thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৩ আশ্বিন ১৪২৫,  ৭ মহররম ১৪৪০
তাজউদ্দীন আহমদ

ঢাকা থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশ

২০১৪ জুলাই ২৩ ১৭:৫৪:৫২
ঢাকা থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশ

২৫ মার্চ ১৯৭১। স্থান ৭৫১নং সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা। পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত ছিল রাত ১১টার আগেই নারায়ণগঞ্জ পৌঁছে যাব এবং নির্ধারিত গন্তব্যস্থানের উদ্দেশে রওনা দেব। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। এদিকে একটি কাপড়ের থলেতে প্রয়োজনীয় কয়েকটি জিনিস রাখা ছিল, সেই থলেটাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি তখন চরম উত্তেজনায় রীতিমতো কাঁপছি। এক সময় বলেই ফেললাম, এক মিনিটও যেখানে জীবনের নিরাপত্তা নেই সেখানে বাড়িতে রয়ে যাওয়া, এই দীর্ঘ সময়ের অপচয় নিশ্চয়ই আমার নির্ঘাত মৃত্যুরই ইঙ্গিত বহন করছে।

এমন সময় আমাদের দোতলার ভাড়াটে, আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য ও একনিষ্ঠ সমর্থক আবদুল আজিজ বাগমার আমার সামনে এগিয়ে এসে বললেন, আমরা সামরিক বাহিনীকে প্রতিহত করব। আমি বললাম, সেটা তো আরও পরের কথা। এই মুহূর্তে সেনাবাহিনীকে দাঁতভাঙা জবাব দিতে পারলে উচিত শিক্ষা হতো। বিভিন্নমুখী চিন্তায় উত্তেজিত হয়ে আমি বলেই ফেললাম, আর কোথাও যাব না। কিন্তু এটা আমার উত্তেজনার কথাই ছিল, সিদ্ধান্তের নয়। আমি মন ঠিক করে ফেলেছি, যেতে আমাকে হবেই। বাংলাদেশ ও জাতির এই চরম দুর্যোগের মোকাবেলা করতেই হবে।

আমি বেরিয়ে পড়ব এমন সময় ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম ও ড. কামাল হোসেন এলেন। তারা বললেন, শহরের পরিস্থিতি খুব ভালো নয়। কয়েক মিনিট কথা বলে আমরা তিনজন একসঙ্গে দ্রুত বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। বাসা থেকে বেরিয়ে যাবার মুহূর্তে আমি শুধু আমার স্ত্রীকে বলে গেলাম, আমি যাচ্ছি, আর্মি আসছে, তোমরা যেখানে পারো চলে যেও।

বাসা থেকে পথে নেমে দেখি ততক্ষণে সমস্ত পথঘাট আওয়ামী লীগ কর্মীরা বন্ধ করে দিয়েছে। প্রতিটি মোড়ে মোড়ে প্রতিবন্ধকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। খুব বেশি দূর যেতে পারিনি।

গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসছে। ড. কামাল হোসেন বললেন, একসঙ্গে তিনজন থাকা নিরাপদ নয়। তিনি এখানেই তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়িতে নেমে যাবেন। পরে আবার মিলিত হবেন। ড. কামাল হোসেনকে ধানমন্ডিতে তাঁর আত্মীয়ের বাড়িতে নামিয়ে, আমীর-উল-ইসলাম এবং আমি সাতমসজিদ রোডের দক্ষিণে পিলখানার দিকে কিছু এগিয়ে আবার ঘুরে উত্তরে লালমাটিয়ার দিকে পৌঁছেই দেখতে পেলাম মোহাম্মদপুর সেকেন্ড ক্যাপিটালের (বর্তমানে শের-ই-বাংলা নগর) দিক থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এগিয়ে আসছে। সামনে এগিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হলো না। পথের পাশেই একজন পরিচিত ভদ্রলোকের বাড়িতে প্রবেশ করলাম। বাড়ির মালিক জনাব আবদুল গফুর, প্রকৌশলী।

এই বাড়ির পাশের বাড়িই ছিল সংগ্রাম পরিষদের দপ্তর। সেখান থেকে ছেলেদের ডাকা হলো। তাদের পতাকা নামিয়ে অফিস বন্ধ করে দিতে বললাম। আরও বললাম, সেনাবাহিনী আসছে, সংগ্রাম পরিষদের অফিস বুঝতে পারলে এখানকার সব শেষ করে দেবে। প্রতিরোধ করবার মতো শক্তি এখন আমাদের হাতে নেই। সময়ের প্রয়োজন আছে। তাই সেই সময় পর্যন্ত আমাদের সাবধানে কাজ করতে হবে। আওয়ামী লীগ কর্মীরা নির্দেশ মেনে নিল।

এদিকে চারদিক থেকে আক্রমণের ভয়াবহ শব্দে আমার ধারণা হলো সামরিক বাহিনী আগামীকাল নদীর ঘাটে, স্টেশনে অনেক লোক মারবে। কারণ, শহর ছেড়ে যেতে হলে ওই দুটো পথেরই আশ্রয় নিতে হয়। আমি তখন ভাবছি, এ পথ বন্ধুর, এ পথ ভারি কঠিন। স্বাধীনতার ‘সূর্য’ বহু রক্ত চায়। কারণ তার আবির্ভাবের রংও রক্তিম।

পাশাপাশি আমরা বুঝতে পারছি এখানে কোনো নিরাপত্তা নেই। যে কোনো মুহূর্তে সেনাবাহিনীর লোক এসে পড়তে পারে। তাই প্রাথমিক ব্যবস্থা হিসেবে আমরা ঠিক করলাম আমাদের দু’জনের নাম পাল্টে ফেলব। আমার নাম তাজউদ্দীন আহমদের পরিবর্তে হবে মোজাফ্ফর হোসেন এবং আমীর-উল-ইসলামের নাম রহমত আলী। আরও ঠিক করলাম আমরা যথাক্রমে চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরে ঠিকাদারের অধীনে চাকরি করি। মালিকের বাড়ি কুষ্টিয়া। টাকার জন্য ডাকায় এসেছি কিন্তু গণ্ডগোলের কারণে মালিকের বাড়ি যেতে পারিনি, তাই এখানে আশ্রয় নিয়েছি। আপাতত আমাদের এই পরিকল্পনাই স্থির রইল। তারপর সারারাত আমরা গুলির শব্দ শুনলাম এবং আগুনের লেলিহান শিখা প্রত্যক্ষ করলাম। সামনে একটু দূরেই ছিল বস্তি। আমার ধারণা হয়েছিল এখানেও আক্রমণ হবে। কারণ বর্বরদের হাতে বস্তি কিংবা বস্তির মানুষ রেহাই পাবার কথা নয়।

২৬ মার্চ ১৯৭১। সকাল হলো। এই বাড়ির ভেতর থেকে লালমাটিয়ার পানির ট্যাঙ্ক দেখা যায়। সেনাবাহিনীর একটি দল এগিয়ে গেল পানির ট্যাঙ্কের কাছে। দারোয়ানকে ধরে এনে পানি সরবরাহ শুরু করার জন্য বেদম পেটাতে লাগল। তারপর দারোয়ানের কাছ থেকে চাবি নিয়ে পানি সরবরাহ শুরু করল। সারাদিন শোনা গেল প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ। চারদিকে অবাঙালি বসতি থাকায় গফুর সাহেবের বাড়ি আর নিরাপদ মনে হলো না।

২৭ মার্চ ১৯৭১। ভোরবেলা আমার সঙ্গের বন্দুক ও গুলি এই বাড়িতে রেখে কারফিউর ভেতরে প্রাচীর টপকে খানিকটা পথ হেঁটে রওনা হলাম। শহর সীমার বাইরে যেতে হবে আমাদের। পাশেই ছিল একটি মসজিদ। একবার ভাবলাম কিছু সময়ের জন্য এখানে আশ্রয় নিলে কেমন হয়। কিন্তু দেখলাম সেখানেও অবাঙালিদের আনাগোনা। মসজিদ, রাজপথ, বস্তি ও ক্যান্টনমেন্ট মিলে সমস্ত ঢাকা শহর যেন রূপ নিয়েছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এক বর্বর হত্যাযজ্ঞের বীভৎসতার। তাই মসজিদে না গিয়ে সামনের এক বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। বাড়িটি ছিল আতাউল হক সাহেবের। এই বাড়ির দেয়াল ছিল মাত্র পাঁচ ইঞ্চি ইটের। এই গাঁথুনিতে বুলেট সহজেই প্রবেশ করতে পারে। তবুও যেখানে কোনো আশ্রয় নেই সেখানে এটাই নিরাপত্তার প্রতীক। এই বাড়ির উত্তর পাশ দিয়ে রাজপথ চলে গেছে সাতমসজিদের দিকে।

সামনে ছিল বস্তি। দেখলাম কিছু অবাঙালি লোক মাথায় উর্দি, মুখে রুমাল বেঁধে বস্তির প্রতিটি ঘরে দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। তখনও কারফিউ বলবৎ আছে। আগুনের উত্তাপ সহ্য করতে না পেরে বস্তির আবাল বৃদ্ধ বনিতা যখন খুপরিগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল ঠিক তখন পৃথিবীর সমস্ত বর্বরতাকে ম্লান করে দিয়ে নিরীহ নিরপরাধ মানব সন্তানদের ওপর মেশিনগানের বুলেটবৃষ্টি শুরু হলো। মুহূর্তে লুটিয়ে পড়তে থাকল অগণিত বাংলার সন্তান। অপরাধ, তারা বাংলার স্বাধীনতা দাবি করেছিল। তাদের অসহায় চিৎকারে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠছিল। মনে হয়েছে এই প্রকম্পনই যেন প্রেরণা জোগাবে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে-প্রাণ দেব বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করব। সেই মুহূর্তে আমার মুখ থেকে একটি শব্দই বেরিয়েছে ‘এরা হারবে।’

ইতিমধ্যে সাড়ে সাতটা বেজে গেল। আশ্রিত বাড়ির ভেতর থেকে ঢাকা বেতারের ঘোষণা প্রচারিত হলো। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে ন’টা পর্যন্ত কারফিউ প্রত্যাহার করা হলো। আর একমুহূর্ত দেরি না করে সিন্ধান্ত নিলাম যে করে হোক সাতমসজিদ রোড পার হয়ে রায়েরবাজার দিয়ে শহর ছেড়ে যেতে হবে। কিছুক্ষণ এগিয়ে যেতেই দেখলাম মোহাম্মদপুরের দিক থেকে সেনাবাহিনীর গাড়ি দ্রুত বেগে ছুটে আসছে। আমরা খুব দ্রুত পাশ কাটিয়ে একটি বাড়ির আঙ্গিনায় প্রবেশ করলাম। মনে মনে সিদ্ধান্ত আছে বাড়িওয়ালা যেই হোক, যদি জিজ্ঞাসা করেন কেন এসেছেন, কি চান? তবে জবাব হবে একটা টেলিফোন করতে এসেছি। বিশেষ প্রয়োজন। ইতিমধ্যে সামরিক বাহিনীর গাড়ি দ্রুতবেগে পিলখানার দিকে চলে গেছে। ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে ৩০ সেকেন্ডে সাতমসজিদ রোড পার হলাম। রায়েরবাজার যেতে সাতমসজিদ রোড অতিক্রম করাটাই ছিল সবচাইতে বড় বাঁধা। এই সময় একবার আমি ভেবেছিলাম আমাদের নিজেদের বাড়িটা দেখে গেলে কেমন হয়, কি অবস্থায় আছে তারা, বেঁচে আছে কি মরে গেছে সেটা অন্তত জানা যাবে। কিন্তু আবার সিদ্ধান্ত নিলাম, হয়তো শেষ মুহূর্তের দুর্বলতায় ইতিহাসের গতিধারা পাল্টে যেতে পারে। আর একটুও দেরি না করে শংকর দিয়ে রায়েরবাজারে উপস্থিত হলাম।

রায়েরবাজারের অবস্থা দেখে কিছুটা অবাক হয়ে গেলাম। ওপাশের হত্যাযজ্ঞের কোনো ছোঁয়াই লাগেনি এখানে। অনেকটা স্বাভাবিক মনে হলো। কিন্তু শহরের অসংখ্য মানুষ গ্রামের দিকে ছুটে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা এসে কুশলাদি জিজ্ঞাসা করল। ইউনিয়ন কাউন্সিল অফিসে নসরুল্লা নাস্তা করাল। হাঁটার সুবিধার জন্য পালবাড়ির ছেলেরা এক জোড়া নতুন পাম্প সু এনে দিল। এখানে একটি কথা বলে নেই, সেই পাম্প সু আমি আজও (ফেব্রুয়ারি ১৯৭২) ব্যবহার করছি।

আবার চলতে শুরু করলাম। সামনে নদী, পারাপারের ভীষণ অসুবিধা। এমনি সময় রায়ের বাজারের আওয়ামী লীগ কর্মী রেজার চাচা এসে নদী পারের ব্যবস্থা করে দিলেন। নদী পার হয়ে আটির বাজারে পৌঁছলাম। এই পথে পরিচিত বহু মানুষের সঙ্গে দেখা। তাদের প্রাণঢালা যত্ন, সম্মান সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলছি। বাংলার মানুষের এই আপ্যায়ন বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্য ধারার ঐশ্বর্যের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে বারবার। বাংলার মানুষের এই রূপ নিজ চোখে যারা দেখেনি তারা কোনোদিন জানবে না বাংলার মানুষ নির্যাতিত মানুষের কত আপনজন। এখানেই সিরাজের সঙ্গে দেখা। ঘর থেকে ২৫০ টাকা এনে হাতে তুলে দিয়ে বলল, নিয়ে যান পথে প্রয়োজন হবে। সিরাজ শুধু টাকা দিয়েই ক্ষান্ত হলো না, একটা মোটরসাইকেল জোগাড় করে জনৈক মতিউর রহমানের বাসায় পৌঁছে দিল। এদিকে পথে ঘটনাক্রমে বাবুবাজার ফাঁড়ির পুলিশ কনস্টেবল রুস্তমের সঙ্গে দেখা হলো। সে কোনোক্রমে পালিয়ে বেঁচে এসেছে। সে বলল, তার সহকর্মীরা যখন রাতের অন্ধকারে গভীর নিদ্রায় মগ্ন তখন বর্বর সামরিক দস্যুরা ঘুমন্ত কনস্টেবলদের নির্বিচারে হত্যা করে। ঘটনা এত দ্রুত ঘটেছিল যে রুস্তম শুধু পালাতেই পেরেছিল কোনো শব্দ করতে পারেনি। তাই হয়তো সে বেঁচে গিয়েছে। ২৭ মার্চ রাতে মতিউর রহমান সাহেবের বাড়ির পুকুরে গোসল করলাম। রাতে পাটখড়ির বেড়ার ঘরে কিছু সময় ঘুমালাম।

২৮ মার্চ ১৯৭১। সকালে আবদুল আজিজ মন্ডল মোটরসাইকেল নিয়ে এলেন। স্থানীয় এমপিএ সুবেদ আলী টিপুর বাসায় গেলাম। সেখানে কথাবার্তার পর খেয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম। এবার জয়পাড়া পৌঁছলাম। আশরাফ আলী চৌধুরীর বাড়িতে গেলাম। সেখান থেকে পদ্মা পাড়ে উপস্থিত হলাম। কিন্তু রূপালী পদ্মা তখন উত্তাল মূর্তি ধারণ করে লহরির পর লহরি তুলে আঘাত করছে। প্রচণ্ড ঝড়। পদ্মা পার হবার কোনো ব্যবস্থাই হলো না। অবশেষে তাতের ব্যবসায়ী শুকুর মিঞার বাড়িতে রাতটা কাটাতে হলো। শুকুর মিঞা আমাদের আন্তরিক যত্ন করলেন।

২৯ মার্চ ১৯৭১ সকালে নৌকায় পদ্মা পাড়ি দিচ্ছি। নাড়ারটেক পৌঁছাতে তিন ঘন্টা লাগল। এই তিন ঘন্টায় আমার মনে জেগে উঠল রূপালী পদ্মার বিচিত্র ভাঙাগড়ার বাস্তব ও জীবন্ত লীলাখেলা। আমি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করলাম রূপালী পদ্মার বহুমুখী প্রতিভা। ঘাটে পৌঁছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে দেখা। তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন খবরাখবর জানলাম এবং শুনলাম সেনাবাহিনী তখনও ফরিদপুরের আশপাশে আসেনি। এই ঘাট থেকে ফরিদপুর শহর তিন মাইল। জায়গাটা নিরাপদ নয়। যে কোনো মুহূর্তে সেনাবাহিনী এসে যেতে পারে, তাই সবাই আতঙ্কগ্রস্ত। দ্রুত যাবার যানবাহন নেই।

এখানে ঘোড়ায় চলাচলের ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। সৌভাগ্যক্রমে ঘোড়া পাওয়া গেল। ঘোড়ায় চড়ে আমরা শহরের উপকণ্ঠে গিয়ে শহরে ঢুকলাম না। শহরে ঢুকলাম রিকশায় করে। এমনটি করার কারণ ছিল যাতে আমরা চিহ্নিত না হয়ে যাই। দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে আওয়ামী লীগ কর্মী ইমামউদ্দিনের বাড়ি পৌঁছলাম। তিনি বাড়ি ছিলেন না। তার স্ত্রী হাসি আমাদের খেতে বসালেন। খেতে বসবার একটু আগে রেডিওতে জিয়াউর রহমানের ঘোষণা শুনলাম। সঙ্গে সঙ্গেই আমার মনে সন্দেহ হলো এই জন্য যে, যদি সে এই ঘোষণার সঙ্গে সরকার গঠনের ঘোষণা প্রচার করে তাহলে বিপ্লব ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। কারণ বিশ্ববাসী সে সরকারকে বাংলার জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সরকার হিসেবে গণ্য করবে না এবং স্বীকৃতি দেবে না। কেননা বাংলার মানুষের আস্থা আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বের ওপর, সেনাবাহিনীর কারও ওপর নয়।

খাওয়া তখনও হয়নি এমন সময় খবর ছড়িয়ে পড়ল কামারখালি দিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা এগিয়ে আসছে। তাই আবার পথে বেরিয়ে পড়লাম। পথে রাজবাড়ীর এসডিও শাহ মহম্মদ ফরিদের সঙ্গে দেখা। তিনি খবর দিলেন সীমান্ত ভালো আছে। রিকশা নিয়ে আবার পথ চলতে শুরু করলাম। কিন্তু পথ বন্ধ। মুক্তিকামী বাঙালি ও আওয়ামী লীগ কর্মীরা সমস্ত পথে বড় বড় গাছ কেটে ব্যারিকেড দিয়েছে। তাই হেঁটে কামারখালিতে উপস্থিত হলাম।

সামনে মধুমতি নদী। বৃষ্টি পড়ছে। ভয়ঙ্কর মেঘাচ্ছন্ন, রুদ্র মূর্তি আকাশের। আরোহী অনেক কিন্তু কোনো নৌকাই নদী পার হতে রাজি হচ্ছে না। এক বৃদ্ধ মাঝি ওপারে বাড়ি, তাকে অনেক বলে কয়ে রাজি করানো হলো। মধুমতি নদী পার হয়ে আবার সেই চলা। রাত আড়াইটায় মাগুরায় পৌঁছলাম। সামনে খাল। আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর ছেলেরা সযত্নে খাল পাহারা দিচ্ছে। দুজন করে খাল পারের ব্যবস্থা করছে এবং প্রত্যেককেই তল্লাশি করছে। আওয়ামী লীগ কর্মী ওয়াহেদ মিঞা আমাকে চিনে ফেলল। যখন খাল পার হলাম রাত তখন তিনটা। রিকশা করে সোহরাব হোসেনের বাড়িতে গেলাম। তিনি বাড়িতে ছিলেন না। তার ভাগিনা বাবু আমাদের নিয়ে আবার নদী পার করে সোহরাব হোসেনের কাছে নিয়ে গেল। আমাকে দেখে সোহরাব হোসেন অবাক এবং সঙ্গে সঙ্গে উৎসাহিত হলেন।

৩০ মার্চ ১৯৭১। সকালে আবার পথ চলতে শুরু করলাম। এবার সোহরাব হোসেনের সহযোগিতায় একটি জিপ পাওয়া গেল। গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠো পথ দিয়ে জিপ এগিয়ে চলল। পথের দু’ধারে বাংলার নব বসন্তের অপূর্ব শোভা, মায়াভরা বাংলারই প্রতিচ্ছবি বিরাজমান। অনুভূতির স্তরে স্তরে বার বার মনের কোণে উঁকি দিচ্ছিল রবীন্দ্রনাথের চিরন্তন সৃষ্টি, ‘পায়ে চলার পথে-র কথা- ‘এ যে চলার পথ ফেরার পথ নয়।’ কিন্তু আমি যেন মনে মনে বলছি, কবিগুরু এই পথেই যে আমাদের ফিরে আসতে হবে। না হলে তুমি, এই শাশ্বত বাংলা ধরণীর ধুলায় বিলীন হয়ে যাবে।

১০টা ৩০ মিনিটে ঝিনাইদহে উপস্থিত হলাম। স্থানীয় আওয়ামী লীগ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য এম এ আজিজ ও এসডিপিও মাহবুবের (মাহবুবউদ্দিন আহমেদ) সঙ্গে দেখা হলো। স্থানীয় খবরাখবর আদানপ্রদান হলো। এম এ আজিজ আমাকে একটি লুঙ্গি দিলেন। সেই লুঙ্গি পরে এবার আমরা চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশে রওনা দিলাম। চুয়াডাঙ্গায় পৌঁছে মেজর ওসমানকে সংবাদ পাঠালাম। ইতিমধ্যে সংসদ সদস্য ডা. আসহাবুল হক জোয়ার্দার, আফজালুর রশীদ বাদলসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হয়। সীমান্তের আরও নিকটবর্তী হবার জন্য আমরা জীবননগর থানায় পৌঁছাই।

আমাদের দুজনের সঙ্গে ছিলেন মেহেরপুরের এসডিও তৌফিক-ই-এলাহী এবং এসডিপিও মাহবুব। সেখানে টঙ্গীর খালের ওপর এক কালভার্টের কাছে যাই। তৌফিক ও মাহবুব আমাদের খবর নিয়ে সীমান্তের ওপারে গিয়েছে। আমীর-উল-ইসলাম ও আমি এই কালভার্টের ওপর বসে থাকি। কি খবর আসে সেই অপেক্ষায়। আমি ভেবে নিয়েছি, সিগন্যাল যদি বাংলার স্বাধীনতার পরিপন্থী আসে তবে ওপারে যাব না। সীমান্তের ওপারে গিয়ে জীবন বাঁচিয়ে লাভ নেই। দেশের ভেতরে থেকেই যা কিছু আছে তাই নিয়ে সংগ্রাম অব্যাহত রাখব। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এই ন্যায়ের সংগ্রামে, বাঙালির অস্তিত্বের সংগ্রামে বিশ্ববাসীর নৈতিক সমর্থন আমরা পাবই।

নানা কিছু ভাবতে ভাবতে ক্লান্তিতে আমি ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। হঠাৎ করে গাড়িচালক এসে সংবাদ দিল ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর একজন অফিসার এসেছেন। সেই অফিসার আমাদের স্যালুট করলেন। বললেন, ডিআইজি গোলোক মজুমদার সীমান্তের ওপারে অপেক্ষায় আছেন। পায়ে হেঁটে আমরা সীমান্ত অতিক্রম করলাম। গোলোক মজুমদার তিনি দিল্লীর সঙ্গে যোগাযোগ করে এসেছেন। আলোচনার সংকেত পাওয়া গেল। ভবিষ্যৎ ভবিষ্যতেরই হাতে।

গোলোক মজুমদার সরাসরি দমদম বিমানবন্দরে নিয়ে গেলেন। সেখানে গোলোক মজুমদার আমাকে একখানা চশমা এনে দিলেন। যেটার প্রয়োজন ছিল সব চাইতে বেশি। রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে আইএএফ-এর বিমান এল দিল্লি থেকে। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক কে এফ রুস্তামজী রাজা গোপাল এসে আমাদেরকে স্বাগত জানালেন। তারপর একসঙ্গে গাড়িতে করে রাত দেড়টায় অসম ভবনে পৌঁছালাম।

এতদিন দাড়ি কামানো হয়নি। কাপড়চোপড় ছেঁড়া ময়লা রুস্তামজী আমাদের দুজনকে পায়জামা পাঞ্জাবি দিলেন পরতে। তার আতিথেয়তায় খাবার শেষে সেই রাতেই আমাদের কথাবার্তা শুরু হলো।

পরদিন ৩১ মার্চ ১৯৭১ সকালে শরদিন্দু চট্টোপাধ্যায় ও নিরাপত্তা অফিসার সৌমেন চট্টোপাধ্যায় এলেন। গোলোক মজুমদারসহ আমরা আবার টঙ্গীর সীমান্তে ফিরে গেলাম। গোলোক মজুমদার আমাকে একটি এলএমজি উপহার দিলেন। আমি সেই এলএমজিটি মেজর আবু ওসমানের হাতে তুলে দিয়ে বললাম, ‘আপনি সামলাবেন এটা।’ এবং তখনই সুবেদার মজিবর রহমানকে এলএমজি করায়ত্ত করবার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। এই সময় গোলোক মজুমদার আমাকে উদ্দেশ করে ইংরেজিতে বললেন, ‘You will win’.

এরপর সাতক্ষীরা থেকে আগরতলা পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে গ্রহণ করবার জন্য খবর পৌঁছে দিতে অনুরোধ করলাম এবং ব্যক্তিগতভাবে হিঙ্গলগঞ্জ, টাকী, হাসনাবাদ প্রভৃতি সীমান্ত এলাকা সফর করলাম আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের খোঁজে।

১ এপ্রিল ১৯৭১। রাত দুটোয় ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে দিল্লীর উদ্দেশে রওনা হলাম। প্রটোকল অফিসার শাহী বিমানবন্দরে আমাদের স্বাগত জানালেন। ৮৭/ বিডিসি নম্বর বাড়িতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো।

২ এপ্রিল ১৯৭১। দিল্লীতে অধ্যাপক রেহমান সোবহান, ড. আনিসুর রহমান, এম আর সিদ্দিকী, সিরাজুল হক প্রমুখের দেখা পেলাম।

৩ এপ্রিল ১৯৭১। রাত ১০টায সফদার জং রোডের বাড়িতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আমার দেখা হয়। সেখানে আরও যারা সঙ্গে ছিলেন তারা হলেন, রুস্তামজী, পি এন হাকসার, মি. রাম এবং কর্ণেল মেনন। এই আলোচনার আগেই সমস্ত পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে আমাদের সরকার গঠন করতে হবে।

৪ এপ্রিল ১৯৭১। পি এন হাকসার এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর আরও কয়েকজন নীতিনির্ধারকের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

৫ এপ্রিল ১৯৭১। সরকার গঠনের ঐতিহাসিক বিবৃতি ও দলিল লেখা শেষ হয়। এই লেখায় আমার সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম এবং অধ্যাপক রেহমান সোবহান।

৬ এপ্রিল ১৯৭১। বিবৃতি ও দলিলের বাংলা অনুবাদ সম্পন্ন হয়।

৮ এপ্রিল ১৯৭১। সরকার গঠন সম্পর্কিত বিবৃতি আমার কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়।

৯ এপ্রিল ১৯৭১। আমি এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার নরেন্দ্র মোদীকে সঙ্গে নিয়ে একটি বিশেষ বিমানে সীমান্তবর্তী এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। এই দিন মনসুর আলী ও জনাব এ এইচ এম কামারুজ্জামান এসে পৌঁছেন কলকাতায়।

১০ এপ্রিল ১৯৭১। সরকার গঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সম্বলিত আমার বিবৃতি রাতে বেতারযোগে প্রচারিত হয়।

১১ এপ্রিল ১৯৭১। আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত আকাশবাণী থেকে পুনঃপ্রচার করে।

এদিন ময়মনসিংহের তুরা এলাকায় সৈয়দ নজরুল ইসলামের খোঁজ পেলাম। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে সেদিনই রাত ৮টায় আগরতলায় গেলাম। আগরতলায় খন্দকার মোশতাক আহমদ, কর্নেল এম এ জি ওসমানীসহ অন্যান্য আরও কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে পেলাম।

আগরতলায় এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো চুয়াডাঙ্গায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা ১৪ এপ্রিল প্রকাশ্যে শপথগ্রহণ করবেন। সেখানেই (চুয়াডাঙ্গাতেই) রাজধানী স্থাপন করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কাজকর্ম পরিচালনা করা হবে। আমি ঠিক করলাম এ রাজধানীর নাম হবে মুজিবনগর।

কিন্তু আমাদের একজন সহকর্মীর অসাবধানতার জন্য সেই সিদ্ধান্ত গণমাধ্যম প্রচারিত হয়ে যায়। ফলে পাকিস্তান বাহিনী চুয়াডাঙ্গার সেই নির্দিষ্ট স্থানে প্রবল বোমাবর্ষণ করে। পরে আবার খুব গোপনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় চুয়াডাঙ্গার পার্শ্ববর্তী মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে।

এই বৈদ্যনাথতলার আম্রকুঞ্জে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ শত শত দেশি-বিদেশি সাংবাদিক এবং হাজার হাজার জনতার সামনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণ সম্পন্ন হয়। এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বক্তৃতা দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তারপর আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বক্তৃতা করি। দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেই।

[তাজউদ্দীন আহমদের চিঠি বই থেকে নেওয়া]

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে