thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫,  ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

আম্মু আমার প্রিয় বান্ধবী

২০১৪ মে ১১ ১১:০৯:৩৮
আম্মু আমার প্রিয় বান্ধবী

ইসহাক ফারুকী, দ্য রিপোর্ট :আমি জন্ম থেকেই দেখছি আম্মু চাকরি করেন। কার কাছে যেন শুনেছিলাম, চাকরিজীবী মায়েদের ছেলেমেয়েরা হয় বখে যায়, না হয় ঘরকুনো হয়। আমি তার কিছুই হইনি। কারণ, সারাদিন অফিস করে বাসায় এসেই মা আমাদের নিয়ে বসতেন। গল্প করতেন, পড়া ধরতেন, আদর করতেন, মারতেনও। যেমন রাগী, তেমনই মমতাময়ী আমার আম্মু। আমি এখন চাকরি করি। অফিসের পরিবেশ কেমন হয়, মানুষজনের চিন্তাভাবনা কেমন, ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব-সবকিছুই ছেলেবেলা থেকে আম্মুর কাছ থেকে জেনেছি। শুধু তিনি আমাকে বন্ধুর মতো সবকিছু বোঝাতেন।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। পাড়ার এক মেয়েকে দেখে ভাল লাগল। মনটা বেশ অস্থির। আম্মু আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে? আমি আমতা আমতা করছিলাম। তিনি আমার মনের কথা বুঝে ফেললেন। জানতে চাইলেন, কাউকে পছন্দ করে ফেলেছি কিনা? এই বয়সে প্রেম করতে শুরু করব সেটা ভাবা অস্বাভাবিক ছিল। যাহোক, আম্মুর সামনে ধরা খেয়ে গেলাম। বলেই ফেললাম। আম্মু চুপ করে সব শুনলেন। পরে আমাকে বললেন, দেখো বাবা, তুমি এখনও যথেষ্ট ছোট। তা ছাড়া মেয়েটা তোমার বয়েসি। ওরা এলাকার স্থানীয়। তার ওপর ওদের পরিবারে প্রেম ভালবাসাকে অন্যায়ের চোখে দেখা হয়। এখন যদি তুমি ওই বাড়ির মেয়ের সঙ্গে প্রেম করো, তাহলে অনেক কিছুই হতে পারে। তুমি ভেবে দেখো, মেয়েটির সঙ্গে কি প্রেম করবে? আরও অনেক কথা বুঝিয়ে বললেন। তিনি না করেননি। রাগও দেখাননি। পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন মাত্র। আমি প্রেম করতে ভুলে গেলাম। পরে বুঝেছিলাম, ওটা মোহ ছিল। কারণ, ভাললাগা ভালবাসা এক নয়। আম্মু এটা বুঝেছিলেন।

অন্য আরেকটি কথা মনে পড়ছে। স্কুলে পড়াকালীন মাসুদ রানা বা তিন গোয়েন্দা সিরিজ পড়ার হিড়িক ছিল। বইয়ের ফাঁকে রেখে পড়তাম। যাতে কেউ বুঝতে না পারে। একদিন আমি পড়ায় মগ্ন (মাসুদ রানা সিরিজের বই)। আম্মু যে কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন তা বুঝতেই পারিনি। হুট করে তিনি বললেন, এভাবে গল্পের বই পড়লে হবে? পড়ার বই পড়বে কখন? আমি তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠলাম। মনে হলো ভূত দেখেছি। আম্মু পাশে বসলেন। বললেন, ‘গল্পের বই পড়ার জন্য অনেক সময় আছে। আগে পড়া শেষ করো। পরে বুঝবে, পড়ার কি মূল্য?’

একবার কি হলো? আমি পরীক্ষায় খুব খারাপ করলাম। আম্মু অফিস থেকে বাসায় এসে রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন। আমি তো ভয়ে অস্থির। ভয়টা আরও বাড়ল, যখন আম্মু দরজা বন্ধ করে স্টিলের স্কেল দিয়ে মারতে শুরু করলেন। আম্মুর একটাই কথা, পরীক্ষায় খারাপ করলি কেন? আমি বলতে থাকি, আমি ভাল করব, আমাকে আর মেরো না। তার ভালবাসা ও শাসনের জোরেই হয়ত ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করেছি। এরপর আমাকে উদ্ধার করলেন আম্মুর আম্মু, মানে আমার নানু। আম্মু অফিসে গেলে নানুই আমাকে গাইড করতেন। নানুর কথায় আম্মুর রাগ কমে এল। কিছুক্ষণ পর আম্মু আমাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিলেন। মনেই হলো না, একটু আগেই আম্মু রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছিলেন। আমিও ভাল ছেলের মতো সব অভিমান ভুলে আম্মুর হাতে ভাত খেয়েছিলাম। ইন্টারমিডিয়েটে ওঠার পরও আম্মু আমাকে খাইয়ে দিতেন। এখনও সেই সুযোগ ছাড়ি না। আম্মু ভাল রান্না করেন। একে তার নিজের হাতের রান্না আর খাইয়ে দেওয়া-দুইয়ে মিলে ভালবাসার স্মৃতিকাব্য সৃষ্টি হয়েছে।

আমি যখন আম্মুর অফিসে যাই, গর্বে আমার বুক ফুলে যায়। সবাই আম্মুকে অনেক পছন্দ করেন। ছেলেবেলায় আমাকে দেখেই সবাই বলতেন, ও তুমি মিসেস ফাতেমা খাতুনের ছোট ছেলে। তোমার আম্মু তোমাদের কথা সবসময়ই বলে। আম্মুর পুরো জীবনটাই তার দুই ছেলে। এটা সবসময়ই আমাকে আন্দোলিত করে। আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই।

আম্মু আমার প্রিয় বান্ধবী। ছেলেবেলা থেকে তাই দেখে এসেছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতার কথা বলি, ‘মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে, মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।’-কবিতার অবতারণা করলাম এই ভেবে যে, মার্কেট, পার্টি থেকে শুরু করে অনেক জায়গায় আম্মুর নিত্যসঙ্গী আমি। একসময়ের খালি রাস্তা বা বর্তমান যানজটের শহরে রিকশা বা অন্য কোনো বাহনে করে গন্তব্যে যাওয়ার সময় আমরা গল্প করি। সেই গল্পে উঠে আসত বাসার কথা, আম্মুর অফিসের কথা, আমার অফিসের কথা। কথার মধ্যেই মাঝে মাঝে এমন ভাব ধরতাম, যেন আমি তার বাবা। যদিও আম্মু আমাকে আব্বু বলেই সম্বোধন করেন।

হুট করে একটা কষ্টের কথা মনে পড়ছে। সেবার আম্মু বেশ অসুস্থ। হাসপাতালে ছিলেন। আমি, আব্বু, ভাইয়া সবাই খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। কি করব, বুঝে উঠতে পারছি না। আমরা হাসপাতালের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে অস্থিরচিত্তে ঘোরাফেরা করছি। যখন তার জ্ঞান ফিরল, তখনি ছুটে গেলাম। চোখ মেলে আমাদের দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। মা, আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি কথাটা মুখ ফুটে বলতে পারিনি। তিনি বুঝে নিয়েছিলেন। এখনও বুঝেন।

যে মানুষটি আমার ছেলেবেলা থেকে বন্ধুর মতো আমার পাশে থেকেছেন। তার সঙ্গে ইদানীং ব্যস্ততার জন্য খুব কমই দেখা হয়। সকালবেলা তিনি আমাদের ঘুমে রেখে অফিসে চলে যান। যাওয়ার আগে দোয়া-দরূদ পড়েন। আমরা যেন ভাল থাকি। রাতে যখন আমি অফিস শেষ করে বাসায় ফিরি, তিনি ঘুমে থাকেন। সপ্তাহে এক-দুইদিন তার সঙ্গে দেখা হয়। কথা হয় ফোনে। ব্যাপারটা আমাকে অনেক পোড়ায়। আমি কাঁদি, কিন্তু আম্মু তা জানতে পারেন না। জানাতে চাইও না। আমি জানি, আম্মুও অলক্ষ্যে কাঁদেন। তিনিও জানাতে পারেন না। পাছে দুজনেই কষ্ট পাই। কি এত ব্যস্ততা যে আম্মুর সঙ্গ পেতে সময়ের কাছে হাত পাততে হয়?

(দ্য রিপোর্ট/আইএফ/এইচএসএম/এনআই/মে ১১, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

মায়ের জন্য ভালবাসা এর সর্বশেষ খবর

মায়ের জন্য ভালবাসা - এর সব খবর