thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫,  ১১ মহররম ১৪৪০

তাজউদ্দীন আহমদ : প্রথমে নেতা, পরে পিতা

২০১৪ জুলাই ২৩ ১৫:২৪:১৬
তাজউদ্দীন আহমদ : প্রথমে নেতা, পরে পিতা

বাহরাম খান, দ্য রিপোর্ট : আজ থেকে ৩৯ বছর আগে ১৫ বছরের এক কিশোরী তার ডায়েরিতে লিখছেন, ‘আব্বু তো মরেনি ঘুমিয়ে আছে সারা পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের অন্তরে। আব্বুর আদর্শ, আব্বুর কাজ কত মহান লক্ষ্যের দিকে ধাবিত ছিল! দেশের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মুহূর্তেই যেন আব্বু দূরে চলে গেলেন! কে এখন পথ দেখাবে? আর তো কোনো নেতা নেই!’

কত তীক্ষ্ণধীশক্তি থাকলে সদ্য বাবা হারানো শিশু সন্তান তার পরিবারের কথা চিন্তা না করে, নিজের ভবিষ্যৎ কি হবে সেই কথা চিন্তা না করে লেখেন-

‘কে এখন পথ দেখাবে?’

এই পথ দেখানো শিশুটির নিজের বা পরিবারের জন্য নয়, ‘পথ’ বলতে জাতির পথকে বোঝানো হয়েছে। পরের লাইনটিতে আরও পরিষ্কার-

‘আর তো কোনো নেতা নেই!’

জাতির পথ দেখানোর জন্যই তো নেতার দরকার হয়।

তাজউদ্দীন তাই সার্থক পিতা ও নেতা। না, ভুল বললাম- নেতা ও পিতা। সত্যিই তাজউদ্দীন প্রথমে নেতা, দ্বিতীয়ত পিতা। এ জন্যই আজন্ম রাজনীতির ভেতরে বেড়ে ওঠা লেখিকা শারমিন আহমদ তার স্মৃতিচারণমূলক ঐতিহাসিক বইটির নাম রেখেছেন অত্যন্ত সার্থকভাবে-‘তাজউদ্দীন আহমদ : নেতা ও পিতা।’

পঁচিশে মার্চ রাতে অপ্রস্তুতভাবে বের হওয়া তাজউদ্দীন আহমদ তার পরিবারকে তেমন কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারেননি। গোটা জাতির ক্রান্তিলগ্নে একজন নেতা তার পরিবারকে নিয়ে চিন্তা করেন না। চিন্তা থাকে দেশবাসীকে নিয়ে। তাই ঢাকা ত্যাগ করার আগে বাহক মারফত স্ত্রীকে লেখেন, ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের সাথে মিশে যেও। বেঁচে থাকলে দেখা হবে।’ লেখিকার লেখাতেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়, বলছেন, ‘নেতা তাজউদ্দীনের বিশাল ব্যক্তিত্বের মধ্য থেকেই তাই খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি পিতা তাজউদ্দীনকে।’

‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের সাথে মিশে যেও। বেঁচে থাকলে দেখা হবে।’

স্মৃতিচারণমূলক লেখায় সত্য ও বাস্তবতাই মূল উপজীব্য। সেখানে ব্যক্তি, পারিপার্শ্বিকতা ও সময় অনেক বড় উপাদান। তবে লেখক শারমিন আহমদের বিষয় যখন তাজউদ্দীন আহমদ তখন তাজউদ্দীনের ছায়ায় সব কিছু ঢাকবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ তাজউদ্দীনের ছায়া ইতিহাস অনেক আগেই তৈরি করে রেখেছে। আলাদা বৃক্ষরোপণের কোনো দরকার নেই। তার সুযোগ্য কন্যা সেটি করেনওনি। উপরন্তু অন্যসব ঐতিহাসিক বা স্মৃতিচারণ গ্রন্থে বাংলাদেশের ইতিহাসে এককেন্দ্রিক বন্দনায় তাজউদ্দীনকে উপেক্ষিত দেখতে হয়। আলোচ্য বইয়ে শারমিন আহমদ বরং অনেক ক্ষেত্রে পার্শ্বচরিত্রগুলোকে আন্তরিক গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। যেমন- ব্যারিস্টার আমির-উল-ইসলাম, গোলাম মোরশেদ, নূরুল হক প্রমুখ।

