thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫,  ৮ মহররম ১৪৪০

সারাদেশে সাংগঠনিক ‘রেড এলার্ট’ খালেদার

২০১৪ মে ০১ ১৬:২১:৪৪ ২০১৪ মে ০১ ০৫:৪০:০০
সারাদেশে সাংগঠনিক ‘রেড এলার্ট’ খালেদার

দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক : গুম, খুন ও অপহরণ প্রতিরোধে সারাদেশে সাংগঠনিক ‘রেড এলার্ট’ ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এ জন্য তিনি বিএনপিসহ ১৯ দলের নেতাকর্মী-সমর্থকদের প্রস্তুত থাকারও নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘নির্দেশ দিচ্ছি কাউকে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। সে পুলিশ হোক, র‌্যাব হোক, হোক আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী। সবাইকে ঘেরাও করে ফেলবেন। ছেড়ে দেবেন না। নির্দোষকে ছিনিয়ে আনবেন, আর দোষীকে আইনে সোপর্দ করবেন। আজ থেকে সারাদেশে রেড এ্যালার্ট জারি করা হল।’

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বৃহস্পতিবার বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের উদ্যোগে শ্রমিক সমাবেশের প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন।

৪৮ মিনিটের বক্তব্যে খালেদা জিয়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘সময় থাকতে সাবধান হন। বাংলাদেশের মানুষ জেগে উঠলে রেহাই পাবেন না। এখনও সময় আছে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। আলোচনা করুন। এই অবৈধ সংসদ ভেঙ্গে দিন। না হলে রেহাই পাবেন না।’

খালেদা জিয়া নারায়ণগঞ্জের অপহরণ ও খুনের ঘটনায় আওয়ামী লীগকে দায়ী করে বলেন, ‘সরকার অপহৃতদের খুঁজে বের করতে পারল না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থেকে হাসিনা কেন তাদের উদ্ধারে ব্যবস্থা নিলেন না। ৭ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেল। এই হত্যার দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হাসিনা ও সরকারকে নিতে হবে।’

তিনি অভিযোগ করেন, এসব খুন, গুমের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের লোকজনই জড়িত। আওয়ামী লীগের দুর্নীতির কারণে পুলিশ বিভাগের চেইন অফ কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে। তারা পুলিশকে অন্যায়ভাবে কাজে লাগাচ্ছে। পুলিশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বলে ‘টাকা দাও, না হলে জেলে যাও’।

খালেদা জিয়া বলেন, দেশের মানুষ আজ রুদ্ধ। সারাদেশকে এই অবৈধ সরকার আজ একটি কারাগারে পরিণত করেছে। দেশের মানুষকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে এই অবৈধ সরকার।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ দেশের মানুষকে বিশ্বাস করে না। তাদের কথায় দেশের মানুষ ৫ জানুয়ারিতে ভোট দিতে যায়নি। আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে কেউ ভোটকেন্দ্রেও যায়নি। কেন্দ্রে কোনো পুলিশও ছিল না। ছিল কিছু কুকুর। তাহলে কি ভূত ও জিনে এদের ভোট দিয়েছে? এই সরকার হচ্ছে ভূত ও জিনের সরকার। তাই এ অবৈধ সরকার জনগণের সমর্থনে নয়, এটা একটি একদলীয় সরকার।

খালেদা জিয়া বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সবক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। সেজন্য জনগণকে ভয় পেয়ে চিরদিন ক্ষমতায় থাকতে সংবিধান বদল করেছে। কিন্তু আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলে দিতে চাই, দেশের মানুষ যখন জেগে উঠবে তখন এই সংবিধান তাদের রক্ষা করতে পারবে না। আজ কিছু নমুনা দেখা যাচ্ছে, নারায়ণগঞ্জ তার উদাহরণ। নারায়ণগঞ্জের ঘটনার জন্য আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাসিনাকে জবাব দিতে হবে। তিনি বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ড আওয়ামী লীগ ঘটিয়েছে। তাদের লোকেরাই ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। সেদিন কেন প্রধানমন্ত্রী গণভবন ছেড়ে দ্রুত হেয়ার রোডে গিয়ে উঠেছিলেন? কেন তিনি বিডিআরের ডিনারে যাননি। কেন বিদ্রোহীদের সঙ্গে লাঞ্চ করলেন? কেন সেনাবাহিনী, র‌্যাবকে অভিযানে যেতে দেওয়া হয়নি? এসব সকলেই বুঝতে পারেন। কাজেই আওয়ামী লীগ হচ্ছে- খুনিদের দল। রক্ত খেকো সরকার। আওয়ামী লীগ হচ্ছে ড্রাকুলার সরকার। আওয়ামী লীগের হাতে দেশের মানুষ নিরাপদ নয়। দেশও নিরাপদ নয়।’

খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগের ৫ বছরে দুই লাখ তাঁত বন্ধ হয়েছে। বেকার হয়েছে লাখ লাখ শ্রমিক। একদিকে আওয়ামী লীগ মানুষ খুন করছে, অন্যদিকে বেকার করছে। আজ হাজার হাজার গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেছে। কাজেই শ্রমিক-মালিকের স্বার্থেই এই অবৈধ আওয়ামী লীগ সরকারকে বিদায় করতে হবে।

তিনি বলেন, আজ শুধু আওয়ামী লীগ ও তাদের এমপি-মন্ত্রীরা লাভবান হচ্ছেন। কোনো টেন্ডার হচ্ছে না। তারা লুটেপুটে খাচ্ছেন। জীবনের ভয়ে কেউ টেন্ডারে অংশও নেয় না। আজ ৩০০ এমপির মধ্যে ২২৬ জন কোটিপতি হয়েছেন। ৪২ জন কোনো ট্যাক্স দেন না। আজ পুকুরচুরি হচ্ছে। এরা হচ্ছে চোর ও খুনির সরকার।

তিনি আরো বলেন, ‘কথায় কথায় বিরোধী দলের নামে মামলা দেওয়া হয়। কিন্তু কেন ২২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয় না? যে ৪২ জন ট্যাক্স দেন না, কেন দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে না? দুদক কেন আজ আওয়ামী লীগের অঙ্গ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে?’

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। আর আওয়ামী লীগ আজ ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছে। সীমান্তে যখন আমার ভাই-বোনদের হত্যা করা হয়, সীমান্তের ভেতরে ঢুকে যখন আমার লোকদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, সীমান্তে ফেলানীকে যখন হতা করে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হয়, সীমান্তের ভেতরে এসে যখন আমাদের কৃষকদের ধান কেটে নিয়ে যাওয়া হয় তখন এই ক্রীতদাস আওয়ামী লীগ কোনো কিছুই করতে পারে না। কারণ তারাতো ক্রীতদাস।’

তিনি বলেন, ‘এই ক্রীতদাসরা ক্ষমতায় থাকলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো বিনিয়োগ করবে না। কাজেই এই ক্রীতদাস সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটাতে হবে। সেজন্য সকলের প্রয়োজন আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়া।’

বিএনপি প্রধান অভিযোগ করেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে জঙ্গিদের সম্পর্ক রয়েছে। জেএমবির আ. রহমান মির্জা আজমের দুলাভাই। মির্জা আজম কি বিএনপি করে? আওয়ামী লীগ করে। ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে জঙ্গিদের কারা অপহরণ করেছে? আওয়ামী যুবলীগের নেতারা করেছে। এই জঙ্গি, দুর্নীতিবাজ, খুনিদের ক্ষমতায় রাখা যাবে না। তাদের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে কোনো লাভ নেই। কাজেই এখন গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমি জনগণের নিরাপত্তার দাবিতে, গণতন্ত্রের দাবিতে, মানুষের জন্য, দেশের জন্য আবারও রাস্তায় নামবো। সকলে প্রস্তুত নিন, সতর্ক থাকুন। সময় মতো ডাকলে আসবেন।’

শ্রমিক সমাবেশে খালেদা জিয়া বলেন, ‘রানা প্লাজায় যেসব শ্রমিক নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের কোনো সাহায্য ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। সে সময় এই আওয়ামী লীগ দেশ-বিদেশ থেকে অনেক চাঁদা তুলেছিল। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তদের তা দেওয়া হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় এসে নতুন নতুন কল কারখানা স্থাপন করেছে, তিন শিফটে উৎপাদন চালু করেছে, শিশুশ্রম বন্ধ করেছে, উৎসব বোনাস চালু করেছে, গার্মেন্টস কারখানা চালু করেছে। জিয়াউর রহমান এসব চালু করেছিলেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘আজ দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। ব্যাংকে অলস টাকা পড়ে আছে। নতুন কোনো শিল্প কারখানা হচ্ছে না। বিদেশে কোনো নতুন শ্রমিক যেতে পারছে না। আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় শ্রম বাজার হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। সেই মধ্যপ্রাচ্য আমাদের কোনো শ্রমিক নিচ্ছে না। সেখান থেকে অনেক শ্রমিক খালি হাতে দেশে ফেরত আসছেন। আওয়ামী লীগের কার্যকলাপের কারণে আমাদের সবচেয়ে বড় এই শ্রম বাজার বন্ধ হয়ে গেছে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ শ্রমিক নিচ্ছে না। তারা না বলে দিয়েছে।’

বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘আমরা ভাত চাই, কাজ চাই, শান্তি চাই। আওয়ামী লীগ কোনটাই দিতে পারেনি।’

সরকারের উদ্দেশে খালেদা জিয়া আরো বলেন, ‘অবিলম্বে অবৈধ সংসদ ভেঙ্গে দিন। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। আলোচনায় আসুন। বিন্দুমাত্র দেশপ্রেম থাকলে, দেশকে ভালোবাসলে গদি ছেড়ে নির্বাচন দিন। জনগণ যদি আপনাকে ভোট দেয়, তাহলে গদিতে বসবেন। না হলে গদি ছাড়বেন।’

খালেদা জিয়ার বক্তব্যের শেষ মুহূর্তে হঠাৎ সমাবেশস্থলে বিক্ষিপ্ত বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কিছু উৎকণ্ঠিত নেতাকর্মী সমাবেশের পশ্চিম ও পূর্ব দিকে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। এ সময় সময় তিনি ঘোষণা দেন, ‘আমাদের এই বিশাল সমাবেশে কিছু দালাল ও বেঈমান ঢুকে পড়েছে। দালালদের চ্যাপ্টা করে দেবেন। কাউকে ছেড়ে দেবেন না।’

বৃহস্পতিবার বিকেল সোয়া ৪টায় শ্রমিক দলের ‘মে দিবস’র সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে খালেদা জিয়া মঞ্চে উপস্থিত হন। এ সময় হাজার হাজার নেতাকর্মী শ্লোগানে শ্লোগানে নেত্রীকে স্বাগত জানান। হাত নেড়ে তিনি উপস্থিত নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছার জবাব দেন।

পবিত্র কোরআন তেলওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশ শুরু হয়। পরে ‘সরকারদলীয় সন্ত্রাসী’দের হাতে নিহত এবং রানা প্লাজা ও তাজরিন গার্মেন্টসে নিহতদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন ও মোনাজত করা হয়।

বিএনপির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ও নির্দেশনায় সাভারের রানা প্লাজা ধসের স্মরণে লেখা দুটি গানও পরিবেশন করা হয়। জাসাসের শিল্পীরা বিএনপির দলীয় সংগীত পরিবেশন করেন।

এর আগে, দুপুর থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে আসতে থাকেন। বিকেল ৩টায় সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও দুপুর থেকে বিএনপি এবং এর সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।

মাথায় লালপট্টি বেঁধে, ঢোল-তবলা ও বাদ্যযন্ত্র বাজাতে বাজাতে নেতাকর্মীরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করেন। সমাবেশ ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে এক উৎসবের আমেজ দেখা দেয়।

নেতাকর্মীদের হাতে ধরা ফেস্টুন ও প্লাকার্ডে লেখা ‘মে দিবস দিচ্ছে ডাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’, ‘এই মুহূর্তে দরকার খালেদা জিয়ার সরকার’।

এরও আগে, জাসাসের গণসংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন।

(দ্য রিপোর্ট/টিএস-এমএইচ/এমএআর/মে ০১, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

রাজনীতি এর সর্বশেষ খবর

রাজনীতি - এর সব খবর



রে