thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫,  ৯ মহররম ১৪৪০

রক্তস্নাত মে দিবস : বেঁচে থাকুক স্পাইজ-ফিশাররা

২০১৪ মে ০১ ১২:৫৬:৫২
রক্তস্নাত মে দিবস : বেঁচে থাকুক স্পাইজ-ফিশাররা

মে দিবস; শ্রমজীবী মানুষের সংহতির রক্তখচিত স্মারক। বিশ্বব্যাপী মেহনতী-শ্রমিকের বিজয়ের দিন, আনন্দ ও উৎসবের দিন। আবার বীর শহীদের আত্মত্যাগ-উৎসর্গের দিনও এটি। নতুন সংগ্রামের শপথ নেওয়ারও দিন মহান মে দিবস। এক কথায় মে দিবস শ্রমিক আন্দোলন-সংগ্রামের অবিসংবাদিত স্মারক হিসেবেই যুগ যুগ পালিত হবে। এবং বেঁচে থাকবেন স্পাইজ, ফিশার, অ্যাঞ্জেল ও পারসনসরা— যাঁদের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ জীবনের বিনিময়ে অর্জিত দাবী; উড়েছে বিজয়ের লাল নিশান। শ্রমিক-মেহনতী মানুষ পেয়েছে তার বেঁচে থাকার অধিকার।

স্মৃতিবিজড়িত মহান মে দিবস। বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে ১লা মে জাতীয় ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক দেশে দিবসটি বেসরকারিভাবে পালিত হয়। যথাযথ মর্যাদায় ও ধূম-আয়োজনে পালিত হয় বাংলাদেশেও।

‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ শ্লোগান সামনে রেখে; প্রায় ১২৭ বছর আগে কাজের সময়সীমা ৮ ঘণ্টা; এই দাবীতে একজোট হয় শ্রমজীবী মানুষ। শুরুটা ছিল কাজ ফেলে অবস্থান ধর্মঘট দিয়ে। ১৮৮৬ সালের ১ মে প্রথম সরাসরি প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ব্যাপক সাড়া পান শ্রমিক নেতারা। ফলে দ্রুতই বিস্তৃতি ঘটে আন্দোলনের। তাদের ডাকা ৪ মের ধর্মঘটে বিপুল শ্রমিক সমাবেশ ঘটে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর শহরের হে মার্কেটে। ওই দিন সমাবেশ ঘিরে থাকা পুলিশের ওপর এক অজ্ঞাতনামা বোমা বিস্ফোরণ করে। ঘটনায় একজন পুলিশ নিহত হন। নিরীহ শ্রমিকরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে পুলিশ। ঘটনাস্থলেই প্রায় ১১ জন নিহত হয়।আহত হয় হাজার হাজার শ্রমিক। ওই ঘটনার পর দাবানলের মতো আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ৪ মে ঘটনায় ‘পুলিশ মারা নাটক’ সাজিয়ে আন্দোলনের প্রদান নেতৃবৃন্দকে আটক করা হয়। পরে প্রহসনের বিচার করে কারো কারো মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মেহনতী মানুষের শ্রম-ঘাম-রক্তে অর্জিত মর্মস্পর্র্শী ঘটনায় ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর আন্দোলনের অগ্রভাগের নেতা স্পাইজ, ফিশার, অ্যাঞ্জেল ও পারসনসসহ ৬ জনের ফাঁসীর রায় হয়। এঁদের মধ্যে একজন আত্মহত্যা করেন এবং আর একজনের বয়স কম থাকার কারণে পরবর্তীকালে যাবতজীবন হয়।

ওই প্রাণদণ্ডের প্রতিবাদে বিশ্বের প্রায় ৫০টি শহরে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে শুধু শ্রমিক-মেহনতী জনতাই নয়; সাধারণ আম-জনতা থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী-লেখক-শিল্পী-সাহিত্যিকরাও যোগ দেন। ওই ন্যক্করজনক ঘটনার বিপক্ষে কঠোর প্রতিবাদ জানায়। প্রতিবাদী ভাষা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্ব।

আটক শ্রমিক নেতাদের মুক্তির দাবীতে সোচ্চার হয়ে ওঠে বিশ্ববাসী। সেই আন্দোলন মিছিল-সমাবেশে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী জর্জ বার্নার্ড শ। তখন তাঁর বয়স ৩১ বছর। তখনও শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে ফাঁসীর আদেশ কার্যকর হয়নি। ১৮৮৭ সালের ২২ অক্টোবর আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজন করা হয়। সেখানে শ্রমিক মেহনতী মানুষের পাশাপাশি ব্যাপক জনতারও ঢল নামে। সেই প্রতিবাদমঞ্চ কাঁপিয়ে তোলেন জর্জ বার্নার্ড শ। তিনি অত্যাচারী প্রশাসনের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে তাদের কঠোর ভাষায় হুশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, ‘লক্ষ লক্ষ নিপীড়িত মানুষ, যারা দারিদ্য ও দুর্দশার হাত থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আন্দোলন করেছেন; তাঁদের ফাঁসীরকাষ্ঠে ঝুলিয়ে যদি ভেবে থাক শ্রমিক আন্দোলন দমন করা যাবে; এবং এই যদি তোমাদের অভিমত হয়; তা হলে আমাদেরও ফাঁসী দাও। তুমি এখানে আগুনের একটি ফুলকিকে মাড়িয়ে গেলেও মনে রেখ, তক্ষুণি তোমার পেছনে বা সামনে সর্বত্র আগুন জ্বলে ওঠবে। মাটির তলা থেকে ওঠে আসা সেই আগুন তুমি কখনোই ঠেকাতে পারবে না।’ বার্নার্ড শ-র ইংরেজি কথাগুলো এমন; যা হুবহু তুলে দেওয়া হল— ‘If you think that by hanging us you can stampout the labor movement... the movement from which downtrodden millions, the millions who toil in want and misery- expect Salvation if this is your opinion, then hang us. Here you will tread upon a spark, but there and there, behind you and in front of you, and everywhere, flames blaLwe up; It is a subterranean fire up, Noone can not put it out.’ Source: Glorious Saga of May Day Martyrs: Willium Adelman: CITU Publication Page 30.

