thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫,  ৯ মহররম ১৪৪০

মাগো তোমায় ভালোবাসি

২০১৪ মে ১১ ০০:২৩:৩৩
মাগো তোমায় ভালোবাসি

রানা মুহম্মদ মাসুদ, দ্য রিপোর্ট : অভাবী জীবনে না পাওয়ার বৈরী উত্তাল ঢেউ থাকে। আমি অভাব, সঙ্কটেই ব্যথা নিয়ে বেড়ে উঠেছি। তবে আক্ষেপ ছিল না, ভেবেছি পৃথিবীতে কাউকে না কাউকে দুঃখ সইতে হয়। এ সবের মধ্যেই শিক্ষাটাকে সঙ্গী করে নিতে পেরেছি। ক্রমাগত টানাপোড়েনে এই বেড়ে ওঠার কৃতিত্বটুকু আমার মায়ের।

ছোটবেলা থেকে মাকে দেখে আসছি। বড় দুঃখিনী, বড় নিঃস্বার্থ। কখনও তার আঁচলে শ্রমের গন্ধ মোছে না। সীমিত যোগ্যতার উদাসী বাবার নামমাত্র আয়ে কোনোদিনই আমাদের সংসার চলেনি। তাই আমার মা চির দুঃখযাপিনী। রাগী ও গম্ভীর ব্যক্তিত্বের কারণে বাবার সঙ্গে আমার ভয়মিশ্রিত একটা দূরত্ব ছিল। আমার মনে পড়ে না কোনোদিন বাবার বুকে মাথা রেখে নির্ভয় উষ্ণতার ছোঁয়া নিয়েছি। মা সবটুকু মাতৃত্বে আগলে রেখেছেন আমাদের দু’ভাই বোনকে।

দেখেছি বাবারটা ঠিক রেখে মা না খেয়ে দু’ভাই বোনকে খাইয়েছেন। আমার মায়ের কত দুঃখ। তখন মায়ের কষ্টে আড়ালে কত কেঁদেছি, বিদ্রোহী হয়েছি। কিশোর মন রাঙানোর নানা সরঞ্জাম না পাওয়ার অভিমানে গাল ফুলিয়ে থাকার দিনগুলো কেটেছে আমার খাতা, কলম, স্কুলের ড্রেস যোগাড়ের সংগ্রামে। বাবা কলজে কাঁপানো ধমক দিলেও এ সব দিনে মা তার রক্ত নিংড়ানো সঞ্চয়টুকু তুলে দিতেন। সকল বৈরিতা মোকাবেলা করে মা আমার লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন।

দুই
স্কুল ছেড়ে কলেজে উঠি। পড়ার খরচের ভারটা নিজের কাঁধেই তুলে নেই। মায়ের দুঃখ তখনও মোছেনি। সারাদিন ক্লাস, টিউশনি, পড়ায় ব্যস্ত থাকি। নিয়ম করে খাওয়া হয় না। রাতে ফিরে ক্লান্তিতে বিছানায় নেতিয়ে বসে পড়লে মা কাছে এসে বসেন। ছল ছল চোখে খালি গায়ে আদরের হাত বুলাতে বুলাতে বলতেন, ‘আহা! পোলাডা আমার কত শুকাইয়া গেছে। বাবা তুমি টাকা দিয়া ভালমন্দ খাইয়ো।’ তারপর চুলে আঙ্গুল ডুবিয়ে বলতেন, ‘বাবা তুমি আগের মতো আর মা মা কর না।’ মা’র মুখের দিকে তাকাতাম। এ দুঃখিনী মুখ আমি সইতে পারি না। অস্তিত্বের শিকড়-বাকড় উপড়ে বলতে ইচ্ছে করে, মাগো তোমায় ভালবাসি। বলি- ‘মা একদিন আমাগো টাকা হইব, কোনো দুঃখ থাকব না।’ মা’র বুকে কতদিন পর মাথা রাখি। মনে হয় আমার কোনো ক্লান্তি নেই, দুঃখ নেই। মায়ের সুবাস কী অপার্থিব! মা কাঁদেন। আনন্দ, বেদনা, রাগ, প্রতিবাদ সবকিছুতেই মা কাঁদেন।

তিন
লেখাপড়া শেষ করে চাকরি নেই, বিয়ে করি। মায়ের দুঃখ কি ঘুচল! কাজে সকালে বের হই রাতে ফিরি। রাত ১০টা পার হলেই মায়ের ফোন, ‘বাবা তুমি কোথায়?’ পেশাগত কারণে কখনও কখনও রাতটা একটু বেমানান রকম বেশী হয়ে যায়। বউ হয়ত বোঘোরে ঘুমায় কিংবা টিভি দেখে। মা খানিকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসে দরজা খুলে দেন। আর্থ্রাইটিস আছে। আমি না ফেরা পর্যন্ত রাতের খাবারও খান না। কখন বিরক্ত হই- ‘আপনার বসে থাকার দরকার কী, পপি (আমার স্ত্রী) আছে না?’ মা আস্তে শুধু বলেন, ‘বাবা তোমার সন্তান হলে বুঝবা।’

আমি বুঝি সম্প্রসারিত পারিবারিক জটিলতায় মায়ের গভীর গোপন দীর্ঘশ্বাস আছে। মাকে সুখী করার চেষ্টা হয়ত আমার আরেকটি যুদ্ধ।

চার
সবচেয়ে নির্মমতম ঘটনাটা ঘটে যায় আমাদের পরিবারে। আমার একমাত্র বোন দু’টি সন্তান রেখে মর্মান্তিকভাবে মারা যায় গত বছর। সীমাহীন শোকে পরিবার যেন থৈ থৈ ব্যথার সাগর। এখন আর আমাদের পরিবারে কোনো উৎসব নেই। মা ভাত রাঁধতে গেলে কাঁদেন, খেতে গেলেও কাঁদেন, ঘুমাতে গেলেও কাঁদেন। ডায়াবেটিস বাঁধিয়েছেন, সঙ্গে আছে উচ্চ রক্তচাপও। বোনের জন্য বুকের ভেতরটা আমারও হু হু করে। মাকে বুঝতে দেই না। তিনি হয়ত আরও ভেঙ্গে পড়বেন। দল পাকিয়ে আসা সব কষ্ট গিলে ফেলি।

সন্তানের মর্ম আমিও বুঝতে শিখেছি। আমারও একটি মেয়ে আছে। চিরদুঃখী মা আমার দুঃখী হয়েই রইল। হয়ত মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শোকে মায়ের চোখের জল ঝরবে। আমার ক্ষুদ্র সামর্থ্য দিয়ে মাকে সুখী করার চেষ্টা করব। হয়ত স্বভাবের অন্তর্মুখিতায় কোনো দিনও বলিনি। কিন্তু নিয়ত যেন বুকের গভীরে নীরব চিৎকার উঠছে, ‘মাগো তোমায় ভালোবাসি।’

(দ্য রিপোর্ট/আরএমএম/আইজেকে/এইচএসএম/এনআই/মে ১১, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

মুক্তমত এর সর্বশেষ খবর

মুক্তমত - এর সব খবর



রে