শারমিন আহমদ তার লেখনীতে একজন নেতাকে চিত্রিত করেছেন। প্রাসঙ্গিকভাবে এসেছেন পিতা। পিতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নন। কারণ পিতা হওয়ার কারণেই তাজউদ্দীনের অপ্রকাশিত অনেক বিষয়ই তাদের কাছ থেকে জানতে পারছে মহাকাল।

স্বাধীনতার পূর্বাপর সাক্ষী শারমিন আহমদ। তার জন্ম বাংলাদেশের ইতিহাসের আঁতুড় ঘরে। আজ তার পরিণত জীবনে যে বইটি উপহার দিয়েছেন তাতে ইতিহাসের তাজউদ্দীনকে নতুনভাবে, নতুন আঙ্গিকে তেমন কোনো মৌলিক উপস্থাপন করতে পারেননি। যারা তাজউদ্দীনকে নিয়ে সামান্য হলেও পড়েছেন তারা হয়ত বিষয়টি উপলব্ধি করবেন। তারপরও এই বই অমূল্য। কারণ, সরাসরি তাজউদ্দীনকে দেখা মানুষের যত বেশি বয়ান আসবে ততই উপকৃত হবে এই প্রজন্ম, ভবিষ্যত প্রজন্ম।

শারমিন আহমদ পুতুল তার ‘কুতকুত’ খেলার বয়সে নিজের অজান্তেই হয়েছেন রাজনৈতিক কর্মী। ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের জেলে ঢোকানো হয়। তাজউদ্দীন আহমদের বাড়িতে তখনও অনেক গুণী রাজনীতিকের আনাগোনা। কাজের লোক থাকা সত্ত্বেও বইয়ের লেখিকা তাদের বাড়িতে আসা নেতাদের চা-নাস্তায় আপ্যায়ন করতেন নিজ হাতে। বিশেষ কোনো দিনে বেশি লোকজন এলে গেটে দাঁড়িয়ে লিফলেট দিতেন। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান আন্দোলনে প্রাইমারি স্কুল শাখার ভাইস প্রেসিডেন্ট হন শারমিন আহমদ। আর তার এ সব কার্যক্রম জেল থেকে অনুপ্রেরণা দিতেন নেতা তাজউদ্দীন ও পিতা তাজউদ্দীন।

মাত্র ৮-৯ বছরের এ বালিকা একজন নেতা ও পিতাকে উপস্থাপন করার সঙ্গে সঙ্গে তার সময়কেও (ষাট ও সত্তরের দশক) রেখেছেন সমানতালে। এ কারণেই বইটি পড়ার সময় মনে হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোর মধ্য দিয়েই যেন সময় গড়াচ্ছে। নিজের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে লেখিকা তার জেলে থাকা পিতাকে জানাচ্ছেন - একদিন আমেনা বেগম (আওয়ামী লীগের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক) আমাদের বললেন, ‘তোমরা এই বইগুলো নিয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকো। যারাই সভায় আসবে তাদের হাতে একটি করে বই দেবে। বই বিলি করার দায়িত্ব পেয়ে আমরা ভীষণ খুশি। সবুজ রঙের বইয়ের ওপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল সেই যুগান্তকারী বৈপ্লবিক বাণী -পূর্ব বাংলায় স্বায়ত্তশাসন চাই।’

জেল থেকে তাজউদ্দীন আহমদ ফিরতি চিঠি লিখলেন, মেয়ের রাজনৈতিক কাজে তিনি খুশি হয়েছেন। তাজউদ্দীন আহমদ নিজে যা বিশ্বাস করতেন তা সবার জন্যই সমানভাবে দেখতে পারতেন। না হয় নিজের একেবারে শিশু মেয়েটিকে এভাবে রাজনৈতিক কাজে উৎসাহ দিতে পারতেন না।