শুধু বার্নার্ড শ-ই নয়; প্রাণদণ্ডের প্রতিবাদে সেইদিন মুখ খুলেছেন ঔপনাস্যিক উইলিয়ামস ডিন হোয়েলস, হেনরি ডেমাবেস্ট লয়েড় প্রমুখ সমাজ সচেতন ব্যক্তিত্ব। তাঁদের বক্তব্য ছিল এক সুতোয় বাঁধা, ‘The greatest wrong that ever threatened our fame as a native’

ফ্রান্সের সংবাদপত্র বলা হয়েছে— ‘এই প্রাণদণ্ড একটি রাজনৈতিক অপরাধ। এটা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় নীতির ওপর দুর্নামের কালিমা লেপে দেবে।’ হয়েছেও তাই।

১৮৮৬ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্র বা বিশ্বের কোথাও শ্রম আইন ছিল না। শ্রমিকদের মানবিক ও অর্থনৈতিক অধিকার বলতেও কিছু ছিল না। তারা ছিল মালিকদের দাস মাত্র। এমনকি তাদের ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হত। ছিল না চাকরীর স্থায়িত্ব ও ন্যায়সঙ্গত মজুরীর নিশ্চয়তা। এর আগে শ্রম ঘণ্টা ৮ করার জোর দাবীকে সামনে রেখে ‘আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার’ ১৮৮৫ সালের সম্মেলনে ১৮৮৬ সালের ১লা মে আমেরিকা ও কানাডার রেলপথ-রাজপথ অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। যেখানে প্রায় ৩ লক্ষাধিক শ্রমিক সমবেত হয়।

আন্দোলনের বিজয় অর্জিত হয় ১৮৮৯ সালে। ওই সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে শিকাগোর রক্তঝরা দিনটিকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সম্মেলনে প্রতিবছর ১লা মে ‘শ্রমিক হত্যা দিবস’ ও ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। দৈনিক ৮ ঘণ্টা কার্য সময় ও সপ্তাহে এক দিন সাধারণ ছুটি প্রদানের ব্যবস্থা করে প্রথম শ্রম-আইন প্রণীত হয়। আর সিদ্ধান্তক্রমেই ১৮৯০ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হচ্ছে মে দিবস। কোনো কোনো স্থানে শিকাগোর হে মার্কেটের আত্মত্যাগী শ্রমিকদের স্মরণে আগুনও জ্বালানো হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, কিউবাসহ বিশ্বের অনেক দেশেই মে দিবসে ঘটা আয়োজন থাকে। আমেরিকা ও কানাডাতে অবশ্য সেপ্টেম্বর মাসেশ্রম দিবস পালিত হয়।

শান্তি ও ন্যায়ের ধর্ম ইসলামেও শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করে। শ্রমিকদের প্রতি সুবিচারের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ (সা.) শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষকে অত্যন্ত সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতেন। শ্রমের মর্যাদা বুঝাতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, مَا أَكَلَ أَحَدٌ طَعَامًا قَطُّ خَيْرًا مِنْ أَنْ يَّأْكُلَ مِنْ عَمَلِ يَدَيْهِ وَإِنَّ نَبِىَّ اللهِ دَاؤُوْدَ عَلَيْهِ السَّلاَمُ كَانَ يَأْكُلُ مِنْ عَمَلِ يَدَيْهِ- ‘কারো জন্য স্বহস্তের উপার্জন অপেক্ষা উত্তম আহার্য আর নেই। আর আল্লাহর নবী দাঊদ (আ.) স্বহস্তে জীবিকা নির্বাহ করতেন।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও এরশাদ করেন, أُعْطُوا الْأََجِيْرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَّجِفَّ عَرقُهُ- অর্থাৎ— ‘তোমরা শ্রমিককে তার শরীরের ঘাম শুকানোর পূর্বেই পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।’

মহান মে দিবসে আমরা তাঁদেরকে স্মরণ করি যাঁরা মেহনতী শ্রমিকদের দাবী আদায় করতে গিয়ে আত্মহুতি দিয়েছিলেন। তাঁদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে পারে না। তাঁরা শ্রমিক শ্রেণীর হৃদয়ে রাজটীকা হয়েই থাকবেন। আর মেহনতী-শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলন যতদিন থাকবে; ততদিন ওই স্পাইজ, ফিশার, অ্যাঞ্জেল ও পারসনসরা বেঁচে থাকবেন মৃত্যুহীন স্মারক হাতে।

লেখক : সাংবাদিক, রাজনীতিক ও প্রাবন্ধিক

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

মুক্তমত এর সর্বশেষ খবর

মুক্তমত - এর সব খবর



রে