thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

আবর্তন

২০১৪ জুলাই ২৭ ১৯:৪৪:০৩
আবর্তন

হাসান অরিন্দম

অসময়ে শেনিনের ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় সে অপ্রস্তুত এক বিমূর্ত ঢেউয়ের উপর আছড়ে পড়ে। শুয়ে থেকে ঠিক অনুমান করতে পারে না এখন রাত ক’টা। কয়েকবার এপাশ-ওপাশ করে কোল বালিশটা জড়িয়ে ধরে আবারও ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার ক্লান্তিকর চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ফলে খানিক নির্বিকার শুয়ে থেকে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন স্বামীর বাহুবন্ধন হতে নিজেকে মুক্ত করে ভাবে- এখন কী করা যায়। আজকাল তার মাঝে মাঝেই এ রকম হয়। ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে উঠে এমন মনে হয়। কিংবা সে মনে করতে চায়, রাত যা-ই হোক এখন তার আর কোনো ক্লান্তি নেই, তন্দ্রা নেই, ভোর পর্যন্ত না ঘুমিয়েও কাটিয়ে দেয়া সম্ভব, অনেক সময় জেগে থাকাটাও উপভোগ করা যায়। অহেতুক ঘুমের প্রত্যাশায় ঘোলাটে মশারীর ভেতর নরম বিছানায় গতানুগতিক শুয়ে থাকা বৃথা। বাথরুম সেরে এসে জগ থেকে একগ্লাস পানি ঢেলে খেতে খেতে দেয়াল ঘড়িতে দেখে রাত মোটে পৌনে দু’টো। আশ্বিনের ভোরের দেখা পেতে আরও দেড় প্রহর। কী করা যায় এতটা সময়? শেনিনের পরিচয় একজন গৃহিণী, তবে গড়পড়তা মেয়েমানুষ সে নয়। ঢাকা থেকে বইগুলো আনা হয় নি বলে শফিকের আইন-কানুন চাকরি-বিধি ছাড়া পড়ার মতো কোনো বইও নেই। ঘরের কম্পিউটারে ইন্টারনেটের ব্যবস্থা থাকলে হয়তো এখন ফেসবুকে চ্যাট করা যেত বা কোনো একটা ওয়েবসাইটে ঢুকে পড়ত। হঠাৎ সে ভাবে আচ্ছা ছাদে গেলে কেমন হয়? দোতলার জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ মাঝ আকাশ পেরিয়ে আবছা জোছনা দিয়ে চলেছে। একবার ভাবে শফিককে ডাকবে, দু’জনে একসাথে ছাদে বসে খানিকটা সময় কাটিয়ে আসা যাবে, চাইলে শেনিন দু’-একটা গানও শোনাতে পারে। মশারীর কাছে গিয়ে ডিম লাইটের আলোয় দেখে তার চওড়া রোমশ-শরীর, শ্যামবর্ণ স্বামী কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে সটান পড়ে আছে। শফিক ব্যস্ত লোক, এখন ঘুম ভাঙ্গালে নিশ্চিত রেগে যাবে। বলবে গভীর রাত ঘুমানোর সময়, আর দিন কাজের। এই ছোট্ট উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা শফিক, অল্প কিছু দিনের সংসারেই শেনিন বুঝে নিয়েছে রুটিনের বাইরে চলা তার একদম পছন্দ নয়। শেনিন ঠিক করে সে ছাদেই যাবে, যদিও তাতে তার একটু ভয় ভয় লাগে। তা লাগুক, ছোটখাটো ভয়ও কিন্তু এনজয় করার ব্যাপার। নিরাপত্তার জন্য হাতে একটা টর্চ নিয়ে সে সিঁড়ির দিকে অগ্রসর হয়। এর আগে একদিন বিকেলে সে ছাদে উঠেছিল। কিন্তু রাতের দৃশ্যটা একেবারে আলাদা। জোছনার আবছা আলোয় চারদিকে প্রচুর গভীর কালো হয়ে থাকা গাছ চোখে পড়ে। আশপাশের গ্রাম্য বাড়িগুলো ঘুমে শুনশান। কি যেন একটা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে, ডাকটা একটু অন্যরকম, পাখির না হয়ে অন্য কোনো প্রাণীরও হতে পারে। ঘোলাটে চাঁদের ফিকে জোছনায় রাতটা যে খুব বিশেষত্বপূর্ণ তা বলা যাবে না। তবু এই নির্জনতা বেশ ভাল লাগে। সে কবিতা লিখলে মাথায় নিশ্চয়ই এখন নতুন একটা আইডিয়া আসত। অবশ্য কবিতা যে দু’-চারটা লেখেনি তা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে উঠে রায়হানের পাল্লায় পড়ে প্রকাশও করেছিল কিছু। কিন্তু কেন যেন আর লেখা হয় না, বিশেষ করে বিয়ের দু’সপ্তাহ আগ থেকে আজ পর্যন্ত একটি শব্দও সে লেখে নি। রায়হান কিন্তু ধুমছে লিখে চলেছে, গতকালের কাগজেও ওর একটা কবিতা বের হয়েছে। ওর সেই পুরনো পাগলামি আর গেল না, কৌশলে কবিতায় ‘শেনিন’ শব্দটি প্রয়োগ করেছে, আর তা আবার ছাপতে দিয়েছে সেই পত্রিকায় যেটি শেনিন বাসায় পড়ে। ভাগ্যিস শফিক ওসব সাহিত্যের পাতা-টাতা ছুঁয়েও দেখে না, না-হলে এ সব দেখে নিশ্চয়ই তাকে প্রশ্ন করত। কিন্তু রায়হান এমন শুরু করল কেন? ভাবতে ভাবতে শেনিনের মাথার ভেতর দু’টি চরণ বারবার খেলা করে, অস্থির শব্দগুলো যেন একটা পূর্ণাঙ্গ কবিতা হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু শেনিনের তো কবি হওয়ার বাসনা নেই। তাই রাজধানী ছেড়ে বিয়েটা কবুল করে চলে আসা এই মফস্বলে। রায়হান যদি তাকে এখনও ভাববেই, যদি তার নাম নিয়ে কবিতাই লিখবে তাহলে তাকে গ্রহণ করতে কেন উদাসীনতা দেখাল। এখন আবার কবিতার খেলায় মেতেছে। এই জন্যেই সে কবিদের দু’চোখে দেখতে পারে না। অবশ্য রায়হান ওকে স্পষ্ট ভাষায় চাইলে সে কিছু না-ভেবে হ্যাঁ করত এ কথা হলফ করে বলতে পারবে না। ওর মোবাইল নম্বরটা তো আছেই— কালই ফোন করে একবার বিষয়টা ফয়সালা করা দরকার- একটা বিবাহিতা মেয়ের নাম নিয়ে কবিতা লেখার অর্থটা কি? নাকি তা ঠিক হবে না? ওর সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে আবার নতুন করে সবকিছু ওলটপালট হয়ে যেতে পারে। তাই বলে সে কারো পাগলামির শিকার হতে পারে না। অবশ্য খানিকটা পাগলামি ছাড়া যে জীবন তা তো মানুষের নয়, যন্ত্রের জীবন। শফিকের জীবনের সাথে জড়িয়ে পড়ে তাকেও কি শেষে যন্ত্র হয়ে যেতে হবে?

বিয়েটা মোটেই তার অনিচ্ছায় হয় নি। পুরো একমাস ভেবে তবেই সে ইতিবাচক উত্তর দেয়। শফিক বিয়েতে কেবল একটা শর্ত দিয়েছিল- সে যেখানেই যাক তার সাথে সাথে থাকতে হবে, কাজেই চাকরির কথা ভাবা যাবে না। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে বেশ ভাল বেতনের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে তবেই সে বিয়ের কনে সেজে বসেছিল। মাত্র দু’মাসের মাথায় সেই সিদ্ধান্তটাকে নিজের কাছেই অদূরদর্শী বলে আশঙ্কা হচ্ছে শেনিনের। তারচেয়ে বড় কথা মাথার ভেতর আবার কবিতার শব্দ আর এলোমেলো চরণগুলো জাগতে শুরু করেছে। ওরা যদি কানাইয়ের বাঁশির মতো বেপরোয়া হয়ে ওঠে তাহলে সংসারে সে নিজেকে সামলাবে কেমন করে? যে শৃঙ্খল নিজেই বরণ করে নিয়েছে তা থেকে কি তবে মুক্তি প্রার্থনা করতে হবে? মা জিজ্ঞেস করেছিল, তুই পারবি তো সবকিছু ছেড়েছুড়ে বরের সাথে জায়গায় জায়গায় ঘুরতে? তোর চাকরি- আবার কী সব লিখিস-টিখিস।’ শেনিনের মনে হয় মা সে সময় তাকে যতটা বুঝতে পেরেছিল শেনিন নিজেকে ততটা বুঝতে পারেনি।

রায়হানটা এখন কী করছে? সেই সংবাদপত্রের চাকরি? ওকে এখনই একটা ফোন দিলে কেমন হয়? ঘুমিয়ে পড়লে পড়–ক, শেনিন তাকে ফোন করে জাগাতেই পারে- বন্ধুত্বের সে অধিকার তার আছে। কিন্তু এত রাতে কারো সাথে কথা বলতে দেখলে শফিক কি ভাববে। স্বামী হওয়া সত্ত্বেও নিজের নির্ঘুমতা আর জেগে থাকা চেতনার অনুভূতিগুলো শফিকের সাথে শেয়ার করবার সুযোগ নেই। এ জন্য অবশ্য শফিককে খুব বেশি দোষারোপ করা যায় না, তার যে কাঠামোবদ্ধ আচরণবিধি-নিয়ন্ত্রিত জীবন সেখানে রুটিন ভাঙ্গার সুযোগ নেই। তবে কি শেনিন পারাপারের আশায় ভুল নৌকায় উঠে পড়েছে? এ নৌকা কি কখনও তার প্রার্থিত কূলে ভিড়বে? একঘেয়ে নিয়ম চিরকালই তার কাছে অসহ্য ঠেকে। সে আসলে কী চেয়েছিল তাও কি স্পষ্ট নিজের কাছে? এক ধরনের নিরাপত্তার লোভেই কি সে শফিকের বধূত্ব বরণ করে নি? নিজের চাকরির ঝক্কি থেকে সেই তো মুক্তি চেয়েছিল, রায়হানকে সে যদি নির্ভরযোগ্য মনে করত তবে সে কথা সে নিজেও তো বলতে পারত।

গ্যাসের চুলোয় দুপুরের রান্না বসিয়ে শেনিন রায়হানকে ফোন দেয়। ঠিকা কাজের মেয়েটি বাথরুমে কাপড় ধুচ্ছিল। ওদিক থেকে প্রথম কথা, ‘এতদিনে মনে পড়ল?’

‘মনে পড়বে না কেন? মনে পড়লেই কি কথা বলা যায়?’

‘তাহলে যে ফোন দিলে?’

দিলাম একটা ফয়সালা করতে, আমার নাম নিয়ে কবিতা লিখে ছেপেছ কেন?’

‘তোমার নাম মানে? বাংলা ভাষার সব শব্দ নিয়ে খেলবার অধিকার একজন বাঙালী কবির আছে। সেখানে তোমার নাম কোনটা তা তো কবির জানবার কথা নয়।’

‘আচ্ছা এখন তোমার কবিত্ব রাখো। বিয়ে-শাদী করছ কবে?’

‘কেন আমি বিয়ে না করলে তোমার কোনো সমস্যা?’

হ্যা, আমি দেখতে চাই কোনো সুন্দরী তোমার বউ হয়।’

‘কথায় আক্রমণের ঝাঁঝ পাচ্ছি মনে হয়। বউ যে একজন থাকতেই হবে এমন তো কোনো কথা নেই। তুমি নিশ্চয়ই জেনেছ আমি জীবনটা নিজের মতো করে দেখি, যাপনও করতে চাই একান্ত আমার মতো করেই।’

‘সে তুমি পুরুষ মানুষ বলে এভাবে বলতে পারছ।’

‘তুমিও চাইলে পারতে। নিজেকে তুমি যদি গুটি পোকার মতো বন্দী করে রাখ তাহলে তো কিছু বলবার নেই। সংসার করছ কর। তোমার তো অবসরের কমতি নেই, লেখাটা ছেড়ে দিলে কেন?’ লিখে কী হবে, আর লেখার জন্য তো পরিবেশ লাগে, নাকি?’

শেনিনের চুলোর তরকারি ধরে আসছিল বলে কথা আপাতত শেষ করতে হয়। অবশ্য তরকারি চুলোয় রেখে গ্যাসটা কমিয়ে দিয়েও সে কথা বলতে পারত। কিন্তু তার নিজের কাছে আশঙ্কা হয় রায়হানের সাথে কথা বলা যদি তাকে নেশার মতো পেয়ে বসে তাহলে নিজের জন্য নিজেই এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে। এমনিতেই কবিরা কথার যাদুকর।

আরও দু’টো-তিনটে দিন শেনিন চেষ্টা করে নিজের মন ঘর ও স্বামীতে নিবিষ্ট করতে। তার মতো এমন স্বামীভাগ্য তো আর সকলের হয় না। নিজের ভেতর সাধ্যমত একটা উৎফুল্ল ভাব আনতেও তৎপর হয়। প্রতি বেলায় ভাল ভাল খাবার রান্না করে, সেজেগুঁজে থাকে, গায়ে সুগন্ধী মাখে, গুণগুণ করে গান করে। কিন্তু এ সব কোনো কিছুই শফিকের চোখে পড়ে না। তবে এর মধ্যে সে দু’টো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে- শফিক এমনিতেই একটু বয়স করে বিয়ে করেছে তাই সে শেনিনকে সন্তান গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হতে বলে। দ্বিতীয়ত সে শুনছে শেনিন নাকি কি-সব কবিতা-টবিতা লেখে। ফলে পরামর্শ দেয়, ‘এ সব করে লাভ কী? বরং কনস্ট্রাকটিভ কিছুতে সময় দিতে পার। তোমার তো আর চাকরি করতে হচ্ছে না, একটা দু’টো প্রমোশন পেলে আমার আর টাকার কোনো অভাব হবে না। তুমি দিব্যি রাণীর হালে চলতে পারবে। অবশ্য এখনও তা একবারে অবসম্ভব নয়।’ শেনিন জানে এখনও শফিকের টাকার কোনো অভাব নেই। বেতনের তিন-চার গুণ অর্থ মাসে মাসে তার হাতে আসে। দামী একটি ব্রান্ডের মদও অল্প স্বল্প সে গ্রহণ করে। অবশ্য পয়সা দিয়ে তার কিনে খেতে হয় না, যারা নানা কাজে তার কাছে ঠেকে যায় এ রকম বহু লোক আছে তাকে এ সব উপহার দেওয়ার।

শেনিনের তবু মনে হয় তার চারদিকে কে যেন দেয়াল তুলে দিচ্ছে। সেই দেয়ালের ভেতর গুমোট বাতাস, সেখানে শেনিনের ইচ্ছের কোনো দাম নেই। আর সে দেয়াল চারটি ক্রমইে আরও তার নিকটবর্তী হচ্ছে। শফিকের সাথে এ ক’দিনের সংসারে সে বুঝতে পেরেছে সে মনে করে স্ত্রীর কোনো নিজস্ব অভিপ্রায় বা অভিরুচি অবান্তর কোনো বিষয়। শফিকের পরিপাটি পোশাকের আড়ালে সংকীর্ণ চেহারাটি ক্রমেই শেনিনের কাছে স্পষ্ট হয়। আর সেই সংকীর্ণতা স্পষ্ট হল শফিক যেদিন দুপুরে খেতে এসে ঘোষণা করল শেনিনের আলাদা সেলফোন ব্যবহার করা চলবে না। শেনিন বলল, ‘কেন?’

তোমার কাছে কত আজে-বাজে ফোন আসতে পারে। আপাতত ওটা ক’দিন বন্ধ রাখ। পরে দরকার হয় নতুন সিম তুলে নিও।’

‘এ সবের মানে কী?’

‘মানে বুঝতে পারছ না? আমি বাসায় আসার আগে রোজ বেলা ১১টার সময় তুমি কার সাথে কথা বল?’

শেনিন বুঝতে পারে শফিক বাড়ির ঠিকা কাজের মেয়েটার কাছ থেকে এই তথ্য সংগ্রহ করেছে। তা ছাড়া বাড়িতে আর তো কোনো প্রাণী নেই।

‘তুমি জাহানারার কাছে শুনেছ না?’

‘কার কাছে শুনছি সেটি বড় কথা নয়। কথাটা সত্যি কিনা সেটাই বড় কথা।’

‘কিন্তু আমি তো মনে করি কথাটা কে বলছে, কীভাবে বলছে সেটিও কম কথা নয়।’

‘আমার এখন সময় নেই। তুমি টেবিলে ভাত দাও অফিসে অনেক লোক বসে আছে আমার জন্য।’

শফিক মুরগীর মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে বেসিনের সামনে দু’মিনিট টুথপিক দিয়ে দাঁত খুঁচিয়ে সশব্দে কুলি করে। সে সময় শফিক শেনিনকে বলে, ‘রাত-বিরাতে ছাদে যাওয়ার অভ্যাসটা কি পুরনো? ভদ্র পরিবারে কি ওসব মানায়?’

‘ওÑ তাহলে তুমি টের পেয়েছিলে? রাতেই বলনি কেন আপত্তির কথাটা? আর আমাদের ফ্যামিলি কতটা ভদ্র না অভদ্র সে তুমি বিয়ের আগেই ভাল করে যাচাই করে নিয়েছ?’

‘তোমাকে একটু স্বাধীনভাবে চলতে দিয়ে দেখলাম তুমি কী কর।’

‘তার মানে আমি আসলে পরাধীন?’

‘তা বলছি না, তবে সব কিছু তো লিমিটের মধ্যে থাকাটাই ভাল, কি বল?’

বলতে বলতে শফিক শেনিনের মোবাইল ফোনের সিমটা খুলে নিজের মানিব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে রাখে। শেনিন কিছু বলে না, ক্ষোভে তার চোখে পানি আসে। শফিক বেরিয়ে গেলে কিছুক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে মানুষের চলাফেরার দৃশ্য দেখতে-দেখতে মাথার ভেতর বিচিত্র চিন্তা ও পরিকল্পনা বন্দী পাখির মতো ডানা ঝাঁপটাতে থাকে।

এর খানিকটা বাদে সে কি যেন সিদ্ধান্ত নেয়। চোখে-মুখে পানির ঝাঁপটা দিয়ে শেনিন ধীরে-সুস্থেই খাবার খায়। ব্যাগ গুছিয়ে পোশাক বদলে নেয়। তখন ঘড়িতে দুপুর দু’টো দশ। তিনটের গাড়ি পেলে সন্ধের খানিক পরই ঢাকায় পৌঁছে যেতে পারবে। ব্যাগ হাতে কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে উপজেলা অফিস পার হওয়ার সময় একটু ভয়ই লাগছিল শফিকের- অফিসের তিন-চারজন ওকে চেনে, গিয়ে আবার বলে না দেয়! রাস্তায় পাঁচ মিনিট রিকশা থামিয়ে ফোনের জন্য নতুন একটা সিম কিনে নেয়। ২:৪৫ মিনিটে বাসে উঠে প্রথম ফোনটা দেয় তার ছেড়ে আসা স্কুলে। প্রিন্সিপালকে বলে, ‘আই উড লাইক টু উইদড্রো মাই রেজিগনেশন লেটার, ইজ ইট পসিবল ম্যাডাম?’

প্রিন্সিপাল আনন্দের সাথে সম্মতি জানান। ‘তোমার জন্য বাচ্চারা মন খারাপ করে। ঠিক হয়েছিল তুমি বাই চান্স ফিরে এলে তোমাকে এবার ইনক্রিমেন্ট বাড়িয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু তুমি যে আসছ তোমার হাজব্যান্ড?’

‘ও ভাল আছে, বাকি কথা পরে বলব। গুড বাই ম্যাম।’

বাস ছেড়ে দিলে মাকে রিং দেয় শেনিন। ‘মা আমি ঢাকা আসছি।’

‘জামাইর কি ঢাকাতে কাজ?’

‘না আমি একা।’

‘তুই একা, এই অবেলায়?’

‘কোনো ভয় নেই, আমি একাই আসতে পারব।’

ফোনটা রেখে বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে শেনিন মায়ের শঙ্কাগুলো অনুমান করার চেষ্টা করে। তার খানিকক্ষণ বাদে ভাবে শফিক যখন বাসায় এসে দেখবে ঘর শূন্য তখন কী করবে সে? রাগে চুল ছিঁড়বে? শেনিনের মা-বাবার কাছে ফোন করবে? পুলিশে খবর দেবে? ও কি অফিসেও মানুষের সাথে এ রকম প্রভুর মত আচরণ করতে চায়? মাঝে মাঝে ওর কৃত্রিম গাম্ভীর্য দেখে শেনিনের মনে হত কি যেন সে আড়াল করতে চাইছে।

মা ছাড়া মুখস্থ আছে রায়হানের সেলফোন নাম্বার। ওকে তো ফোন দিতেই হবে। শেনিন ঢাকায় আসছে শুনে রায়হান কি খুব উচ্ছ্বাস প্রকাশ করবে? ও ফ্রি থাকলে কাল সারাদিন সেই আগের মতো ঘুরে বেড়ানো যাবে টিএসসি, চারুকলা, পাবলিক লাইব্রেরি প্রাঙ্গণ…। পুরনো লেখাগুলো ফ্রেশ করে পাঠানো যাবে পত্রিকাগুলোতে। বাসের গতির সাথে সাথে নিজের লেখা অনেক কবিতার চরণ মেঘের মতো বাতাসে উড়তে থাকে। শেনিনের এখন সেই মেঘের ভেতর দিয়ে উড়ে চলা পাখি হতে ইচ্ছে করে। সে খুব আশ্চর্য হয় মোহনপুর উপজেলা আবাসিক কোয়ার্টারের হলুদ রঙের সেই বাড়ি এবং সাড়ে চার মাসের চেনা বরকে না-বলে ছেড়ে এসে তার ভেতর কোনো ভয়, অনুশোচনা বা পিছুটান কাজ করছে না।

লেখক : কলেজশিক্ষক ও কথাসাহিত্যিক

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

SMS Alert

গল্প এর সর্বশেষ খবর

গল্প - এর সব খবর