ ফয়সালা প্রকাশ করা হয়ে থাকে। --- (৪ আয়াত)
অন্যদিকে ইমাম যুহরী বলেন, কদর অর্থ হচ্ছে শ্রেষ্টত্ব ও মর্যাদা। অর্থাৎ এটি অত্যন্ত মর্যাদাশালী রাত। এই অর্থ সমর্থন করে এই সূরার এ আয়াতটি "কদরের রাত হাজার মাসের চাইতেও উত্তম। "

লাইলাতুল কদর কবেঃ

কোন রাত লাইলাতুল কদর এ ব্যাপারে ব্যাপক মতবিরোধ দেখা যায়। এ সম্পর্কে প্রায় ৪০টি মতের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে আলেম সমাজের সংখ্যাগুরু অংশের মতে রমযানের শেষ দশ তারিখের কোনো একটি বেজোড় রাত হচ্ছে এই কদরের রাত। আবার তাদের মধ্যেও বেশীরভাগ লোকের মত হচ্ছে সেটি সাতাশ তারিখের রাত। তাফসীরে আযহারীতে একটি সংখ্যাতত্ব তুলে ধরা হয়েছে- لَيْلَةُ ٱلْقَدْر শব্দ দ্বয়-এ মোট ৯টি অক্ষর রয়েছে, আর সুরা কদর-এ শব্দদ্বয় তিনবার উদৃত হয়েছে। ৯কে তিন দিয়ে গুন করলে ২৭ হয়। সুতরাং সাতাশ তারিখের রাত কদরের রাত হবার ব্যাপারে বেশী যুক্তিযুক্ত। হযরত আবু হুরাইরা বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ্ লাইলাতুল কদর সম্পর্কে বলেনঃ সেটি সাতাশের বা উনত্রিশের রাত (আবু দাউদ)। হযরত আয়েশা বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ্ বলেনঃ কদরের রাতকে রমযানের শেষ দশ রাতের বেজোড় রাতগুলির মধ্যে তালাশ করো।
লাইলাতুল কদর পাওয়ার জন্য নবীজি (সা.) শেষের ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। হজরত আয়িশা (রা.) বলেন, ‘ওফাতের আগ পর্যন্ত প্রত্যেক রমজানের শেষের ১০ দিন রাসুল (সা.) ইতিকাফ করতেন।’ (বুখারি: ২৩২৬, মুসলিম: ১১৭২)।

