thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

জিনেদিন জিদান : একজন আপাদমস্তক ফুটবলার

২০১৪ জুলাই ১০ ২৩:০৫:৪৫
জিনেদিন জিদান : একজন আপাদমস্তক ফুটবলার

মার্শেইর তীরে এক নদীর নাম রোন। পড়ন্ত বিকেলে নদীর পানিতে যখন সূর্যটা ডুবছিল সেদিকে তাকিয়ে ভারী মন খারাপ এক কিশোরের। ঝাকড়া চুলের নিচে আরব মুখাবয়ব কিন্তু এই সূর্যের জন্য বিষণ্ন নয়। স্কুল পালিয়ে পাশের শহরতলীতে ফুটবল খেলতে গিয়েছিল সে। সেখানে একজন দর্শক ছিল তার বাবা। ৩-১ গোলে হেরে গেছে কিশোরের দল। খেলা শেষে ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ বাবাকে আবিষ্কার, শিঁড়দারা বেয়ে এক চোরা স্রোত নেমে গেল ভয়ে- ‘আজকে পিঠে বস্তা বাঁধতে হবে।’ ‘স্কুল পালিয়ে যদি এমনভাবে হারতে হয় তাহলে স্কুল পালানোর দরকার নেই। যেটা পারবে না, তার পেছনে সময় নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।’ পালিয়ে ধরা খাওয়ার জন্য নয়, কিশোরের মন খারাপ তার খেলার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলায়। সে কি তাহলে ফুটবল খেলতে পারে না? কোনো দিন বড় ফুটবলার হতে পারবে না? ‘হায় আল্লাহ, আমি যে ফুটবল অনেক ভালোবাসি!’

বিষয়টি ফুটবল বিধাতা খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই। মার্শেইর এক ঠাণ্ডা-স্নিগ্ধ গোধূলীতে কিশোরের প্রার্থনা কবুল হলো। ওই কিশোরই ১৯৯৮ সালে স্তাদো দ্য ফ্রান্সে ব্রাজিলের কফিনে মাথা দিয়ে দুটি পেরেক ঠুকলেন, সপ্তম আকাশে তুলে দিলেন নেপোলিয়নের উত্তরসূরিদের। জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান। ওপরের গল্পটি আপাদমস্তক বানানো। কিন্তু জিদানকে নিয়ে লিখতে বসে পরিসংখ্যানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে না। প্রফেশনাল ক্যারিয়ার শুরু করেন কত সালে, প্রথম হ্যাটট্রিক করেন ওই বয়সে, প্রথম বিশ্বকাপ খেলেন আমেরিকার ইরাক আক্রমণের পর- এ সমস্ত কথা, শব্দ বা বাক্যমালা বড় ক্লিসে, পানি পানি লাগে। বলের সঙ্গে যার পা সিল্কি ভাষায় কথা বলে, এত অলস সৌন্দর্য জড়িয়ে তার প্রতিটি মুভমেন্টে, হঠাৎ হঠাৎ অপার্থিব সব গোল করে বসেন যেন এই জিদে ‘আরে ভাই, চাইলে আমিও পেলে, রোনালদোর মতো গোল করতে পারি। দুজন ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে চকিতে ব্যাকহিল, বল গলিয়ে ১৯০ ডিগ্রী ঘুরে অনায়াসে বেরিয়ে যান, যেন কোনো ধ্রুপদী নাচের স্টেপস। তাই জিদানকে নিয়ে ধরাবাঁধা লেখা লিখতে মন চায় না। এর চেয়ে বরং একদা কেভিন কিগান কি বলেছেন শুনি- ‘আপনি খেয়াল করে জিদানের খেলা দেখলে বুঝবেন এমন কাউকে আর দেখেননি। ম্যারাডোনা, ক্রুয়েফ গ্রেট পেয়ার, কিন্তু জিদান যেভাবে

বল ‘ম্যানুপুলেট’ করে, চরম ভিড়ের মধ্যে এক মোচরে জায়গা তৈরি করে নেয়; এটা সত্যিই স্পেশাল।’ সাবেক এই ইংলিশ কোচ নিজেও এক সময় বর্ষসেরা ফুটবলার নির্বাচিত হয়েছিলেন, বহু বছর শীর্ষ পর্যায়ে ফুটবল খেলেছেন। বিশ্বকাপ জয়ী ইটালিয়ান কোচ মার্সেলো লিপ্পি বলছেন, ‘গত ২০ বছরে আমার দেখা সেরা প্রতিভাবান জিদান। সৌভাগ্য যে, ওর ম্যানেজার ছিলাম আমি।’ পেলে হয়ত ম্যারাডোনাকে খোঁচা দেয়ার জন্যই একদা বলেছিলেন, ‘সে তো ডি স্টেফানোর মানের ফুটবলারও নয়।’ ফুটবলের প্রথম সুপারস্টারদের একজন সেই স্টেফানো বলেছেন, ‘জিদান ইজ এ ওয়াকিং স্পেকটেক্ল। ওর পায়ের পাতায় সিল্কের গাভস আছে! এমন একজনের খেলা দেখতে স্বশরীরে স্টেডিয়ামে যেতে মন চায়।’ টানা তিনবার ‘ইউরোপিয়ান ফুটবলার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার জেতা মিশেল প্লাটিনি আরও স্পেসিফিক, ‘ফুটবলের ফান্ডামেন্টালস হলো কন্ট্রোল অ্যান্ড পাসিং। বল কন্ট্রোল ও রিসিভ করার ব্যাপারে জিদানের তুলনীয় কেউ নেই।’ বল রিসিভ করাও যে একটা শিল্প হতে পারে; তা বোঝার জন্য ইউটিউবে জিনেদিন জিদানের বিক্ষিপ্ত ভিডিওটা যে কেউ দেখে নিতে পারেন। মাটি থেকে তিন ফুট লাফিয়ে, পুরো বাম পা স্ট্রেচ করে যে বলের নিয়ন্ত্রণ নেন জিদান, তা ডেলিভারি করার পরই পাসার নিশ্চিত ছিলেন ‘থ্রো ইন’ হবে! নাইজেরিয়ার এক ডিফেন্ডারের ট্যাকেলে এক হাঁটু ভেঙে পরে গিয়েও বলের নিয়ন্ত্রণ হারাননি জিদান। উল্টো, আস্তে-ধীরে উঠে কত নিস্পৃহভাবেই না সতীর্থকে ঠেলে দিলেন সে বল। ২০০৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তার এক লম্বা পাসেই ব্রাজিলের রক্ষণ চুরমার করে দিলেন থিয়েরি হেনরি; যেমনটি ১৯৯০ সালে ম্যারাডোনার পাসে করেছিলেন ক্যানিজিয়া। এখানেই সাধারণ ফুটবলারদের সঙ্গে গ্রেটদের পার্থক্য। তাদের একটি ছোঁয়া অথবা মুহূর্তের চপলতা ব্রাজিলের মতো দলকে ছিটকে ফেলে দিতে পারে বিশ্বকাপ থেকে। ‘জিদান অন্যগ্রহের ফুটবলার, ও যখন মাঠে প্রবেশ করে, অন্য দশজন সতীর্থ আরও ভালো হয়ে যায়। ইট ইজ সিম্পল।’ এই তো কিছুদিন আগে বললেন ইব্রাহামোভিচ, যাকে নরডালের পর সেরা সুইডিশ ফুটবলারের সম্মান দিয়ে দিয়েছে সবাই। ১৯৮৯ সালে ক্যানসের হয়ে লিগ ওয়ান শুরু। এরপর ৪ বছর বোর্দোতে, ১৯৯৬ সালে যোগ দেন জুভেন্টাসে। সিরি-এ-টাইটল জিতে ওল্ড লেডি। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে হেরে যায় আয়াক্সের কাছে (১-২)। পরের মৌসুমে আবারও স্কুডেট্টো আসে জিদানের হাতে, (৩২ ম্যাচে ৭ গোল, আগেরবার করেছিলেন ১১টি), কিন্তু এবারও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফসকে চলে যায় রিয়াল মাদ্রিদের কাছে (০-১)। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে আসেন মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে। প্যারাগুয়েকে ১ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ড, কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালিকে টাইব্রেকারে আউট করে এক প্রকার খোঁড়াতে খোঁড়াতেই ফাইনালে উঠে ফ্রান্স। মাঝখানে উইং ব্যাক লিলিয়ান থুরামের জোরা গোল সেমিফাইনাল অভিশাপ থেকে মুক্তি দেয় তাদের। ফাইনালে ব্রাজিল হট ফেভারিট। দুর্দান্ত ফর্মে রোনালদো। রোনালদিনহো, রিভালডো, রবার্টো কার্লোস ও কাফুদের নিয়ে কি ভয়ংকর স্কোয়াড ব্রাজিলের! ওদিকে দেশম, ত্রেজেগে, হেনরি, থুরামদের সঙ্গে জিদান নামে যে কেউ আছেন, অন্তত স্কোরকার্ড দিয়ে তা আলাদা করার উপায় নেই। ফিল্ডগেমে অবশ্যই সবাইকে ছাড়িয়ে আকাশে জ্বলছেন। ওয়েল, এখন গোল দরকার? ‘এই নাও’ বলে হাফ টাইমের আগে দু’প্রান্তের দুটি কর্নার থেকে চাঁদির দু’পাশ দিয়ে বুলেট গতির দু’টি হেডার, এখনই জেনে রাখুন এর আগে শীর্ষ পর্যায়ে মাথা দিয়ে কখনও গোল করেননি জিদান। এক্সট্রা টাইমে মানুয়েল পেটিটের গোলে ব্রাজিলকে বিধ্বস্ত করে প্রথম বিশ্বকাপ জিতে নেয় ফ্রান্স। দু’বছর পর আবার ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনালে দারুণ এক ফ্রিকিকে স্পেন বধের পর (১-০) সেমিতে পেনাল্টি গোলে ফিগোর পর্তুগালকেও বিদায় করে দেন জিদান। ফাইনালে উইলটর্ড ও ত্রেজেগের গোলে ইতালিকে হারায় রজার লেমেরের দল। ১৯৯৮ সালের পর সেবারও ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলার জিদান। ক্যারিয়ারে খুব বেশি গোল নেই। কিন্তু প্রয়োজনের সময় ঠিকই জাল ছুঁয়েছেন জিজু। ২০০২ চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে যেমন বক্সের বাইরে থেকে বা পায়ের অসাধারণ এক ভলিতে বেয়ার লেভারকুজেনকে অসহায় বানিয়ে দেন। হ্যাম্পডেন পার্কে উপস্থিত এক ইংলিশ সাংবাদিক পরে বলেছিলেন, ‘জিদানের এমন অবিশ্বাস্য গোলের দিনে মাইকেল বালাক কিভাবে শিরোপা জেতেন?’ তখন লেভারকুজেনে খেলতেন সাবেক জার্মান অধিনায়ক। ঐ বছরও ফিফা বর্ষসেরা মনোনীত হন জিদান। রোনালদো, জিদানকে (৩ বার) ছাপিয়ে মেসি অবশ্য ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ ৪ বার এই পুরস্কার জিতেছেন। তবে মেসির সময়কাল ২০১১-তেই বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের ভোটে গেল দুই দশকের সেরা ফুটবলার (চ্যাম্পিয়ন্স লিগের) বিবেচিত হন জিদান। এর আগে ২০০০ সালে ৫০ বছরের মধ্যে সেরা ইউরোপিয়ান ফুটবলারের সম্মানও জুটে। প্রতিদ্বন্দ্বিদের নামগুলো স্মরণে নেয়ার লোভ সামলাতে পারছি না। বেকেনবাওয়ার, চার্লটন, ক্রুয়েফ, ববি মুর, প্লাটিনি, বাস্তেন, গুল

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

তারকা কথন এর সর্বশেষ খবর

তারকা কথন - এর সব খবর