thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫,  ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

ইসলামে শ্রমিকের অধিকার

২০১৪ মে ০১ ১৪:০৭:০৭
ইসলামে শ্রমিকের অধিকার

এ.কে.এম মহিউদ্দীন

শ্রমিক শ্রেণীর ভাগ্যোন্নয়নে আমাদের নবী করীম (সা.) অনেক কাজ করে গেছেন। তাদের জন্য বিভিন্ন কর্মপন্থা গ্রহণ করেছিলেন মানবতার অকৃত্রিম বন্ধু মহানবী (সা.)। এ পর্যায়ে আমরা কয়েকটি হাদিস বর্ণনা করার পাশাপাশি বলার চেষ্টা করব কেমন ছিলেন তিনি। পাশাপাশি তাঁর আদর্শের ধারক খলিফাদের নীতিও আমরা এখানে সন্নিবেশ করব।

এটা খুবই স্পষ্ট রাসূল মুহাম্মদ (সা.) এমন একটি অর্থব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করেন যেখানে পুঁজির মালিক শ্রমিক নিয়োগকর্তা ও নিয়োজিত হিসেবে নয়, বরং অংশীদার হিসেবে অংশগ্রহণ করে। একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় মধ্যযুগের মুসলিম অর্থব্যবস্থার একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র অংশ মজুরীভিত্তিক ছিল। তারা ছিল প্রধানত শিল্পকর্মী যারা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করতো। তবে এ সব উপার্জনকারী ব্যক্তিরা কোনো ব্যক্তিবিশেষের বেতনভুক শ্রমিক বা চাকরিজীবী ছিল না, বরং তারা কাজ অনুপাতে পারিশ্রমিক গ্রহণ করত। মহানবী (সা.) মজুরীভিত্তিক শ্রমব্যস্থাও বন্ধ করে দেননি। কারণ এ ছাড়া অর্থনীতির সেবাখাত চালু রাখা সম্ভব ছিল না। কিন্তু উৎপাদন খাতে শ্রমিকদেরকে মালিকের সাথে উৎপাদনে অংশীদার করা হয়।

অংশীদার হিসেবে শ্রমিকের ভূমিকা নিয়ে রাসূলের একটি মত আমাদের পঠনের সীমানায় লক্ষ্য করা যাক, ‍‍"আল-মারুর ইবনে সুয়াইদ (র.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু যার (রা.)-দেখলাম যে, তার পরনে যে চাদর, অনুরূপ চাদর তার খাদেমের পরনেও। আমি তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর যুগে এক ব্যক্তিকে গালি দিয়েছিলেন এবং তার মায়ের নিন্দা করে তাকে লজ্জা দিয়েছিলেন। আবু যার (রা.) বলেন, অতঃপর লোকটি নবী (সা.)-এর কাছে এসে ঘটনাটি তাঁকে জানাল। নবী (সা.) আবু যারকে (রা.) বলেন, ‘তুমি তো এমন ব্যক্তি যে, তোমার মধ্যে মূর্খতা রয়েছে।’ তোমাদের খাদেমরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। সুতরাং কারো অধীনে তার ভাই থাকলে, সে নিজে যা খায় এবং যা পরে তাকেও যেন তাই খাওয়ায় ও পরায়। আর তোমরা তাদেরকে বেশী কষ্টকর কাজ করতে দিও না। যদি এরূপ কাজ করতে দাও তবে তোমরা তাদেরকে সাহায্য কর। (মুসলিম, আয়মান, অধ্যায় ১০, নং ৪৩১৫/৪০)।

আরেকটি হাদিসে উদ্ধৃত হয়েছে এভাবে-আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, খাদেমদের ন্যায্য অধিকার হচ্ছে, খাওয়া ও পরা তাদেরকে সরবরাহ করা এবং সাধ্যের অতিরিক্ত কষ্টকর কাজ তাদের উপর চাপিয়ে না দেওয়া (প্রাগুক্ত, নং ৪৩১৬/৪১)। অধিকার সম্পর্কিত আরও একটি হাদিস এমন-আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমাদের কারো খাদেম যখন তার জন্য খাদ্য প্রস্তুত করে নিয়ে আসে, অথচ সে রান্নাঘরে আগুনের উত্তাপ ও ধোঁয়া এবং খাদ্য তৈরীর সমুদয় ক্লেশ বরদাশত করেছে, তখন উচিত তাকেও নিজের সাথে আহার করানো। যদি খাদ্য এতো সামান্য হয় যে, অন্যান্য খানেওয়ালাদের তুলনায় খাদ্য কম, তাহলে তার হাতে অন্তত দুই-এক লোকমা (গ্রাস) অবশ্যই দিয়ে দাও। (প্রাগুক্ত, নং ৪৩১৭/৪২)।

এই হাদিসের টিকায় ভাষ্যকার বলছেন, ইসলামে চাকর ও মালিকে কোনো ভেদাভেদ নেই, সবাই সমান। তাই পাচক খানা পাক করে নিয়ে আসলে তাকে সাথে বসিয়ে খাওয়ানোই ইসলামের নিয়ম। নিজে যা খাবে তাকেও তা খাওয়াবে, যা পরবে তাকেও তা পরাবে। যদি এতটুকু উদারতা দেখানোর মনোবল না থাকে তবে অবশ্যই সে যেন ওই খানা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত না হয়। কারণ মালিক সে খাবারের আস্বাদ ভোগ করছে, তা রান্না করতে আগুনের উত্তাপ এবং ধোঁয়ার যন্ত্রণা ইত্যাদি চাকর বা পাচককেই ভোগ করতে হয়েছে।

