thereport24.com
ঢাকা, সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
সিমিন হোসেন রিমি

সংসদ সদস্য

‘আরও অনেক কাজ করার আছে’

২০১৪ জুলাই ২২ ১৯:৩২:২০
‘আরও অনেক কাজ করার আছে’

বাহরাম খান, দ্য রিপোর্ট : সিমিন হোসেন রিমি। দীর্ঘদিন গবেষণাধর্মী কাজ করছেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ওপর। একই সঙ্গে আরও অনেককে কাজে উৎসাহ ও সহযোগিতা দিচ্ছেন। নিজের বাবা না হলেও সারাজীবন তাজউদ্দীনকে নিয়েই কাজ করতেন বলে জানালেন তিনি। নেতা ও পিতা তাজউদ্দীনকে নিয়ে মগ্ন থাকা এ সমাজকর্মী অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই বার সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী মহান নেতার ৮৯তম জন্মবার্ষিকী ২৩ জুলাই। দ্য রিপোর্টের বিশেষ আয়োজনের অংশ হিসেবে সম্প্রতি সিমিন হোসেন রিমির বনানীর বাসায় বসে নেওয়া হয় সাক্ষাৎকারটি।

প্রথমেই রাজনীতিবিদ সিমিন হোসেন রিমির কাছ থেকে তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে জানতে চাইব

এ কথা নিঃসন্দেহে বলতে পারি তাজউদ্দীন আহমদ গতানুগতিক রাজনীতিবিদ ছিলেন না। টমাস জেফারসনের মতো ব্যক্তিত্ব যেমন বুদ্ধি মেধার মাধ্যমে দেশের জন্য অবদান রেখেছেন তাজউদ্দীন তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। তাজউদ্দীন আহমদ মানুষকে খুব ভালোভাবে চিনতে পারতেন, নাড়ির সম্পর্ক অনুভব করতেন। আমার বাবা না হলেও আমি হয়ত তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়েই কাজ করতাম।

তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে সরদার ফজলুল করিম সাহেবের একটি কথা আমার খুব মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘তাজউদ্দীন তার সময়ের অগ্রগামী মানুষ। তিনি সময়ের আগে চলে এসেছেন। তাকে বুঝতে আমাদের অনেক বাকি।’

আমি অবাক হয়ে যাই ২২ বছর বয়সী তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি পড়ে। তৎকালীন পূর্ববঙ্গে আইএমফ’র প্রতিনিধি দল এসেছে। প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যারা কথা বলতে যাচ্ছেন তারা বাইশ বছর বয়সী তাজউদ্দীন আহমদকে সঙ্গে নিচ্ছেন তার অর্থনীতি বিষয়ক চিন্তা শেয়ার করার জন্য, বলার জন্য। ওই সময় থেকেই তিনি রাষ্ট্র গড়ার চিন্তা করতেন। তখনও কিন্তু পাকিস্তান হয়নি। চিন্তা করতেন রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের কী সম্পর্ক হবে। ধর্মের সঙ্গে যেন রাষ্ট্রের সংঘাত না ঘটে সে বিষয়ে তাজউদ্দীন আহমদ তখন থেকে ভাবতেন।

নিজের ধর্মকে বোঝার জন্য তিনি আরবি বিষয়ে অধ্যয়ন করেছেন। আরবি ভাষা বুঝতেন। কথা বলতে পারতেন। তার চিঠিগুলো পড়লেও দেখা যায়, প্রতিটা লেখাতেই যেন অনেক ইঙ্গিতধর্মী নির্দেশনা আছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল এবং আপনার বেড়ে ওঠা অনেকটা সমসাময়িক। প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যোগ দিয়ে পার্থক্য কী দেখছেন?

কোনো পরিবর্তন হয়নি বলেই আমার মনে হয়। তাজউদ্দীন আহমদ থাকতে এবং তার ডায়েরি পড়ে যে সব বিষয় আমরা পাই, এখনও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সে সব সমস্যাই যেন রয়ে গেছে। তবে এ অপরিবর্তনশীলতার মধ্যে অনেক আধুনিক সংস্কৃতি আমরা গ্রহণ করেছি। ফলে অনেক বিষয় আরও জটিল হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতার আগে আমরা আন্দোলন করতে শিখেছি। সফল হয়েছি। কিন্তু দেশ গড়ার কাজটি শিখিনি, এখনও অনেক বাকি।

কী করা দরকার বলে মনে করেন?

সবাইকে নিজের কাজটা ভালভাবে করার বিষয়টাতে আমি জোর দিতে চাই। আমার সামনের জীবনের দর্শনই হলো মানুষকে এ বিষয়টাতে আগ্রহী করে তোলা। তাহলে আমাদের অনেক কিছুর ইতিবাচক পরিবর্তন হবে।

আপনারতো আরও ভাই-বোন আছেন। তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে আপনার এত আগ্রহ কেন?

তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে আসলে খুব কম মানুষই জানে, এটাই সত্য, বাস্তবতা। তার যে বিশাল কর্মময় জীবন ছিল এটা মানুষকে জানাতে চাই। বিশেষ করে তার ডায়েরিতে যেন সারা জীবনের ছক এঁকে গেছেন তিনি। অথচ মনযোগ দিয়ে পড়লে দেখবেন তার লেখায় তিনি যেন নিজেই অনুপস্থিত। মনে হয় মহাকালের কেউ ঘটনাগুলো বর্ণনা করে যাচ্ছেন। এমন একজন মানুষকে জানা বড়ই জরুরি। তিনি মানুষকে বুঝতে পারতেন এটা অনেক বড় গুণ।

বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘মানুষকে বুঝে মানুষকে ভালবেসে মানুষের জন্য কাজ করতে হবে।’

তাজউদ্দীন আহমদ মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। তাকে জানা দরকার। এ ছাড়াও ছোট বেলা থেকেই পড়াশোনার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টেটলদের পড়েছি ক্লাস নাইনের দিকে। কিন্তু তাদের সম্পর্কে জানি সম্ভবত তৃতীয় শ্রেণী থেকেই। এই যে বিভিন্ন দেশের বড় বড় মানুষ সম্পর্কে জানা, মূলত সেখান থেকেই যারা দেশের জন্য বড় কাজ গেছেন তাদের সর্ম্পকে জানা ও জানানোর প্রত্যয় জাগে আমার। আমাদের পাঠচক্রে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীসহ আরও অনেক বই পড়ি।

যদি প্রশ্ন করি এ সময় তাজউদ্দীন আহমদ এত প্রাসঙ্গিক কেন?

তাজউদ্দীন সাহেব আসলেই সময়ের অগ্রবর্তী যাত্রী ছিলেন। আপনি যদি তার বক্তৃতা, লেখা ও ডায়েরিগুলো ভালভাবে খেয়াল করেন তাহলে দেখবেন যেন আজকের দিনের সমস্যাগুলো তিনি তখনই দেখছিলেন। তাই লিখে গেছেন। তার সমস্তটাজুড়ে ছিল একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা। গণপরিষদে ১৯৭২ সালের ৩০ অক্টোবর সংবিধানের ওপর দেওয়া তার ভাষণটি যদি পড়েন তাহলে তার রাষ্ট্রভাবনার অনেক বিষয় সেখানে পাবেন।

তার সেই ভাবনার কোন জায়গায় আছে বাংলাদেশ? এই বাংলাদেশ কি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী নেতার ভাবনা ধারণ করতে পেরেছে?

আমরা সেটা পারিনি। ‘তাজউদ্দীন আহমদের সমাজ ও রাষ্ট্রভাবনা’ থেকে উদ্ধৃত করছি, তিনি বলে গেছেন, ‘জাতি হিসেবে আমাদেরকে লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে আমাদের একটা ঐক্য থাকতে হবে। আমরা যে দলেই থাকি না কেন, আমাদের লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট। সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে প্রথমত আমাদের জাতীয় ঐক্য দরকার। পথ বিভিন্ন থাকতে পারে। আমরা হয়ত ভাবছি এইপথ দিয়ে তাড়াতাড়ি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব। আরেকজন হয়ত ভাবছেন অন্য পথে গেলে তা হয়ত সহজ হবে। আমরা যদি লক্ষ্য ঠিক রাখতে পারি তাহলে আমাদের পথিমধ্যে কোনো বাধাই টিকবে না। এই আবেদনই আমি সকলের কাছে রাখব, আমাদের একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে প্রয়োজন পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ, শ্রদ্ধাবোধ। আমরা যদি পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ-সম্মানবোধ না রাখি তাহলে সেই পরিস্থিতি যে কী আকার ধারণ করবে তা সহজেই অনুমেয়।’

আমার মনে হয় উল্লিখিত উক্তির শেষ দুটি লাইন গত কয়েক বছর যাবত আমরা পার করছি।

তিনি (তাজউদ্দীন আহমদ) আরও বলে গেছেন, ‘যত সুন্দর ভাষা ও স্বপ্ন নিয়ে সংবিধান লেখা হোক না কেন জাতীয় জীবনে সেটার প্রয়োগ না হলে তা অর্থহীন হয়ে পড়বে। সংবিধানে শুধু মৌলিক অধিকার লিখলেই চলবে না, জনগণ যাতে সে সব অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় তার জন্য সরকারকে দায়িত্বশীল হতে হবে, সবাইকে সচেতন হতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণকে অধিকার সচেতন করে তোলার জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। জনগণ সচেতন না হলে আদালত তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।’

তাজউদ্দীন সম্পর্কে আরও কী করার আছে বলে মনে করেন?

একজন আড়ালে থাকা মানুষকে সামনে আনার চেষ্টাটুকু করছি আমি। এ সব বিষয় নিয়ে অনেক গবেষণা হতে পারে। কারণ তাজউদ্দীন আহমদ যদি বিশ্বের অন্য কোনো দেশে জন্ম নিতেন তাহলে হয়ত বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে তার তুলনা হত। তার চিন্ত-ভাবনা, স্বপ্ন, দিকনির্দেশনা সব কিছুতেই যেন অন্যরকম ছোঁয়া। তাকে নিয়ে আরও অনেক কাজ বাকি। কেউ কেউ কিছু করছেন। আরও কেউ না কেউ কাজ করবেন বলেই আমার বিশ্বাস।

(দ্য রিপোর্ট/বিকে/এনডিএস/এনআই/জুলাই ২২, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর