thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৮ কার্তিক ১৪২৫,  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

আমার কাছে ঈদ মানেই আত্মীয় সম্মেলন

২০১৪ জুলাই ২৭ ২১:৫১:২৪
আমার কাছে ঈদ মানেই আত্মীয় সম্মেলন

আরিফ সোহেল

‘আছে আনন্দ
বেদনার রঙে জীবনের গান
সেই গানই আমাদের একাত্ম
পরিজনের অশেষ ঐকতান।’

রহমান মাস্টারের পারিবারিক মিলনমেলা, তথা আত্মীয় সম্মেলন উপলক্ষে প্রকাশিত আলম শহীদের কবিতার ছত্রগুলো প্রত্যেক অনুপরিবারের কাছে নির্বিশেষে সত্যি।

সত্যি বলতে দ্বিধা নেই, আমার কিংবা রহমান মাস্টার পরিবার-পরিজনের কাছে ঈদ মানেই আত্মীয় সম্মেলন! অথচ আত্মীয় সম্মেলনের আয়োজনে বাহুল্য নেই, নেই আতিশয্য। এক কথায় একেবারে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই এখানে যাপিত হয় সামগ্রিক আয়োজন। তবে সর্বত্র থাকে সুরুচি ও পরিমিতিবোধের ছাপ। রহমান মাস্টার পরিবারের আত্মজনের ভেতর থেকে উত্থিত একান্ত আপনজনের মহাসমাবেশ মানেই সময়ের রথে চড়ে এখন এক বহুমাত্রিক বর্ণিল আনন্দ-উৎসব।

দুই শ’ গজও হবে না, প্রমত্তা পদ্মার গ্রাসমুখে দাঁড়িয়ে রহমান মাস্টারের বাড়ি। মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজংয়ের কনকসার গ্রামে সেই বাড়ি ঘিরেই প্রাণেপ্রাণে উৎসব। আয়োজনে নাড়ির টানে ছুটে আসে একদল মানুষ; কেউ আসে সেই সুদূর রাজশাহী থেকে, কেউবা টাঙ্গাঈল-ফরিদপুর-নারায়ণগঞ্জ-কিশোরগঞ্জ থেকে। আর ইট-পাথরের রাজধানীর অনুপরিবারের সদস্যদের নামে ঢল এখানে। ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজনে এক-দুই-তিন করে ভরে ওঠে রহমান মাস্টারের বাড়ির আঙিনা।

ঈদ আয়োজনের পরিমণ্ডলে একটি পরিবারকেন্দ্রিক আত্মীয় সম্মেলনের প্রপাগান্ডা নিয়ে কেউ প্রশ্নও তুলতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে রহমান মাস্টার পরিবার থেকে বেড়ে ওঠা অনুপরিবারের কাছে এই সম্মেলন যাপিত জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি সেই পরিবারেরই সন্তান। রহমান মাস্টারের মেঝ মেয়ের বড় সন্তান হিসেবে আমার কাছে ঈদের আন্ন্দ মানেই আত্মীয় সম্মেলন। ওই পরিবারকে আলাদা বৈশিষ্ট্য এনে দিয়েছে এই আয়োজন। রহমান মাস্টার পরিবারের আনুষ্ঠানিক আত্মীয় সম্মেলন শুরু ১৯৯১ সালে। ১৯৯২-৯৩ সালে মৃত্যুজনিত কারণে বন্ধ ছিল তা। কিন্তু এরপর আর থেমে থাকেনি আত্মীয় সম্মেলন। শুধু ২০০২ সালে অনভিপ্রেত কারণে শেষ মুহূর্তে আয়োজন বাদ দিতে হয়েছে। এবারের আয়োজন ২১তম। তবে ১৯৮৪ সালে আব্দুর রহমান মাস্টারের উত্তরসূরিদের এক সুতোয় বেঁধে রাখতেই এই উদ্যোগ-সূচনা। স্রেফ রহমান মাস্টারের মৃত্যুদিবস উদযাপন করতে গিয়ে সম্মেলন ভাবনার বীজ বপন করা হয়। যা কালের আবর্তে যুগাত্তীর্ণ ঐতিহ্যসম হয়ে উঠেছে পরিবারের সকল সদস্যের কাছে।

আত্মীয় সম্মেলন যাকে ঘিরে সেই আব্দুর রহমান মাস্টার সম্পর্কে কিছু কথা প্রাসঙ্গিকভাবেই বলা প্রয়োজন। দরিদ্র পরিবারের সন্তান রহমান মাস্টার। জীবন শুরুর আগেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। ৯ বছর বয়সেই তার শুভ পরিণয় হয়েছে ৫ বছরের মোমেনা খাতুনের সঙ্গে। শিক্ষার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ ছিল বলেই ম্যাট্রিক পরীক্ষায় দুর্দান্ত রেজাল্ট করেছেন। ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে যোগ দিয়েছেন শিক্ষকতার মহান ব্রতে। পাশাপাশি এক সচেতন মানুষ হিসেবে জীবনের শুরুতেই বেছে নিয়েছেন প্রগতিশীল আন্দোলনের লাল ঝাণ্ডা। আন্দোলন করতে গিয়ে চারবার খেটেছেন জেলও। কিন্তু সমাজ বদলের বিশ্বাসে, আদর্শে, জীবনচর্যায়, আচার-আচরণে এক চুলও ফাটল ধরেনি। বরং বাস্তব কর্মকাণ্ডেও আদর্শিকতার এক অতুলনীয় জনঘনিষ্ঠতাই তাকে একজন অসাধারণ মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যেখানে ভোগ-বিলাসিতা নয়, রাজনৈতিক ও দেশকর্মীর জীবনবোধ আর ত্যাগ-তিতিক্ষায় রহমান মাস্টারের জীবনকে অন্যন্য অসাধারণের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তার পাশে থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও একজন স্বশিক্ষিত মোমেনা খাতুন ছেলে-মেয়েদের মানুষের মতো মানুষ হওয়ার মন্ত্রে দিক্ষিত করেছেন আলোকবর্তিকা হাতে। রহমান মাস্টার পরিবারের শিক্ষা-সংস্কৃতির যে মশাল তিনি জ্বালিয়েছেন তা প্রজন্মান্তরে আলোর বাতিঘর হয়ে জ্বলছে। সেই আলোর শিখা অনির্বাণ প্রজ্বলনে আত্মীয় সম্মেলনের আয়োজন চলছে বিরামহীনভাবে।

অন্ধকার থেকে উঠে এসেছেন রহমান মাস্টার আর মোমেনা খাতুন। একেবারেই হতদরিদ্র পরিবার। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর যোগাড়। কিন্তু তারা জীবনের সঙ্গে কোনো আপোস করেননি। বিকিয়ে দেননি নিজদের। সত্য-সুন্দরের পথে তাদের নিরবচ্ছিন্ন লড়াই; এখনও এই পরিবারের সকলের কাছে বড় অনুপ্রেরণা। নতুন প্রজন্মই সেই সততা-বিশ্বাস আগলে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

রহমান মাস্টার-মোমেনা খাতুন থেকেই রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠছে একটি বৃহৎ পরিবার। রহমান মাস্টার পরিবারের শিকড়ে সন্তান ১৫ জন। এর মধ্যে ৮ ছেলে ৭ মেয়ে। এদের মধ্যে সময়ের আগেই বিদায় নিয়েছেন ২ জন। মূল পরিবারের থেকে এখন সদস্য সংখ্যা ১৩২। এর মধ্যে ২১ জন সদস্য প্রবাসে রয়েছেন রুটি-রুজি এবং কেউবা উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজনে। প্রতিবছর ঈদুল আজহায় বিদেশের সদস্যদের ছাড়া প্রায় সবাই এখানে এসে প্রাণ জুড়ায়। এই পরিবারের সদস্য যারা প্রবাসে রয়েছেন, তাদেরও মন পড়ে থাকে আত্মীয় সম্মেলনে। প্রবাসে থেকেও তারা থাকছেন আত্মীয় সম্মেলনের আষ্টে-পৃষ্টে বাধা। মন-দৈহিকভাবে উপস্থিত হতে না পারলেও আর্থিকভাবে সম্পৃক্ত থাকার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। কারণ রাজনৈতিক-সামাজিকভাবে উঁচুস্তরে অবস্থান করার পরও আর্থিক দীনতা এখনও এই পরিবারের নিত্যদিনের সঙ্গী। অনেকটা কবি নজরুলের কবিতার একটি ছত্রের মতো –‘হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছো মহান।’ কারণ রহমান মাস্টার পরিবার মানেই আর্থিক বিবেচনায় অদূরদর্শী এবং সমধিক অবিমৃষ্যকারী একটি পরিবার। কিন্তু জ্ঞান-গৌরব, শিক্ষা-দীক্ষায় একটি প্রাণোজ্জীবিত একটি সাংস্কৃতিক পাঠাগার।

এই পরিবার থেকেই গড়ে উঠেছে এক একটি অনুপরিবার। পরিবারগুলো ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে সারা বাংলাদেশে। কিন্তু তারপরও অনুপরিবার যেন এক ছাতার তলেই তার ডালপালা ছড়াচ্ছে এক অভিন্ন আকাশের নিচেই। আত্মীয় সম্মেলনকে ঘিরে কত আয়োজন। বিস্মিত হওয়ার মতো রয়েছে অনেক রসদও। রয়েছে প্রকাশনার মতো অনুসঙ্গও। যেখানে চোখ রাখলেই পরিবারকে চিনতে-জানতে কোনো বেগ পেতে হয়না। ছাপা হয় স্মারক ছবিও। সম্প্রতি শুরু হয়েছে ২/৩ বছর বিরতি দিয়ে ‘আমরা’ নামে একটি নান্দনিক প্রকাশনা বের করা। যেখানে ফোন নাম্বার থেকে শুরু প্রত্যেকের প্রোফাইলও জুড়ে দেওয়া রয়েছে। অনেক সদস্যই লেখক না হয়ে লিখেন নিজেদের প্রকাশনায়, ডুবে যান নস্টালজিয়ায়। শৈশব-কৈশোর আর আত্মীয় সম্মেলনের কথা নিজের মতো লিখে বনে যান পেশাদার লেখক! এই প্রকাশনার জন্যই একটি কমিটি করা হয়। যাদেরকে কাঠ-খড় পোড়াতে হয় ওই ভিন্নমাত্রার প্রকাশনা বের করতে।

আত্মীয় সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য অনেকেই প্রবল আগ্রহে নিয়ে চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করেন। কবে আসবে আত্মীয় সম্মেলন! গৎ-বাধা শহুরে জীবনের একঘেয়েমি সিকেয় তুলে ঈদ-উদযাপনের এই রীতি ক্রমেই এই পরিবারের কাছে আবহমানকালের ঐতিহ্য আরাধ্য হয়ে উঠছে।

আমি রহমান মাস্টারের মেঝ মেয়ের বড় সন্তান। গত ২৩ বছরে একটি ঈদেও আমি এই আয়োজনে না গিয়ে থাকতে পারিনি। পদ্মাবিধৌত নানা বাড়িতে ঈদ-উল-ফিতর উদযাপনের উৎসবমুখর পরিবেশের কথা মনে পড়লেই বর্ণিল আনন্দে চোখ ছানাবড়া হয়ে ওঠে। আত্মীয় সম্মেলনের আড়ালে যে নির্মল উন্মাদনার রঙ ছড়িয়ে রয়েছে; তা অকুণ্ঠ অবগাহন এখন পারিবারিক শিল্পকলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাই যখন একে এক কনকসারের রহমান মাস্টারের বাড়িতে সমবেত হয়; তখন আনন্দময়ী সৌরভের মৌ মৌ গন্ধ বাড়িময় ভেসে বেড়ায়। মহানন্দের রোশনাই আকাশ সীমানা অবদি ছড়িয়ে পড়ে। হয়ত সে কারণেই নির্ভেজাল আনন্দের কথা মনে করে সবার নাভিশ্বাস ওঠে, কখন যাব কনকসারে!

আয়োজনের বিশেষত্ব হচ্ছে এখানে মা-খালা-মামি-মেয়েরা রাজরানী। তাদের কোনো কাজ নেই। নেই থালা-বাসন ধোয়া-মোছার কাজ। নেই খাবার দেওয়ার জঞ্ঝাটপূর্ণ দায়-দায়িত্ব। তাদের কাজ খোশ গল্প আর পটের বিবি সেজে এপাড়া-ওপাড়া; কখনো নদীর ধারে কাশফুলে মিলেমিশে একাকার হওয়া। আর নিত্যদিন পদ্মার পানিতে ঝাপিয়ে-ডুবিয়ে সমুদ্রস্নানের স্বাদ গ্রহণ করা। রান্না-বান্নার সব কাজ কাজের লোকের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখানে চলে শুধু আমার মা- রহমান মাস্টারের মেঝ মেয়ে শরিফা বেগমের কঠিন তদারকি। তাকে পাশে থেকে হামেশাই সাহায্য করেন হেনা মাসি; কাজল মামী আর কচি মামী। বিশেষ রান্না আয়োজনে কখনো কখনো ছোট মামা চিকিৎসক শামীমের উনুন পাড়ে হাঁড়ি ঠেলার কাজটি চোখ সয়ে গেছে। কখনও আমার সহধর্মিনী রাজিয়া সুলতানা, রহমান মাস্টার পরিবারে বড় নাতনি কোহিনুর মনি, সেঝ মামি মাধবীর বিশেষ রেসিপির ঐচ্ছিক আয়োজন খাদ্য রসনাপ্রেমীদের বেশিমাত্রায় উদ্দীপ্ত করে। খাবার-দাবার পরিবেশনে আমার ছোট ভাই বিপ্লব-পলাশ-তুষারে নীতিবান হওয় যাওয়া গল্প মনে রাখার মতোই। নিজের বউ-মেয়ে-ছেলেদেরকে ‘বাড়তি’ একটুও নয় এই নীতিতে সারক্ষণ অটল তারা।

রাতের জলসাকেই অনেকেই সেরা মনে করেন সামগ্রিক আয়োজনে। এখানে একে এক গান গাইতে শুরু করে আমার ছোট্ট মেয়ে ৫ বছরে ব্রতি থেকে রহমান মাস্টার পরিবারের বড় সন্তান মাহবুব দিদার। বাদ যান না আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন। এই জলসার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে আমার ছোট মামা চিকিৎসক শামীম পরিবার। ওরা না হলে যেন আমাদের পরিবারের জলসাই জমে না। কখনও নাটক আয়োজন করে বিদিতা-মৌমিতারা আসরে এঁকে দেয় নতুন এক প্রণোদনা। আবার নিজের কথা-বুদ্ধিদীপ্ত পরামর্শও নিয়েও ঢের আলোচনা হয়। রাতের জলসায় কে কোন গান গাইবে সেই প্রস্তুতি আগে-ভাগেই নিয়ে আসে শিল্পীরা। উৎসব-আয়োজনে কখনও কখনও নেমে আসে মেঘকালো অন্ধকার, নেমে আসে এই পরিবার ছেড়ে যাওয়ার স্বজনদের জন্য ক্ষণিক কষ্ট-কান্না। নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। যেখানে খুব মনে পড়ে আমার বাবা; রহমান মাস্টার পরিবারের জামাতা প্রয়াত আরফানউদ্দিন আহমেদের কথা। অনেকেই আফসোস করে বলেন, ‘বড় ভাল লোক ছিল আরফান ভাই।’ কখনো সেজ মাসির অকাল মৃত্যু কথা মনে পড়ে যায়; তার বড় ছেলে পলাশের দরাজ কণ্ঠের ‘মায়ের এক ভাগ দুধের দাম...’ এই গানটি শুনে। অকাল মৃত্যুর কষাঘাতে চলে যাওয়া রুমি মাসির কথা মনে পড়লে বাকি হয়ে যায় পরিবেশ।

সেই ১৯৮৪ সাল থেকে আত্মীয় সম্মেলনের শুরু। প্রথম আয়োজন কলমায় হলেও এর পর থেকে রহমান মাস্টারের পরের প্রজন্ম কনকসারেই আয়োজনের রীতি চালু হয়েছে। প্রায় ৭ দিনের আয়োজন। উদ্যোক্তা থাকেন তার চেয়েও বেশি। অগ্রবর্তী বাহিনীর প্রধান হিসেবে সেঝ মামা ব্যাংকার রফিকুল আলম, আমার মা শরিফা বেগম আগে-ভাগেই কনকসারে হাজির থাকেন। কখনো কখনো অধ্যাপক আলম শহীদ, বড় মামার ছোট ছেলে তুষারও সেই বহরে সঙ্গী হন। বিছানাপত্র থেকে শুরু করে আয়োজনে খুনসুটিও তারা দেখভাল করে রাখেন। ফলে বড় আয়োজনের অনেক ছোট-খাটো সমস্যাও কেটে যায়। বিশালযজ্ঞ। একশ’ প্লাস মানুষের আয়োজন। প্রয়োজন অনেক টাকার। তাই টাকা পয়সার হিসাবটা বিন্দু-বিসর্গসহ তুলে রাখার দায়িত্ব তুলে নেন সেজ মামার। মাছ বাজার-কাঁচা বাজার টুকিটাকি কেনার দায়িত্ব বর্তায় আমার ছোট ভাই বিপ্লবের ওপর। তার সঙ্গে বড় মামার ছোট ছেলে শিল্পী তুষারকেও বেজায় পরিশ্রম করতে হয়। কখনো কখনো সেখানে সম্পৃক্ত হন কাজল মামা, খালাতো ভাই পলাশ। ঘুমানোর স্থান সঙ্কুলান যথেষ্ট না হলেও একবারে কম নয়। তারপরও খাতায় লিখে তালিকা করে দেওয়া হয় কে কোথায় ঘুমাবে সেই গন্তব্যের ঠিকানা। আমার বয়সী যারা; তারা এক সঙ্গে ঢালাই বিছানায় থাকে। যেখানে এক মশারীর নীচে আমরা ২০জনও ঘুমাতে পারি। চলে তাসের আড্ডা ওই বিরল মশারীরর ভেতরেই।

আত্মীয় সম্মেলনকে ঘিরে পরিবারের বড় জামাই মোহাম্মদ মুসার বাড়ি উৎসাহ সবাকেই আরো বেশি মুগ্ধ করে। বিশেষ করে বড় মাসি লক্ষ্মী যিনি হুইলচেয়ার ছাড়া চলতে পারেন না; তাকে কেন্দ্র করে বড় খালু মোহাম্মদ মুসার জীবনসঙ্গী হিসেবে দায়িত্ব-পালন সবাইকে বিস্মিত করে। আবার কখনো কখানো বড় খালুর ৫০টি রসগোল্লা খাওয়ার ঘটনা সবাইকে বিরল কল্পনার রাজ্যে নিয়ে যায়। মো. শাহজাহান খালুর রাহা খরচ চাওয়া আবদার; বিপ্লবের অর্নগল বকে যাওয়া; লেনিন মামার রাজনৈতিক জীবনের আজানা কাহিনীর উপস্থাপনা আরো বেশি পুলকিত করে।

নিয়ে তিনি এখনো বড়দের মতো ছোটরা যেন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা বনে যান। কনকসারে যাবারও আগেই মনে মনে ছক এঁকে ফেলে। পরিকল্পনা নাম্বার এক. পদ্মায় পানিতে অবিরাম ঝাপানো-ডুবানো। পরিকল্পনা নাম্বার দু্ই. সমর্পিত প্রাণে নির্ভেজাল আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে পথে কষ্টের কাসুন্দি না ঘেঁটে আত্মীয় সম্মেলনে যোগ দেওয়া। নাড়ির টানে ক্লান্তিকর ভ্রমণেও কোনো বিষণ্ণতার ছায়া পড়ে না। অনুপরিবারের সংকীর্ণতার চৌহদ্দি পেরিয়ে সবাই এক সুতোয় বাঁধা পড়তেই কনকসার অভিমুখে ছুটে আসে নির্ভার আনন্দে মাতোয়ারা হওয়ার উপলক্ষ খুঁজতে।

সেই কাকডাকা ভোরে তাজা মাছ কেনার জন্য বিপ্লব-তুষারের মাওয়াঘাট যাওয়া। তাদের নিত্য সঙ্গী ভিন জাতিসত্ত্বার সনৎ মামা (অধ্যাপক আলম শহীদের বন্ধু)। এক সঙ্গে ডাইনিংয়ে ভূরিভোজ। রাতের তাসের আড্ডা। আলাদা আলাদা গল্প-সাগরের ভেসে বেড়ানোর আনন্দটাই আলাদা। ছোটদের নিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন, মেধাভিত্তিক প্রশ্নোত্তর আয়োজন, দৌড়-ঝাঁপ ভিন্ন এক আবহ সৃষ্টি করে। কখনও টলার করে পদ্মার ভেসে বেড়ানো; চরে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো, ফুটবল-ক্রিকেটে মেতে ওঠার সাতকাহন। পদ্মার নির্মল বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে নেওয়া। যেন আনন্দের কোনো শেষ নেই। অনুপরিবারের সবাই নতুন এক প্রেরণা খুঁজে পায় এই উৎসব-সম্মিলনে। কখনো কখনো নামী-দামী ব্যক্তিদের সমাগমও আয়োজনের পরিধিকে আরও উৎসবমুখর করে তোলে।

দেখতে দেখতে দুই যুগ রহমান মাস্টারের পরিবার-পরিজন আত্মীয় সম্মেলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সবাই আসে প্রাণের টানে। কখনও কখনও ছেলেদের ঘুমানোর স্থানও থাকে না। থাকে না খেতে বসে শেষ বৈঠকে মাছের লেজটাও। কিন্তু নিটোল বিনোদনের মোহাবিষ্ট সবাই তা থোরাই নজরে নেয়। তবে কাউকেই বাধ্য করা হয় না এখানে আসার জন্য। কিন্তু আবার কেউ না এসেও পারেন না। এটা রক্তের অবিচ্ছেদ্য বাঁধন।

রহমান মাস্টার নেই। আছেন তার বড় সন্তান, উত্তরসূরি, আমার বড় মামা মাহবুব-উল-আলম দিদার। যিনি একজন সত্যিকারে মুক্তিযোদ্ধা, একজন আদর্শ ব্রতচারী শিক্ষক। আত্মীয় সম্মেলনকে ঘিরে অশীতিপর এই ব্যক্তির অপেক্ষার পালা যেন শেষ হয় না। বছরের ৩৬৫ দিন তীর্থের কাকের মতো তিনি অপেক্ষায় থাকেন কবে ভরে উঠবে তার আঙিনা পরিবারের আত্মীয়-স্বজনের কোলাহলে। আত্মীয় সম্মেলনে উপস্থিত হওয়ার পর তার চোখ দেখেই বোঝা যায় সবার আগমনে যারপরনাই খুশি তাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। খুশি সবাই। আত্মীয় সম্মেলনের আদলে এই আয়োজন যেন এক আদর্শিক পাঠশালা। এখানে নির্মল আনন্দের খোরাক যেমন রয়েছে; তেমনি রয়েছে আলোকিত সত্য-ন্যায়ের পথে চলার অনুপ্রেরণা। যা আমাকে অনেক বেশি প্রাণিত করে; আর্দশিক লড়াইয়ে শাণিত করে। আমি রহমান মাস্টার পরিবারের একজন হয়ে তাই আমি গর্ব করি, সৎ এবং সাহসী থাকার প্রেরণায় উজ্জীবিত হই।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

মুক্তমত এর সর্বশেষ খবর

মুক্তমত - এর সব খবর