ফজিলতঃ এ রাতে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। এ কারণে আল্লাহ তাআলা এ রাতের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন। উম্মতে মুহাম্মাদিকে হাজার মাসের ইবাদত-বন্দেগি ও আমলের সাওয়াব দান করা হবে। কুরআনুল কারিমের অন্য স্থানে এ রাতটিকে বরকতময় রাত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
حم وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ - إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ - فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ - أَمْرًا مِّنْ عِندِنَا إِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ - رَحْمَةً مِّن رَّبِّكَ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
হা-মীম। শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। আমি একে (কুরআন) এক বরকতময় রাতে নাজিল করেছি। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে, আমিই প্রেরণকারী। আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা দুখান : আয়াত ১-৬)
সুরাতুল কদরে লাইলাতুল কদরের ফজিলত সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন- (১) এই রাতে কোরআন নাযিল করার দুটি অর্থ হতে পারে। প্রথম অর্থ হচ্ছে, এই রাতে সমগ্র কোরআন ওহীর ধারক ফেরেশতাদেরকে দিয়ে দেয়া হয়। অতপর অবস্থা ও ঘটনাবলী অনুযায়ী তেইশ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে জিবরাঈল আল্লাহর হুকুমে তার আয়াত ও সূরাগুলি রসূলুল্লাহ্ -এর ওপর নাযিল করতে থাকেন। ইবনে আব্বাস এ অর্থটি বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, এই রাত থেকেই কোরআন নাযিলের সূচনা হয়। এটি ইমাম শা'বীর উক্তি। এটি একটি অভ্রান্ত সত্য, রসূলুল্লাহ্ -এর এবং তঁর ইসলামী দাওয়াতের জন্য কোনো ঘটনা বা ব্যাপারে সঠিক নির্দেশ লাভের প্রয়োজন দেখা দিলে তখনই আল্লাহ কোরআনের সূরা ও আয়াতগুলি রচনা করতেন না। বরং সমগ্র বিশ্ব জাহানের সৃষ্টির পূর্বে অনাদিকালে মহান আল্লাহ পৃথিবতে মানব জাতির সৃষ্টি, তাদের মধ্যে নবী প্রেরণ, নবীদের ওপর কিতাব নাযিল, সব নবীর পরে রসূলুল্লাহ্ -কে পাঠানো এবং তার প্রতি কোরআন নাযিল করার সমস্ত পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছিলেন। কদরের রাতে কেবলমাত্র এই পরিকল্পনার শেষ অংশের বাস্তবায়ন শুরু হয়।
(২) মুসনাদে আহমদে হযরত উবাদাহ ইবনে সামেত বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রসূলুল্লাহ্ বলেছেনঃ কদরের রাত রয়েছে রমযানের শেষ দশ রাতের মধ্যে যে ব্যক্তি প্রতিদান লাভের আকাংহ্মা নিয়ে এই সব রাতে ইবাদতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে আল্লাহ তার আগের পিছের সব গুণাহ মাফ করে দেবেন।এই একটি রাতে এত বড় নেকী ও কল্যাণের কাজ হয়েছে যা মানবতার সূদীর্ঘ ইতিহাসে কোনো দীর্ঘতম কালেও হয়নি।
(৩) রুহ বলতে জিবরাঈল -কে বুঝানো হয়েছে। তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার কারণে সমস্ত ফেরেশতা থেকে আলাদা করে তার উল্লেখ করা হয়েছে।
(৪) অর্থাৎ তারা নিজেদের তরফ থেকে আসে না। বরং তাদের রবের অনুমতিক্রমে আসে। আর প্রত্যেকটি হুকুম বলতে সূরা দুখানের ৫ আয়াত "আমরে হাকীম" (বিজ্ঞতাপূর্ণ কাজ) বলতে যা বুঝানো হয়েছে এখানে তার কথাই বলা হয়েছে।
(৫) অর্থাৎ সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত সারাটা রাত শুধু কল্যাণে পরিপূর্ণ। সেখানে ফিতনা, দুস্কৃতি ও অনিষ্টকারিতার ছিঁটেফোটাও নেই। লাইলাতুল কদরে আল্লাহর ওইসব বান্দা সবচেয়ে বেশি সম্মানিত ও মর্যাদার অধিকারী হবেন, যার সঙ্গে কুরআনের সম্পর্ক বেশি হবে। যিনি কুরআনের আলোকেই গড়বেন নিজের জীবন। বাস্তবজীবনে কুরআনের আমলে সাজাবেন জীবন। আর তারাই হবেন সফল।
তাফসীরে ফী যিলালিল কুরআনে লাইলাতুল কদরের মর্যাদা এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে, এই মোবারকপূর্ণ রাতে এমন যে ঘটনা ঘটছিল তা পৃথিবী আসমান জমীনের মাঝে আর কোনদিন ঘটবেনা। ক. এই রাতেই মুহাম্মদ সা. রাসুল হিসেবে মনোনীত হন। খ. বিশ্বনবীর সা. উপর ওহী আগমন গ. তাকে সারা বিশ্বের নেতা নির্বাচন ঘ. অবহেলিত, নিগৃহীত, মজলুম ও বঞ্চিত মানবতাকে স্বাধীন ও অধিকার সচেতন করার জন্য এ রাতে বিধান নাযিল হয় ঘ. জািলমের মসনদ ভেঙ্গে খান খান করে মুহাম্মদ সা. কে ক্ষমতা দানের বিপ্লবী ইতিহাস রচনা করা হয় এ রাতেই। সুতরাং যে এরাতে নিজেকে প্রেমময় আল্লাহর দরবারে নিঃশেষে বিলিয়ে দেয়ার কাজ করতে পারবে সে বড়ই সৌভাগ্যবান ও মর্যাদাবান।
এ রাতের সৎ কাজ হাজার মাসের সৎ কাজের চেয়ে ভালো। রসূলুল্লাহ্ এই রাতের আমলের বিপুল ফযীলত বর্ণনা করেছেন। কাজেই বুখারী ও মুসলীমে হযরত আবু হুরাইরা বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রসূলুল্লাহ্ বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কদরের রাতে ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান লাভের আশায় ইবাদাতের জন্য দাঁড়ালো তার পেছনের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে।।”
লাইলাতুল কদরের মর্যাদা
লাইলাতুল কদরের মর্যাদা এত বেশি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ রাতটি পাওয়ার জন্য শেষ দশকে আজীবন ইতেকাফ করেছেন। উম্মতে মুসলিমার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেছেন-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমি কদরের রাতের সন্ধানে (রমজানের) প্রথম ১০ দিন ইতিকাফ করলাম। এরপর ইতিকাফ করলাম মধ্যবর্তী ১০ দিন। তারপর আমার প্রতি ওহি নাজিল করে জানানো হলো যে, তা শেষ ১০ দিনে রয়েছে। সুতরাং তোমাদের যে ইতিকাফ পছন্দ করবে, সে যেন ইতিকাফ করে। তারপর মানুষ (সাহাবায়ে কেরাম) তাঁর সঙ্গে ইতেকাফে শরিক হয়।’ (মুসলিম)
‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে শবে কদরকে সন্ধান করো। (মুসলিম)। সে হিসেবে এ রাতগুলো হলো- ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯।
হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি বিশ্বাসের সঙ্গে সাওয়াবের নিয়তে ‘লাইলাতুল কদর’-এ জেগে থেকে ইবাদত করবে, তার অতীতের সব গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (বুখারি)

