thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

 

ইতিকাফ : আল্লাহ্‌র রঙে রঙিন হওয়ার পণ

২০১৪ জুলাই ১৮ ১৭:০২:২৬
ইতিকাফ : আল্লাহ্‌র রঙে রঙিন হওয়ার পণ

এ.কে.এম. মহিউদ্দীন

‘তোমার রঙে আমার মনকে রঙিন করো ও আল্লাহ্
তোমার সরল পথে আমার জীবন গড়ো ও আল্লাহ্
আমারে তুমি সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করো ও আল্লাহ্
তোমার দরবারে মনেপ্রাণে গ্রহণ করো ও আল্লাহ্ ...’

আল্লাহ্‌র রাহে রঙিন হওয়ার একটা মোক্ষম সময় পবিত্র রমজান মাস। আর এই রমজানে রয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যাণময় রাত লাইলাতুল কদর। এ কদর রাত্রির সন্ধানের মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে মানবিক ও আত্মিক যাবতীয় কল্যাণ। মানুষকে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছে খলিফা হিসেবে। আর তাকে পবিত্র জান্নাতের মাধ্যমে কিনে নেওয়া হয়েছে। সুতরাং এই মানুষ খলিফা হিসেবে আল্লাহ্‌র সব থেকে প্রিয়। সে কারণে মানুষের প্রথম ও একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে সেই মহান স্রষ্টার রঙে রঙিন হওয়ার।

ঝকমারী দুনিয়াদারীর কারণে বান্দাহ্‌র কলবে ময়লা-জঞ্জালের সমাবেশ ঘটে। এটাকে দূর করতেই প্রতিবছর আসে রমজান। এই রমজানের শেষ দশকটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। এই দশকে লাইলাতুল কদর হাসিলের মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে সমূহ কল্যাণ। আর এ কারণে মু’মীনগণ মসজিদে ইতিকাফ করেন।

আমরা এখানে ইতিকাফ ও তার বিধান সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করছি।

ইতিকাফ শব্দের আভিধানিক অর্থ : কোনো জিনিসকে বাধ্যতামূলকভাবে ধরে রাখা। কোনো জিনিসের উপর নিজেকে শক্তভাবে আটকে রাখা। আর শরীয়তের পরিভাষায় ইতিকাফ বলা হয়— মসজিদে কোনো বিশেষ ব্যক্তির বিশেষ ধরনের অবস্থান-অবস্থিতি গ্রহণ।

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখেছেন, ইতিকাফ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘শুধু অবস্থান করা’। যে লোক মসজিদে অবস্থান গ্রহণ করেছে তাকে বলা হয়— আকিফ বা অবস্থানকারী। আর শরীয়তের পরিভাষায় এর অর্থ হল— আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে মসজিদে থাকা ও অবস্থান গ্রহণ করা। (উমদাতুল কারী)

কুরআন মজিদের দুইটি আয়াতে এই ইতিকাফ শব্দটি উল্লিখিত হয়েছে— ‘আর যতক্ষণ তোমরা ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান করো, ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীদের সাথে মিশো না।(সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭)। এর আগে আরও বলা হচ্ছে, ‘তোমরা দুইজনে আমার ঘরকে তওয়াফকারী ও অবস্থানকারীদের জন্য পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করে রাখ।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১২৫)

ইতিকাফ শব্দের মূল ভাবধারা : তাজুল উরুস গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবিন্দুতে মন-মগজ দৃঢ়ভাবে নিবদ্ধ রেখে অবস্থান করা এমনভাবে যে সেই দিক হতে অন্য কোনো দিকে দৃষ্টি আদৌ ফিরবে না।

ইতিকাফ হল সকল কাজ থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর ইবাদতের জন্য মসজিদে অবস্থান করা। এটা হল সুন্নত। আয়েশা রাদীআল্লাহু আনহা বলেন :—

«أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، كَانَ يَعْتَكِفُ العَشْرَ الأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللَّهُ، ثُمَّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُهُ مِنْ بَعْدِهِ»

‘রাসূলুলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসের শেষ দশকে মসজিদে ইতিকাফ করতেন। যতদিন না আল্লাহ তাকে মৃত্যু দান করেছেন ততদিন তিনি এ আমল অব্যাহত রেখেছেন। তার ইন্তিকালের পর তার স্ত্রীগণ ইতিকাফ করেছেন।’ [বুখারী : ২০২৫]

ইতিকাফ শুরুর ক্ষণ : হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেছেন, রাসূলে করিম(সা.) যখন ইতিকাফের ইচ্ছা করতেন, তখন ফজরের নামাজ পড়তেন ও পরে তাঁর ইতিকাফ স্থানে প্রবেশ করতেন।- তিরমিজি।

এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, উল্লিখিত হাদীস থেকে বাহ্যত জানা যায় নবী করীম (সা.) ফজরের নামাজ পড়ে ইতিকাফ শুরু করতেন। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হল, তিনি তো পূর্ণ দশ দিনের জন্য ইতিকাফ করতেন। আর সেই জন্য রমজান মাসের একুশ তারিখ ফজর পড়ে নয়— তার পূর্বের রাত্রি সূচনায়-বিশ তারিখ মাগরিবের সময় হতে ইতিকাফ স্থানে উপস্থিত হওয়া আবশ্যক। অন্যথায় চান্দ্রমাসের হিসাবে দশ দিন পূর্ণ হতে পারে না। এই কারণে মুহাদ্দীসদের মধ্যে দুইটি মতের উদ্ভব হয়েছে। কয়েকজনের মত হচ্ছে, বিশ তারিখ মাগরিবের সময়ই ইতিকাফ কেন্দ্রে অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। তারা এই হাদীসের ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, আসলে তিনি আগের দিন মাগরিবের সময় থেকেই ইতিকাফ শুরু করেছেন। পরবর্তী ফজরের নামাজ পড়ে তিনি ইতিকাফ কেন্দ্রে তার জন্য নির্দিষ্ট হুজরায় প্রবেশ করেছেন মাত্র।

এ পর্যায়ে আরও একটি প্রশ্ন উঠেছে। তা হলে ইতিকাফ দশদিন না দশ রাত? হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত এক হাদীসের ভাষা হলো, নবী করিম (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। আর আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলে করিম (সা.) প্রত্যেক রমজান মাসের দশ দিন ইতিকাফ করতেন।

প্রথমোক্ত হাদীস থেকে দশরাত প্রমাণিত হয়। আর শেষোক্ত হাদীস হতে প্রমাণিত হয় দশদিন। এই কারণে মুহাদ্দীসগণ বিশ তারিখ দিনগত রাত শুরু-মাগরিবের সময়-থেকেই ইতিকাফ ধরেছেন। এতে উভয় হাদীস অনুযায়ী আমল হওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়েছে।

ইতিকাফ সংক্রান্ত হাদীসসমূহ থেকে জানা যায়, ইতিকাফের জন্য মসজিদ জরুরী শর্ত— ইতিকাফ মসজিদেই করতে হবে। (উমদাতুল ক্বারী)

ইতিকাফের উদ্দেশ্য : মানুষের ঝামেলা থেকে দূরে থেকে আল্লাহ তা’আলার ইবাদতে একাগ্রচিত্তে নিয়োজিত হওয়া। এ লক্ষ্যে কোনো মসজিদে অবস্থান করে আল্লাহর তরফ থেকে সওয়াব ও লাইলাতুল কদর লাভ করার আশা করা। ইতিকাফকারীর কর্তব্য হলো অনর্থক কথা ও কাজ পরিহার করে সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, ইস্তিগফার, দুআ ইত্যাদি ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত থাকা। তবে পরিবার-পরিজন বা অন্য কারো সাথে অতিপ্রয়োজনীয় কথা বলতে দোষ নেই। ইতিকাফকারী নিজ অন্তরকে সর্বদা আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত রাখতে চেষ্টা করবে। নিজের অবস্থার দিকে খেয়াল করবে। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনের ব্যাপারে নিজের অলসতা ও অবহেলা করার কথা মনে করবে। নিজের পাপাচার সত্ত্বেও আল্লাহ যে কত নেয়ামত দিয়েছেন তা স্মরণ করে তার প্রতি কৃতজ্ঞ হবে। গভীরভাবে আল্লাহর কালাম অধ্যয়ন করবে। খাওয়া-দাওয়া, নিদ্রা ও গল্প গুজব কমিয়ে দেবে। কেননা এ সকল কাজ-কর্ম আল্লাহর স্মরণ থেকে অন্তরকে ফিরিয়ে রাখে। অনেকে ইতিকাফকে অত্যধিক খাওয়া-দাওয়া ও সাথীদের সাথে গল্প-গুজব করে সময় কাটানোর সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। এতে ইতিকাফের ক্ষতি হয় না বটে তবে আল্লাহর রাসূলের ইতিকাফ ছিল অন্য রকম।

ইতিকাফ অবস্থায় স্ত্রীকে চুম্বনও নিষেধ। শরীরের কিছু অংশ যদি মসজিদ থেকে বের করা হয় তাতে দোষ নেই। নবী করীম রাসূলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফ অবস্থায় নিজ মাথা মসজিদ থেকে বের করতেন। তখন আম্মাজান আয়েশা (রা.) তাঁর মাথার চুল বিন্যস্ত করে দিতেন।

ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদ থেকে বের হওয়ার বিধান : ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদ থেকে বের হওয়া তিন ধরনের হতে পারে :

এক. মানবীয় প্রয়োজনে বের হওয়ার অনুমতি আছে। যেমন পায়খানা, প্রস্রাবের জন্য, খাওয়া-দাওয়ার জন্য, পবিত্রতা অর্জনের জন্য। তবে শর্ত হল এ সকল বিষয় যদি মসজিদের গণ্ডির মাঝে সেরে নেওয়া যায় তবে মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না।

দুই. এমন সকল নেক আমল বা ইবাদত-বন্দেগীর জন্য বের হওয়া যাবে না যা তার জন্য অপরিহার্য নয়। যেমন রোগীর সেবা করা, জানাজাতে অংশ নেওয়া ইত্যাদি।

তিন. এমন সকল কাজের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না যা ইতিকাফের বিরোধী। যেমন ক্রয়-বিক্রয়, চাষাবাদ ইত্যাদি। ইতিকাফ অবস্থায় এ সকল কাজের জন্য মসজিদ থেকে বের হলে ইতিকাফ বাতিল হয়ে যায়।

পরিশেষে পয়েন্ট আকারে ইতিকাফ পালনের সময়টুকুতে করণীয় বিষয়াদি তুলে ধরছি—

  • সালাত আদায় করতে হবে।
  • যত বেশী পারা যায় তত সুন্নাৎ, নফল ইত্যাদি সালাত আদায় করতে হবে।
  • বেশী বেশী আল্লাহ্‌র কাছে দুআ-মুনাজাত করতে হবে।
  • আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
  • কলেমা ও তাকবীর পড়তে হবে।
  • জিকির করতে হবে। যেমন— সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ইত্যাদি।
  • মুহাম্মদ (সা.)-এর রূহের প্রতি দুরুদ পাঠ এবং মাগফিরাত কামনা করতে হবে।
  • যথাসম্ভব বেশী বেশী কুরআন তিলওয়াত করতে হবে।
  • কুরআন তিলাওয়াতের পাশা-পাশি তাফসীর পড়তে হবে। হাদীস পড়তে হবে।
  • কোনো ব্যাপারে চরমপন্থা বা গোঁড়ামী করা যাবে না।

হাদীসে এসেছে যে, একদিন মুহাম্মদ (সা.) এক ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার? সে বলল যে, সে আবু ইসরাইল এবং সে শপথ করেছে যে, সে দাঁড়িয়ে থাকবে এবং বসবে না। কথা বলবে না, ছাউনির বাইরে যাবে না এবং সে রোজা রাখবে। অতঃপর মুহাম্মদ কোনো একজনকে বললেন, তাকে কথা বলতে বল, বসতে বল এবং তাকে রোজা সম্পূর্ণ করতে বল।’ (বুখারী, হাদীস নং ৬৭০৪)

[1] ফানাফিল্লাহ, আসিফ আন্দালিব



লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

ধর্ম এর সর্বশেষ খবর

ধর্ম - এর সব খবর