thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫,  ১১ মহররম ১৪৪০
শুভ কিবরিয়া

নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক

তাজউদ্দীন আহমদ : প্রান্তরের কুয়াশায়

২০১৪ জুলাই ২২ ১৮:৩৭:০০
তাজউদ্দীন আহমদ : প্রান্তরের কুয়াশায়

২৩ জুলাই তাজউদ্দীন আহমদের জন্মদিন। ১৯২৫ সালে তার জন্ম। ঢাকার অদূরে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া থানার দরদরিয়া গ্রামে। ১৯৭৫ সালে তার হত্যা। তারিখ ৩ নভেম্বর। জন্মে মানুষ অন্যের ইচ্ছায়, মারা যায় ঈশ্বরের কৃপায়। তাজউদ্দীন আহমদ সেই কৃপা পাননি। তাকে মরতে হয়েছে মানুষের নির্মম পৈশাচিকতার কাছে। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে অস্ত্র হাতে ঢুকে একদল মানুষ অন্য তিন সহকর্মীর সঙ্গে তাকে হত্যা করে। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য গুলি করার পর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তার ইহজীবনের সমাপ্তি টানে বাংলাদেশের একদল মানুষ। এরা কেন মারে? এরা কারা? যারা খুন হাতে জেলখানার সুরক্ষিত দরজা খুলে খেলতে খেলতে, হাসতে হাসতে তাজউদ্দীনকে মারে! তারাই কি তার প্রকৃত খুনী?

নাকি এরা কেবল শ্যুটার? অন্যের নির্দেশে যাদের গুলি চলে! তাহলে অলক্ষ্যে বসে কেউ কি নিশানা বানায়, তাজউদ্দীনকে লক্ষ্য করে? এ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।

উত্তর পাবার জন্য যে মনীষা, যে দীপ্তি, যে ঔজ্জ্বল্য প্রয়োজন বাংলাদেশ তা অর্জন করতে পারেনি আজও।

২.

তোষামোদ খুব অপছন্দ করতেন তাজউদ্দীন আহমদ। পছন্দ করতেন শত্রুর গুণ ও যোগ্যতা। বাঙালি জাতির ভ্রুণে এ সংস্কৃতি নেই। সম্ভবত সেই দোষে তাজউদ্দীন খুন হয়েছেন আরও দু’বার। প্রথমবার তার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকালে। মন্ত্রিসভার দুই নম্বর ব্যক্তি ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। নেতা চিঠি লিখে নির্দেশ দিলেন, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে পদত্যাগ করতে হবে তাকে। ‘জাতির বৃহত্তর এই স্বার্থ’ কি কেউ জানে না? জানতেন হয়ত নেতা মুজিব। খুব সুস্থিরতার সঙ্গে তার নেতার পাঠানো সেই পদত্যাগী পরোয়ানায় সই করেছিলেন তাজউদ্দীন ২৬ অক্টোবর ১৯৭৪ দুপুর ১২টা ২২ মিনিটে।

এই প্রথম খুন ছিল অযাচিত, তবে অপ্রত্যাশিত নয়। তাজউদ্দীন জানতেন, অপছন্দের তালিকায় চিহ্নিত তিনি। এই অপছন্দ আদর্শিক এবং আন্তর্জাতিক। মার্কিন বলয় ঘেঁষে বাজার অর্থনীতি চালু করা যে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে যায় না- এই গোঁ ছাড়েননি তাজউদ্দীন মৃত্যু মুহূর্তেও। তাই ১৯৭৪ সালে অর্থমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেও মার্কিনমুখী আদর্শের পতাকা বহন করতে রাজি হননি তিনি। ঠিক যেমন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে তিনি মার্কিন দিশায় পথ চলতে চাননি।

৩.

তাজউদ্দীনের দ্বিতীয় খুন তার দল, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাতে। যদিও অসম্ভব নিগ্রহ সত্ত্বেও এ দল ছাড়েননি তিনি, এমনকি তার পরিবারও। আজও তাজউদ্দীন পরিবার আওয়ামী লীগ থেকে মুখ ফেরায়নি। নানা অপমান, নানা চাপ এসেছে তবুও তাজউদ্দীন আহমদের পরিবারের সদস্যদের কেউ না কেউ এসে আওয়ামী লীগের ব্যানারে এমপি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন, আজও হচ্ছেন। ভবিষ্যতেও হবেন। তাজউদ্দীন পরিবারের এই নীরব সরবতা তারই উত্তরাধিকারের স্বরূপ। মানুষ যত নিন্দাই করুক, তাজউদ্দীন পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম এই সংস্কৃতিই ধরে রাখবে। কেননা, তাজউদ্দীন আহমদ সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের মধ্যে মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি খুঁজেছিলেন। সমস্ত সম্ভাবনা সত্ত্বেও তিনি কমিউনিস্ট হননি, সমাজ বিপ্লবের ভিন্ন পথে পা রাখেননি।

লক্ষ্যে অবিচল থাকার দলনিষ্ঠ পথে হেঁটেছেন তাজউদ্দীন, হাঁটছে আজও তার পরিবার। তার পরও তাজউদ্দীন আহমদ তার প্রিয় দলের হাতে খুন হয়েছেন দ্বিতীয়বার। তাজউদ্দীনের দীপ্তি, ঔজ্জ্বল্য, সাফল্য ছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত, মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে। সকল উপলক্ষে দু’পায়ে ঠেলে স্বাধীনতার লক্ষ্যে পৌঁছেছিলেন তাজউদ্দীন এই নয় মাসে। নয় মাসে বঙ্গবন্ধু মুজিব মাঠে ছিলেন না, ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে। তাজউদ্দীন মাঠে ছিলেন, নেতার পতাকার নিচে আশ্রয় নিয়েই যুদ্ধে মেতে। এই থাকা ও না থাকা অনেক বিভ্রম তৈরি করে। ফলে আওয়ামী লীগ তার ইতিহাস চর্চায় নয় মাসকে খুব কৌশলে দ্রুত এড়িয়ে চলে, তাজউদ্দীনকে এড়াবার ছলে। নিজ দল কর্তৃক এই তাজউদ্দীন খুন আজও আওয়ামী লীগের পরতে পরতে। গত তিন দশকে আওয়ামী লীগের হাতে লেখা সকল দলিলে তার রক্তপ্রমাণ সু-উপস্থিত। আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের সকল কলমে তার সাক্ষ্য সুপ্রতিষ্ঠিত।

৪.

দুই খুনের তাজউদ্দীন তাই আমাদের প্রিয়। যে দ্বিতল বাড়িটিতে বসে এই রাজনীতি চিনেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, ধানমন্ডি সাতমসজিদ রোডের ৭৫১ নম্বর বাড়িটির সেই স্মৃতিচিহ্নও খুন হয়েছে বাজার অর্থনীতির তোড়ে। তাজউদ্দীনের সেই ইতিহাস ঘেরা বাড়ি এখন বেসরকারি ডেভেলপারের হাতে নির্মিত বহুতল ভবন। দুইতলা বাড়ির খুন ঘটেছে ১২ তলার চাপে। কিন্তু একটা নিরীহ, দুর্বল, লিকলিকে আমগাছ বাড়িটির সামনে তাজউদ্দীন হয়ে বেঁচে আছে। সাতমসজিদ রোডের বাণিজ্যমুখী বাতাস এখনও সেই আম গাছটাকে মারেনি। প্রকৃতির আলো হাওয়ায়, তাজউদ্দীনপ্রেমী মানুষের ভালবাসায় তার হাতে লাগানে আম গাছটি এখনও বেঁচে আছে ১১তলা ভবনের চকচকে দাপটের নিচে খুব নিরীহভাবে, সকলের অলক্ষ্যে।

৫.

তাজউদ্দীন আহমদ এমনি নিরীহ গোছে, নম্রতায়, প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে, অনেকের হৃদয়ে জেগে আছেন। কেননা, তাজউদ্দীন রাষ্ট্র চেয়েছিলেন। ব্যক্তির প্রাধান্য চাননি। তাজউদ্দীন ন্যায্য রাষ্ট্র তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তিনি জানতেন বাংলাদেশ ‘রাষ্ট্র’ না হয়ে উঠলে কর্তৃত্ববাদী শাসন গণতন্ত্রকে গলা টিপে মারবে। আর গণতন্ত্র না থাকলে কারও বিকাশ ঘটবে না। না রাষ্ট্রের, না গণতন্ত্রের!

তাজউদ্দীন আহমদের এই শিক্ষাটা, খুব শক্তিমান কাজ। দুর্বল বাঙালির কাঁধে এই ভার বহন করা কঠিন। কঠিন বলেই তাজউদ্দীন আজও মুখ্য হয়ে উঠছেন না। কেননা, তাজউদ্দীন আহমদ সময়কে অতিক্রম করেছিলেন ধীমান প্রজ্ঞায়। আমরা সেই সময়ের পিছে আছি বলে তাজউদ্দীন আহমদ এখনও গৌণ। নিরীহ ও পেছন সারির। বাঙালি যদি রাষ্ট্র তৈরি করতে সক্ষম হয়, কখনও কোনো কালে, তবে তাজউদ্দীনও সবল, প্রবল, উজ্জ্বল হয়ে উঠবেনই জাতির নিজস্ব প্রয়োজনেই।

(দ্য রিপোর্ট/এনডিএস/সা/জুলাই ২২, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে