thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

লুডু খেলায় আমি আর আম্মা একপক্ষে থাকতাম

২০১৪ মে ১১ ১১:০৫:৫২
লুডু খেলায় আমি আর আম্মা একপক্ষে থাকতাম

হানিফ রানা, দ্য রিপোর্ট : আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে জীবনে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি কাকে? এক কথায় উত্তর চলে আসে আমার মা। ছোটবেলা থেকেই আমি আমার মাকে বেশি ভালোবাসি। কেন জানি না। লোকে বলে ছেলেদের মায়ের প্রতি টান থাকে আর মেয়েদের বাবার প্রতি। আমরা দুই ভাই-বোন। আমার বোন আমার পাঁচ বছরের বড়। আপুকে দেখতাম আব্বার প্রতি একটু বেশি টান। তার মানে এই নয় যে মায়ের প্রতি টান কম। আমার এই জীবনে কখনও আব্বা শাসন করে আমার গায়ে হাত তুলেননি, আব্বার হাতে মার খাইনি। যত শাসন যত শাস্তি পেয়েছি সব আম্মার হাতে। আমার মনে আছে দুষ্টুমির দায়ে পৌষ মাসের সন্ধ্যায় আম্মা আমাকে পুকুরের মধ্যে একটা বাঁশের খুঁটির সঙ্গে এক ঘন্টা বেঁধে রেখে ছিলেন আর মাথায় অনবরত পানি ঢেলেছিলেন। এই ঘটনা দেখে আব্বা আম্মাকে বকাবকি করে আমাকে পুকুর থেকে তুলে আনলেন এবং আমাকে গরম কাপড় পরিয়ে দিলেন। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো গরম কাপড় পরেই আমি মায়ের কোলের মধ্যে গিয়ে বসলাম।

তখন আমি ক্লাস ওয়ানে পড়ি। আপুকে একদিন মেরেছিলাম, এই অপরাধে মা আমার দুহাত ফ্যানের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন অনেকক্ষণ, আব্বা এসেই আমাকে পরিত্রাণ দিলেন বরাবরের মতো। রাতে খাওয়া শেষে আমরা লুডু খেলতে বসতাম, সব সময় আমি আর আম্মা একপক্ষ আর আব্বা আর আপু আরেকপক্ষ হিসেবে খেলতাম। কখনই আব্বা তার পক্ষে আমাকে নিতে পারতেন না। আমি আমার আম্মার মুখের খাবার খেতাম, কিন্তু আব্বার খেতাম না। দিলেও বলতাম খাব না ঘৃণা লাগে। আব্বা আমার কোনো চাহিদাই অপূর্ণ রাখতেন না। তারপরও ছোট বেলায় বেচারা আমার সমর্থন পেতেন না। এতে আব্বা কষ্ট পেতেন না বরং হাসতেন, আর আম্মা বলতেন রানা তোমার ছেলে, তোমাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না।

মায়ের প্রতি আমার ভালোবাসা আমার টানটা বেশি কেনো আজও জানি না। মায়ের চোখের পানি আমি কখনই দেখতে চাই না। যদিও বা কখনও মায়ের চোখে পানি দেখি তাহলে খুব কষ্ট লাগে।

ছোট বেলা থেকে মায়ের শাসন আবার আব্বার আদরে বড় হয়েছি। দেখেছি আমার অসুস্থতায় আব্বা কেমন করত। মাকে ওতটা উদগ্রীব দেখিনি আমার অসুস্থতায়। তবে আমি অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখানো, টেককেয়ার করা সবকিছুই আম্মা করে থাকে। তবে আমার জীবনের একটি ঘটনায় বুঝতে পারলাম আম্মা আমাকে কতটা ভালোবাসেন। তার ভালোবাসার কাছে মায়ের প্রতি আমার ভালোবাসাটা তুচ্ছ।

খুলনাতে আমাদের নিজেদের বাড়ি ছিলো। কিন্তু খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাদের বাড়ির দুরত্ব বেশি হওয়ায় এবং হলের খাওয়া-দাওয়ায় কষ্ট হবে ভেবে আম্মা ভার্সিটির পাশে একটা বাসা ভাড়া করে থাকতেন। যাতে ভার্সিটিতে যাওয়া আসায় এবং আমার খাওয়া দাওয়ায় কষ্ট না হয়। ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসের ঘটনা। ভার্সিটির ফাইনাল সেমিস্টারের পরীক্ষা শেষ। ঢাকায় এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে একটা অনলাইন পত্রিকায় কাজের কথা চলছিল। ঠিক ওই সময় হঠাৎ করেই আমার ঠাণ্ডা-কাশির সমস্যা দেখা দিল। এক সপ্তাহ ‍দুই সপ্তাহ করে কাশিটা আর ঠিক হচ্ছিল না। তখন আমি ধূমপানও করতাম না। অবস্থার এতটাই অবনতি হলো যে কিছু খেলেই কাশি শুরু হত। অক্টোবর মাসের ২২ তারিখ রাত ৩টা কি ৪টা। তখন আমার শ্বাসকষ্ট দেখা দিল। অনেক কষ্ট হচ্ছিল আমার। আমার আম্মাকে পাশের রুমে ডাকব সে শক্তি বা সামর্থ্য আমার ছিল না। কিন্তু আমার আম্মা কেন জানি ঐ দিন আমার রুমে বার বার আসছিলেন। আমার গায়ে জ্বরটা প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় মেপে দেখছিলেন। যখন আম্মা আমার অবস্থা এরকম দেখলেন ঠিক তখন আমার আম্মা পাগলের মতো কাঁদতে শুরু করে দিলেন। আর দোয়া পড়ে আমার বুকে ফুঁ দিচ্ছিলেন। কিন্তু কোনো কিছুতে কিছু হচ্ছিল না। ওই দিন রাতে আম্মা আমাদের বাড়িওয়ালী আন্টিকে কল করেন। তিনি থাকতেন আমাদের উপরতলায়। আমার শারীরিক অবস্থা শুনে আন্টি তার ছেলে বাপ্পি ভাইয়াকে পাঠিয়ে দেন। সেই রাতে আম্মা আমাকে নিয়ে হাসপাতালে রওনা দেন (খুলনা মেডিকেলে)। রাস্তায় কোনো গাড়ি ছিল না। আর অ্যাম্বুলেন্স কল করবে সেটাও আম্মার মাথায় ছিল না। আমার বাসার পাশে এক রিকশা গ্যারেজ ছিল। সেখানে গিয়ে আম্মা পরিচিত এক রিকশাওয়ালাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে আমাকে রিকশায় তোলেন। রিকশায় ওঠার আগেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই আমি। পরদিন সকাল ১০টায় যখন আমার জ্ঞান ফিরল তখন দেখি আমার মুখে অক্সিজেন মাস্ক আর আমার আম্মা পাশে বসে কাঁদছেন আর দোয়া পড়ে পড়ে আমার গায়ে ফুঁ দিচ্ছেন। আম্মার হাতটা নাকি আমি রাত থেকেই আমার বুকের উপর চেপে ধরে রেখেছিলাম। জ্ঞান ফেরার পর দেখলাম আব্বা ঢাকা থেকে চলে গেছেন। আপু-দুলাভাই কাঁদছেন। হাসপাতালে প্রথম তিন তিনটি দিন আমার আম্মা নির্ঘুম আমার পাশে বসে থাকলেন। সকালে আপু যখন আসত তখন আম্মা বাসায় যেতেন রান্না করে খাবার আনার জন্য। টানা চার দিন আমার আম্মা রোযা রেখেছেন আমার জন্য। ২৫ দিন এক অজানা রোগে আমি হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। অজানা রোগ এই জন্য বলছি, আমার শ্বাসকষ্টটা কমে গেলেও কিছু খেলে আমার মুখ ও নাক থেকে রক্ত পড়ত। খুলনা মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপ্যাল (নাম মনে নাই), কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান ডা. মিজানুর রহমান ও মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. আবু বকরের তত্ত্বাবধানে ছিলাম আমি। সব রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারা কোনো অসুখ ধরতে পারছিলেন না। ধারণা করেছিলেন যক্ষ্মা, কিন্তু তাদের ধারণা ভুল ছিল। পরে ডা. আবু বকর আম্মা আর আব্বাকে ডেকে বললেন, ‘আপনাদের ছেলের অসুখ আমরা ধরতে পারছি না। তবে যেভাবে ওর শরীর থেকে রক্ত যাচ্ছে তাতে আমাদের ভয় হচ্ছে।’ ডা. আবু বকর খুব ধার্মিক ছিলেন, তিনি আম্মাকে বললেন, ‘ডাক্তার হয়েও একটা পরামর্শ দিই, মনে কিছু করবেন না। অনেক ক্ষেত্রে কিছু রোগের ব্যাখ্যা আমরা দিতে পারি না। চিকিৎসাও করতে পারি না। আপনারা একটু অন্য চিকিৎসা দিন (ধর্মীয়)। চিকিৎসাটা সম্পর্কে আর লিখলাম না। এই চিকিৎসা নেওয়ার আগ পর্যন্ত এবং চিকিৎসা নেওয়ার পরেও আমি ওই চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসী নই। শুধু আমার মায়ের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমি সেই চিকিৎসা নিয়েছিলাম। হয়ত আল্লাহ আমার মায়ের বিশ্বাসটি কবুল করেছিলেন। তাই এখনও পর্যন্ত বেচে আছি, মায়ের বিশ্বাসের একটি তাবিজ শরীরে নিয়ে। ঢাকা থেকে বাড়িতে গেলে মা আমার তাবিজটা আছে কিনা জানতে চান এবং দেখতেও চান। এই হলো আমার মা, আমাকে জন্ম দিয়েছেন, আমার অসুস্থতায় পুনর্জন্মটাও দিয়েছেন তিনি। তাই তো ওই গানটার মতো করে বলতে হয়, ‘মা তুমি আমার আগে যেও নাগো মরে, আমিকেমনকরেদেবমাটিতোমার কবরে।’

(দ্য রিপোর্ট/এইচআর/এইচএসএম/এনআই/মে ১১, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

মায়ের জন্য ভালবাসা এর সর্বশেষ খবর

মায়ের জন্য ভালবাসা - এর সব খবর