thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

শ্রাবণ ধারা

২০১৪ জুলাই ২৭ ২১:১৯:২৮
শ্রাবণ ধারা

দর্পণ কবীর
নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস এলাকার ফুটপাত দিয়ে আনমনে হেঁটে যাচ্ছিল রাজীব। সোনাচান্দি জুয়েলারি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ভীষণ চমকে উঠল ও। এ জুয়েলারির ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে নীলা। দীর্ঘ আট বছর পর নীলাকে এক ঝলক দেখেই চিনতে পারল ও। আট বছর নয়, আট হাজার বছর পরও নীলাকে এক দেখাতেই চিনতে পারবে রাজীব। নীলাকে দেখে রাজীবের ভেতরে মিহিন ভাঙাচোরা হতে লাগল। ও প্রথমে ভাবল নীলার সঙ্গে দেখা করবে না। কী হবে এখন দেখা করে? আজ এতদিন পর পুষে রাখা আগুনকে উস্কে দিয়ে কী হবে? এ প্রশ্ন ওর ভেতরে তোলপাড় তুললেও একটা অদৃশ্য টানও তীব্রভাবে অনুভূত হতে লাগল। রাজীব এগোতে গিয়ে টের পেল ওর পা যেন অনড় পাথর হয়ে গেছে। ও খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল ঐ জুয়েলারি শপের সামনে। দোকানের বিশাল আয়নার ভেতর দিয়ে ও অপলক দেখতে লাগল নীলাকে। এই কয়েকটি মুহূর্তে রাজীবের পৃথিবী লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। ওর ভেতরে আবেগ হলো বরফ গলা নদী। এক সময় নিজের কাছে হার অথবা জয় হলো নিজেরই। ও পা বাড়াল সোনাচান্দি জুয়েলারি দোকানের দিকে। ভেতরের কষ্টকে সামলে নেওয়ার চেষ্টাও করল। অনেক মানুষকেই জীবনের বিশেষ কোনো সময়ে নিজেকে সামলে নিতে হয়।

নীলা সোনাচান্দি জুয়েলারি শপে বিক্রয় প্রতিনিধির চাকরী করে। আজ ক্রেতার ভিড় নেই। ক্রেতা না থাকলে ও কাঁচের স্যুটকেসের মধ্যে রাখা স্বর্ণালংকার ভালভাবে সাজিয়ে নেয়। কখনো নতুন নতুন ডিজাইনের স্বর্ণালংকারের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। নীলা এই মুহূর্তে স্বর্ণালংকার সাজাচ্ছিল। রাজীব নীলার সামনে গিয়ে আলতো গলায় বলল—

‘আমাকে বিয়ের কনের জন্য একসেট ভাল গহনা দিতে পারেন?’

কণ্ঠ নয়, যেন বিদ্যুতের চমক। এই কণ্ঠে ভীষণ চমকে গেল নীলা। চোখ তুলতেই আরো গভীর বিস্ময়ের ধাক্কা! ওর চোখের সামনে রাজীব দাঁড়িয়ে আছে। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না ও। আর্তচিৎকারের মতো ওর কণ্ঠ থেকে অস্পষ্ট নাম বেরিয়ে এল-

‘রা-জী-ব!’

‘হ্যাঁ, এত অবাক হচ্ছ কেন?’

‘সত্যিই তুমি! আই মিন, তুমি আমেরিকায়! কীভাবে এলে!’

নীলার এই বিস্ময়ের সঙ্গত কারণ আছে, তা জানে রাজীব। নীলা যে রাজীবকে দেখেছে, সেই রাজীবের আমেরিকায় আসাটা পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যের ব্যাপারের মতোই। একেবারেই অবিশ্বাস্য। কিন্তু রাজীবের যে দিন বদলে গেছে, সে কথা তো নীলা জানে না। রাজীব কণ্ঠে বিস্ময় ছড়িয়ে বলল—

‘বাহ্, আমেরিকায় শুধু তোমরাই আসবে নাকি? ওপি-ডিভি বা বৈবাহিক কারণ ছাড়াও অনেকে এই দেশে আসতে পারে। তা জানো?’

‘না, মানে...!’

‘তুমি যে রাজীবকে চিনতে, সে ছিল বেকার ও ভবঘুরে। ব্যর্থ কবিও বটে। আজকের রাজীব সফল ও সচ্ছল একজন চাকরিজীবী।’

‘তাই নাকি! তা দেশে কি করছ?’

‘একটা এনজিওতে প্রজেক্ট পরিচালক পদে চাকরী করছি। নিউইয়র্কে এসেছি জাতিসংঘের একটি সেমিনারে অংশ নিতে।’

‘বলো কি!’

‘হ্যাঁ। এখানে এসে ভাবলাম, বাঙালী অধ্যুষিত এলাকা জ্যাকসন হাইটসে ঘুরে যাই। তাই এলাম। আর দেখো, তোমাকে পেয়ে গেলাম!’

নীলার মুখে কোনো কথা জোগায় না। ও ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে রাজীবের মুখের দিকে। ও এক নতুন রাজীবকে দেখছে। নীলার তন্ময়তা ভেঙ্গে দিয়ে রাজীব বলে,

‘অমন হা করে কি দেখছ?’

‘রাজীব আমি কেমন ঘোরের মধ্যে ডুবে আছি। সত্যিই কি আমার সামনে তুমি?”

‘হ্যাঁ, আমিই তোমার সামনে। তা কেমন আছ?’

ধাতস্ত হয়ে আসে নীলা। ওর শিরা-উপশিরায় কষ্ট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ও দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে। এটা ওর পুরানো অভ্যাস। রাজীবের সামনে অভিমান বা রাগ করলে ও ঠোঁট কামড়ে ধরে রাখত। কোনো কথা বলত না। এ দৃশ্যটা রাজীবকে কাঁপিয়ে দিল। ও তাগিদ দিয়ে বলল—

‘স্বামী-সংসার নিয়ে এই স্বপ্নের দেশে কেমন আছ, বললে না যে?’

‘ভালই আছি। তুমি?’

‘স্বাভাবিক এবং কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি।’

‘কেন তোমার স্ত্রীকে সময় দাও না?’

এ কথায় হো হো করে হেসে ফেলল রাজীব। ওর হাসিতে বিব্রত হয়ে পড়ল নীলা। ওর সহকর্মী নাজরা ওদের কথা শুনছে। তবে নাজরা বাংলা বুঝে না। ও ইন্ডিয়ান। তবুও রাজীবের সঙ্গে নীলার কথাবার্তা যে, ক্রেতা ও বিক্রেতার নয়, তা ও নিশ্চয় বুঝতে পারছে। তা বুঝুক। নীলা আজ ও সব নিয়ে ভাবতে চায় না। আট বছর পর রাজীবকে ও দেখছে। যাকে একদিন না দেখলে ওর কোনোকিছুতেই মন বসত না, আজ তাকে দেখছে আট বছর পর। ওর ভেতরে সে-কী উথাল-পাতাল ঢেউ বইছে! রাজীব হাসি থামিয়ে বলল,

‘স্যরি, অনেকদিন পর খুব হাসলাম।’

‘আমি কি হাসির কথা কিছু বলেছি?’

‘তা নয়। তবে...?’

‘তবে কি?’

‘না কিছু না। তুমি এই চাকরীটা কতদিন যাবত করছ?’

‘কথা ঘুরাবে না। আগে বলো, তোমার স্ত্রী কেমন আছে? তুমি কেমন আছ, ধনীর মেয়েকে বিয়ে করে?’

এই প্রশ্নের জবাবে রাজীব কী বলবে, তা ভেবে পাচ্ছে না। প্রশ্নটার জবাব দেওয়া যায় না। আবার এখন আর মিথ্যা বলা ঠিক হবে কিনা— তাও ভাবছে ও। নীলার কৌতূহলী চোখ প্রশ্ন হয়ে আটকে রইল রাজীবের বিব্রতকর মুখের দিকে। অস্বস্থিতে পড়ে রাজীব ভাবতে লাগল ও কী করে বলবে যে, ওর স্ত্রী বলতে কেউ ছিল না, এখনও নেই। তাহলে অনেক প্রশ্ন উঠবে। এর জবাব ও দিতে পারবে না। রাজীবের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠল আট বছর আগের দু’টো ঘটনার কথা। দু’টো ঘটনাই একটি অপরের পরিপূরক। আজ সে ঘটনার কথা নীলাকে বলা যায় না। স্মৃতির খামে বেদনার নক্ষত্র হয়েই থাকুক তা— ভাবে রাজীব। ওর মন ছুটে যায় ফ্লাশব্যাকে।

আট বছর আগের কথা। লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে রাজীব হন্যে হয়ে চাকরী খুঁজছে তখন। হতাশা, আক্ষেপ, স্বপ্ন ও সংগ্রাম ছিল ওর দিনলিপিতে। মধ্যবিত্তের টানাপোড়ন, অপ্রাপ্তির দহন, আর স্বপ্ন ভাঙা-গড়ার সাতকাহনে ভরা জীবনের সঙ্গে নীলাকে জড়িয়ে নিতে চেয়েছিল রাজীব। নিজের দারিদ্র্য নিয়ে ওর কোনো সংকোচ ছিল না। নীলাকে ভালবেসে ও জীবনের স্বার্থকতা খুঁজে পেত। কিন্তু একদিন ভালবাসার অন্য মানে এসে দাঁড়াল ওর সামনে। ভালবাসার মানুষকে ‘সুখী’ দেখার দৃষ্টি খুলে গেল সেদিন। নীলা’র মা ওর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিল। নীলা মায়ের আকুতির কাছে হেরে গেল রাজীব। একদিন সকালে নীলার মা এলেন রাজীবের মেসে। তিনি মায়ের দাবী নিয়ে রাজীবকে বললেন—

‘বাবা, আমি জানি, তুমি নীলার ভাল চাও। নীলার বাবা সামান্য একজন চাকরিজীবী। আমার আরও তিনটি মেয়ে আছে। অভাব-অনটনের সংসার। তুমি নিশ্চয়ই আমাদের সব কথা জানো।’

‘জানি, মা। আপনি কী বলতে চাচ্ছেন?’

‘নীলার জন্য একটি ভাল বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। ছেলে আমেরিকায় থাকে! নীলা যদি এই বিয়েতে রাজী হয়, আমরা বেঁচে যাই। ওর ছোট তিনটি বোনের ভবিষ্যৎও এই বিয়ের ওপর নির্ভর করছে বাবা। বিয়েটি একটি অসহায় পরিবারকে রক্ষা করতে পারে। কিন্তু নীলা এই বিয়েতে রাজী হচ্ছে না। একমাত্র তুমিই পার ওকে রাজী করাতে।’

এ পর্যন্ত বলে নীলার মা কাঁদতে লাগলেন। রাজীব বিব্রত ও বিষণœ হয়ে পড়ল। এক সময় ও বলল—

‘নীলাকে আমি কীভাবে রাজী করাব?’

‘আমি জানি না, বাবা। শুধু বুঝি, তুমিই পারবে ওকে রাজি করাতে। একজন অসহায় মাকে সাহায্য করো, বাবা! তোমার ওপর আমাদের ভাগ্য নির্ভর করছে।’

মাত্র কয়েক মুহূর্তে রাজীব ভেঙ্গে-চূড়ে কেমন বদলে যেতে থাকে। নীলার মায়ের কান্না আর আকুতির সামনে ও ত্যাগের মহিমাকে বেছে নেয়। একদিকে নিজের অসহায়ত্ব, অপরদিকে নীলা এবং ওর পরিবারের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের চিন্তার কথা ভাবিয়ে তোলে ওকে। এক সময় নীলার মায়ের আকুতিই জিতে যায়। রাজীব বলে,‘আপনি বাসায় চলে যান। দেখি, আমি কি করতে পারি।’

‘তুমি কথা না দিলে আমি যাব না, বাবা।’

অশ্রুভরা চোখ তুলে নীলার মা বলেন। রাজীব কথা দেয়। এ ছাড়া ওর আর কোনো উপায় ছিল না। নীলার মা চলে যাবার সময়ও বারবার বললেন—

‘তুমি কিন্তু কথা দিয়েছ, বাবা! যেভাবেই হোক, ওকে রাজী করাতে হবে।’

‘আচ্ছা!’

এরপর রাজীব নিজেকে খুব দ্রুত তৈরী করে নেয়। নীলাকে ফিরিয়ে দিতে গুছিয়ে একটি চিত্রনাট্য তৈরী করে। নীলাকে রাজীব পত্র লিখে জানিয়ে দেয় যে, ও একজন ধনী ব্যক্তির মেয়েকে বিয়ে করতে যাচ্ছে। ঝড় হয়ে ছুটে আসে নীলা। রাজীবের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বেদনা বিধুর কণ্ঠে বলে,‘সত্যিই তুমি বিয়ে করতে যাচ্ছ! টাকার লোভে...ছিঃ!’

‘নিজের দারিদ্র্যকে জয় করার অন্যকোনো পথ আমার জানা নেই। দারিদ্র্যকে মেনে নেওয়ার সাহস বা ইচ্ছা কোনোটাই আমার নেই। তাই, ধনী হতে আমি তোমাকে ত্যাগ করছি।’

‘ছিঃ রাজীব, ছিঃ!’

‘আমাকে ক্ষমা করো, নীলা।’

‘ক্ষমা? তোমাকে করুণা করতেও আমার রুচিতে বাঁধছে। তুমি ঘৃণারও অযোগ্য!’

সেদিন অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল রাজীব। নীলার অঝোর কান্নার সামনে পাষাণ পাথর হয়ে গিয়েছিল ও। নীলা ফিরেছিল ওর প্রতি একরাশ ঘৃণা নিয়ে। অথচ আজ ওকে দেখামাত্রই নীলা সব ভুলে কেমন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। নারীরা নদীর মতোই সব সহে যায়, বয়ে যায়। রাজীব সেদিনের কথাই ভাবছিল। নীলা বলল,

‘উদাস হয়ে কী ভাবছ?’

‘না, কিছু না।’

‘তাহলে চুপ করে আছ যে! বললে না তোমার স্ত্রী কেমন আছে? ছেলেমেয়ের বাবা হয়েছ কিনা?’

রাজীব এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বলে,

‘নীলা, আজ তোমাকে সত্যি কথাটি বলছি। আমি বিয়ে করিনি।’

‘কী বললে!’

‘তুমি শান্ত হও।’

‘সেদিন যে বলেছিলে...?’

‘সেদিন মিথ্যা কথা বলেছিলাম। ঠিক বলেছিলাম নয়, বলতে বাধ্য হয়েছিলাম।’

‘রা-জী-ব!’

‘নীলা তোমাকে না পাওয়ার দুঃখ আমার নেই। তুমি ভাল আছ, এ টুকুই আমার আনন্দ।’

‘চুপ করো! সেদিন কেন মিথ্যা বলেছিলে? দেবদাস হবার জন্য?’

এ কথা বলেই নীলা অঝোর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। ওর সহকর্মী নাজরা এই দৃশ্যে ‘হোয়াটস হ্যাপেনড!’ বলে চেঁচিয়ে উঠল। নীলা কান্না সামলানোর চেষ্টা করল না। রাজীব ওর কান্নার সামনে খুবই অপ্রস্তুত হয়ে গেল। ও নীলার কান্না দেখতে চায় না। রাজীব হঠাৎ হনহন করে দরোজার দিকে এগিয়ে গেল। পেছন থেকে কান্নাজড়িত গলায় নীলা ডাকল—

‘রাজীব!’

রাজীব ওর ডাকে সাড়া দিল না। পেছনে ফিরে তাকাল না। রাজীব ওর দু’চোখের শ্রাবণ ধারা দেখাতে চায় না নীলাকে। কিছুতেই না। ঝড়োগতিতে ও বেরিয়ে এল দোকান থেকে।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর