thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫,  ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

শোক

২০১৪ জুলাই ২৭ ২০:০২:১৬
শোক

কাজী সিফাতউল্লাহ

চিকিৎসা সহায়তা পাবার আশায়, মুমুর্ষূ অবস্থায় অসহায় সালেহা বেগম শ্বশুর বাড়ি থেকে বাবার বাড়ির আশ্রয়ে এসে, বাপ-ভাইদের আশা পূরনের যথেষ্ট সময় ও সুযোগ না দিয়ে, ইহলোকের সকল কিছুকে ত্যাগ করে, সকল সম্বন্ধকে ছিন্ন করে, উপরন্তু তিন সন্তানকে এতিম করে গতরাতে একেবারে সরাসরি পরলোক গমন করেছে। পরলোক গমন যে করেছে তার নিশ্চিত প্রমাণ- স্বরূপ অন্য দু’দশ জনার মতো আত্মাশূন্য দেহটি রেখে যেতে ভোলেনি। সেই সূত্রে প্রমাণিত হওয়ার পর থেকে পরলোকগত অনুপস্থিত আত্মার জন্য জীবনের মতো সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া শোকাভিভূত উপস্থিত আত্মীয়-স্বজন আত্মাশূন্য দেহ ও দেহের গর্ভজাত তিন সন্তানকে ঘিরে শোক প্রকাশে ব্যস্ত। এই মুহূর্তে তাদের সম্মিলিত দীর্ঘশ্বাসের গরম বাতাস, কান্নার সুতীব্র আওয়াজ, শোক কথার হাহাকার, সান্ত্বনার মুহুর্মুহু উচ্চারণ দশ দিকের খানিকটা অঞ্চল সরব করে রেখেছে। এই সরবতার মাঝে ছোট্র একটি ছেলের নীরবতা অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মাত্রই ধরা পড়বে। কিন্তু শোক ধাক্কায় ঝাপসা হয়ে আসা দৃষ্টিতে অনুসন্ধানের ক্ষমতা থাকে না বলে বাঁচা। ঐ ছেলেটি আর কেউ নয়, তিন এতিমের ছোট এতিম সুজন। দু’সপ্তাহ পরে যার বয়স চার বছর পূর্ণ হবে। অনুদীর্ঘ এই বয়স সীমায় জীবন অভিজ্ঞতা শূন্য থাকায় বাস্তব-বুদ্ধিতে অপরিণামদর্শী শিশুমনটি ঘটনার উপরে ভেসে বেড়াচ্ছে। কোনোভাবে ঘটনার গভীর তলকে ঠাওরে উঠতে পারছে না। তবে ঘটনার ঘনঘটার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে উঠতে না পারলেও, আর তাতে শোকাভিভূত না হলেও, উদ্ভুত এ পরিবেশ তাকে আতঙ্কিত করছে যথারীতি। আর সেই আতঙ্কের চক্রান্তে সে বিরতি দিয়ে বার কয়েক কেঁদেছেও। কিন্তু তার ঐ কান্নাকে কোনোভাবে শোক বলা যাবে না। বড়জোর ভয় বলা যেতে পারে। আর এই ভয় উৎপাদনে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা রাখছে মায়ের পূর্ণনীরবতা, সবার অতি আদরের যন্ত্রণা। যদিও সে যন্ত্রণা সহ্য করার ধৈর্য্য তার এ মুহূর্তে পুরোপুরি রয়েছে। থাকত না যদি সে খানিক আগে শুনতে না পেত— বাবা আসছে ঢাকা থেকে। আর ঐ একই সংবাদ তার ভয়টাকেও কমিয়ে দিয়েছে আশ্চর্যভাবে। বাবাকে সে মহাশক্তিধর ভাবে। বাবা আসলে তৈরী হওয়া এই জটিলতা যে মুহূর্তে ঠিক হয়ে যাবে— এতে তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। সবাই বলছে মা মারা গেছে, আর কোনোদিন কথা বলবে না। মারা যাওয়াটা যে কী? এ বিষয়টি সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। এতক্ষণে তার কাছে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেছে, আসলে এ সব কিছু নয়। বাবাকে দেখার জন্য মা এ কৌশল করেছে। তাকেও বহুবার মারা যাওয়া দেখিয়ে ভয় দেখাত। পরক্ষণে আবার হেসে চমকে দিত। সে রকম ঘুমের ভান করেছে, এরা যে কী? এই সাধারণ ব্যাপারটি বুঝতে পারছে না। খামোখা হট্রগোল করছে। এর আগের বার বাবা যখন বাড়ীতে এসেছিল তখন মা ঠিক ওভাবে কথা বন্ধ করে বারান্দার একপাশে শুয়ে ছিল। নড়াচড়াও করত না। অবশ্য এখনকার মতো ঘুমের ভান করত না। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখত। বাবা আসার পর কয়েকদিনের মধ্যে মা বিছানা ছেড়ে দিব্যি হাঁটাচলা, কর্থাবার্তা শুরু করেছিল। কৈ সেবার তো সবায় বলত— প্যারালাইসিস না কি যেন হয়েছে— আর কোনোদিন কথা বলতে পারবে না, হাঁটাচলা করতে পারবে না। কিন্তু বাবা আসার পরে মা আগের মতো ভাল হয়ে গিয়েছিল। এবারও নিশ্চয় বাবাকে দেখার জন্য মা অমন মরার ভান করছে। বাবা আসলে যখন সব ঠিক হয়ে যাবে তখন দেখি এরা সব কি করে? যত্তোসব! এই ভেবে সুজনের হাসি পেল। কিন্তু পাছে সব গোপন কথা ফাঁস হয়ে যায় আর বাবাকে সবায় আসতে না করে দেয় এই ভয়ে সে হাসল না। বাবার আসায়-ই চাই।

