thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫,  ১১ মহররম ১৪৪০

‘গোল্ডেন বল’ মালিকের ‘গোল্ডেন ফিনিশিং’ নয়

২০১৪ জুলাই ১৪ ০৮:১৩:০৪
‘গোল্ডেন বল’ মালিকের ‘গোল্ডেন ফিনিশিং’ নয়

জামান তৌহিদ, দ্য রিপোর্ট : একদিকে বিশ্ব জয়ের উল্লাসে মত্ত জার্মানরা। অন্যদিকে স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায় ক্রন্দনরত আর্জেন্টাইনরা। কাঁদছেন দলের সব ফুটবলার। শুধু ব্যতিক্রম একজন। হারের বেদনায় তার ফর্সা মুখটি লাল হযে রয়েছে। চোখ ফেটে জল আসতে চাইছে। কিন্তু কাঁদতে চাইছেন না তিনি। চোয়াল শক্ত করে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। নিস্পৃহ চোখে দেখছেন চারদিকের দৃশ্য। সেরা ফুটবলার হিসেবে তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ‘গোল্ডেন বল’। নিয়মকানুন মেনে ওটা হাতে নিয়েছেন বটে, তবে তা যেন প্লাস্টিকের খেলনা এমন একটা ভাব নিয়ে স্বর্ণের বলটা হাতে ধরে রইলেন। জার্মান ল্যাপ অব অনারের মধ্য দিয়ে রানার্সআপ মেডেল নিতে সতীর্থরা যখন হেঁটে এলো, তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন নির্লিপ্তভাবে একপাশে। অধিনায়ক হিসেবে সবার সামনে থেকে রৌপ্য মেডেল গলায় পরলেন, এরপর ‘নিজের মাঝে নিজে যেন নাই’ এমন ভঙ্গিতে হেঁটে এলেন পুরস্কার মঞ্চ থেকে। লিওনেল মেসি যেন যুদ্ধহারা এক যুবরাজ, শোকে দুঃখে পাথর হয়ে যাওয়া মানুষ। মুখে কথা নেই, চোখে ভাষা নেই। শুধু একটা কথাই বলেছেন, ‘এটা বড় লজ্জার যে, আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ উপহার দিতে পারলাম না। তবে হেরে গেলেও মাথা উঁচুই রয়েছে আমাদের। একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে আমি গর্বিত।’

মঞ্চ প্রস্তত ছিল। প্রস্তুত ছিল সিংহাসনও। কেবল তাতে চড়ে বসার অপেক্ষা। তবে লিওনেল মেসির ওই অপেক্ষার অবসান হয়নি। ফুটবলের জাদুকর পারেননি রাজার আসনে বসতে। হাতে নিতে চেয়েছিলেন বিশ্বকাপের শিরোপা, কিন্তু ওঠেছে নামেমাত্র একটা স্বর্ণের বল। তাতে কি সন্তুষ্টি মেলে? বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলারের পুরস্কার জিতেও বিমর্ষ বদনে তাই ফুটবলের বিশ্ব আসর থেকে বিদায় ঘটেছে ‘লিওনেল মেসি’ নামক জগতখ্যাত ফুটবলারের। যিনি ‘গোল্ডেন বল’ পেয়েছেন, কিন্তু বিশ্বকাপে দিতে পারলেন না ‘গোল্ডেন ফিনিশ’। পেলে-ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তি হতে পারলেন না মেসি।

ফুটবলেই তার ধ্যান-জ্ঞান। অসাধারণ দক্ষতা। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বফুটবলের সবচাইতে আলোকিত তারকা তিনি। ক্লাব ফুটবলে মেসি মানে জাদুকরী প্রতিভা, গোলের মেশিন; প্রতিপক্ষের জন্য জীবন্ত বিভীষিকা। জিতেছেন রেকর্ড ৪ বার ফিফার বর্ষসেরা ফুটবলারের খেতাব। ক্লাব ফুটবলের আঙিনায় এমন কোনো অর্জন নেই যে মেসির ঝুলিতে তা ধরা পড়েনি। বিশ্বজীয় আলেকজান্ডারের মতোই অপ্রতিরোধ্য তিনি। বিশ্ব ফুটবলে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবেও কেউ কেউ তাকে আখ্যায়িত করেছেন। এ নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে তর্ক হয়েছে। বিপক্ষবাদীরা বলেছেন, ‘ক্লাব ফুটবলে যাই হোক না কেন আন্তর্জাতিক ফুটবলে ওর তো কিছু নেই।’ পক্ষবাদীরা বলেছেন, ‘নেই তো কি হয়েছে, একদিন হবে। ও ঠিকই একদিন জায়গা করে নেবে পেলে, ম্যারাডোনাদের পাশে; বলা যায় না, হয়ত ওদের ছাড়িয়েও যেতে পারে।’ বিরুদ্ধবাদীরা ফের বলেছেন, ‘সেই একদিনটা কবে?’ পক্ষবাদীরা চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। চ্যালেঞ্জটা স্বয়ং মেসি নিয়েছিলেন। সমালোচকদের উত্তর দিতেই যেন ব্রাজিল বিশ্বকাপকে বেছে নিয়েছিলেন।

গ্রুপ পর্বের প্রথম ৩ ম্যাচেই প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছেন। মাঝারিমানের আর্জেন্টাইন দলটাকে একাই টেনে তুলেছেন দ্বিতীয় পর্বে। নকআউট স্টেজে নিজে আর গোল পাননি। তবে সতীর্থদের দিয়ে কখনও গোল করিয়েছেন, কখনও দুর্দান্ত প্লেম্যাকার হিসেবে দলকে সার্ভিস দিয়েছেন। আর্জেন্টিনাকে ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার যোগ্যতা দিয়েছেন। মেসির কৃতিত্বে নড়েচড়ে বসেছিল বিশ্ব। এবারের বিশ্বকাপটা মেসির বিশ্বকাপ-জোড় ভিত্তি পেয়েছিল এ কথা। ওটা হয়েও যেত শুধু যদি মেসি আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপটা জিতিয়ে দিতে পারতেন। ফাইনালের মঞ্চে ৩-৪ বার স্বভাবসুলভ ঝলকে তিনি ওই কাজটা করে ফেলবেন এমন আভাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু মারিও গোতসে নামক এক তরুণের শেষ মুহূর্তের ভেল্কিতে জার্মানি জিতে নিয়েছে বিশ্বকাপ। মেসির হাতছাড়া হয়ে গেছে কিংবদন্তি ফুটবলার হওয়ার সুসজ্জিত সিংহাসনটা। এই সিংহাসনে তিনি আর কখনও বসতে পারবেন কিনা, বহু কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ শিরোপা একবার হাতে নিয়ে বিজয় উৎসব করতে পারবেন কিনা-এমন প্রশ্ন এখন জনে জনে। কারণ মেসির বয়স ২৭। রাশিয়ার মাটিতে ৪ বছর পর আবার বিশ্বকাপের আসর বসবে তখন বয়স হবে ৩১। ওই বয়সে মেসি কতটা ফর্মে থাকবেন, অদৌ তার পক্ষে আর ‘মেসি ম্যাজিক’ দেখানো সম্ভব হবে কিনা, আর্জেন্টিনাই বা বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার সুযোগ পাবে কিনা-এমন অসংখ্য শঙ্কা রয়ে গেছে। কে জানে হয়ত ‘লিওনেল মেসি’ নামক এই বিস্ময়কর ফুটবল প্রতিভা আর কোনোদিনই বিশ্বকাপের শিরোপায় হাত ছোঁয়াতে পারবেন না! বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডন বল জিতলেও মেসির ফুটবল জীবনে হয়ত তাই গোল্ডেন ফিনিশিং জুটল না!

রবিবার আর্জেন্টিনা-জার্মানি ফাইনাল ম্যাচটি মাঠে গড়ানোর আগে মূল আলোচনা ছিল মেসিকে ঘিরে। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে মেসি পেলে ও ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তি ফুটবলার হতে পারবেন কিনা-এ সংক্রান্ত আলোচনায় ব্যতিব্যস্ত ছিলেন বিশ্ব ফুটবলের সাবেক গ্রেটরা। সঙ্গে ছিল আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং ফুটবলবোদ্ধারাও। লাখ লাখ আর্জেন্টাইন ভক্ত বিশ্বাস রেখেছিলেন মেসির ওপর। আর্জেন্টাইনদের দৃঢ়বিশ্বাস ছিল তাদের ফুটবল জাদুকর সফল হবেনই। তাই তো বিশ্বকাপ জয়ের উল্লাস করার আশায় ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে হাজির হয়েছিলেন ৫৫ হাজার আর্জেন্টাইন সমর্থকও। কিন্তু সবাইকে হতাশ করেছেন লিওনেল মেসি। ফাইনালের মঞ্চে বার কয়েক ঝলক দেখালেও সত্যিকারের জাদু দেখাতে পারেননি। বিশ্বকাপ আর লিওনেল মেসি নাম দুটি তাই আর একসূত্রে গাঁথা হতে পারেনি। হয়ত আর কোনোদিন পারবেও না।

(দ্য রিপোর্ট/জেডটি/সিজি/শাহ/জুলাই ১৪, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

M

M

SMS Alert

এর সর্বশেষ খবর

- এর সব খবর



রে