thereport24.com
ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫,  ১৩ মহররম ১৪৪০

মাকে নিয়ে জনপ্রিয় গান

২০১৪ মে ১১ ১১:০২:০০
মাকে নিয়ে জনপ্রিয় গান

দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক : মা’কে নিয়ে অডিও ভুবন এবং চলচ্চিত্রে প্রচুর গান হয়েছে। জনপ্রিয় গানের সংখ্যাও কম নয়। জনপ্রিয় এই গানগুলো সৃষ্টির পেছনের গল্পও যেমন অতুলনীয় তেমনই হৃদয়ঘনিষ্ঠ। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে মাকে নিয়ে তৈরি গানগুলোর শিল্পী, গীতিকার ও সুরকাররা জানিয়েছেন পেছনের গল্প ও ঘটনা। দ্য রিপোর্টের পাঠকদের জন্য তাদের সেই বক্তব্য উপস্থাপন করা হলো।

মাগো মা, ওগো মা, আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা : খুরশীদ আলম

প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা দিলীপ বিশ্বাস ছবি বানাবেন। নাম ‘সমাধি’। গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ারের মালিবাগের বাসায় সুরকার সত্য সাহা (প্রয়াত), পরিচালকের সঙ্গে প্রতিদিন আমিও গিয়ে বসছি।

গানটি হবে ‘মা’কে নিয়ে। পর্দায় এ গানে ঠোঁট মেলাবেন নায়ক রাজ রাজ্জাক। গানটির কথা ও সুর তৈরি হতে দুই তিন দিন লেগে গেল। এরপর রেকর্ডিং হলো কাকরাইলের ইপসা রেকর্ডিং স্টুডিওতে। সাধারণত ছবি মুক্তি পাওয়ার পরই গান হিট হয়। কিন্তু সত্যদা যেন আগেই বুঝে গিয়েছিলেন, গানটি হিট হবে। তিনি আমাকে বললেন, ‘যত দিন তুই বেঁচে থাকবি, ততদিন তোকে এই গানটা গাইতে হবে।’

সত্য সাহার কথাই সত্যি হলো। আমি যেখানে গান গাইতে যাই, সেখানেই এ গানটি গাইতে হয়। এরপর ‘মা’ নিয়ে আরও ২৫টির মতো গান গেয়েছি। কিন্তু এ গানটির মতো আর কোনো গানই এত জনপ্রিয় হয়নি। আসলে গানের কথা ও সুর অনেক সহজ-সরল ছিল। সিনেমার সিকোয়েন্সটা ছিল অনেক আবেগময়। সব মিলিয়ে গানটি জনপ্রিয় হয়। সত্য সাহার সুরে গানটির কথা লিখেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার।

মায়ের একধার দুধের দাম, কাটিয়া গায়ের চাম : ফকির আলমগীর
১৯৭৭ সালের কথা। আমি তখন নাখালপাড়ায় থাকি। বিয়ে করিনি তখনও। মাকে নিয়ে ফরিদপুরে যাচ্ছি। আরিচাঘাটে পৌঁছাতেই অন্ধ এক বাউলের সঙ্গে দেখা। দোতারা বাজিয়ে দেহতত্ত্বের গান গাইছেন। গানটা শুনেই আমার কানে লেগে গেল। সঙ্গে সঙ্গে রেকর্ডার বের করে গানটা ধারণ করে নিলাম। পরে গানটি বিটিভির একটি অনুষ্ঠানে নিজের মতো তৈরি করে গাইলাম। তখনই সবার প্রশংসা পেলাম।

নব্বইয়ের দশকে অজিত রায় বিটিভির জন্য গানটি আবার রেকর্ড করান। এ গানটিই আমার ‘সখিনা-২’ অ্যালবামে সংযোজন করি। এরপর গানটি আরও দুই বার রেকর্ড হয়েছে। আলাউদ্দিন আলীর সংগীতায়োজনে ‘অবরোধ’ চলচ্চিত্রের জন্য এবং ফরিদ আহমেদের সংগীতায়োজনে দ্বিতীয়বার। আমার ‘সখীপুরের সখিনা’ অ্যালবামে গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়। এ গানটিই সব জায়গায় শোনা যায়।

এমন একটা মা দে না : ফেরদৌস ওয়াহিদ

১৯৭৪ সাল। আমি তখন কলেজে পড়ি। প্রয়াত শিল্পী ফিরোজ সাঁই আমাকে একদিন ডেকে বললেন, একটা গান গাইতে হবে। গানটি লিখেছেন ও সুর করেছেন ডা. নাসির আহমেদ। গানটা শুনলাম। খুবই পছন্দ হলো। ফিরোজ সাঁই বললেন, ‘গানটি তোমার গলায় খুব মানাবে। আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, তুমি শুধু টাকা জোগাড় করো।’ গানটি রেকর্ড করতে মোট খরচ হবে ৩৩০ টাকা। এত টাকা আমার কাছে নেই। এগিয়ে এল আমার চার বন্ধু সাইফ, রুমী, শামীম ও এনায়েতুল্লাহ। নিজের টিফিনের টাকা এবং বন্ধুদের টাকায় কাকরাইলের ইপসা রেকর্ডিং স্টুডিওতে গানটি রেকর্ড করলাম।

এরপর ১৯৭৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর বিটিভির বিশেষ সংগীতানুষ্ঠানে গানটি প্রচারিত হয়। চারদিকে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। ১৯৭৭ সালে ‘এমন একটা মা দে না’ এবং ‘স্মৃতিরও সেই পথে’ গান দুটি নিয়ে আমার একটি আরপিএম রেকর্ড বের হয়। মনে পড়ে, রেকর্ড করে গানটি আমি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে শোনাই। তিনি তখন বলছিলেন, ‘এ গানটি এখন যতটা জনপ্রিয়, ২৫ বছর পর তা আরও বেশি জনপ্রিয় হবে।’ গানটির বয়স আজ প্রায় ৪০ বছর। এখনও গানটি অনেক জনপ্রিয়।

১০ মাস ১০ দিন করে গর্ভধারণ : জেমস

১৯৯৭ সালে প্রিন্স মাহমুদের মা মারা যান। খালাম্মার মৃত্যুর পর একটা শূন্যতা এসে ভর করল। চারদিকে কেবল মাকে খুঁজে বেড়াত সে। এ রকম একটা মানসিক কষ্টের ভেতরই ‘মা’ গানটি লিখেছে প্রিন্স মাহমুদ।

গানটি সুর করতেও খুব বেশি সময় লাগেনি। অনেক ভেবে সে ঠিক করল, আমাকে দিয়ে গানটি গাওয়াবে। কেননা, আমার মাও বেঁচে নেই। রেকর্ডিংয়ে ভীষণ আবেগ দিয়ে গানটি গাইলাম। রেকর্ডিংয়ে বসেই মনে হচ্ছিল, গানটা ভালো হবে। প্রয়াত শব্দ প্রকৌশলী মবিন তখন প্রিন্সের স্টুডিওতে ছিলেন। বললেন, ‘জেমস ভাই যা গাইলেন। এই গান মানুষের ভালো না লেগে পারে না।’

১৯৯৯ সালে ‘এখনও দুচোখে বন্যা’ মিশ্র অ্যালবামে গানটি বের হয়। মবিনের কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়ে গেল।

আমাদের জন্য ‘মা’ বিষয়টা খুবই স্পর্শকাতর। প্রিন্স ও আমি দুজনই মাকে হারিয়েছি। তাই হয়ত দুজনের আবেগ এক হয়ে গিয়েছিল। এ কারণেই গানটি এত শ্রোতাপ্রিয় হয়েছে।

একটা চাঁদ ছাড়া রাত আঁধার কালো : কুমার বিশ্বজিৎ

এই গানটির গীতিকার কবির বকুল। সুর ও কণ্ঠ আমার। পিএ কাজল পরিচালিত ‘স্বামী স্ত্রীর ওয়াদা’ ছবির প্লে-ব্যাকে গানটি ব্যবহার করা হয়। গানটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাই আমি এবং গীতিকার কবির বকুল। এটি একাধারে বিজ্ঞাপনচিত্র, চলচ্চিত্র ও অডিও অ্যালবামে ব্যবহার করা হয়েছে। গানটি প্রথম বের হয় ২০০৯ সালে ওয়ারিদের বিজ্ঞাপনচিত্রে। এরপর ‘স্বামী স্ত্রীর ওয়াদা`’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে গানটি জনপ্রিয়তা পায়। একই বছর গানটি প্রকাশ হয় আমার একক অ্যালবাম ‘রোদেলা দুপুর’-এ।
গানটির গীতিকার কবির বকুলের অনেকদিন মায়ের সঙ্গে দেখা হয় না। গানটি লেখার আগের রাতে কেবল মায়ের কথা ভাবেন। মায়ের কথা ভাবতে ভাবতে সারারাত কেটেছে। পরদিন মায়ের মুখখানি মনে করে একবসায় গানটি লিখে ফেলেন।

গানটির কথা প্রথমবার পড়েই আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়েছিল। বেশ সময় নিয়ে গানটি সুর করি। এতে কণ্ঠ দেওয়ার সময় মায়ের কথা খুব বেশি মনে পড়ছিল।

ওই আকাশের তারায় তারায় : ইমন

অনেক দিন ধরেই মাকে নিয়ে একটা গান করব ভাবছিলাম। ২০০৬ সালের রমজান মাস। ভোরবেলা সেহরি খেয়ে মাত্র বসেছি। এমন সময় গীতিকার আসিফ ইকবালের ফোন এল। কান্নাভেজা কণ্ঠ। একটু ভয় পেয়ে গেলাম। কী হয়েছে- জিজ্ঞেস করতেই বলে উঠলেন, ‘১৪ বছর আগে এই দিনে মাকে হারিয়েছি। আজ প্রথমবার আমি মাকে স্বপ্নে দেখেছি। খুব খারাপ লাগছে।’ আমি কী বলব বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকলাম। আসিফ ভাই বলে গেলেন, ‘মাকে ভেবে চারটা লাইন লিখেছি। শুনবি?’ তখন আসিফ ভাই চারটা লাইন শোনালেন। আমি বললাম, ভাই, আমি আপনার গানটা সুর করতে চাই।
আসিফ ভাই সম্মতি দিলেন। মাকে মনে করে আরও অনেক কথা বললেন আমাকে। এভাবেই গানটির প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বললেন শওকত আলী ইমন।

তিনি আরও বলেন, পরদিন দুপুরে আসিফ ভাইয়ের ফোন। বললেন, তোর বাসায় আসছি ২০ মিনিটের মধ্যে। আমি তখন মাত্র ঘুম থেকে উঠেছি। চার লাইন তখনও সুর করা হয়নি। তাই হাত-মুখ ধুয়ে গিটার নিয়ে বসে পড়লাম। আসিফ ভাই আসতে আসতে আমার সুর করা শেষ। তিনি সুরটা শুনে বেশ পছন্দ করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কে গাইবে গানটা? তখন ক্লোজআপ ২০০৬-এর চূড়ান্ত পর্ব চলছে। গানটা রাশেদকে দিলাম। ক্লোজআপের ওই রাউন্ডটি যেদিন প্রচারিত হলো, সেদিন মা আমার সামনে ছিলেন। গানটা শেষ হলে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তুই অনেক বড় হবি বাবা।’ মায়ের সেই দোয়া পাওয়ার পর আমার আর কিছু পাওয়ার আছে বলে মনে হয় না। এই একটি গান গেয়ে রাশেদও বেশ পরিচিতি পায়।

গ্রন্থনা : অদিত্য রুপু

(দ্য রিপোর্ট/এআর/এপি/এনআই/মে ১১, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জলসা ঘর এর সর্বশেষ খবর

জলসা ঘর - এর সব খবর



রে