“তাজউদ্দীন আহমদ : নেতা ও পিতা” বইটি একটি দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পরিবার, নেতা ও রাজনীতিকে কেন্দ্র করে বর্ণিত হলেও একান্ত আপন মনে হয়। যেন এগুলো আমাদের জীবনেরই অংশ। কারণ নেতা তাজউদ্দীন তার পরিবার, রাজনীতি ও নিজেকে সব সময় সাধারণের কাতারে রাখতেন। যে কারণে একটি দলের সাধারণ সম্পাদক, একটি দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের চারদিকের ঘটনা কোনো কিছু বিচ্ছিন বোধ হয় না। তাই এই বই, বিশেষ করে আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি তাদের কাছে নতুন দুয়ার খুলবে। একই সঙ্গে একাত্তর প্রজন্মের যারা তাজউদ্দীনকে উপেক্ষিত দেখে ব্যথিত হন তারাও আনন্দ পাবেন। দেখবেন তাজউদ্দীন আসলে উপেক্ষিত হওয়ার নয়। এ যে খাঁটি সোনা। পুড়ে যাওয়া ছাই উড়তে শুরু করেছে। মানুষ সোনা খুঁজে নেবেই নেবে।

তাজউদ্দীনের অর্ধাঙ্গিনীর অনেক কথাই তুলে ধরেছেন শারমিন আহমদ। বিশেষ করে স্বামীর জেল জীবনে ছেলেমেয়েদের নিয়ে যে সংগ্রাম জোহরা তাজউদ্দীন করেছেন তা এক কথায় অতুলনীয়। এমন যোগ্য সহধর্মিনী না পেলে তাজউদ্দীনের মতো পূর্ণ নেতা হওয়াও সম্ভব হতো কি না- সন্দেহ আছে। লেখিকার বয়ানে, ‘তার (জোহরা তাজউদ্দীন) কাঁধে তখন ঘর ও বাইরের সব দায়িত্ব এসে পড়েছে। তিনি সব কিছুই একাকী সামলাচ্ছিলেন তেজস্বী মনোভাব নিয়ে। একদিকে অর্থনৈতিক সংগ্রাম, তিনটি শিশুর লালনপালন, রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের সাহায্য-সমর্থন, রাজবন্দিদের পরিবারের খোঁজখবর, তাদের মুক্তির দাবিতে মিটিং, মিছিল, সমাজসেবা আবার লেখাপড়াও চালিয়ে যাচ্ছিলেন পূর্ণোদ্যমে।’

তাজউদ্দীন আহমদ জীবনে যেখানেই থেকেছেন ফুল ফুটিয়েছেন সব জায়গায়। হোক সেটা জঙ্গল-নর্দমা পরিষ্কার করে জেলখানার ভেতরের অনুর্বর মাটিতে কিংবা দলের কর্মীদের মনের মধ্যে। এই কর্মবীর মানুষটিরই দরকার ছিল একটি দেশের স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেওয়ার। বঙ্গবন্ধু সেদিন ছিলেন না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে মাথার তাজ বানিয়ে, তার নামকে জিকির সমতুল্য করে কাজ করে গেছেন একনিষ্ঠতার সঙ্গে। নিজেকে যেমন কোথাও হাল্কা ব্যক্তিত্বের ঢেউয়ে ভাসিয়ে দেননি, তেমনি দেশকে রেখেছেন তারও অনেক ওপরে।

যেদিন বাংলাদেশের সীমানা পার হয়ে ভারতে যান সেদিন স্বাধীন দেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ্য মর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে ঢোকেন। সেভ না করা মলিন চেহারা, ময়লা জামা-কাপড়ের ভেতর বিষণ্ন তাজউদ্দীন সেদিনও নিজেকে, দেশকে সমুন্নত রেখেছেন।

বাংলাদেশের সৌভাগ্য তাজউদ্দীন এ ভূখণ্ডে জন্মেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যারা যুদ্ধ করেছেন তারা তাদের পরিবারের কথা না ভেবে দেশের জন্য রণাঙ্গনে থাকছেন। তাজউদ্দীন আহমদ তার রণাঙ্গন বানিয়েছিলেন থিয়েটার রোডের আট নম্বর বাড়িটিকে

সরকার গঠন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক তৎপরতা, নিজের দলের মধ্যে মনোমালিন্য, অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে সামলানো, মুক্তিযুদ্ধে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ঠিক রাখা, মন্ত্রিপরিষদের মধ্যে থাকা মোশতাকের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা, নিয়ন্ত্রণের বাইরে মুজিব বাহিনী, খবরহীন নিজের পরিবার। এতকিছুর মধ্যেই কাজ করলেন একাগ্রচিত্তে। কিছুদিন পর পরিবার কলকাতায় গেলেও মন্ত্রিপরিষদের সবাই প্রতিজ্ঞা করেন দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত পারিবারিক জীবন-যাপন করবেন না। অন্য সদস্যরা এই ওয়াদা রাখতে পারেননি। তাজউদ্দীন পেরেছিলেন।

যুগে যুগে এমন ঋষিতুল্য মানুষ কমই আসে। বাংলাদেশের সৌভাগ্য তাজউদ্দীন এ ভূখণ্ডে জন্মেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যারা যুদ্ধ করেছেন তারা তাদের পরিবারের কথা না ভেবে দেশের জন্য রণাঙ্গনে থাকছেন। তাজউদ্দীন আহমদ তার রণাঙ্গন বানিয়েছিলেন থিয়েটার রোডের আট নম্বর বাড়িটিকে। প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেছেন বহুমুখী।

যুদ্ধজয়ী সেনাপতি যখন তার সর্বাধিনায়ককে প্রধানমন্ত্রিত্ব বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সেদিন তাজউদ্দীন ছিলেন সবচেয়ে খুশি। এমনটা তাজউদ্দীন আহমদের পক্ষেই সম্ভব ছিল। নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হল। অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে অনর্থক অভিযোগের পাহাড় জমতে থাকে বঙ্গবন্ধুর কাছে। উদার হৃদয়ের বঙ্গবন্ধু সারাজীবন প্রথার পাহাড় ভেঙ্গে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু কান কথাওয়ালাদের প্রশাসনিকভাবে বুঝতে পারেননি। সবকিছু দেখেছেন রাজনৈতিভাবে।

যা হবার তাই হলো। ক্রমেই মন্ত্রিসভায় কোণঠাসা হয়ে পড়া তাজউদ্দীন অপেক্ষা করছিলেন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পদত্যাগের। নির্দেশ এলো। পদত্যাগ করলেন। বঙ্গবন্ধু তাকে ছাড়লেন, তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুকে ছাড়লেন না। তাজউদ্দীন নেতার দুর্দিনে বসে থাকতে পারলেন না। শারমিন আহমদ লিখছেন, ‘একদিন রাত ১১টায় গেঞ্জি ও লুঙ্গি পরেই হেঁটে সোজা চলে যান মুজিব কাকুর বাসায়। মুজিব কাকু তখন শোবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আব্বু মুজিব কাকুকে ষড়যন্ত্রের খবর জানিয়ে বললেন, তিনি যেন অবিলম্বে সেনাবাহিনী, বিশেষ করে তার গোয়েন্দা বাহিনীর ওপর নজর দেন। তিনি যেন এই খবরকে কোনোমতেই হাল্কাভাবে না নেন। কিন্তু মুজিব কাকু আব্বুর এই সর্তকবাণীকে আমল দিলেন না। সেদিন আব্বু খুব চিন্তিতভাবেই ঘরে ফিরে এলেন।’

২৫ শে মার্চের কথাতেও বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীন আহমদের কথা রাখেননি। তখন অবশ্য তাদের মধ্যে অবিশ্বাসের সম্পর্ক ছিল না। শারমিন আহমদ লিখেছেন, ‘বড় কোনো সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আব্বুর উপদেশ গ্রহণে মুজিব কাকু এর আগে দ্বিধা করেননি। আব্বুর সে কারণে বিশ্বাস ছিল যে, ইতিহাসের এই যুগসন্ধিক্ষণে মুজিব কাকু কথা রাখবেন। মুজিব কাকু আব্বুর সাথেই যাবেন। অথচ শেষ মুহূর্তে মুজিব কাকু অনড় রয়ে গেলেন। তিনি আব্বুকে বললেন, ‘বাড়ি গিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকো, পরশুদিন (২৭ মার্চ) হরতাল ডেকেছি। মুজিব কাকুর তাৎক্ষণিক এই উক্তিতে আব্বু বিস্ময় ও বেদনায় বিমূঢ় হয়ে পড়লেন।’

তাজউদ্দীন যেন সামনের দিনগুলোকে আয়নায় দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি বিশ্ব ইতিহাসের কিছু উদাহরণ টেনে বঙ্গবন্ধুকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। বলেন, ‘মুজিব ভাই বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হলেন আপনি। আপনার নেতৃত্বের উওপরেই তারা সম্পূর্ণ ভরসা করে রয়েছে।’

উত্তর এল- ‘তোমরা যা করবার কর। আমি কোথাও যাব না।’

বঙ্গবন্ধু যাননি। তাজউদ্দীন গিয়েছিলেন। বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়ে স্বাধীন করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর নামেই।

তবে ২৫ মার্চ তাজউদ্দীন আহমদের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাধীনতা ঘোষণা না করা এবং ওই রাতেই বলধা গার্ডেন থেকে আসা রহস্যজনক ফোনের বিস্তারিত ঘটনা এখনও অনুদ্ঘাটিত। যদিও ইঙ্গিতে মনে হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী সেখান থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তথাপি এর আরও অকাট্য প্রমাণ ইতিহাসই হয়ত সামনে আনবে।

তাজউদ্দীন আহমদের সবচেয়ে বড় দুর্বল জায়গা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। শেখ মুজিবের এমন নিঃস্বার্থ বন্ধু আর কেউ ছিলেন না। ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু না গেলেও তাজউদ্দীন পা বাড়িয়েছিলেন ভারতের পানে। ১৫ আগস্ট সকালে এক শুভাকাঙ্ক্ষী তাকে সেই পথে পা বাড়াতে বলেছিলেন। তাজউদ্দীনের উত্তর ছিল, ‘যে পথে একবার গিয়েছি সে পথে আর যাব না।’

তবে তাজউদ্দীনের মনে একটি আক্ষেপ জন্মে সেইদিন। বঙ্গবন্ধু জেনে গেলেন না তার হত্যাকারী কে। তাজউদ্দীনের ভাষ্যে- মৃত্যুর আগে যদি এতটুকু সময় চিন্তার জন্য পেয়ে থাকেন হয়ত ভেবেছেন আমি তাকে হত্যা করিয়েছি।

শারমিন আহমদের লেখা তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা বইটি ৭টি পর্ব ও পরিশিষ্টসহ ৪৪৮ পাতার। ছোটবেলার ডায়েরিসহ সম্ভাব্য সব জায়গা থেকে খোঁজ করে যে বিশাল তথ্যভাণ্ডার তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে সাজিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক দলিল।

বিশেষ করে পরিশিষ্ট অংশে তাজউদ্দীন পরিবারের সকল সদস্যের সংক্ষিপ্ত অথচ গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার বইটিকে তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। নূরুল হকের স্ত্রী, বঙ্গবন্ধুর পার্সোনাল এইড গোলাম মোর্শেদের পরিবার, ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম, সাংবাদিক জহিরুল ইসলামের সাক্ষাৎকারসহ তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরির কিছু অংশ বইটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

বিভিন্ন ঘটনায় আমরা মানুষ তাজদ্দীন তথা ব্যক্তি তাজউদ্দীনের কিছু তুলনাহীন গুণ দেখতে পাই। এ কারণেই হয়ত ব্যক্তি, নেতা ও পিতা হিসেবে তাজউদ্দীন অন্য উচ্চতার মানুষ।

ইচ্ছে করলেই দুর্দান্ত মেধাবী তাজউদ্দীন ব্যক্তিগতভাবে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তার চোখে দেখেছিলেন নিপীড়িত মানুষের মুক্তি। তাজউদ্দীনের ডায়েরি পড়লে বিষয়গুলো আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে। বিশেষ করে এসএসসি পাস (সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৪র্থ) করা তাজউদ্দিন এইচএসসি পরীক্ষা দেন কয়েক বছর গ্যাপ দিয়ে। কারণ রাজনৈতিক ব্যস্ততা। ছয়দফা ঘোষণার পর ক্রমেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাজউদ্দীনকেও মানুষ নতুনভাবে চিনতে শুরু করে। তবে নিজের কাছে তাজউদ্দীন একই রকম ছিলেন। কারণ তিনি জানতেন কোথায় তার গন্তব্য।

মানবিক তাজউদ্দীন লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে প্রায় একহাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অথচ নিজে কোনো জীবজন্তুর জবাই, রক্ত দেখতে পারতেন না। মুরগি জবাই পর্যন্ত দেখতেন না সেই তিনি আবার বন্দুক পিস্তল রেখেছেন সঙ্গে। কারণ দেশকে স্বাধীন করতে হবে।

তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের নানা দিকে দেখতে পাই, জেলখানায় পরিচিত হওয়া খুনি কেরাম আলীকে তিনি তার বাড়িতে কাজ করতে দিচ্ছেন। যেন সে আবার খারাপ পথে চলে না যায়, কুরআনে হাফেজ তাজউদ্দীন আহমদ স্বপ্ন দেখতেন শোষণহীন ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের। সংবিধানেও তার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন।

প্রথম তিন সন্তান মেয়ে হওয়াতে অনেকে বেজার হতেন। তাজউদ্দীন আনন্দে মিষ্টি বিতরণ করতেন। অথচ ছেলে (সোহেল তাজ) হওয়ার পর সবাই যখন তাকে মিষ্টি খাওয়ার বায়না ধরল তিনি মিষ্টি না এনে যারা বায়না ধরছে তাদের মিষ্টি এনে মানুষকে খাওয়ানোর কথা বললেন। নিজের মায়ের মৃত্যুতে শোকবিহ্বল তাজউদ্দীনের কর্তব্য পালনের চিত্র আমরা দেখতে পাই। তার সুন্দর হাতের লেখা, জেলে থেকে পরিবার ও রাজনৈতিক নেতাদের খোঁজ রাখা, ভারতে থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করলেও নিজের ঘড়িতে রাখতেন বাংলাদেশি সময়, বিদেশি কোনো অতিথি কিংবা সাংবাদিকের সঙ্গে চেষ্টা করতেন বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলে সাক্ষাৎ করতে।

অল্প সময়ের জন্য কখনও পরিবারের কাছে গেলেও বঙ্গবন্ধুর কথা ভেবে নীরবে কাঁদতেন। নিজে অর্থমন্ত্রী হিসেবে হাত পেতে সাহায্য আনতেন আত্মসম্মানের সঙ্গে। তাজউদ্দীন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বলেছেন, ‘রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে না।’

এমন একজন রাষ্ট্রনায়ককে শারমিন আহমদের বইয়ে আমরা দেখতে পাই, নিজের বাসার টয়লেট নিজে বানাতে, বাগান করতে, পশুপাখিকে পরম যত্নে আদর করতে, অন্যের অধিকারকে নিজের মনে করতে এমন কত গুণ আছে বলে শেষ করা যাবে না।

অথচ ওই সময়ের সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম সফল রাষ্ট্রনায়ক তাজউদ্দীনকে বিদেশে যেতে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নেওয়ার নিয়ম করা হয়েছিল, খোন্দকার মোশতাক তাকে বানানো দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার করে বিচারের চেষ্টা করেছিল, পারেনি। কেউ পারেনি তাজউদ্দীনের সঙ্গে। বঙ্গবন্ধুকে মাথার ওপরে রেখে একক নেতৃত্বে স্বাধীন করেছেন বাংলাদেশকে। কিন্তু হেরে গেছেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। এ নিয়তি বড় নিষ্ঠুর।

পাদটীকা : শারমিন আহমদের এই বইতে তাজউদ্দীন আহমদ প্রসঙ্গ এবং দলীয় (আওয়ামী লীগ) প্রেক্ষিতে জোহরা তাজউদ্দীনকে উল্লেখযোগ্যভাবে আনা হয়নি বলেই মনে হয়েছে। এর কারণ হতে পারে লেখিকা হয়ত আওয়ামী লীগের রাজনীতির আরেক দিকপাল জোহরা তাজউদ্দীনকে নিয়ে নতুন বই আমাদের উপহার দেবেন।

(দ্য রিপোর্ট/বিকে/এনডিএস/এনআই/জুলাই ২৩, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

তাজউদ্দীন অাহমদের জন্মদিন এর সর্বশেষ খবর

তাজউদ্দীন অাহমদের জন্মদিন - এর সব খবর



রে