আল্লাহ্‌র রাসূলের (সা.) মজুরী সম্পর্কিত বাণী

আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, শ্রমিকের দেহের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার আগেই তোমরা তার মজুরী দাও (ইবনে মাজা, কিতাবুর রাহুন, অধ্যায়-৩,নং ২৪৪৩)।

আরেকটি হাদিসে রাসূল (সা.) এ সম্পর্কে কঠোর উক্তি করেছেন। হাদিসটি এ রকম- আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেছেন, কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিবাদী হব। যে ব্যক্তি আমার নামে শপথ করে, অতঃপর বিশ্বাসঘাতকতা করে, যে ব্যক্তি কোনো স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করে এবং যে ব্যক্তি শ্রমিক নিয়োগ করে তার থেকে পুরো কাজ করিয়ে নেয়, কিন্তু তার মজুরী দেয় না। (বুখারী, কিতাবুল বুয়ু, অধ্যায় ১০৬, নং ২২২৭)। অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে যা আল-মুসতাওরিদ ইবনে শাদ্দাদ (রা.) উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেন, আমি নবী (সা.) কে বলতে শুনেছি : যে ব্যক্তি আমাদের (সরকারের কাজের) কর্মকর্তা হবে সে স্ত্রী গ্রহণ করবে (এ জন্য বিবাহের খরচ আমরা দিব), তার যদি কোনো খাদেম না থাকে সে একজন খাদেম গ্রহণ করবে (যার বেতন বা ভরণপোষণ আমরা দিব)। আর তার যদি কোনো বাসগৃহ না থাকে তো সে একটি বাসগৃহের ব্যবস্থা করবে (যার নির্মাণ ব্যয় আমরা বহন করব)। রাবী (বর্ণনাকারী) বলেন, আবু বাক্‌র (রহ.) বলেছেন, আমাকে জানানো হয়েছে যে, নবী (সা.) বলেছেন, : “আর যে ব্যক্তি এ ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করবে সে প্রতারক বা চোর”।(আবু দাউদ, খারাজ, অধ্যায়-৯, নং ২৯৪৫)।

উল্লিখিত হাদিসের আলোকে লক্ষ্য করা যায়, একজন পরিশ্রম করবে অন্যজন তাকে বঞ্চিত করে তার শ্রমের ভোগ করবে এ রূপ ব্যবস্থা রাসূল (সা.) সমর্থন করেন নি। প্রকৃতপক্ষে ইসলামে শ্রমিক আর অফিসার বলে কিছু নেই। হোয়াইট কালার বা ব্লু কালার এগুলো বর্তমান সামন্তবাদী ধনতন্ত্রী সমাজে যেমন দেখা যায় সমাজতান্ত্রিক দেশেও তেমন। ইসলামী সমাজে সকল ব্যক্তিই শ্রমিক। ইসলামী সাধারণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা হজরত আদম (আ.) থেকে হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সকল নবী-রাসূলই ছিলেন শ্রমিক। নবীরা মেষ-পালকের কাজ করেছেন। আমাদের নবী (সা.)ও মেষ চরাতেন।

সীরাত পাঠে এ কথা পষ্টভাবে জানা যায়, আমাদের নবী করীম (সা.) সব ধরনের কায়িক পরিশ্রম করেছেন। ইসলাম প্রচারের শুরুতে কায়েমী স্বার্থবাদীরা তাদের শতাব্দীব্যাপী শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থার প্রতি আল-আমিন এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় মহান যুবক মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতিবাদ এবং চ্যালেঞ্জ লক্ষ্য করে তাঁকে বশীভূত করার প্রয়াস পেয়েছিল। তাঁকে রোমান ও পারস্যবাসীদের ন্যায় রাজার মসনদে বসাতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি সারা জীবন শ্রমিকই থেকে গেলেন। পরবর্তীকালে ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক হয়েও তিনি অতি সাধারণ শ্রমিক মজুরের ন্যায় নিঃস্বই ছিলেন। অন্তিম রজনীতে তাঁর বাসগৃহে দীপ জ্বালানোর জন্যে তেল কেনার পয়সাও ছিল না। প্রদীপবিহীন অন্ধকার গৃহে শেষ নিঃশ্বাসের সময় তাঁর চেহারা মুবারক কেউ ভাল করে দেখতে পায় নি।

তাঁরই আদর্শের ধারক খলীফাগণও ছিলেন যথার্থ নমুনা। হজরত উমর (রা.) এর জামায় ১৪টি তালি ছিল। আজকাল চৌদ্দ তালি জামা গায়ে দেওয়া সরকারি কর্মচারী তো দূরে থাক, ভিক্ষুকও দেখা যায় না। খলীফার চেয়ে কম বেতনের কোনো সরকারী কর্মচারী ছিলনা।

প্রকৃত কথা হচ্ছে, ইসলামী অর্থনীতি বা সমাজে শ্রমিকের খাওয়া-পরা বা বাসস্থান কিছুর মানই মালিকের জীবনযাত্রার মানের চেয়ে নীচে নামতে পারবে না।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

ধর্ম এর সর্বশেষ খবর

ধর্ম - এর সব খবর