thereport24.com
ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫,  ১২ মহররম ১৪৪০
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

অধ্যাপক

তাজউদ্দীন ইতিহাসের ঠিক জায়গায় নাই

২০১৪ জুলাই ২২ ২১:০২:৫৯
তাজউদ্দীন ইতিহাসের ঠিক জায়গায় নাই

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ হলেন তাজউদ্দীন আহমদ। তার সম্পর্কে আমরা অনেক বেশি জানতে পারছি সিমিন হোসেন রিমির কারণে। তাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই। তার কারণেই তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে নতুন প্রজন্ম জানতে পারছে। তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে কাজগুলো ইতিহাসে থেকে যাচ্ছে। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরও মানুষ এগুলো পড়বে তাদের দৃষ্টি দিয়ে।

সে সময় আজকে আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি তাদের কেউ হয়তো থাকব না। থাকবে শুধু ডকুমেন্ট। ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুকে আমরা ঠিক জায়গায় স্থান দিতে পেরেছি। কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ ইতিহাসের যে জায়গায় স্থান পাওয়ার কথা সেই জায়গায় স্থান দিতে পারিনি আমরা। এটা আমাদের একটা কষ্টের জায়গা।

‘তাজউদ্দীন আহমদের চিঠি’ বইতে আমরা একটি ঐতিহাসিক চিঠি পাই। যদিও এটা আগে থেকে সবাই জানেন, তারপরও এ চিঠিগুলো এভাবে ছাপা হয়ে সংরক্ষিত হওয়া জরুরি ছিল। বইটির পরিশিষ্টতে তাজউদ্দীন আহমদের অর্থমন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করার সেই চিঠি আছে। আমরা সবাই জানি একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদের মধ্যে যে অকৃত্রিম বন্ধন ছিল তা তাদের মধ্যে আদান-প্রদানকৃত চিঠির মধ্যেও বুঝা যায়। সরকারি কাজেও তাজউদ্দীন আহমদ অফিসিয়াল চিঠিতে বঙ্গবন্ধুকে ‘মুজিব ভাই’ বলে সম্মোধন করছেন। আবার এ দুজনের মধ্যে যে ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির শুর হলো তাও সেই চিঠির মাধ্যমেই। সাধারণ দুটি দুই লাইনের চিঠি ছিল সেগুলো।

তাজউদ্দীন আহমদের বয়ানে মার্চ (১৯৭১) মাসে ঢাকা থেকে ভারত যাওয়ার যে বর্ণনা পড়েছি, তাতে তার যাত্রার শুরু থেকেই যেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। তিনি অনেক কষ্ট করে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পৌঁছান। কিন্তু যথোপযুক্ত সম্মান না নিয়ে ভারতে ঢোকেননি। নিজের ব্যক্তিত্বের মধ্যে তিনি বাংলাদেশকে ধারণ করেছিলেন। মানুষের প্রতিনিধিত্বকে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।

তার চিঠিগুলো পড়লে দেখা যায়, সব বিষয়েই যেন অত্যন্ত স্পষ্ট ধারণা করতে পারতেন তিনি। একটি চিঠিতে পেয়েছি ২৭ মার্চ জিয়াউর রহমানের ঘোষণাটি বেশি বেশি প্রচার হওয়ার কারণে তাজউদ্দীন আহমদ খুব চিন্তিত ছিলেন। শত্রুপক্ষ যদি বহির্বিশ্বে এ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে প্রচারণা চালায় যে এটি পাকিস্তানের একটি সেনাবিদ্রোহ তখন বিশ্ববাসীকে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের মর্মার্থ বুঝাতে বেগ পেতে হবে। তাই তিনি চাইছিলেন, এটা বাংলাদেশের একটি গণতান্ত্রিক সরকারের ঘোষণা হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাক।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে যে কী প্রভাব ফেলেছিল সেই বিষয়ে আমরা জানতে পারি মঈদুল হাসনের মূলধারা একাত্তর বই পড়ে। এর মাধ্যমে আমরা জেনেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরোশিমা নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার পর দ্বিতীয়বার পারমাণবিক বোমা নাড়াচাড়া করেছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়। তাজউদ্দীন আহমদ সেই সময়টিতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো ওই সময়ে তাজউদ্দীন আহমদকে যখন বিশ্বশক্তির নানা হিসাব-নিকাশের বিষয়াবলী মাথায় নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে ঠিক সেই সময়ে তার কাছে চিঠি আসছে সামান্য টাকার সাহায্য চেয়ে, থাকার জায়গার ব্যবস্থা চান কেউ কেউ। আরও আশ্চর্যজনক হলো মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকে তিনি নিজেও জানতেন না তার পরিবার কোথায় আছে, কীভাবে আছে। আর সেই তিনি কিনা, অন্যের চিঠি পেয়ে তার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করছেন। সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দলীয়-উপদলীয় কোন্দল সামলাচ্ছেন। এ ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।

আমি আবারও বলছি, ইতিহাসের সঠিক জায়গায় তাজউদ্দীন আহমদকে জায়গা দিতে পারিনি আমরা। তবে এটাও ঠিক, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর যখন নির্মোহভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসকে দেখা হবে তখন তাকে (তাজউদ্দীন আহমদ) তার যোগ্য স্থান না দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। প্রতিটি ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা ছিল।

আমাদের মতো সৌভাগ্যবান জাতি বিশ্বে খুব কম আছে। তাজউদ্দীন আহমদের যোগ্য নেতৃত্বে মাত্র নয় মাসে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আজকের প্যালেস্টাইনের দিকে তাকিয়ে দেখেন। কত দীর্ঘ তাদের সংগ্রাম। এর পরও কোনো আশার আলো দেখতে পারছে না তারা। পাকিস্তান নামের একটি রাষ্ট্র আছে, তার জন্য আমরা করুণা ছাড়া আর কিছু জানাতে পারি না।

আমরা অনেক সৌভাগ্যবান যে, বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদের মতো মানুষকে আমরা নেতা হিসেবে পেয়েছি। আমার মনে হয়, খোদা আমাদের প্রতি বিশেষ উপহার দিয়েছেন। কারণ এ দুজন নেতাকে একসঙ্গে না পেলে আমাদের কী হতো? আমাদের প্রতি খোদার অশেষ মায়া আছে। এ জন্যই যখন দরকার তখন এ দুজনের মতো রাজনীতিক দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

আমি বিজ্ঞানের মানুষ হিসেবে জানি, যখন কোনো বড় পরিবর্তন হয়ে কার্ভ উপরের দিকে যায় তখন হঠাৎ করে নিচের দিকে আসে। আবার উপরে ওঠে। এভাবে ওঠা-নামা করতে করতে এক সময় স্থিতিশীল অবস্থা তৈরি হয়। তেমনি মুক্তিযুদ্ধে অনেক বড় অর্জন আমরা করেছি, ’৭৫-এর ভয়াবহতাও দেখেছি। এটাই নিয়ম।

এখন আমাদের স্থিতিশীলতার জায়গায় যাওয়ার সময়। যে স্বপ্ন তাজউদ্দীন আহমদ দেখেছিলেন, যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন তা বাস্তবায়নের সময় এখন। সেই পথে হাঁটতে হবে আমাদের।

[১৯ জুলাই ২০১৪ ‘তাজউদ্দীন আহমদের চিঠি’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে দেওয়া মুহম্মদ জাফর ইকবাল- এর বক্তব্য (সংক্ষেপিত)]

(দ্য রিপোর্ট/এনডিএস/জুলাই ২২, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে