thereport24.com
ঢাকা, সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

মানহীন মিউজিক ভিডিওর বিপক্ষে তারকারা

২০১৪ মার্চ ২৯ ২০:৫২:৫০
মানহীন মিউজিক ভিডিওর বিপক্ষে তারকারা

দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক : দেশের সঙ্গীতাঙ্গনের তারকাশিল্পীদের তর্কবিতর্কে জমে উঠেছিল দ্য রিপোর্ট কার্যালয়ের মতবিনিময় সভা। শনিবার দুপুর ১২টায় ‘প্রসঙ্গ : মিউজিক ও মিউজিক ভিডিও’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় মানহীন মিউজিক ভিডিওর বিপক্ষে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন তারা। মতবিনিময় সভায় অংশ নেন- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জনপ্রিয় শিল্পী তিমির নন্দী, গীতিকার শহীদুল্লাহ ফরায়জী, ঢাকা ব্যান্ডের মাকসুদুল হক, ক্লোজআপ ওয়ান তারকা মৌসুমী আক্তার সালমা, নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি, আরফিন রুমী, সঙ্গীত পরিচালক আহম্মেদ হুমায়ূন, সংগীতশিল্পী লুৎফর হাসান, কাজী শুভ, সঙ্গীত পরিচালক ও শিল্পী বেলাল খান, প্রথম বাংলাদেশি আইডল মং উচিং মারমা, সঙ্গীত পরিচালক এফ এ সুমন, সিডি চয়েসের কর্ণধার ও মিউজিক ভিডিও নির্মাতা শেখ সুমন এমদাদ প্রমুখ।

দ্য রিপোর্ট সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টুর সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভা পরিচালনা করেন যুগ্ম সম্পাদক আমিরুল ইসলাম নয়ন। এতে উপস্থিত ছিলেন ইউনাইটেড মিডিয়া লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মুশফিকুর রহমান, দ্য রিপোর্টের বার্তা সম্পাদক মো. আল-আমিন ও হোসেন শহীদ মজনু প্রমুখ।

সূচনা বক্তব্যে তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু দ্য রিপোর্ট কার্যালয়ে মতবিনিময় সভায় উপস্থিত হওয়ার জন্য সকলকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, আলোচ্য বিষয় নিয়ে নানান রকম মত আছে। অনেকে মনে করেন কোনো গান যদি জনপ্রিয় না হয়, তাহলে জনপ্রিয় করার জন্য মিউজিক ভিডিও করা হয়। আবার অনেকের মতে, একটি সুন্দর-ভালো গানেরই মিউজিক ভিডিও করা উচিত। এ বিষয়ে আপনাদের আলোচনা শুনব।

বাংলা গানের ইতিহাসের প্রতি আলোকপাত করে আমিরুল ইসলাম নয়ন বলেন, এক সময় গান শুধু শোনার বিষয় থাকলেও বর্তমানে তা দেখারও বিষয়। এ ক্ষেত্রে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে মিউজিক ভিডিও। কিন্তু মিউজিক ভিডিওর গুণগত মান, নির্মাণ নিয়েও অনেক প্রশ্ন আছে। কেউ কেউ মিউজিক ভিডিও যেমন পছন্দ করেন না, তেমনি আবার অনেকে পছন্দও করেন। আমরা আজকের আলোচনায় মূলত আপনাদের মতামত জানতে চাইব।

তিমির নন্দী : শাস্ত্রীয় সঙ্গীত চর্চা না করলে আসলে ভিত শক্ত হয় না। আগে গানের কথার সঙ্গে সুরের সামঞ্জস্য ছিল। পাশ্চাত্যে মিউজিক ভিডিও হচ্ছে। তা অনুকরণ করে আমরা মিউজিক ভিডিও করছি। আমি মনে করি একজন শিল্পীর গান ভালো না হলে তা নিজে থেকেই বাতিল করা উচিত। আমি এমনটি করেছি। আর সেরকম গানের মিউজিক ভিডিও করা উচিত না। কিন্তু যেনতেন গানের মিউজিক ভিডিও করে তা বাজারে ছাড়া হচ্ছে।

আগে গানের কথা ও সুরের সঙ্গে মিল ছিল, সুন্দর ছিল। কারণ আগে যারা গান লিখতেন ও সুর করতেন তারা সকলে পড়াশোনা করতেন। এখন দেখা যায় মিউজিক আগে কিন্তু ভয়েস পরে দেওয়া হয়। দেখা যায় গানে গলা বসেনি, কিন্তু কোনো রকমে গেয়ে গেলাম। গান হলো, সঙ্গে মিউজিক ভিডিও বানিয়ে দেওয়া হয়। আমি মনে করি ভিডিও হলে গানের দিকে নজর কম দেওয়া হয়।

আগে এক সপ্তাহ ধরে গানের রিহার্সাল করে তারপর ফাইনাল টেক নেওয়া হতো। আসলে মিউজিক ভিডিও একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য। সকল শ্রেণি মিউজিক ভিডিও দেখেও না।

সালমা : সবাইকে ধন্যবাদ। আমার গুরুজি বলতেন,আমরা যদি গানের সঙ্গে একদিন না থাকি তাহলে গান আমাদের ওপর রাগ করবে। আমরা যারা নতুন সঙ্গীতে এসেছি তাদের আসলেই অনেক শিখে তারপর আসতে হবে। আর প্রতিদিন যদি আমরা সাধনা না করি তবে সঙ্গীত আমাদের ভুলে যাবে।

মিউজিক ভিডিও দরকার, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই মিউজিক ভিডিও গানকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। কেননা যা আমরা মুখে বলছি তা যদি অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা যায় তা অবশ্যই বেশি প্রভাব ফেলে। আর আমি বলব-মিউজিক ভিডিওতে অন্যকে মডেল না বানিয়ে নিজে মডেল হলে তা আরও ভাল হবে। নিজে বিষয়টি বুঝে করা যাবে। এর বেশি কিছু বক্তব্য আমার নেই।

শহীদুল্লাহ ফরায়জী : অনেককে একসঙ্গে করার জন্য দ্য রিপোর্টকে বিশেষ ধন্যবাদ। ইদানিং গানের সঙ্গে মিউজিক ভিডিও দেখে অবাক হই। কী ভেবে লিখলাম, আর কী চিন্তায় ভিডিও তৈরি হচ্ছে? আমি মিউজিক ভিডিও নির্মাতাদের অনুরোধ করব যেন গীতিকার-সুরকারের সঙ্গে কথা বলে, তাদের চিন্তার বিষয়টি মাথায় রেখে ভিডিও তৈরি করা হয়।

আমি বলব-গানের গুরুত্বটা আগে বুঝতে হবে। মানুষ যেমন সৃষ্টির সেরা জীব, তেমনি গান হলো মানুষের মহত্তম সৃষ্টি। একটা গান দিয়ে জাতির চেতনার মান নির্ধারণ হয়। আজকের পৃথিবীর যে দেশেই তাকাই না কেন প্রতিটা দেশেরই একটা জাতীয় সংগীত আছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সঙ্গে গানের সম্পর্ক অপরিহার্য।

গান দিয়ে আমরা সমাজকে মানবিক করব, নৈতিক শিক্ষা দিয়ে রাষ্ট্র গড়ে তুলব। রাষ্ট্র তৈরিতে গান হয়, রাষ্ট্রের শুভ দিনে গান হয়, কেউ মারা গেলে গান হয়, বিয়েতেও গান হয়। সুতরাং গান অপরিহার্য উপাদান। আমাদের গানে নৈতিক সৌন্দর্য্য আছে এগুলোকে যত্ন করতে হবে। গানের বোধকে অনুধাবন করতে হবে। যে জাতির গান যত শক্তিশালী, সে জাতির চেতনা তত সমৃদ্ধ। বাংলা গান দিয়ে আমরা প্রমাণ করব-আমরা সমৃদ্ধ জাতি। গান ভালো হতে হবে, তারপর তার ভিডিও হতে হবে।

আরফিন রুমি : না বুঝে কাজ করা যাবে না। গানের সাবজেক্ট থেকে সরে যাওয়া যাবে না। তবে আমাদের এটাও ভাবতে হয় মাসের শেষে বাসা ভাড়াটা কোথা থেকে আসবে। এর বেশি আমি আর কিছু বলব না।

মাকসুদ : আমি সকলকে বলব-জেনে শুনে গান করতে হবে। সংগীতকে শিল্প হিসেবে দেখুন, ব্যবসা হিসেবে নয়। তাছাড়া কোন গান হিট হবে তা ঠিক করবে রেকর্ডস। কিন্তু আমাদের দেশে সেটা না করে এটা আপনারা ঠিক করার গণ্ডি থেকে বের হয়ে আসুন।

আমি বলব-মিউজিক ভিডিও কীভাবে হবে, কেমন হবে তা ঠিক করবেন শিল্পী, সুরকার, গীতিকার। চেহারা দেখাতে মিউজিক ভিডিও করা ঠিক না। লাখ লাখ টাকা খরচ করে মিউজিক ভিডিও করা হচ্ছে, এর আউটপুট কী।

অডিও ও ভিডিও’র মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য আছে। রেডিও’র গান যখন মানুষ শুনে তখন মানুষের মনে অনেক ইমেজ আসে। আর ভিডিও’র মধ্যে মানুষের সামনে একটি নির্দিষ্ট সীমার ইমেজ তৈরি হয়। মূলত যে গানটি লিখে তারই গানটির ওপর সবচেয়ে বেশি অধিকার থাকে।

মিউজিক ভিডিও করার পূর্বে গীতিকারের কাছ থেকে ধারণা নেওয়া দরকার বলে আমি মনে করি। আমি বলব- কবিদের যুগ শুরু হয়েছে। কবিদের মনে কোনোভাবেই দুঃখ দেওয়া উচিত নয়।

এখানে যারা উপস্থিত আছেন তার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী তিমির নন্দী দা-ই একমাত্র শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মানুষ। অন্যরা মূলত পপ মিউজিক (মানে পপুলার মিউজিক) শিল্পীদের মধ্যে আরফিন রুমী, ন্যান্সি, সালমা, মং সবার প্রতি আমার ভালোবাসা আছে। কিন্তু সবাইকেই ক্লাসিক্যাল মিউজিক শিল্পী তিমির নন্দীর কথা মাথায় রাখতে হবে।

আমরা সবাই মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমরা কত নাটক, সিনেমা দেখেছি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ যে দেখেছে সেই তো জানে মুক্তিযুদ্ধ আসলে কেমন ছিল। মিউজিক ও মিউজিক ভিডিও নিয়েও ব্যাপারটা আসলে একই।

কি কারণে মিউজিক ভিডিও করা হচ্ছে? এ প্রসঙ্গে বলব, এখন অনেক নবীন শিল্পী এসেছে যাদের পিছনে লাখ লাখ টাকা খরচ করে মিউজিক ভিডিও করা হচ্ছে। সংগীত হল বাঙালির শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের ধারণা তো থিয়েটার থেকেই এসেছে। সংগীতই আমাদের মুক্তির আন্দোলন ও সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। আমরা কি কখনই ভুলেছি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি।’ গান ও জ্ঞানের সমন্বয়ে সংগীত। গান ও জ্ঞানই হল বাঙালির অস্ত্র, হাতিয়ার।

আহম্মেদ হুমায়ূন : আমি প্রথমেই বিশ্বাস করি ভাল গানের বিকল্প নেই। ভালো গান হলে চিরদিন বেঁচে থাকবে এটা খুবই স্বাভাবিক। ছোটবেলায় সিনেমায় যে গান শুনেছি, ঘরে এসে বেতারে বা অডিও ক্যাসেটে তাই শুনেছি। ফলে ভালো গানগুলো মানুষের কানে আসে। তবে এখন মানুষের জীবনের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ব্যস্ত হয়ে গেছে মানুষ। ফলে অনেক সময় বর্তমানের ভালো গানগুলো মানুষের কানে আসছে না।

তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি মিউজিক ভিডিও খারাপ না। তবে খারাপভাবে উপস্থাপন করা খারাপ। এ ক্ষেত্রে যারা এসব নির্মাণ করেন তাদের ভালো করে দেখা দরকার যে গানের কথা ও সুরে ঠিকভাবে সমন্বয় হয়েছে কিনা। আমি বলব আগে একটা ভালো গান হবে তারপর মিউজিক ভিডিও।

আমি বলব, মিউজিক ভিডিও হলে দর্শকরা শিল্পীকে চিনতে পারে। তা না হলে এমনও হয় রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিনের গান শুনে শ্রোতা চিনতে পারেন না কার গান শুনছেন।

[আলোচনার এ পর্যায়ে ন্যান্সি তীব্র প্রতিবাদ জানান। ন্যান্সি বলেন, না এ কথা ঠিক না, আপনি না জেনে বলছেন। ন্যান্সি আরও বলেন, সালমা, মাকসুদ ভাই, তিমির দা’র গান শুনলে যে কেউ বলতে পারবে কার গান শুনছেন। তাদের দেখানোর জন্য ভিডিও লাগবে না। গলা শুনেই বুঝতে পারবে গানটা সালমার। সালমা এ সময় হেসে হেসে বলেন, আমি তো কণ্ঠ দিয়েই পরিচিতি পেয়েছি। এ সময় আহম্মেদ হুমায়ূন বলেন, না আমি ঠিক সেরকম বলিনি।… এবার কথা বলেন সঞ্চালক। আমার মনে হয় একজনের কথা শেষ হলে অন্যজন কথা বলা দরকার। এরই মধ্যে কথা বলে ওঠেন ন্যান্সি। ন্যান্সি বলেন, কণ্ঠশিল্পীকে কেন গানের জন্য মডেল হতে হবে।–এ সময় তার হাতের মাইক্রোফোনের তার খুলে পড়ে]।

মাকসুদ : [ন্যান্সিকে উদ্দেশ করে], রাগটা একটু কমাও, দেখছো না রাগে তার খুলে গেছে। [এ সময় সবাই হেসে ওঠেন।]

ন্যান্সি : আমি তিমির দা’র সঙ্গে একমত। আমার গাওয়া গানটা যদি ভালো না হয়, তাহলে তা বাতিল করব। আমার মা মারা যাওয়ার পর আমার মনে হল- যে মাকে এতো ভালোবাসি তাকে নিয়ে কোনো গান গাওয়া হয়নি। আমি একটি গান তাকে নিয়ে তৈরি করি। কিন্তু গানটি গাওয়ার পর আমার মনে হলো-মাকে আমি যতটা ভালোবাসি তার দশভাগও প্রকাশ করতে পারিনি আমার গানে। তাই সেটি প্রকাশ করিনি। গানটি নিজের জন্য রেখে দিয়েছি।

আমি মিউজিক ভিডিওর বিপক্ষে। কারণ আমি কন্ঠশিল্পী, আমাকে মানুষ চিনবে আমার কন্ঠ দিয়ে। গানের জন্য কেন আমাকে অভিনয়ের মডেল হিসেবে পর্দার সামনে দাঁড়াতে হবে।

একটা মিউজিক ভিডিও তৈরি করতে ২০ লাখ টাকা লাগে [অনেকটা অভিযোগের সুর তার কণ্ঠে]। আমার মতো শিল্পীরা কীভাবে এত টাকা দিয়ে মিউজিক ভিডিও বানাবে?

যারা কণ্ঠের বদলে মিউজিক ভিডিও দিয়ে শ্রোতা আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন তাদের এই রকম কাজ করা থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করছি।

আমি এ প্রসঙ্গে বলব-আমাদের দেশে অনেক অভিনেতা ও অভিনেত্রী রয়েছেন। যদি মিউজিক ভিডিও করতেই হয় তাহলে তাদের দিয়ে আমরা অভিনয় করাব। একজন কন্ঠশিল্পীকে কেন অভিনয় করতে হবে।

আরেকটা বিষয়ে আমি বলব-যারা গান লেখেন, তারা এখন আর ভালো গান লিখছেন না। গত দুই বছর ধরে আমি কোনো গান করিনি। ভালো কথার গানই পায়নি। তাহলে আমরা কীভাবে ভাল গান গাইব?

লুৎফর হাসান : আমার কোনো মিউজিক ভিডিও নেই। সত্যি কথা বলতে কী সামর্থ্য নেই বলেই নেই। যাদের লাখ টাকা খরচ করার সামর্থ্য আছে তাদের এখানে আসা উচিত। আমাদের মিউজিকের ভাষায় ‘মুরগি’ বলে একটা শব্দ আছে- যারা কণ্ঠে নয়, টাকার বিনিময়ে অ্যালবাম তৈরি করে বাজারে ছাড়ে। যাই হোক আমি ‘মুরগির’ সঙ্গে কোকিলের কণ্ঠের সামঞ্জস্য করব না। আমি বলব প্রথমে গানের কথা তারপর গান। ভালো গান হলে তা কখনও চাপা থাকবে না। যারা মিউজিক নয়, মিউজিক ভিডিও করে জনপ্রিয় হতে চায় তাদের সঙ্গে সবসময় দ্বিমত পোষণ করি। এর মানে আমি মিউজিক ভিডিওর বিপক্ষে তা নয়। মিউজিক ভিডিও হতে হবে ভালো গানের।

কাজী শুভ : আমি বলব-গানের বিষয় বোঝানোর জন্য ভিডিও’র অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। তবে, বস্তাপচা ভিডিও হলে অবশ্যই সাপোর্ট করি না। কিন্তু সুন্দর ভিডিও হলে কেন সাপোর্ট করব না।

গানে টেকনোলজির প্রয়োজন আছে। ৯০% ভয়েসের সঙ্গে ত্রুটি এড়ানোর জন্য ১০% টেকনোলজির ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু ২০% ভয়েসের সঙ্গে যদি ৮০% টেকনোলজির ব্যবহার করা হয় তাহলে তো হবে না।

বেলাল খান : আমি মিউজিক ভিডিওর বিপক্ষে না, কিন্তু পক্ষে থাকতে হবে এমনও না। এমনও অনেকবার হয়েছে যে একজন এসে আমাকে বলছেন, ভাই ভিডিওটি করে নিয়ে এসেছি এখন আপনি যদি একটু ভোকাল দিয়ে দিতেন। এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে অনেক শিল্পীকেই পড়তে হয়েছে। এ জন্য আমি মিউজিক ভিডিও’র বিপক্ষে।

মানুষ শিল্পীকে দেখতে চায়, জানতে চায়। গানের সময় তাদের এক্সপ্রেশন দেখতে চায়। তাই ঢালাওভাবে মিউজিক ভিডিও না করে, বুঝে মিউজিক ভিডিও করা উচিত।

মং উচিং মারমা : ভাল গান আসলে সবই। কিন্তু গানে প্রাণ থাকা উচিত। মিউজিক ভিডিও এক ধরনের বিনোদন। মানুষ কর্মব্যস্ত দিন শেষে বিনোদন চায়। যারা গান ও গানের ভিডিও বানাচ্ছে তাদের সবাইকে সম্মান জানাই। কিন্তু ভাল ভিডিওকে সবসময়ই সাপোর্ট করব।

এফ এ সুমন : আমাদের দেশে মিউজিক অনুয়াযী সাউন্ডও আন্তর্জাতিক মানের। দশটা মেয়ের গানকে ব্যালেন্স করে গান গাওয়া হচ্ছে। এই ভয়েসের সঙ্গে যারা রিলেটেড তাদের বলব এমন অবস্থা থেকে ফিরে আসুন। সেই সঙ্গে সবাইকে ভালো কাজগুলোকে প্রমোট করতে হবে।

শেখ সুমন এমদাদ : জীবনের জন্য ক্যারিয়ার, ক্যারিয়ারের জন্য জীবন নয়। প্রথমে ভালো গান হওয়া দরকার। মাঝে মাঝে জোরপূর্বক গান চাপিয়ে দেওয়া হয়। অনেক সময় শিল্পীরা তাদের পছন্দ মতো মান নির্ধারণ করে দেয়। ফলে কাজ সুন্দর হয় না। আমি কম টাকার অ্যালবাম করতে নারাজ। দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম যেমন ভালো কাজের মধ্যদিয়ে অল্প সময়ে অনলাইন নিউজ পোর্টালের তালিকায় দশম প‌র্যায়ে চলে এসেছে, ঠিক তেমনি সিডি চয়েস ভালো কাজের মাধ্যমে দেশের শীর্ষ পর্যায়ে চলে এসেছে। অর্থাৎ ভালো সব সময়ের জন্যই ভালো। তবে আমি বলব সব গানকে প্রমোট করা সম্ভব নয়। কোনো বাইন্ডিংস না দিয়ে যদি কাজ করা হয়, তাহলে কাজ সুন্দর হবে বলে আমার বিশ্বাস।

[এ পর্যায়ে পুনরায় কথা বলার জন্য সঞ্চালকের অনুমতি চান মাকসুদ]

মাকসুদ : আমি বলব-আমাদের দেশে এমন সব ব্যবসায়ী, এমন ব্যবসা করেন যে ব্যবসার ভিত সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। [শেখ সুমন এমদাদকে উদ্দেশ করে বলেন] আপনি মিউজিক ভিডিও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার, আপনি কি গান জানেন? আপনি কি মিউজিক ভিডিও সম্পর্কে কিছু বুঝেন? আপনি কি শিল্পী, সুরকার, গীতিকার? [সুমন এ সময় মাথা নেড়ে না বোধক উত্তর দেন]। অথচ আপনি মিউজিক ভিডিও বাজারজাত করেন। তাই আমি বলব-এ ক্ষেত্রেই সমস্যা। যারা মিউজিক ভিডিও করেন, তারা কাজটা ভালো মতো জানেন না। এর কনসেপ্ট নিয়ে ভাবেন না। মেলা, উল্লাস, বৈশাখ…এরকম কনসেপ্ট হতে পারে এ সম্পর্কেই আপনাদের ধারণা নেই। চেন অব প্রডাকশনটা জানতে হবে মিউজিক ভিডিও মেকারদের। আপনারা ট্যাক্স দেন না, রয়্যালটি দেন না, কত লাখ অ্যালবাম রিলিজ হয়েছে তার তথ্য থাকে না। অথচ ইচ্ছে হল-একজন শিল্পীকে তারকা বানিয়ে দিলেন। চাইলেন একজনকে হিট করে দিলেন। এগুলো কীভাবে হয় আমরা তা জানি। টাকা আছে, চ্যানেল মালিকের শ্যালিকা কিংবা আত্মীয়তার সূত্র ধরে এ সব করা হয়। অথচ পাশের দেশ ভারতের দিকে তাকান সেখানে শিল্পীকে তারকা হতে হলে তার অ্যালবাম বিক্রিতে রেকর্ড করতে হয়, সেই তথ্য পাওয়া যায়।

আমি নিজে গত সাত বছর কোনো অ্যালবাম করিনি। ১৪ বছর গান লিখি না। ষোলটি রেকর্ডেড গান ডিলিট করে দিয়েছি, কারণ গানগুলো আমার কাছে ভালো লাগেনি। এটাই শিল্পীর সত্তা।

এখানে যারা মিউজিক ভিডিও বানাচ্ছে তারা শুধুই ব্যবসায়ী। সংগীত সম্পর্কে তাদের কোনোই ধারণা নেই। গানকে শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে না মিউজিক ভিডিও কোম্পানিগুলো। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যারা এই ভিডিও তৈরি করছে তারা মিউজিক সম্পর্কে ভালো জ্ঞান ও ধারণা রাখেন। কোনো অ্যালবাম বের করার আগে অবশ্যই এর কনসেপ্ট ঠিক এবং শিল্পী, গীতিকার ও সুরকারদের সমন্বয় করা দরকার।

[এরই মাঝে টেবিলে সবার সামনে দুপুরের খাবার পৌঁছে গেছে। আলোচনার সমাপ্তি টানতে চেষ্টা করেন সঞ্চালক। এ সময় শেখ সুমন এমদাদ দু’ মিনিট কথা বলার জন্য সময় চান…]

শেখ সুমন এমদাদ : মাকসুদ ভাই আমি অন্য দশটা ব্যবসা করতে পারতাম। কিন্তু একটি সাংস্কৃতিক পরিবার থেকে এসেছি বলেই এই ব্যবসা করছি। আমরা ট্যাক্স দেই, শিল্পীদের রয়্যালটি দেই। কিন্তু অ্যালবামের বিক্রি তো নেই। গান সব ডাউনলোড হয়ে যায়। রয়্যালটি বিষয়ে কোনো শিল্পী অভিযোগ করলে আমি এখনই এখান থেকে উঠে চলে যাব। তবে আপনার অভিযোগ সত্য- এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে।

তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু : সবাইকে আবারও ধন্যবাদ। আগামীতে এরকম আরও আয়োজন করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে মতবিনিময় সভার সমাপ্তি ঘোষণা করছি।

[প্রতিবেদন তৈরি করেছেন : ইসহাক ফারুকী, আদিত্য রুপু, প্রিয়াংকা রায়, মুহম্মদ আকবর, মৌমিতা মাশিয়াত ও শামীম রিজভী]

(দ্য রিপোর্ট/এইচএসএম/এনআই/মার্চ ২৯, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

M

M

SMS Alert

জলসা ঘর এর সর্বশেষ খবর

জলসা ঘর - এর সব খবর