thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫,  ১১ মহররম ১৪৪০

ইসলামী দৃষ্টিকোণ

মায়ের প্রতি ভালোবাসা

২০১৪ মে ১১ ১৭:৫৪:৩২
মায়ের প্রতি ভালোবাসা

এ.কে.এম. মহিউদ্দীন
‘মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু জেনো ভাই,/ইহার চেয়ে নাম যে মধুর ত্রিভুবনে নাই।’ —এটাই সত্য। মানবজাতির মুখে সবচাইতে সুন্দর শব্দ হচ্ছে 'মা' শব্দটি, আর সব চাইতে সুন্দর ডাক হচ্ছে 'আমার মা' ডাকটি। এই শব্দটি পরিপূর্ণ আশা এবং ভালবাসায় অন্তরের গভীর থেকে বেরিযে আসা একটি মধুর এবং সহৃদয় শব্দ। মা আমাদের কিছু-দুঃখে সান্ত্বনা, বিপদে ভরসা, দুর্বলতায় শান্তি। তিনি প্রেম, দয়া, সহানুভূতি এবং শক্তির উৎস। যে মাকে হারায় সে একটি পবিত্র আত্মাকে হারায়, যে আত্মা তাকে সর্বদা দোয়া করেন, পাহারা দিয়ে চলেন নিয়ত।

এ মায়ের প্রতি কর্তব্যজ্ঞান প্রখর থাকা দরকার। যেহেতু মা যে ভালবাসার উৎস। এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআন ও হাদীস শরীফের অসংখ্য জায়গায় সচেতন করা হয়েছে, সতর্ক করা হয়েছে। অন্যান্য ধর্মে এ ব্যাপারে যতটা দৃষ্টিপাত করা হয়েছে, ইসলাম তার চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে।

মায়ের অধিকার পিতার তিন গুণ : আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, আমি মানুষকে মা-বাবার সাথে সুন্দর আচরণের তা’কিদ দিয়েছি। তার মা অনেক কষ্টে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং বহু কষ্ট করে ভূমিষ্ঠ করেছে। গর্ভে ধারণ করা ও দুধ পান করানোর (কঠিন কাজের) সময়কাল হল আড়াই বছর। –(সুরা আল আহকাফ: ১৫)

তিনি আরও বলেন, আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট স্বীকার করে গর্ভে ধারণ করেছে। আর দুধ ছাড়ানো হয় দু’বছরের মধ্যে। এ নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার মা-পিতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।–(সুরা লুকমান : ১৪)

আবু হুরাইরা (রা.) বলেন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার সুন্দর আচরণের সবচেয়ে বেশী হকদার কে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার মা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এরপর কে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার মা। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, এরপর কে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার পিতা। –(সহীহ আল বুখারী)

বাহ্‌জ ইবন হাকীম তাঁর পিতার সূত্রে তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কার সাথে সবচাইতে বেশী ভালো ব্যবহার করব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার মায়ের সাথে। তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কার সাথে? এবারও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার মায়ের সাথে। আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কার সাথে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার পিতার সাথে। অতঃপর পর্যায়ক্রমে নিকটতম আত্মীয়-স্বজনের সাথে। –(আল মুস্তাদরাক, ৪খণ্ড, পৃ-১৫০)

মিকদাম ইবন মাদিকারাব (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ্ তায়ালা তোমাদের মায়েদের সম্পর্কে তোমাদের উপদেশ দিচ্ছেন। অর্থাৎ তাদের সাথে সদাচরণ করার আদেশ দিচ্ছেন। এ কথা তিনি তিনবার বললেন। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের পিতাদের সম্পর্কে তোমাদের উপদেশ দিচ্ছেন। নিশ্চয় আল্লাহ পর্যায়ক্রমে নিকটবর্তীদের সম্পর্কে তোমাদের উপদেশ দিচ্ছেন (সদাচারের)। –(ইবনে মাজাহ : পৃ-২৬০)

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী (সা.)-এঁর কাছে এসে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তিনি বললেন, তোমার মাতা-পিতা কি বেঁচে আছে? লোকটি বললেন, হ্যাঁ, বেঁচে আছে? তিনি বললেন, তাদের মাঝে জিহাদ করো। –(সহীহ মুসলিম, আবু দাউদ)

তাদের মাঝে জিহাদ করো— অর্থ তাদের সেবা-যত্ন ও খেদমতে আত্মনিয়োগ কর।

অন্য একটি হাদীস যা হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছি, হে আল্লাহ্‌র রাসূল (সা.), মহিলাদের ওপর সবচাইতে বেশী অধিকার কার? তিনি জবাব দিলেন, তার স্বামীর। আমি বললাম, পুরুষের ওপর সবচাইতে বেশী অধিকার কার? তিনি বললেন, তার মায়ের।

মায়ের সাথে নাফরমানী হারাম : হজরত মুগীরা ইবন শু'বা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ্‌ তায়ালা তোমাদের উপর মায়ের নাফরমানী, কন্যা শিশুকে জীবিত কবর দেওয়া, কৃপণতা করা ও ভিক্ষাবৃত্তি হারাম করে দিয়েছেন। আর বৃথা তর্ক-বিতর্ক, অধিক জিজ্ঞাসা ও সম্পদ নষ্ট করাকে তোমাদের জন্য অপছন্দ করেছেন।–(সহীহ আল বুখারী, আদব, হাদিস নং ৫৯৭৫)

প্রকৃত কথা হচ্ছে, সন্তানের জন্য মায়েরা যে সীমাহীন কষ্ট করে থাকেন, তার এক মুহূর্তের বদলা সন্তান সারা জীবনেও দিতে পারবে না। মায়েদের মন অত্যন্ত নরম। সামান্য কথাতেই অন্তরে আঘাত লেগে যেতে পারে, তাঁদের মন আহত হয়ে যেতে পারে। মায়ের সন্তুষ্টির প্রতিদান হলো, আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভ। আর মায়ের অসন্তুষ্টির প্রতিফল হচ্ছে, আল্লাহ্‌র অসন্তুষ্টি এবং চির জাহান্নাম। সুতরাং মায়ের সাথে কথা-বার্তা ও আচার-আচরণে অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, যেন মায়ের মনে সামান্যতম কষ্টও না লাগে। মায়ের মনে কষ্ট দেওয়া, তাঁর নাফরমানী করা ও অবাধ্য হওয়া থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখতে হবে। মায়ের অধিকার আদায়, তাঁর সেবা-যত্ন ও সন্তুষ্টির জন্য জীবন উজাড় করে দেওয়া সন্তানের অপরিহার্য কর্তব্য।

মায়ের সাথে নাফরমানীর শাস্তি : হজরত আব্দুল্লাহ ইবন আবু আওফা (রা.) বলেন, আমরা নবী (সা.)-এঁর দরবারে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে বললেন, একজন যুবকের মুমূর্ষু অবস্থা। লোকজন তাকে (কালিমা) লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ার উপদেশ দিচ্ছে, কিন্তু সে পড়তে পারছে না। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, এ ব্যক্তি কি নামাজ আদায় করতো? তিনি বলল, জি, হ্যাঁ। এ কথা শুনে রাসূল (সা.) উঠে (যুবকটির উদ্দেশে) রওয়ানা করলেন। আমরাও তাঁর সাথে চললাম। তিনি যুবকের কাছে গিয়ে তাকে কালিমা পড়ার তালকিন দিলেন অর্থাৎ বললেন, বলো লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু। সে বলল, আমি বলতে পারছি না। তিনি বললেন, কেন কী হয়েছে? লোকটি বলল, সে তার মায়ের সাথে নাফরমানী করত। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, তার মা কি জীবিত আছে? লোকেরা বলল, হ্যাঁ, জীবিত আছেন। তিনি তাঁকে ডেকে আনার নির্দেশ দিলেন। তার বৃদ্ধ মাতা আসলে তিন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, একি আপনার ছেলে? বৃদ্ধা বললেন, হ্যাঁ, আমার ছেলে। তিনি বৃদ্ধাকে বললেন, আপনি কি মনে করেন, যদি একটা ভয়ংকর আগুন প্রজ্জ্বলিত করা হয় এবং আপনাকে বলা হয়, যদি আপনি ছেলের জন্য সুপারিশ করেন তাহলে তাকে এ আগুন থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া হবে; অন্যথায় তাকে এ আগুনে ফেলে পুড়িয়ে মারা হবে। এ অবস্থায় আপনি কি সুপারিশ করবেন? বৃদ্ধা বললেন, জি, সুপারিশ করব। এ কথা শুনে নবী (সা.) বললেন, তাহলে আপনি আল্লাহ ও আমাকে সাক্ষী রেখে বলেন, আপনি তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে বলছেন। বৃদ্ধা বললেন, হে আল্লাহ! আমি তোমাকে এবং তোমার রাসূলকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আমার কলিজার টুকরা সন্তানের প্রতি রাজী হয়ে গেছি। তখন রাসূল (সা.) যুবকটির প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, বলো লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকা লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু (সন্তানের প্রতি মায়ের সন্তুষ্টির বরকতে যুবকটির মুখ খুলে গেল এবং তৎক্ষণাৎ) সে কালিমা পাঠ করল। রাসূল (সা.) আল্লাহ্‌র প্রশংসা করলেন আর বললেন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য যিনি আমার অসিলায় এ যুবককে জাহান্নামের কঠিন আজাব থেকে নাজাত দিয়েছেন।

প্রকৃত বিষয় হচ্ছে মায়ের স্থান সবার উপরে। তিনি ভালবাসার আধার। তাকে সব সময় আনুগত্য করতে হবে। কেননা মায়ের অবাধ্য সন্তানের জন্য জান্নাত হারাম। সাম্প্রতিক সময়ে বখে যাওয়া সন্তানের হাতে অনেক সময় প্রাণ যাচ্ছে মায়েরও। এ থেকে উত্তরণের পথ হচ্ছে— মাকে সার্বিকভাবে ভালবাসার স্থানে অবশ্যই স্থান দিতে হবে। আর ওই সব সন্তানদের কাছে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা মূল্যবোধ সমঝে দিতে হবে।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

ধর্ম এর সর্বশেষ খবর

ধর্ম - এর সব খবর



রে