thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫,  ১১ মহররম ১৪৪০

আজীজুল হকের অপ্রকাশিত কবিতা

২০১৪ জুলাই ২৭ ১২:৪৮:০২
আজীজুল হকের অপ্রকাশিত কবিতা

সংগ্রহ : পাবলো শাহি

[আজীজুল হক (২ মার্চ, ১৯৩০-২৭ আগস্ট, ২০০১) বাংলা সাহিত্যের বিরলপ্রজ, অন্তর্মুখী কবিসত্তা। সুবক্তা ও সফল সংগঠক এই শিক্ষক-কবি জনকোলাহল থেকে বহদূরে নিজস্ব সৃষ্টিশীলতার জগতে নিয়ত যাপন করেছেন। বিশ শতকের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বৈশ্বিক ও দেশীয় রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে জন্ম ও বেড়ে ওঠা কবি আজীজুল হকের কবিচৈতন্যে সমাজ ও সময়ের মানুষ দ্বন্দ্বময় সূত্রে অস্তিত্বমান। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা মাত্র ৩টি। ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝিনুক মুহূর্ত সূর্যকে’, দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বিনষ্টের চিৎকার’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে। তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ঘুম ও সোনালী ঈগল’ ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯৯৪ সালে তাঁর কাব্যসমগ্র ‘আজীজুল হকের কবিতা’ প্রকাশিত হয়। সৃষ্টিশীলতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮৫ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান।

শেষজীবনে আজীজুল হক তাঁর অগ্রন্থিত ৬৩টি কবিতা প্রিয়ছাত্র কবি পাবলো শাহির কাছে দিয়ে যান। এরমধ্যে অধ্যাপক ড. সৈয়দ আকরম হোসেনের মাধ্যমে ভোরের কাগজে ছয়টি এবং কবি কর্তৃক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আকরম হোসেনের কাছে পাঠানো ১০টি কবিতা ‘নিরন্তর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

আজীজুল হকের দু’টি অপ্রকাশিত কবিতা দ্য রিপোর্টের ঈদসংখ্যায় গ্রন্থিত হলো। এরমধ্যে ‘স্মৃতিগন্ধা’ শিরোনামের কবিতাটি ১৯৯০ সালের ৫ ডিসেম্বর লিখিত। দুই মাস পরে ফেব্রুয়ারির পহেলা তারিখে ‘নীল সবুজ চোখ ও অন্ধত্ব বিষয়ে’ কবিতাটি লিখিত।]

স্মৃতিগন্ধা
সকালে আসবে কথা ছিল, এলে তো সন্ধায়। এসেই
বললে, চলো আরও কিছু ছায়ার ভিতর, যাই
আরও কিছু নৈঃশব্দ্যের কাছে, গিয়ে কিছুক্ষণ
বসি পাশাপাশি, আমরা তো এখনো কেউ অ-শরীরী নই
বিস্ময় সমস্ত তার প্রাচীনতা নিয়ে এইভাবে
এর আগে আসেনি কখনো।
ইচ্ছা ছিল বলি,
--------জানো না তুমি, কী
দারুণ পিপাসা নিয়ে আলো ও শব্দের
সারাক্ষণ বসে আছি। বিকেল গড়িয়ে তার প্রান্তে
চলে গেলে
সবুজ মোমের আলো কিছুক্ষণ জ্বলেছিল ঝাউয়ে
মাথায়। কলকণ্ঠ পাখির পালক করতলে
এই দ্যাখো এখনো রয়েছে। ইচ্ছে ছিল বলি,
হে রমনী, তুমি কেন এ রকম সময় স্খলিতা?
বলিনি। কেননা
বনতর ছায়ার গভীরে তুমি ততক্ষণে দ্রুত
গেঁথে গেছো। ততক্ষণে তুমি
আলোহীন শব্দহীন নীলাভ আঁধারে জ্বালিয়েছো
বিনগ্ন শুভ্রতা। ততক্ষণে মৃদু
রজনীগন্ধার ঘ্রাণে তুমি এক সুতনু স্মৃতির।
---------------------৫-১২-১৯৯০
----------------------ঢাকা



নীল সবুজ চোখ ও অন্ধত্ব বিষয়ে

ঘোলাটে বেরঙ কেন ও-রকম তোমার দু’-চোখই,
আগে তো ছিল না, ভয় হয় চোখে দ্যাখো কি না,
অনেকে জিজ্ঞাসা করে,
না, অন্ধ কখনো নই, ছিলাম না কখনো।
শ্রবণ সজাগ আছে। যদিও এখন
সঙ্গীত টঙ্গীত সব দূরাগত ক্ষীণতর বাজে,
ত্রাহি-ত্রাহি, চাই-চাই,
--------------ধ্বংস হোক ধ্বংস হোক,
সংগ্রাম সংগ্রাম ধ্বনি সমস্বর
সুস্পষ্ট শোনার শক্তি রাখি-দুই কানে।
রক্ত ও ঘামের গন্ধে ঘ্রাণেন্দ্রিয় অবিকল আছে।
যা-কিছু কষায় তিক্ত গ্রহণে বর্জনে এই জিহ্বা
পারদর্শী। যা-ই কিছু স্পর্শ করি টের পাই ঠিক
শীতল নিরেই কিংবা জ্বলন্ত আগুন। আসল ঘটনা,
সময়ের সকল কিছুই, বিশেষত চৌম্বক বিষয়
সব কটি ইন্দ্রিয়কে কেজো করে রেখেছে এখনো।
সুতরাং শুধু এক চক্ষু নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ,
অন্ধত্ব বিষয়ে এই প্রমাণ-বিতর্ক টেনে আনা
অশোভন।
তবে এক জনশ্রুতি আছে।
বাল্যে ও কৈশোরে নাকি চোখ ঘোর নীলবর্ণ
ছিল, নীল বড়ি গুলে দেওয়া।
হতে পারে। নীলিমার দিকে
বিশেষত গাঢ় নীল মধুমতী নদীর গভীরে
রোজ রোজ বড় বেশী তাকাতাম কিনা
তারুণ্যে দর্পণে দেখি সেই চোখ সবুজ-সবুজ
চুরোগ বিশেষজ্ঞ বললেন, শহরে—
-----------------নগরে চলে এসো,
গ্রামগঞ্জ জঘন্য সবুজ, এমন কি পাখ-পাখি পতঙ্গ-ফড়িং,
এমন কি সাপ-খোপ ব্যাঙও। কানে-কানে বললেন, শোনো,
সবুজ অরে ছাপা রূপকথা উপন্যাস কবিতার বই
বিশেষত ইশতিহার দেয়াল-লিখন
কখনোই পড়বে না, এ-সব থেকেই চোখে—
সাবুজিক এলার্জি এসেছে।
হতে পারে। গাছপালা ঘাস
অরণ্যের দিকে, বিশেষত সবুজের ঢেউ-তোলা
-------------------------মাঠের গভীরে,
রোজ রোজ বড় বেশি তাকাতাম কি না। তবে
একুশের আগে-পিছে লক্ষ্য করে দেখি
সবুজ-সবুজ রঙ জোড়া-জোড়া শত-শত চোখে
জবা-লাল হিঙুলের ছোপ। আমারও তো। একটানা
বিংশতি বছর। মাঝখানে দুইবার ধূমল
হয়েছে। তারপর গোলাপী-গোলাপী। তারপর
হলুদ-হলুদ। তারপর
-------------এই দু’টি চোখ
স্ফটিক পাথর।

মাঝখানে কোনদিন দিয়েছে কি এই চোখে বিদ্যুৎ ঝিলিক?
কিছু মনে নেই।
মাঝখানে ঝরেছে কি সঙ্গোপনে স্বপ্ন আর চোখের শিশির?
কিছু মনে নেই।
মাঝখানে কোনদিনও পড়েছে কি একবারও চোখের পলক?
কিছু মনে নেই।
হে বন্ধু, জন্মান্ধ তুমি, ঘোলা চোখ দুই হাতে ঢেকে শুধু
কাঁদো,
চুষ্মণি আমি,
আমার চোখের দিকে তাকিও না কখনো আবার।
-------------------------১লা ফেব্রুয়ারি ১৯৯১



* কবির স্বহস্তে লেখা “স্মৃতিগন্ধা”

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর



রে