thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫,  ১৪ মহররম ১৪৪০

আম্মা আমার সর্বশ্রেষ্ঠ

২০১৪ মে ১১ ১৬:৪২:৪৩
আম্মা আমার সর্বশ্রেষ্ঠ

মো. শামীম রিজভী, দ্য রিপোর্ট : মা শব্দটা যেমন ছোট, তেমনি উচ্চারণেও সহজ। তাই যেন মা মানুষটি অনেক সরল হন। আমরা একেকজন মাকে একেক ভাবে ডাকি। কেউ মা, আম্মা, আম্মাজান, মামনি, মাম্মি একেক সুরে মাকে ডাকি। আমি আমার মাকে আম্মা বলেই ডাকতে বেশি পছন্দ কারি।

মানুষ অনেক সময় নির্ধারণ করতে পারে না তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল কোনটি। আমার জীবনে আমি অনেক ভুল করেছি। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় যে ভুলটি করেছিলাম সেটির সাথে আসলে আমার আম্মা সম্পৃক্ত।

আমার আম্মা অনেক পরিশ্রমী, জেদী, ধৈর্য্যশীল ও মমতাময়ী। আরও অনেক গুণাবলী আছে, যা বলে শেষ করা যাবে না। আম্মা কারও কাছে সহজে কোন সাহায্য চান না। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই সবকাজ করতে চাইতেন। আম্মার মেরুদন্ডের হাড়ে দুইবার অপারেশন হয়েছে। ডাক্তার আম্মাকে বলেছেন কোন ধরনের ভারি কাজ না করতে। আসলে আম্মার এই অবস্থার জন্য আমি দায়ী। প্রথম থেকে শুরু করা যাক।

আমি আমার তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন কারও কোল ছাড়া নামতাম না। এ জন্য বেশিরভাগ সময়ই আম্মা আমাকে কোলে নিয়ে হাঁটতেন। আম্মা ক্লান্ত হয়ে গেলেও আমি কখনও কোল থেকে নামিনি। আম্মার কষ্ট কখনও বুঝিনি। আমার এই নির্বুদ্ধিতার জন্য প্রথম দুর্ঘটনায় প্রথমবারের মত মেরুদন্ডের হাড়ে ব্যথা পান আম্মা।

আমি তখন মোটামুটি বড়। হয়ত ৬-৭ বছর বয়স। বিক্রমপুরে আমাদের একটি কাঠের ডুপ্লেক্স বাড়ি ছিল। ঢাকা থেকে আমাকে নিয়ে সে সময় আম্মা বিক্রমপুর গিয়েছিলেন। অন্যান্য সময়ের মত আমি আম্মার কোল থেকে সেদিন নামছিলাম না। বাড়িটির নিচতলা থেকে দ্বিতীয় তলায় ওঠার সিঁড়িটি ছিল কাঠের। আম্মা যখন আমাকে কোলে নিয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠছিলেন তখন পায়ে ব্যালেন্স করতে না পেরে তিনি পড়ে যান। সেদিন প্রথম মেরুদন্ডের হাড়ে আম্মা ব্যথা পান। খুববেশি ব্যথা পেয়েছিলেন। কিন্তু আম্মা কাউকে সেটা বুঝতে দেননি। এমনকি সিঁড়ি থেকে যখন পড়ছিলেন তখন আমার গায়ে একটি আচও পড়তে দেননি।

শেষ ঘটনাটি ঘটে বেশ কয়েক বছর আগে। আম্মার মেরুদন্ডের ব্যথা খুব বেশি বেড়ে যাওয়ার কারণে ডাক্তার অপারেশনের পরামর্শ দেন। আম্মাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হল। অপারেশনও হলো সফল। ডাক্তার বললেন আরও কিছুদিন হাসপাতালে আম্মাকে অবজারভেশনে রাখতে হবে। একদিন বড় ভাইয়া, একদিন মেজ ভাইয়া পালা করে হাসপাতালে থাকছিলেন। আমার দায়িত্ব ছিল বাড়ি পাহারা দেওয়ার।

ঐ বছরই আব্বা হজ্জ্বে যাওয়ার জন্য নিয়ত করেছিলেন। আম্মা যে সময় হাসপাতালে ছিলেন সে সময় আব্বার হজ্জ্বের ফ্লাইটের দিন পড়ে। আব্বাকে এয়ারপোর্টে ভাইয়ারা দিয়ে আসবেন। তাই তার আগের দিন ভাইয়ারা কেউই হাসপাতালে রাতে থাকতে পারবেন না। আমি থাকলাম হাসপাতালে আম্মার সাথে। ঐ দিনই হয়ত কোন গুরুদায়িত্ব পালনের, বিশেষ করে আম্মার জন্য প্রথমবারের মত সুযোগ হয়েছিল।

বাড়ির সব ছোটরা আসলে অকর্মা হয় না। আমার খালাতো ভাই শাওন বাড়ির সবার ছোট হওয়ার পরও পরিবারে সে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ববান। কিন্তু আমি সেদিন অকর্মার পরিচয় দিয়েছিলাম।

অপারেশন হওয়ার কারণে আম্মা একা টয়লেটে যেতে পারতেন না। কাউকে টয়লেটের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসতে হত। আমি এজন্য রাতে জেগেই ছিলাম। ভেবেছিলাম সারারাত জেগে থাকতে পারব। আম্মা বললেন, ঘুম পেলে রুমেই ঘুমাস। তাহলে ডাক দিলে জাগতে পারবি। কিন্তু আমি মনে করলাম ঘুমানো যাবে না। তাই বারান্দায় বসে রইলাম। হাসপাতালের পাশেই একটি খ্রিস্টান কবরস্থান। কেবিনের বারান্দা থেকে কবরস্থানটি স্পষ্ট দেখা যেত। কবরস্থানে ভূত-প্রেত দেখার গল্প শুনেছি। তাই ভাবলাম আজ স্বচক্ষে দেখব। রাতে কবরস্থানের দিকে তাকিয়ে ছিলাম ভূত দেখার আশায়। আম্মা টয়লেটে যাওয়ার জন্য রাতে দুইবার উঠে আমাকে ডেকেছিলেন। আমি আম্মাকে টয়লেটের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এসেছিলাম।

ভোর হয়েছে। ঘড়ির কাটা তখন ৬টা ১০ এর দিকে। আমি ভাবলাম আম্মা হয়ত আর জাগবেন না। সারারাতে কবরস্থানে তেমন কিছুই দেখতে না পেরে বসেই একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। জানি না কেন যেন হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘড়িতে তখন ৬টা ৪৫ বাজে। কেবিনের ভিতরে ঢুকলাম আম্মা ঘুমাচ্ছে কিনা দেখার জন্য। দেখি আম্মা জেগে আছে। চেহারায় ব্যথার স্পষ্ট চিহ্ন। আমি জানতে চাইলাম ব্যথা কি বেড়েছে? আম্মা বললেন, একটু। কিন্তু আসল ঘটনা বললেন না।

সকাল ছাড়া ডাক্তার আসবেন না। ভাইয়ারাও আসবেন আব্বাকে পৌঁছে দিয়ে। তাই কি করব বুঝতে পারছিলাম না। বাইরে দেখি নার্সও নেই। বুঝতে পারছিলাম আম্মার অনেক ব্যথা করছে। কিন্তু অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। সকালে নার্স আসার পর আমি বলি আম্মার ব্যথা বেড়েছে। নার্স আমাকে জানান, ডাক্তার আরও পরে আসবেন। দুপুরের দিকে আমার ভাই, বোন, খালা কয়েকজন আসায় আমি ফিরে যাই।

পরে জানতে পারি, আমি যখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম সে সময়ের মধ্যে আম্মা জেগে গিয়েছিলেন। আমাকে ডেকেছিলেন। কিন্তু আমি শুনতে পাইনি। আম্মা একাই টয়লেটে যাওয়ার জন্য বেড থেকে উঠেছিলেন। হাসপাতালের ফ্লোর ছিল টাইলসের। টয়লেটে ঠিকমত গেলেও, ফেরার সময় পা ভিজা থাকার কারণে টাইলস এ পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলেন। প্রচন্ড ব্যথা পেয়েছিলেন। কিন্তু আমি কষ্ট পাব বলে আমাকে একবারও জানাননি। এ জন্যই আম্মার দ্বিতীয়বারের মত মেরুদন্ডে অপারেশন হয়। প্রথমবারের সময় মানলাম ছোট ছিলাম। কিন্তু শেষবারের সময় তো আমার বয়স ২৩ কি ২৪ ছিল? তখনও একটি দায়িত্ব ঠিকমত পালন করতে পারিনি। বিশেষ করে দায়িত্ব পালনের যখন সুযোগটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির জন্য। তাই আমার জীবনের সেই ৩৫ মিনিট সবচেয়ে অভিসপ্ত সময় ছিল।

ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আম্মা এখনও সংসারের সব কাজ করেন। হাড়ে ব্যথা করলেও আমলে নেন না। রাতে প্রায়ই ব্যথায় কাতরান। কিন্তু আমার আসলে কিছুই করার নেই। যা করার ছিল তা করতে পারিনি। আম্মার আদর আমার জন্য কখনও কমেনি। আম্মাদের আদর কখনও কমেও না। রাতে যখন আম্মার সাথে খেতে বসি তখন ভাল খাবারটা সব সময় আমার জন্যই তিনি রাখেন। সারাদিন কি হয়েছে বাড়িতে যাওয়ার পর আম্মা আমাকেই বলেন। কোন সময় রাগ করলেও কিছু বলেন না আম্মা। তাই আমার আম্মাই সর্বশ্রেষ্ঠ। আমার আম্মার গর্ভে জন্ম নিতে পেরে আমি ধন্য-গর্বিত। ধন্যবাদ সৃষ্টিকর্তাকে এমন মায়ের সন্তান করে তিনি আমাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।

(দ্য রিপোর্ট/এসআর/এনআই/মে ১০, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

মায়ের জন্য ভালবাসা এর সর্বশেষ খবর

মায়ের জন্য ভালবাসা - এর সব খবর



রে