এ রাতের আমল

হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, একবার আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম- হে আল্লাহর রাসুল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনি বলে দিন, আমি যদি লাইলাতুল কদর কোন রাতে হবে তা জানতে পারি, তাতে আমি কী (দোয়া) পড়বো? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি বলবে-اللَّهُمَّ إِنَّكَ عُفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي উচ্চারণ : 'আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুন; তুহিব্বুল আফওয়া; ফাফু আন্নি।’ অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল; ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজি, মিশকাত)

এছাড়া কুরআনে বর্ণীত দোয়াসমূহ বেশী বেশী তেলাওয়াত করা। শবে কদরে যেসব আমল করা যায়: নফল নামাজ- তাহিয়্যাতুল অজু, দুখুলিল মাসজিদ, আউওয়াবিন, তাহাজ্জুত, সালাতুত তাসবিহ, তাওবার নামাজ, সালাতুল হাজাত, সালাতুশ শোকর ও অন্যান্য নফল ইত্যাদি পড়া। নামাজে কিরাআত ও রুকু–সিজদা দীর্ঘ করা। কোরআন শরিফ: সুরা কদর, সুরা দুখান, সুরা মুজাম্মিল, সুরা মুদ্দাচ্ছির, ইয়া-সিন, সুরা ত-হা, সুরা আর রহমান ও অন্যান্য ফজিলতের সুরা তিলাওয়াত করা; দরুদ শরিফ বেশি বেশি পড়া; তাওবা–ইস্তিগফার অধিক পরিমাণে করা; দোয়া কালাম, তাসবিহ তাহলিল, জিকির আসকার ইত্যাদি করা; কবর জিয়ারত করা। নিজের জন্য, পিতা–মাতার জন্য, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও সব মুমিন মুসলমানের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করা এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধি এবং বিশ্ববাসীর মুক্তি কামনা করে দোয়া করা।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে লাইলাতুল কদর পাওয়ার তাওফিক দান করুন।কদরের রাত ইবাদত-বন্দেগিতে অতিবাহিত করার তাওফিক দান করুন। কদরের ফজিলত পেতে আমলগুলো যথাযথভাবে করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

(লেখক: আলেম, গবেষক ও ব্যাংকার)

(দ্য রিপোর্ট/আরজেড/২৩ এপ্রিল, ২০২২)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

ধর্ম এর সর্বশেষ খবর

ধর্ম - এর সব খবর