thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫,  ১১ মহররম ১৪৪০

দিব্যজ্ঞানী

২০১৪ জুলাই ২৭ ১৪:০৯:৩৬
দিব্যজ্ঞানী

মনোজ দে

‘আত্মতত্ত্ব যেই জেনেছে
দিব্যজ্ঞানী সেই হয়েছে
কু-বৃক্ষে সুফল পেয়েছে
আমার মনের ঘোর গেল না’

পল্টন মোড়ের সিগন্যাল ছাড়তে না ছাড়তে মিরপুর ১৪ থেকে বনশ্রী যেতে থাকা ‘বাহন’ বাসটি ডানে-বামে থেমে যাওয়া প্রাইভেট কার, মাইক্রো, লোকাল বাস, সিএনজি, রিকশা আর মানুষজনের মাঝ দিয়ে হর্ন বাজাতে বাজাতে আর ব্রেক কষতে কষতে দৈনিক বাংলা মোড়ের দিকে চলতে শুরু করলে কবি সজীব মাহমুদ একটু নড়েচড়ে ওঠে। দৈনিক বাংলা মোড়ে তাকে নামতে হবে; তারপর ফকিরাপুল তাজরিন প্রেসে বইমেলায় বের হতে যাওয়া লিটলম্যাগের ট্রেসিং কপিটা ফাইনালি চেক করেই যেতে হবে শান্তিবাগে শাহেদ সিরাজের ফ্লাটে। ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় মার্চের ৩-৫ তারিখ হতে যাওয়া বাংলা-ত্রিপুরা সাহিত্য সম্মেলনে আমন্ত্রিতদের ব্যাপারে আলাপ-সালাপ শেষে দুপুরের খাওয়াটা অবসরপ্রাপ্ত আমলার বাসাতেই সারতে হবে। বাসটি কসরত করতে করতে বায়তুল মোকাররমের গেটের সামনে পৌঁছে গেলে হেলপার চিৎকার দিয়ে ডাকতে শুরু করে, ‘দৈনিক বাংলা নামলে আসেন, দৈনিক বাংলা...।’

কবি সজীব মাহমুদের অবস্থান বাসের মাঝ বরাবর; ডানে-বামে-সামনে-পেছনে জমে থাকা ভীড়টা আরও একবার দেখে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে পেছনের গেট দিয়েই নেমে পড়বে— সামনের গেটে সংরক্ষিত নারী আসন ঘেষে ভীড়টা মৌচাকের মতো এঁটে আছে। সামনে-পিছনে-ডানে-বামের ভীড়টা একটু নাড়িয়ে-চাড়িয়ে দিয়ে ফুসফুসে জোর বাতাস টেনে ভারী গলায়, ‘ওই দৈনিক বাংলায় নামার আছে’ হাঁক দিয়ে চলন্ত বাসে চলতে শুরু করে কবি সজীব মাহমুদ। সে সময়েই পরিচিত রিংটোনটা বেজে উঠলে হাতটা নেমে আসে প্যান্টের ডান পকেটে। মায়ের ফোন। কল ধরতে না ধরতে বাসটি এসে ব্রেক কষে দৈনিক বাংলা মোড়ে— ততক্ষণে কবি সজীব মাহমুদ এসে পৌঁছে যায় গেটের পাদানীতে। এপাড়ে না ওপাড়ে ভাবতে না ভাবতে পেছন থেকে যাত্রীদের তাড়া,‘ভাই, গেট ক্লিয়ার করেন, নামতে দ্যান।’ ফোনের রিংটোন ফের বেজে উঠলে আর পেছনে নামতে উন্মুখ যাত্রীদের উৎকণ্ঠা, তাড়াহুড়ো ঠেলাঠেলি এড়াতে কবি সজীব মাহমুদ নেমে পড়ে রাস্তার এপাড়ে; হেঁটে রাস্তা পার হতে হতে কলটা রিসিভ করে—

‘হ্যালো মা।’
‘হ্যা, বাবা। কেমন আছিস?’
‘এইতো মা ভালো। তোমরা কেমন?’
‘এইতো ভালো... আমাদের থাকা।’

‘ক্যান আবার কি হলো? সবতো ঠিকঠাক মতোই হয়ে যাওয়ার কথা। বড়ভাইতো দারোগা আর ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে কথাবার্তা সেরে ফেলেছে। এসআই লতিফ কাজটা করে দিতে ফাইনালি রাজী হইছে। দু’হাজার টাকাও নিছে। দশ পুটলা গাঁজা নিয়ে কাল সকালে যায়ে ধরে আনবে আদিত্যকে। তারপর সোজা চালান।... আবার নতুন করে কি হলো?’

‘না বাবা রনি বলতেছিল একটা বাইপাসের রোগীরে কাস্টডিতে পাঠানো রিস্কি। যদি কিছু হয়ে যায়? তাইলে কি ওরা ছেড়ে কথা কবে?’

‘এগুলো এখন কী বল মা। বাইপাসের রোগী মানে? কুত্তার বাচ্চাটার তিন-চার বোতল ফেনসিডিল লাগে রোজ। এক বছরের মধ্যে জমি-জমা-বাড়ি বেচে ফেলার সময় বাইপাসের কথা মনে ছিল না। আপা নিশ্চয়ই ঝামেলা করতেছে। মন এত দুর্বল হলে চলে না।’

‘না বাবা। ঝর্না কিছু বলে নাই। ঝর্নার বাড়ির লোকজন এখন পিছটান দিছে।’

‘রাখ মা। এ সব আবোল-তাবোল কথা কয়ো না। দুইটা ফুটফুটে মেয়ের মুখের দিকে যে তাকাই না তার প্রতি দরদ তোমাদের উতলাই পড়তেছে।’

‘দ্যাখ তোর আপা বলছিল আবার একবার রিহ্যাবে দিলে…’

‘কি কও মা এইটা? ওরে ৬-৭ বার সেন্টারে দেয়া হইছে। ও কি মানুষ নাকি? আস্ত শয়তানের বাচ্চা। ওর জন্য টাকা দিবে কে? এক পয়সাও আমি দিতে পারব না। দ্যাখো বাড়াবাড়ি করো না। তোমাদের দুর্বলতার সুযোগে ওর লাই বেড়েছে।’

‘হ্যালো, শোন বাবা, ওর উপর আমারও কোনো সিমপ্যাথি নাই। কিন্তু…’

‘মা, থামো এখন। মেজাজটা খারাপ করায়ে দিচ্ছ ক্যান খামাখা? তোমাদের যা ইচ্ছে করগা। শুনে রাখ এর ভিতর আর আমারে টানবা না…’

ফোনটা কেটে দেয় কবি সজীব মাহমুদ। পৌঁছে গেছে সে ততক্ষণে তাজরিন প্রেসের গেটে। কালো থাই গ্লাসের গায়ে পুস লেখা দরজাটি খুলে ভেতরে ঢুকে ডানে কাঠালীচাঁপা রঙের পারটেক্স বোর্ডের টেবিলে স্যামসাং ২১ ইঞ্চি মনিটরের ওপারে মুখ ঢাকা ম্যানেজার আবু তাহেরের দিকে সহাস্য হাত বাড়িয়ে ধরে। করমর্দন আর কুশল বিনিময়ের সাথে সাথে আবু তাহের লাল চায়ের জন্য ডাক ছাড়েন মান্নানের দিকে। টেবিলের ড্রয়ার থেকে ব্রাউন পেপারের মোড়কে ঢোকানো ১৭ ফর্মার ট্রেসিং বাড়িয়ে ধরে কবি সজীব মাহমুদের দিকে। ব্রাউন প্যাকেটটা হাতে ধরে ভিতর থেকে কয়েকটা ট্রেসিং পেপার এলোমেলোভাবে খানিকট বের করে মনোযোগ দেয় আবু তাহেরের কথার সূত্রে। ততক্ষণে আবু তাহের কাগজের রিমের দাম বাড়া, ট্রেসিং পেপারের দাম বাড়া, লেবার কস্ট বাড়া, অফিস ভাড়া বাড়া, বিদুৎ ভাড়া বাড়া, গ্যাস ভাড়া বাড়া, বাসের ভাড়া ভাড়া, তরি-তরকারি মাছ মাংস ডিম তেল নুনের দাম বাড়া, বাচ্চাদের স্কুল কোচিংয়ের খরচ বাড়া, রিকশা ভাড়া বাড়া, নাপিতের দোকানে চুল কাটার খরচ বাড়া, গ্যাস-ডায়াবেটিকস-প্রেসারের ওষুধের দাম বাড়া, জন্মনিয়ন্ত্রণের পিল-কনডমের দাম বাড়া, ন্যাপকিনের দাম বাড়ার ফিরিস্তি দেওয়া শেষে আসল কথাটা পাড়ে-

কবি-ভাই এ বছরে কিন্তু ফর্মা প্রতি তিন শ’ টাকা না বাড়ালে একদম পুষাবে না।

তাজরিন প্রেসের বাচাল ম্যানেজার আবু তাহেরের পাড়া আসল কথাটা কবি সজীব মাহমুদের কানের পর্দা দিয়ে মাথার শতকোটি নিউরন কোষে ঢুকে পড়ার আগেই শুরু হয়ে যায় লাভ-ক্ষতির অংক। তিন শ’ টাকার আবদার মানে অন্তত দুই শ’ টাকা বাড়িয়ে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে হামদর্দের বিজ্ঞাপন এক্সটা নিয়ে লাভ আর কি হলো? নাও, গুড় এখন পিঁপড়া দিয়ে খাওয়াও...! আবু তাহেরের কথার পিঠে কথা বাড়াতে একদমই মনে চায় না কবি সজীব মাহমুদের। এই লোকটা কোনো বিষয়ে কথা শুরু করলে আর থামতে চায় না। রাত জেগে চ্যানেলে চ্যানেলে টক শো দেখে আর সুযোগ পেলেই চৌকোণা মুখে কথার তুবড়ি ছোটায়। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, জাতীয় পার্টি, জাসদ, বাসদ, গণসংহতি, আন্ডারগ্রাউন্ড, জঙ্গি, ভাসানী, শেখ মুজিব, জিয়া, ওবামা, সুচি, বিশ্বমন্দা, জিডিপি, চীন, রাশিয়া, পারমাণবিক বিদ্যুৎ, কুইক রেন্টাল, তেল-গ্যাস, আনু মুহাম্মদ, পিয়াস করিম, মান্না, ডেসটিনি, হলমার্ক, শেয়ারবাজার, তারেক, জয়, গণধর্ষণ, দ্রব্যমূল্য, বকুলতলা, ডাকসু আন্দোলন, এসিড সন্ত্রাস, মনমোহন... এক্কেবারে লাইভ টকশো। দেখছেন ভাই কাপাসিয়ায়.. বলতে শুরু করার আগেই স্মিত হেসে কবি সজীব মাহমুদ চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে। কাল দুপুরে অফিসে যাবার আগে ট্রেসিং কপিটা চেক করে আপনাকে দিয়ে যাব। পাওনা টাকার বাকীটাও দিয়ে যাব। ভাই তাড়াতাড়ি ছেপে বের করেন। মেলার শুরুর দিন থেকেই স্টলে এবারে রাখতে চাই নতুন সংখ্যাটি। এতদিনের সম্পর্ক আমাদের। আপনার দাবীটা বিবেচনাতো করতেই হবে?

তাজউদ্দীনের মেয়ে রিমি… আবু তাহেরের উৎসুক-আগ্রহী-কৌতূহলী-নাছোড় শব্দের ঝাঁক কণ্ঠ দিয়ে বেরিয়ে বাক্যের পর বাক্য হয়ে ওঠার আগেই— আজ আসি, বলে ঘুরে এগুতে শুরু করে তাজরিন প্রেসের দরজার দিকে। ধাক্কা দিন লেখা দরজাটি হাতল ধরে ঠেলে বেরিয়ে পড়ে ফকিরাপুলের গলি-রাস্তায়। ডানদিকে ঘুরে ২০ গজ হেটে ফুটপাথে উঠে আসতে না আসতেই রিকশার বেল, মাইক্রো-কার-সিনজি-হাফ ট্রাক-মিনিবাস-পুলিশভ্যান-মোটরসাইকেলের হর্ন আর ইঞ্জিনের আওয়াজ, ক্যাফে ডি বাগদাদ-নিউ নোয়াখালী রেস্তোরাঁর কেরোসিন স্টোভের টানা শা শা আওয়াজ আর ফুটপাথে সাদা আঙুর-কালো আঙুর-আপেল-কমলা-বেবি অরেঞ্জের দোকান আর চা-সিগারেটের দোকান ঘিরে দোকানী-ক্রেতার দরদাম, ভীড় আর চলমান মানুষের উজান-ভাটি স্রোতের মাঝে গিয়ে পড়ে কবি সজীব মাহমুদ। আর সাথে সাথেই দশাসই এক বেদেনী পথ আগলে সামনে দাঁড়িয়ে যায়।

তেলকালো দেহের বেদেনী। মহুয়া-মলুয়া পালার বেদেনী, নাগিনী কন্যার কাহিনীর বেদেনী জানুয়ারির ২১ তারিখ দুপুর দেড়টার ফকিরাপুলের পানির ট্যাঙ্কির সামনে কবি সজীব মাহমুদের গা-ছোঁয়া ব্যবধানে। সেকেন্ডইয়ারে পড়ার সময় পাঠ্যসূচির মহুয়া-মলুয়া পালা আর তৃতীয় বর্ষে তারাশঙ্করের বেদেনী গল্পের- সর্পিল শরীরের তেলকালো বেদেনীর দেহবর্ণনা পড়তে পড়তে কতবারই রক্তের কোষে কোষে বিষনেশা ছড়িয়ে পড়েছে; ইচ্ছে হয়েছে কালনাগিনীর বিষে নিজেকে নিঃশেষ করে ফেলতে। রাস্তা-ঘাটে তেলকালো সর্পিল দেহের বেদেনী দেখে কতবারইতো কবি সজীব মাহমুদের রক্তে জেগেছে কামনা; বিষে মথিত, জর্জরিত হতে কতবারই জেগেছে ইচ্ছে। আর বেদেনীরা সামনে পড়লেই বেছে বেছে পথ আটকে দাঁড়াবে। তেল কুচকুচে সর্পিল বেদেনীরা দাঁড়ালেই কবি সজীব মাহমুদের দেহ-মনে কেমন অবশ-বিবশ বিষ ঢুকে পড়ে; থির হয়ে যেতে হয়।— দে না ভাই, কালনাগিনীর বিয়ে। সাহায্য কর। দশাসই বেদেনীর কণ্ঠ চুঁইয়ে শব্দগুলো বেরিয়ে আসার আগেই কুচকুচে মুখে খেলে যায় সাদা ধারালো দাঁতের আধা-হাসি; ব্যবসায়ী চোখ গেঁথে যায় কবি সজীব মাহমুদের বিহ্বল চোখে, মুখে, গালে, থুতনিতে। কবি সজীব মাহমুদের আলুথালু বিবশ শরীর-মনের হদীশ কি পেয়ে যায় দশাসই বেদেনী? সর্পিল শরীরে কালো লাল ছাপের শাড়িটার আঁচল ডান বুকের কাছে কিছুটা সরে শিথিল কি হয়ে যায়? —আর সে শিথিলতার ফাঁক গলে কবি সজীব মাহমুদের চোখও আটকে পড়ে লাল ব্লাউজে আটকে থাকা বেদেনীর ভরাট বুকে।—দে না ভাই, কালনাগিনীর বিয়ে। সাহায্য কর। —এবারে কণ্ঠ আরও চুঁয়ানো। তিক্ত-কটু-ঝাঝালো সে শব্দগুচ্ছ কাঁপতে কাঁপতে কবি সজীব মাহমুদের কানের ভিতরে ঢুকে পড়তে থাকলে আর মস্তিষ্কের কোষে কোষে ছেয়ে যেতে থাকলে তার হাতও চলে যায় প্যান্টের পেছনের ম্যানিব্যাগে। মুজিব ছাপমারা ১০, ২০, ৫০, ১০০ টাকার নোটগুলোর ভিতর থেকে হাতের দু’-আঙ্গুলে বেরিয়ে আসে হালকা কমলা শেডের ৫০ টাকার নোটটি। ততক্ষণে বেদেনীর হাত ছোঁ মেরে উঠিয়ে নিয়েছে হালকা কমলা শেডের ৫০ টাকার নোট। কুচকুচে মুখে হাসিটি প্রসারিত হয়ে যেতে যেতেই বেদেনী পৌঁছে গেছে আরেকজনের সামনে...। চলাচলতির ভীড় গলে জ্যামিতিক তালে কাঁপতে থাকা বেদেনীর ভারীপাছার গমনপথের দিকে নজরখানেক তাকিয়ে তারপর ডান কোণার চা-সিগারেটের দোকান থেকে ১০ টাকা নোট দিয়ে ভাংতি ২ টাকা ফেরত নিয়ে সুতোয় ঝোলানো হলুদ লাইটারে আগুন জ্বেলে একরাশ আয়েশী ধোঁয়া ছেড়ে রিকশার জন্য ফুটপাথ ছেড়ে রাস্তায় নেমে পড়ে কবি সজীব মাহমুদ।

রাস্তায় মিনিবাস, পুলিশের ভ্যান, সিএনজি, রিকশা, ভ্যান, মাইক্রো আর কারের জমে থাকা দঙ্গল দেখে সাহস হয় না রিকশার দরদাম করতে, ফুটপাথে উঠে আবার ফুটপাথ ধরে বেনসনে টান দিতে দিতে রাজারবাগের দিকে হেঁটে রওয়ানা হয়। ফুটপাথ জুড়ে পড়ে থাকা সারি সারি ফার্নিচারের দোকান, ফলের দোকান, ফ্লেক্সির টুল, পান-চায়ের দোকান, ছোট্ট চকিতে টুপি-চিরুনী-টুথব্রাশ-কাঁচি-আয়না-মোজা-রুমাল-হ্যান্ডগ্লাভস-লাল-নীল-হলুদ ছাপার গামছা নিয়ে বসা রকমারী দোকান, আর মানুষের ভীড় কেটে কেটে হাঁটতে থাকে রাজারবাগের দিকে। ফুটপাথের মাঝে দাঁড়ানো ট্রান্সফর্মার বসানো খাম্বা দুটোর পাশ ঘেষে রাস্তা-ফুটপাথ জুড়ে মানুষের দলা পাকানো ভীড়টা নজরে পড়লেও এড়িয়ে যেতে চাই কবি সজীব মাহমুদ; কিন্তু মানুষের এলোমেলো ভীড়, জটলা, উৎসাহ, কৌতূহল কিংবা মারমুখিতা কবি সজীব মাহমুদকে থামিয়ে দেয়। আর না থেমেও পারে না— যখন জমে ওঠা ভীড়টা থেকে কারো একজনের সহানুভূতির কণ্ঠ বেয়ে নেমে আসে— আহারে! মইরা গেছে। —রিনরিনে ভীত কাতর কণ্ঠটাকে চাপিয়ে দিয়ে ভারী রাগি ফূর্তিবাজ আরেক কণ্ঠ ততক্ষণে বলতে শুরু করে— আরে না। হালা হিরোঞ্চির জান এত পলকা না। চোর হালায় ভেটকি মাইরা রইছে।—ভেটকি মেরে পড়ে আছে না নিথর শরীর তা পরখ করার জন্যই জমে ওঠা ভীড় থেকে কেউ একজন কষে একটা লাথি মারে লোকটা কিংবা হিরোঞ্চিটা কিংবা চোরটার পাঁজর বরাবর। অনেকদিন আগে ছোটবেলায় শনিবারের হাটে বটতলার ট্রাক থেকে ফেলা বস্তা বোঝাই মালের দুপ্ শব্দের সাথে কোনো আত্মনাদের শব্দ কি মাথার দেড়হাত উপর দিয়ে যাওয়া ডিশ, টেলিফোন ইন্টারনেটের জড়ানো-ছড়ানো তার কিংবা তারও ৫ হাত ওপরের ইলেকট্রিক তার বেয়ে নেমে আসলো? বুঝতে না বুঝতে কিংবা শব্দটা শুনতে না শুনতে দপাদপ লাথি, স্যান্ডেলের বাড়ি কিংবা একটা আধা আধলা ইটের খুলি ফাটাবার কিংবা থ্যাতলানোর শব্দ ভেসে আসলে কবি সজীব মাহমুদের পেটের ভিতরকার জড়ানো পেচানো ক্ষুদ্রান্ত্র আর পাকস্থলি জুড়ে টমেটো, শিম, নতুন আলু, পেঁয়াজ, ফুলকপি দিয়ে ফুটানো মিনিকেট চাল আর অস্ট্রেলিয়ান মসুরের ডালের খিচুরি আর লাল চা আর সিগারেটের ধোঁয়া কেমন যেন এলোমেলো হতে শুরু করে। মাথার ভিতরে জমে থাকা বাতাস শূন্য হতে থাকলে খাদ্যনালি বেয়ে টকো তরল ধেয়ে আসতে শুরু করলে মাথার ভিতরে বাতাস পাবার জন্যেই হোক আর টকো তরলটুকু টুক করে গিলে ফেলবার জন্যই হোক সজীব মাহমুদ ভীড় ঠেলে দ্রুত হাঁটতে শুরু করে। মস্তিষ্কের কোষে কোষে ততক্ষণে তার বোনজামাই আদিত্য। নয় বছর আর পাঁচ বছরের দু’টো মেয়ে। কি হবে আপা আর দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ? দু’হাজার টাকার ঘুষে দশ পোটলা গাঁজা দিয়ে পুলিশ আদিত্যকে তুলে নেবে কাল সকালে। তারপর মোবাইল কোর্ট। ছমাসের সাজা। তিনমাস পর টাকা-পয়সা খরচ করে বের করে আনা যাবে। এবারে কি ভাল হবে? নাকি বের হয়েই আবার নেশা শুরু করবে। গত পাঁচবছরে ছয়বার রিহ্যাব সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। লাভ হয়নি। গতবছর যখন হার্টে ৫টা ব্লক ধরা পড়ল, মেট্রোপলিটন হাসপাতালে বাইপাস করা হল তখন সবার মতো কবি সজীব মাহমুদও ভেবেছিল এবারে নিশ্চয়ই আর নেশার পথে যাবে না। কিন্তু মাস না ঘুরতেই যা তাই। আর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ভিটের তিন শতক জায়গা ১২ লাখ টাকার বদলে ৮ লাখেই লিখে দিতে হলো শরীকদেরকে। এখনও ৫ লাখ আর তিন লাখ টাকার চেক দু’টো ক্যাশ হয়নি। ৮ লাখ টাকা পোস্টঅফিসে রেখে তা থেকে যে ইন্টারেস্ট হবে তা দিয়েই চলতে হবে ওর বোনের পরিবারকে।

‘ওই শালা শিক্ষিত বাঞ্চোৎ। চোখের মাথা খাইসস...।’ ধেয়ে আসা কর্কশ খিস্তির সাথে যখন ডান হাতের ড্যানায় হাঁচকা টান টাল সামলাতে না পেরে কালো পিচের রাস্তায় পড়ে যেতে যেতে কোনো-রকম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সামনে তাকিয়ে রাস্তার এপাশ-ওপাশ জুড়ে নীল পোশাকের পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কবি সজীব মাহমুদের হঠাৎ করে মনে হয় জোট মহাজোটের কাল পেরিয়ে আবার কি পুলিশ-র‌্যাব-আর্মির জরুরী যুগে ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশ? পেছনে পাবলিকের তামাশা মাখানো হাসি আর ডান হাতের ড্যানা ধরে রাখা পুলিশের গরমচোখ কবি সজীব মাহমুদকে জরুরী যুগের ধূসরতা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি দুপুর দুটোয় ফকিরাপুল মোড়ে। ততক্ষণে মুহুর্মুহু হুইসেল, মোটরবহর, এম্বুলেন্স, খোলা জিপ, কালো মার্সিডিজ বেঞ্চ, সাদা এম্বাসাডার গাড়ি, এসএসএফের সশস্ত্র প্রহরায় পতাকাবাহী গাড়ির বহর অতিক্রম করে ফকিরাপুল মোড়।

দুপুর তিনটা। ২৫-এ শাহেদ সিরাজের শান্তিবাগের বাসায় দুপুরের খাবার খেতে খেতে টেলিভিশন স্ক্রলে ভেসে যাওয়া সংবাদ শিরোনামে চোখ রাখে কবি সজীব মাহমুদ— গাজীপুরে ২৫০ মেগাওয়াট কুইকরেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী, রাজধানীর ফকিরাপুল মোড়ে গণধোলাইয়ে অজ্ঞাতপরিচয় যুবকের মৃত্যু... দেখতে দেখতে দেশী রসুন দিয়ে ভুনা করে রান্না করা লইট্যা শুঁটকি মাখানো ভাতের দলা পুরে ফেলে মুখের হাঁয়ের মাঝে— স্ক্রলে ভেসে যেতে থাকে— বাণিজ্যমেলায় প্যাভিলিয়ন ভেঙ্গে ১জন নিহত... মুখের ভিতরে রসুনের ঝাঁঝ মাখানো লইট্যা শুঁটকিমাখানো ভাত ততক্ষণে জিভ, দাঁত, তালুর ঘর্ষণ আর লালা রসের পিচ্ছিলতায় নেমে যেতে শুরু করেছে গলার গহ্বরে।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর



রে