thereport24.com
ঢাকা, রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

শ্রেষ্ঠ রজনী ‘লাইলাতুল কদর’

২০১৪ জুলাই ২৪ ০৫:১৪:৩৪
শ্রেষ্ঠ রজনী ‘লাইলাতুল কদর’

এ.কে.এম মহিউদ্দীন, দ্য রিপোর্ট : ২৫ রমজান, বৃহস্পতিবার। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের বিশ্বাস; ২৬ রমজানের রাতটিই অতি প্রত্যাশিত লাইলাতুল কদর। হাজার মাস অপেক্ষা এক অতিউত্তম রাত এ কদর। লাইলাতুল কদর আরবি শব্দ। লাইলাতুন শব্দের অর্থ রাত, আর কদর শব্দের অর্থ মহিমা, সর্বোত্তম ইত্যাদি। সুতরাং লাইলাতুল কদর শব্দের অর্থ মহিমান্বিত রাত, শ্রেষ্ঠ রাত। লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব বা মাহাত্ম্য হলো- এটি রমজান মাসের এমন একটি রাত, যেটি বছরের অন্যান্য রাতের চেয়ে অনেক অনেক উত্তম এবং এটা সেই রাত, যে রাতে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছিল। এ কারণে কোরআনে বলা হচ্ছে, আমি একে নাজিল করেছি শবেকদর। শবেকদর সম্পর্কে আপনি কী জানেন? শবে কদর হচ্ছে এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ (সূরা কদর)।

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, কদর হলো বছরের সর্বোত্তম রাত এবং এ রাতে পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছে। এ রাত সম্পর্কে আরও বলা হয়েছে, এ রাতের যে কোনো ভালো কাজ অন্য হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। হাজার মাসকে যদি ১২ দিয়ে ভাগ করা হয় তাহলে হিসাব দাঁড়ায় ৮৩ বছরের চেয়ে কিছু বেশি এবং এটা মানুষের গড় আয়ুর চেয়ে অনেক বেশি। অর্থাৎ শুধু এক রাতে এবাদত করা হলে তার মর্যাদা সারাজীবন এবাদত করার চেয়ে আরও অনেক বেশি। এটা এমন এক রাত, যেখানে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত খোদার বিশেষ রহমত ও শান্তি বর্ষিত হতে থাকে।

কোরআনে বলা হচ্ছে, আমি একে নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী, এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরিকৃত হয় (সূরা দুখান)। এ ছাড়া বলা হচ্ছে, আমি কুরআনকে বোঝার জন্য সহজ করে দিয়েছি। সুতরাং লাইলাতুল কদর ভাগ্যেরও রাত। মহামহিম প্রভু এ রাতে প্রত্যেকের জন্য পরবর্তী লাইলাতুল কদরের আগ পর্যন্ত ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন। মুহম্মদ (সা.) বলেন, লাইলাতুল কদরের রাতে যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে খোদার পুরস্কারের আশায় এবাদত করে, তিনি তার আগের সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন (বুখারি)। প্রসঙ্গত, আরেকটি বিষয় উদ্ধৃত করা জরুরি, কোরআনে যে হাজার শব্দটি ব্যবহার করেছে, তা মূলত প্রতীকী শব্দ। সে সময়ের আরব জাতির জ্ঞানের পরিধির আলোকে রাব্বুল আলামিন তার বক্তব্য পেশ করেছেন। আরবরা হাজারকে সর্বশেষ ও সর্বাধিক সংখ্যা মনে করত। তারা বর্তমান যুগের মিলিয়ন ও বিলিয়নের সঙ্গে পরিচিত ছিল না। তাই তারা হাজার সংখ্যাকে শীর্ষ সংখ্যা বলে বিবেচনা করত।

সুতরাং বোঝা গেল, এটা হলো দয়া ও মহিমার রাত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কবে লাইলাতুল কদর? এর উত্তর খুঁজতে আমরা নিম্নোক্ত হাদিসের সহযোগিতা নিতে চাই। পাশাপাশি একটি গাণিতিক হিসাবে মিলিয়ে দেখা যেতে পারে, কারো কারো মতামত সূরা কদরে মোট ৩০টি শব্দ আছে। হিয়া হাত্তা মাতলায়িল ফাজর। এটিতে ‘হিয়া’ শব্দটি ২৭তম শব্দ। আবার অন্যদের মতে, ইন্না আনঝালনাহু ফি লাইলাতিল কদর- এ আয়াতটি সূরা কদরে তিনবার এসেছে। প্রতি আয়াতে ৯টা করে অর আছে। ফলে ৩X৯=২৭ হচ্ছে কদরের রাত। এটা হচ্ছে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত। বস্তুত কদরের রাতটি রহস্যঘেরা। খোদাতায়ালা প্রথমে তার বন্ধুকে তা জানিয়ে দেন এবং পরে আবার তাকে ভুলিয়ে দেন। এটি গোপন রাখার উদ্দেশ, মুসলমানগণ যেন তা লাভ করার জন্য যারপরনাই চেষ্টা করেন।

যির ইবন হুবাইশ (রা.) বলেন, আমি উবাই ইবন কা’বকে জিজ্ঞাসা করে বলি, তোমার ভাই ইবন মাসউদ বলেন, যে ব্যক্তি সারাবছর রাতে কিয়াম করবে সে লাইলাতুল কদর লাভ করবে। তিনি বললেন, রাব্বুল আলামিন তার ওপর রহম করুন, তার উদ্দেশ্য মানুষ যেন অলস না হয়, অন্যথায় তিনি ভালো করে জানেন যে, লাইলাতুল কদর রমজানে, বিশেষ করে শেষ দশকে, বরং সাতাশে। অতঃপর তিনি শপথ করে বলেন, এতে সন্দেহ নেই লাইলাতুল কদর সাতাশে। আমি বললাম, আপনি তা কিভাবে বলেন, হে আবু আব্দুর রহমান, তিনি বললেন, নিদর্শন দেখে অথবা রসূলের নির্দেশিত আলামত দেখে, সেদিন সূর্য উদিত হবে, তার কিরণ থাকবে না। ইমাম আহমদের এক বর্ণনায় আছে, সেদিন সকালে সূর্য উদিত হবে, যেন তা গামলা, যার কোনো আলো নেই।

তিরমিযির এক বর্ণনায় আছে, উবাই বলেছেন, খোদার শপথ ইবন মাসউদ নিশ্চিত জানে যে, লাইলাতুল রমজানে এবং তা সাতাশে, কিন্তু তিনি তোমাদের সংবাদ দিতে চাননি, যেন তোমরা অলস বসে না থাক।

মুয়াবিয়া (রা.)‎ থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন, লাইলাতুল কদর হচ্ছে সাতাশের রাত। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি নবী মুহম্মদ (সা.) এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করে- হে নবী, আমি খুব বৃদ্ধ ও অসুস্থ লোক, আমার দ্বারা দাঁড়িয়ে থাকা খুব কঠিন, অতএব আমাকে এমন এক রাতের কথা বলুন, যেন সে রাতে খোদা আমাকে লাইলাতুল কদর দান করেন। তিনি বললেন, তোমার উচিত সাতাশ আঁকড়ে ধরা।

শিক্ষা ও মাসায়েল

এক. আমাদের পূর্বসূরিগণ কল্যাণের প্রতি আগ্রহী ছিলেন, তারা এবাদতে মগ্ন থাকার জন্য ফযিলতপূর্ণ সময় অনুসন্ধান করতেন।

দুই. কারণবশত কোনো বিষয় না বলা আলেমের জন্য বৈধ। যেমন মানুষের অলসতা ও নেক আমলে ত্রুটির সম্ভাবনা ইত্যাদি।

তিন. নিশ্চিত জ্ঞান বা প্রবল ধারণার ওপর কসম করা বৈধ।

চার. কিরণহীন সাদা-উজ্জ্বলতা নিয়ে সকালে সূর্যের উদয় হওয়া লাইলাতুল কদরের আলামত।

পাঁচ. মুসলিমদের উচিত ফযিলতপূর্ণ মৌসুমের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। যেমন লাইলাতুল কদর অন্বেষণে রমজানের শেষ দশক, যেন অল্প আমলে তার অধিক কল্যাণ অর্জন হয়।

ছয়. আলেমদের বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, লাইলাতুল কদর পরিবর্তনশীল, তবে সাতাশের রাত অধিক সম্ভাবনাময়, যেমন উবাই ইবন কাব শপথ করে বলেছেন।

সাত. নবী করীম (সা.) বৃদ্ধ লোককে লাইলাতুল কদর সাতাশে বলা অন্যান্য হাদিসের পরিপন্থী নয়, যেখানে অন্য রাতে লাইলাতুল কদর বলা হয়েছে। কারণ নবী করীম (সা.) তাকে সে বছরের কথা বলেছেন, যে বছর সে জিজ্ঞাসা করেছে। লাইলাতুল কদর সম্পর্কে সব হাদিসের মধ্যে সমতা রক্ষার জন্য এ ব্যাখ্যার বিকল্প ব্যাখ্যা নেই।

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/ডব্লিউএস/এজেড/জুলাই ২৪, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

ধর্ম এর সর্বশেষ খবর

ধর্ম - এর সব খবর