বাবাকে সে খুব ভালবাসে। যদিও সে বাবাকে হাতে গোনা কয়েকবার দেখেছে। সবাই বলে তার বাবা নাকি ভীষণ বদ, তাদের মা ও তিন ভাইকে রেখে সংসারের কোনো দায়িত্ব পালন না করে দীর্ঘদিন থেকে বাইরে বাইরে থাকে। ঢাকায় আরেকটি বিয়ে করেছে। কিছু দিন আগে নাকি তার একটি সৎ-ভাই হয়েছে। ঢাকায় কে যেন টেলিফোন করে তার বাবাকে আসতে বলেছে। বাবার সম্পর্কে একটিও খারাপ কথা শুনতে ভাল লাগে না সুজনের। খুব রাগ হয়। এরই মধ্যে একটি কথা শুনে বেশ অবাক হয়েছে, বিরক্তিও জন্মেছে জমা হওয়া এ সব মানুষের উপর। সবায় বলাবলি করছে— তার বাবায় নাকি তার মাকে মেরে ফেলেছে। তাজ্জব ব্যাপার! বাবা এল কখন! আর মরে যেতে বললই বা কখন? বরঞ্চ বাবাকে দেখার জন্য মা এ রকম ভান করেছে। মারা যাওয়াটা যে কি! এতটুকু প্রত্যক্ষ জ্ঞান যার নেই তার পক্ষে পরোক্ষ প্রভাব বুঝে উঠা যে অসম্ভব— তা বলায় বাহুল্য।

ইস! মা যদি উঠে সবাইকে খুলে বলত ব্যাপারটা। না!না! সবাই জানলে বাবার আবার আসা হবে না।

এরই মধ্যে সুজন তার দূর সম্পর্কের এক মামাকে বলতে শুনল তার বাবা এলে সবাই মিলে তাকে মারবে। কথাটি শোনার পর থেকে তার ভয়টা আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। সে তার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক থেকে এমন কোনো নির্দেশনা পেল না যা দিয়ে সব কিছুর সমাধান করে ফেলা সম্ভব। বুকের মধ্যে হৃদপিণ্ড অস্বাভাবিক লাফালাফি করছে। আতঙ্কে একটু কাঁদলও। যে কান্নার ভুল মানে এ মুহূর্তে প্রত্যক্ষদর্শী মাত্রই নেবে— এতে কোনো সন্দেহ নেই। ভয়ে সে কাউকে কিছু বলতে পারল না। সবাইকে তার নিজের ও বাবার শত্রু বলে মনে হল। মুহূর্তে সে ভাবল সামনের বড় রাস্তার মোড়ে গিয়ে দাঁড়াবে। সবাই জানার আগে বাবাকে সে সাবধান করবে। চাই কি! সে আর বাবা পালিয়ে যাবে। পালিয়ে যাবার কথা মনে আসার সাথে সাথে তার মায়ের ভাবনাটা এসে গেল। মাকে রেখে সে কীভাবে যাবে? মা যে বাবাকে দেখতে চায়।

ইস! কোন কুক্ষণে যে মা মারা যাওয়ার ভান করতে গেল। অসুস্থ্য ছিল, ছিল ভাল। অসুস্থ্যতার কথা জানালে কি বাবা আসত না মাকে দেখতে? এখন মারা যাওয়ার ভান বুঝতে না পেরে সবাই ভাবছে বাবা মাকে মেরে ফেলেছে। আর বাবাকে এখন হাতের কাছে পেলেই মামারা মারবে। সুজন জানে বাবার উপর মামাদের রাগ আছে। কি করা যায়! ভেবে না উঠতে পেরে হঠাৎ তার মায়ের উপর ভীষণ অভিমান হল।

শিশুমনের ক্ষুদ্র আকাশ জুড়ে যখন নব নব অভিমান অভিযোগের নক্ষত্র উজ্জ্বল রূপে পরিপূর্ণ হতে লাগল তখন তার বাবা মেঘরূপে সব নক্ষত্রগুলোকে ঢেকে দেওয়ার উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সম্ভাব্য একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে তার মনোকাশের একপাশে স্পষ্ট হতে লাগল। সে এসে পড়লে পুরো আকাশটা আচ্ছন্ন করবে তাতে তার বিন্দুমাত্র সংশয় নেই।

সূর্য যখন মাথার উপর তখন সবাই ধরাধরি করে মৃতদেহকে গোসল করাতে নিয়ে গেল। সুজনের ব্যাপারটি ভাল লাগল না। কিন্তু খুব বেশী অবাক হল না। পূর্বেও সে দেখেছে সবাই ধরাধরি করে মাকে বাথরুমে নিয়ে যেত। ঐ যখন মা হাঁটাচলা করত না, কথাবার্তা বলত না। কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে দেখত। এবার যদিও তক্তার উপর শুইয়ে নিয়ে গেল। তবে সে আশ্চর্য্য না হয়ে পারল না যখন মাকে একদম দুধ-সাদা কাপড় পেঁচিয়ে আবার কাঠের একটি পাটাতনের উপর রাখল।

বাবা যে কখন এসে পৌঁছাবে?

দুপুর যখন পৃথিবীর এ খণ্ডের রূপ বদলের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে বিকালের হাতে সমর্পণ করল, ঠিক সে মুহূর্তে সুজনের বাবা তার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী-সন্তানসহ বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। মুহূর্তে লাশকে ঘিরে অভিনব শোকাচ্ছ্বাসের ঘটনা ঘটল। গোসল শেষে লাশটি সাদা কাপড়ে জড়িয়ে খাটিয়ার উপর রাখা ছিল। সুজনের বাবা খাটিয়ার লাশের উপর আছড়ে পড়ে, তারস্বরে উচ্চ কান্নার সুরে, অন্যের শ্রবণেন্দ্রিয়কে বিদীর্ণ করে শোক কথা আওড়াতে লাগল— ‘ওরে সালেহা! তুমি আমাকে রেখে কোথায় যাবা?আমিও তোমার সাথে যাব...।’

তার উচ্ছ্বসিত শোকের বেগ সম্মিলিত সান্ত্বনার বাঁধেও বাঁধা মানল না। বরং আরও দুর্দমনীয় হয়ে উঠল। তার শোকের স্রোতের তোড় এ মৃত্যু ঘটনায় অনন্য রূপ পেল। প্রথমে কিছু সময় তার এ শোককে সবায় সহমর্মিতা ও স্বাভাবিকভাবে নিল। পরবর্তী সময়ে কারও কারও কাছে সেটা বিরক্তিকর ও শোকাভিনয় মনে হল। সময়ের দীর্ঘতায় যখন শোকের বেগ বিন্দুমাত্র কমল না তখন সবাই নিশ্চিত হল— পুরোটা ভণ্ডামী ছাড়া আর কিছইু নয়। তার বাবা এমন বাড়াবাড়ি রূপে শোক প্রকাশ করার পরও যখন দেখল তার প্রতি সবার আগ্রহের অবনতি ঘটেছে এবং সকল আগ্রহের মূলে এসে দাঁড়িয়েছে অতি সত্ত্বর লাশ দাফন। তখন সে শোকের মাত্রা কমাতে কমাতে একেবারে থামিয়ে দিল।

পৌঁছে বাবার এ রকম অদ্ভুত আচরণ দেখে সুজন হকচকিয়ে গেল। ভয়ও পেল। প্রথম ধাক্কায় সে হতভম্ব হল। তাহলে কি মা সত্যি সত্যি মারা গেছে? মরার ভান করেনি! সবার কথায় ঠিক! সে একটু আগে শুনেছে মায়ের জন্য বাঁশ বাগানে কবর না কি যেন খোঁড়া হয়েছে। সেখানে মাকে রেখে আসবে। বাবা কি তাহলে কিছু করতে পারবে না। বাবা অত কাঁদছে কেন? বাবার অসহায়ত্ব দেখে বাবার উপর সুজনের খুব মায়া হল। আর মায়ার আপ্লুত রস যখন তার হৃদয়কে পুরোপুরি সিক্ত করল তখন মায়ের মৃত্যু চিন্তা তার কাছে আর গুরুত্ব পেল না। বাবার অসহায়ত্ব তার চিন্তাকে আকর্ষণ করল পুরোপুরি। এক সময় এ চিন্তার গতিপথে নিজেকে বাবার সহায় হিসেবে আবিষ্কার করল— সে আছে না! কিছু সময় পর সে চিন্তার পথও সামান্য পরিবর্তিত হল— এত বড় সহায় তাকে অবলম্বন করার বিলম্বতায়। তার আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতে লাগল। তারও পর বাবাকে কেন্দ্র করে তার মনে জমে উঠল পাহাড় পরিমাণ অভিমান। তার কথা একেবারে ভুলে গেল!

বাদ আছর, পড়ন্ত বিকাল। শবযাত্রা শুরু হল দাফনের উদ্দেশ্যে। আটজন খাটিয়ার চার হাতল ধরে কাঁধে নিয়ে চলল আগে আগে, পেছনে অন্যরা। সবার মন যখন শেষ বিদায়ের দুঃখে ভারাক্রান্ত একজনের মন তখনও প্রথম মিলনের চিন্তায় অভিমানে স্তব্ধ। দাফনের সমস্ত কাজ সমাধা হওয়ার পরও তা ওভাবে অপরিবর্তিত হয়ে রইল। এক প্রকার অভাব বা অসঙ্গতি থেকে হৃদয়ে অভিমানের সৃষ্টি হয়। হৃদয় যখন অভিমানী থাকে তখন অন্য অভাবের সৃষ্টি হলে তা অভিমানকে বাড়ায়, দুঃখ কিংবা শোককে নয়।

ছেলের অভিমান গাঢ় থেকে গাঢ় হতে লাগল আর বাবার উদাসীনতা তেমনি রয়ে গেল। একপক্ষের অভিমান যখন সম্বল আর অন্যপক্ষের উদাসীনতা। সে মুহূর্তে মিলনের সুর যে বাজে না তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে রইল পিতা-পূত্রের এই মিলন ব্যবধান।

সন্ধ্যা নেমেছে খানিক আগে। শোক ও শবযাত্রায় অংশগ্রহণকারীর দল অধিকাংশ চলে গেছে তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে। একান্তই কিছু আত্মীয়-জন রয়ে গেছে বাড়িটিতে, যাদের কেউ কেউ শোকের সামান্য আওয়াজ তুলছে থেকে থেকে। দিনের তুলনায় যা নগন্য। এভাবেই সময় যত বাড়বে অভাববোধের মাত্রা তত কমবে। সময়ের সাথে সাথে কান্না, দীর্ঘশ্বাস, স্মৃতি, বিস্মৃতির ধাপ পেরিয়ে হারিয়ে যাবে চিরতরে মানব হৃদয় থেকে পরলোকগত ব্যক্তিটি। এই হচ্ছে পৃথিবীতে আসা সাধারণ কাতারের মানুষের মিলিয়ে যাওয়ার ধাপ ও পরিণতি। যদিও অধিকাংশ মানুষের কারও না কারও সাথে অসাধারণ দৃঢ় বন্ধন থাকে। সে জনের ক্ষেত্রে অনুভবটাও অসাধারণ হয় বৈকি।

একবুক অভিমান নিয়ে সুজন তার নানার একপাশে খাটে শুয়ে আছে। প্রতিমুহূর্তে তার মনের রাজ্যে নিত্য-নতুন ভাবনা তৈরী হচ্ছে। এইমাত্র সে একটি নতুন ধারণাকে আবিষ্কার করল। আর আবিষ্কারের সাথে সাথে অভিমানের স্বরূপ ও লক্ষ্য বাবা পরিবর্তিত হয়ে ক্রোধ জমা হতে লাগল সৎ মা ও ভাইটির উপর। তার মনে হল-তার বাবা তার কাছে আসতে চাইছে কিন্তু আসতে দিচ্ছে না ওরা। তার ছোট্ট মনের গভীরে যখন ক্রোধানল প্রবল তেজে প্রজ্জ্বলিত হতে লাগল তখন কোত্থেকে ঘুম এসে ধীরে ধীরে তার শরীর মন পুরোপুরি দখল করে নিল। সে এবার ডুবে গেল ঘুমের রাজ্যে। কিন্তু ঘুমিয়েও নিস্তার পেল না দুঃস্বপ্ন থেকে।

ওদিকে সুজনের বাবা বারান্দার পূর্বকোণার ঘরটিতে তার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অবস্থান করছিল। মায়ের পাশে শুয়ে থাকা ছয় মাসের শিশু পুত্রকে বাবা গাল টিপে, চুমু দিয়ে, ফোঁকলা দাঁতের হাসি দেখার চেষ্টায় ছিল। একদিকে যেখানে সবচেয়ে আদরের উৎস মা হারিয়ে আরেক উৎস বাবা হারানোর ভয়ে অভিমানী শিশুটি ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখছে, অন্যদিকে তখন আরেকটি শিশু মায়ের কোলে শুয়ে বাবার আদর উপভোগ করে ফোঁকলা দাঁতে হাসছে। ঘুমন্ত চার বছরের সুজন জানতেও পারল না ছয় মাসের একটি শিশুর কাছে সে কীভাবে পরাজিত হল। জানলে হয়তো সব অভিমান, অভিযোগ ক্রোধ বাণ রূপ নিয়ে শুধুমাত্র বৈমাত্রীয় শিশু ভাইটিকে বিদ্ধ করতে চাইত।

সবার কোলাহলে খুব ভোরে সুজনের ঘুম ভেঙে গেল, সাথে দুঃস্বপ্নও। ততক্ষণে তাড়াহুড়া করে স্ত্রী-সন্তান ও ব্যাগ নিয়ে বাবা রওনা হয়েছে ঢাকার প্রথম গাড়ি ধরার জন্য। একবারও মা হারা সন্তানদের কাছে ডাকল না পর্যন্ত।

সুজন ঘর থেকে বারান্দায় এসে দেখল উঠানে অনেকে জড়ো হয়ে উচ্চস্বরে যার যার মতো কথা বলছে। আর বাবা এক হাতে শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে আরেক হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্ত্রীসহ উঠান পেরিয়ে রাস্তায় উঠেছে। এই দৃশ্য দেখে সুজন এক মুহূর্তে বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে গেল। রাতে দেখা দুঃস্বপ্ন মনে পড়ল। স্বপ্ন যে এভাবে সত্যি হয় তা তার জানা ছিল না। বিগত ঘুম জড়িত দেহ-মনের জড়তা ভেঙ্গে নতুন অভিজ্ঞতার ধাক্কা যখন সে সামলে উঠল ততক্ষণে বাবা বড় রাস্তা ধরে খানিকটা এগিয়েছে। সে আর এক মুহূর্ত দেরী না করে খালী পায়ে দৌড় লাগাল তাদের অনুসরণে। সবাই নাবালকের এ রকম আচরণে হতবাক হল। কিন্তু তাকে কেও বাঁধা দিল না, কেও পিছে পিছে গেল না। একেবারে বড় রাস্তায় উঠে দৌড় থামাল। ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন ভাব পুরোপুরি রয়েছে, রাস্তায় অন্য কোনো লোকজন নেই। কিছু দূরে বাবা যাচ্ছে, তারা কেও পিছনে ফিরছে না। সুজন এক পলক পেছন ফিরে দেখল তাকে ধরতে পিছে কেও আসছে কিনা? না, কেও নেই। তারপর সামনে বাবার অনুসরণ করে বেশ ব্যবধান রেখে হাঁটতে লাগল। তার সব আশা ভেঙ্গে চুরমার হতে লাগল। ভেতর থেকে উচ্ছ্বসিত আবেগ অশ্রু রূপে তার দু’চোখ বেয়ে নামতে লাগল। কান্নার বেগে তার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠল। এই মুহূর্তে তার পাশে এমন কেও নেই যে তার আবেগকে সামাল দেয়। পূর্বে বাবা যখন ঢাকা থেকে এসে আবার ফিরত তখনও সে কাঁদত, মা তাকে আদর যত্নে কোলে নিয়ে বিভিন্ন উপায়ে ভোলাত। বাবাও এভাবে উপেক্ষা করে চলে যেত না। অভিমানী মন নিয়ে অবহেলা, অপমানে সুজন ঝাপসা চোখে তাকিয়ে দেখতে লাগল বাবার চলে যাওয়া। কতক্ষণ সে দাঁড়িয়ে ছিল বলা যায় না। যখন সম্বিত ফিরে পেল তখন চোখের পানি মুছে চেয়ে দেখল তাদেরকে আর দেখা যাচ্ছে না। এই একটি অসাধারণ চলে যাওয়ার ঘটনায় সুজনের ক্ষুদ্র মনটিতে বাবা চরিত্রটি আজীবনের জন্য একেবারে সাধারণ হয়ে গেল। বুঝিবা বাবার অস্তিত্বটাই বিলীন হয়ে গেল। ক্ষুদ্র বুকে শূন্যতা নিয়ে সুজন যখন ফিরে চলেছে তখন মায়ের মুখটি তার কাছে স্পষ্ট হল সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে। এতক্ষণ পর্যন্ত সে মায়ের অভাবটা সেভাবে বুঝতে পারেনি। দাফন করার পরও তার কাছে ওটা বাবার উপেক্ষার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় নি। হবে কী করে? তার মহাশক্তিধর বাবা মনের পুরো আকাশ জুড়ে অবস্থান করছিল। সেখান থেকে যখন তার পতন হল তখন সে স্থান দখল করল তার আজন্মের সবচেয়ে আপন মুখটি।

এবার সে দিশেহারা । মা যে কী? মারা যাওয়াটা যে কী? অল্প সময় ব্যবধানে নাবালক সুজনের কাছে তা অনেকটা পরিষ্কার হল। এবার তার আরেকবার দৌড়ানোর পালা। বাবার পিছে পিছে নয়, মায়ের কবরের দিকে। সেখানে পৌছে তবেই সে দৌড় থামাল। বাঁশের চটার বেড়ার মধ্যে উঁচু করা মাটিতে খেঁজুর পাতা গোজা। তার পাশে গিয়ে থামল। দৌড়ানোর কষ্টে দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসে তার বুক উঠা নামা করতে লাগলো। মা! মা! বলে চিৎকার করতে লাগল। তার কান্নার শব্দ বাতাসে মিশে নবযৌবন সকালের বুকটা শুধু ব্যথিতই করল না, তাকে একটু বিশেষ করে তুলল, সাক্ষী করে রাখল একটি সত্যিকার শোক দৃশ্যের।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর