thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫,  ১০ মহররম ১৪৪০

আমার চোখে তাজউদ্দীন আহমদ

২০১৪ জুলাই ২২ ২০:৫২:৫৬
আমার চোখে তাজউদ্দীন আহমদ

আমার চোখে তাজউদ্দীন আহমদ কেমন-এ কথা যদি বলতে যাই তাহলে হয়ত আমার প্রজন্মের কথাই বলা হবে। আমার প্রজন্ম বলতে স্বাধীনতার দুই-পাঁচ বছর আগে-পরে জন্ম নেওয়াদের বুঝাচ্ছি। ’৭৫ পরবর্তী সময়ে বেড়ে উঠেছি আমরা । স্বাধীনতার পর মাত্র চার বছর পর সুপরিকল্পিভাবে জাতির ঘাড়ে চেপে বসা সামরিক শাসকদের দুই দশকে এ বেড়ে ওঠা। আমি যখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি তখন ১৫ আগস্টকে নাজাত (মুক্তি) দিবস হিসেবে পালন করা হতো। হত্যাকারীরা কুৎসিত ভাষায় জাতির জনককে গালাগাল করত এবং সেগুলো রেডিও-টেলিভিশনে প্রচার করা হতো। বুঝতেই পারছেন, আমরা যারা সেই দুই দশকে বড় হয়েছি তাদের পক্ষে বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন আহমদকে আবিষ্কার করা কত কঠিন ছিল। সেটা ছিল এক দুর্যোগপূর্ণ সময়। কী যে বিপর্যয়কর কষ্ট, বেদনা আর অজ্ঞতা নিয়ে বেড়ে উঠেছি তা বলে শেষ করা যাবে না।

সেই সময়ে জাতীয় দিবসগুলোতে পাকিস্তানের নামও উচ্চারণ করা হতো না। বলা হতো হানাদার বাহিনী এ দেশের মানুষের ওপর হামলা চালিয়েছিল। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর নয় মাসের যুদ্ধের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। চিন্তা করে দেখুন, কী কৌশলী প্রচারণা। এখানে হানাদার বাহিনী কারা তার কোনো উল্লেখ নেই, কে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন, মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে হলো কোনো বর্ণনা নেই। যেন হঠাৎ করে স্বাধীনতা এসে ধরা দিল। এ প্রচারণাগুলো অত্যন্ত চাতুর্যপূর্ণ ছিল। কারণ সবাই তো বই পড়েন না।

তবে কতিপয় মানুষের কল্যাণে আমরা স্বাধীনতা সম্পর্কে অনেক জানতে পেরেছি। যারা লিখেছেন, কথা বলেছেন, নাটকে স্বাধীনতাকে ধারণ করেছেন, গানসহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য বই হলো মঈদুল হাসানের ‘মূলধারা একাত্তর’।

‘তাজউদ্দীন আহমদের চিঠি’ বইতে একাত্তরে ২৫ মার্চ ঢাকা থেকে রওয়ানা করে কীভাবে ভারত সীমান্তে পৌঁছান তার একটি বিবরণ আছে তাজউদ্দীন আহমদের নিজের লেখাতে। এত বড় একজন নেতা যিনি পায়ে হেঁটে, নৌকায় কিংবা ভেলায়, গরুর গাড়িতে যেখানে যেভাবে পারছেন সেভাবেই পথ পাড়ি দিচ্ছেন। পথ চলার সময়ে তার মধ্যে যে রক্তক্ষরণের উপলব্ধি আমরা পাই তা অবিস্মরণীয়।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুধু দুটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পর্যায়ক্রমে উপমহাদেশীয় বলয় পেরিয়ে এর ব্যাপ্তি ছিল বিশ্বজুড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, ভারত মিলে ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করেছিল। আর সেই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে নেতৃত্বদানকারী সরকারের নিজেদের কোনো কার্যালয় ছিল না। বিদেশের মাটিতে বসে নেতৃত্ব দিতে হয়েছে তাজউদ্দীন আহমদকে। আর এ সব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক হিসেব-নিকেশের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে কেউ চিঠি পাঠচ্ছেন পাঁচশ টাকার সাহায্য চেয়ে, কেউবা লিখছেন থাকার জায়গার ব্যবস্থা করে দিতে। আশ্চর্যজনকভাবে লক্ষ্য করি তিনি এগুলোকেও উপেক্ষা করেননি। বহুমাত্রিক কাজের মধ্যেও তিনি যতটুকু পেরেছেন সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন সবাইকে। আমি চিন্তা করে পাই না, একজন মানুষ কীভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের ওই সময়টুকুতে সাধারণ একটি চিঠির গুরুত্বকেও অবহেলা করেননি। সত্যিই তাজউদ্দীন আহমদের মতো ধীরস্থির মনস্কের মানুষ বিরল। তার চিঠি থেকে এগুলো আমরা জানতে পারি। এই ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, সবাই তাকে সম্বোধন করতেন তাজউদ্দীন ভাই হিসেবে।

বঙ্গবন্ধু বাঙালির সমস্ত আবেগকে তার হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন। ভাষাহীন আবেগকে ভাষা দিয়েছিলেন, প্রকাশ করেছিলেন। বাঙালির সমস্ত দ্রোহকে তিনি একটি আঙ্গুলে তুলে নিয়েছিলেন। আর সেই আঙ্গুল দিয়ে ধমক দিতে পেরেছিলেন সমস্ত জান্তাকে। জাগিয়ে তুলেছিলেন সমস্ত জাতিকে। কিন্তু জাগিয়ে তোলা এ আবেগকে সংহত করার কাজটি করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। মালেক সাহেব নামক একজনকে চিঠিতে তিনি লিখছেন, ‘বিভিন্ন জনস্রোতের গন্তব্যস্থল এক হইলে গতিপথ স্বতন্ত্র থাকা সত্ত্বেও তারা মিলিত হইবে মহান এক আধারে, মহাসাগরে। ... গন্তব্য স্থান এক হইলে সহযাত্রী না হইলেও সহচর একদিন হইতেই হইবে।’ ১৯৫৩ সালে বন্ধুকে লেখা এ ব্যক্তিগত চিঠিতে তাজউদ্দীন আহমদ যা লিখেছিলেন তার ঠিক ১৮ বছর পর তাজউদ্দীন আহমদ ঠিক এ কাজটিই করেছিলেন। বিভিন্ন মত ও পথের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন।

তাজউদ্দীন আহমদকে জানবার ও জানাবার অনেক বাকি আছে। এ কাজটি আমাদের করে যেতে হবে।

[১৯ জুলাই ২০১৪ ‘তাজউদ্দীন আহমদের চিঠি’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে দেওয়া আহমাদ মোস্তফা কামালের বক্তব্য (সংক্ষেপিত)]

(দ্য রিপোর্ট/এনডিএস/এনআই/জুলাই ২২, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে