thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫,  ১১ মহররম ১৪৪০

আমার একটা সুন্দর ছাগলছানা ছিল

২০১৪ জুলাই ২৭ ২২:২৬:০৭
আমার একটা সুন্দর ছাগলছানা ছিল

ফারুক নওয়াজ
আমাদের একটা শাদা ছাগলছানা ছিল। পাশের বাড়ির মোটি খালা কটা লম্বা কানঅলা বিদেশি ছাগল পুষত, ওদেরই ছানা ওটা। মোটি খালা দেখতে খুব মোটা ছিল। পাকিস্তানের লাহোরের মানুষ তারা। খুব ভালো মানুষ ছিল তারা। আন্নু, বাবুয়া, ইকবাল, নাসিম, বিবিয়া- এরা মোটি খালার ছেলেমেয়ে। ওদের এই ছানাটি আমার খুব পছন্দ হলো।

বললাম, ইয়ে বকরিবাচ্চা হামকো দেনা খালা। বহুত খুবসুরত বাচ্চি। দে না খালা!

খালা হেসে বলল, লে না বাপ। এই বলে আমার কোলে ওকে তুলে দিলো। আমি ওকে আদর করতে করতে বাসায় নিয়ে এলাম। মোটি খালার বাড়ি থেকেই কয়েকটা কাঁঠাল পাতার ডাল নিয়ে এলাম। ছানাটিকে কাঁঠাল পাতা খাওয়াচ্ছি আর গান গাচ্ছি- এক মেরা চান্দ, এক মেরা তারা... আম্মাকা লাডলিয়ে, আব্বাকা পিয়ারা...। এমন সময় মোটি খালার ছোট ছেলে বাবুয়া দৌড়ে এসে বলল, এই, তোম হামরা এতনা পিয়ারকা বাচ্চি লে আয়া! এই বলে সে ছানাটা কেড়ে নিতে উদ্যত হলো। আমি কি আর ছেড়ে দেয়ার পাত্র। বললাম, মোটি খালা দেয়া হামকো। হাম নেহি দেঙ্গা। তাতে কাজ হয় না। দিলাম একটা রামঘুষি। আমার ঘুষিটা একটু জোরেই পড়েছিল ওর নাকে। সে বিকট জোরে কাঁদতে লাগলো। উরদু কান্না। সেই স্বভাষার গালি- ইয়ে বাদালকা বাচ্চে হামকো তোম কিছলিয়ে মারা... হাম তোমকো দেখ লেঙ্গা... আঁ আঁ...আঁ...। ও কাঁদতে কাঁদতে মুহূর্তেই বাড়ির বাইরে গিয়ে আরও চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কাঁদতে থাকে। ওর কান্নায় জুটে যায় মহল্লার মানুষ।

ওরা বিহারি, ফলে ওর বিহারি পড়শি-পিচ্চিরা ক্ষেপে ওঠে বেশি। তারা আমার নাম ধরে ডাকতে থাকে, ইয়ে বাদালকা বাচ্চা, তোম ঘারছে নিকলাও, তোমকো দেখ লেঙ্গা , এইছা মারেঙ্গা বেহুঁশ বানা দেঙ্গা।

আমি ভয় না পেয়ে গ্রিলঘেরা বারান্দা থেকে জবাব দিই, হামকো উ খামচি দেয়া, হাম উছকো ছাড় দেঙ্গা নেহি! ঠিক কিয়া হাম! এমন সময় মা দৌড়ে আসে। কাণ্ড দেখে ভড়কে যায়। বাবুয়ার নাক থেকে রক্ত ঝরছে। ঘটনাটি আমার দ্বারা সংঘটিত হয়েছে জেনে কান ধরে পিঠ প্যাঁচিয়ে দমাদম থাপ্পড় কষিয়ে, বাবুয়াকে আদুরে সুরে ডাকল। বলল, আ না বাপ। হাম উছকো খানা নেহি দেঙ্গে। লে বাপ তেরা ছানা তু লে যা।

আমি কিল খেয়েও গোঁ ধরলাম, বকরি বাচ্চি হামারা, মোটি খালা হামকো দেয়া। ইয়ে হামারা। মা আমাকে আরও একটা গালসোজা চড় কষিয়ে বলল, উছকো দে দো, আমি তোকে এমন একটা ছাগল-বাচ্চা কিনে দেবো।

ও ছাগলছানাটা যখন নিয়ে যাচ্ছে... আমার দু-চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।

ও আমারি সমবয়সী, আমি পড়ি ক্লাস থ্রিতে, ও লাট্টু খেলে বেড়ায়। ওর আব্বু ঠিকাদার, আমার বাবা অফিসার। ওদের মাকান লাহোরে, আমাদের বাড়ি যশোরে। ওরা পোষে ছাগল, আমরা পুষি পায়রা। ভাবলাম, ছাগল-ছানাটা আমার চাই-ই। দরকার হলে আমার একজোড়া ঝোটন-বাঁধা পায়রার বদলে ওটা আমি নেবোই।

আমার মন খারাপ। সেদিন স্কুল ছুটি ছিল। ঘটনাটা ঘটেছিলো বিকেলে। কিছুক্ষণ পর বাবা বাসায় ফিরে আমার মন-খারাপ ভাবটা আঁচ করে বললেন, বাপু, কি হয়েছে তোমার? মা বকেছে বুঝি!

আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে হু-হু করে কেঁদে উঠলাম। বাবা আমার মাথায় হাত বুলোতে-বুলোতে মাকে ডাকলেন। মা ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা করল। বাবা শুনে একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, জানো তো বাবা, ওরা বিহারি, ওদের সংখ্যা বেশি এখানে। ওদের ছেলেকে তুমি মেরেছ। এটা যে কী করেছ তুমি... তুমি ছোট মানুষ তাই ভাবতে পারছ না। যাই হোক আমি ওর বাবার সঙ্গে দেখা করে ব্যাপারটার জন্য দুঃখপ্রকাশ করবো। অবশ্য, ওরা ভালো মানুষ। সমস্যা ওদের কমুনিটি নিয়ে। ওদেরকে ইন্ধন দেবে আশপাশের লোকজন। পরে আবার অনাকাঙ্খিত কিছু ঘটিয়ে দেবে।

বাবা এ বিষয়টা আলোচনা করতে না-করতেই মোটি খালা সেই শাদা ছাগল-বাচ্চাটা কোলে করে নিয়ে হাজির। এসেই চেঁচিয়ে বলতে থাকে, কিয়া হুয়ারে বাদাল, বাবুয়া তেরা বাচ্চি লে গিয়া নারে! এ লে তেরা বাচ্চি! আমার কোলে বাচ্চাটা দিয়ে মাকে বলে, তু লেড়কাকো মারা কাহে রে! মা বলল, থোরাছে বোঠকে যা বুজি। এই বলে মা তাকে চা-নাস্তা খেতে দেয়। এরপর দুটো পায়রা মোটি খালাকে দিয়ে বলল, যা কে বাবুয়াকো দে দো। উবি ছোটা বাচ্চাতো!

মোটি খালা বলল, না-না রাখ, কুছ নেহি লাগেগা। তবুও নিলো।

মোটিখালা চলে গেলে বাবা মা-কে হেসে বললেন, সব মানুষ সমান না। ওরা আসলেই ভালো মানুষ। নইলে ছেলের নাক ফাটানোর পরও উলটো ছাগল-ছানাটা দিয়ে আরও কত আন্তরিকতা দেখাল।

মা বললেন, তবে তোমার ছেলেকে একটু ভালো হতে বলো। ও এর আগেও আজগর বিহারির ছেলেকে মেরে কপাল ফুলিয়ে দিয়েছিল। সে জন্য নগত মাশুলও দিতে হয়েছিলো।

বাবা শুধু বললেন, তা ঠিক! না, বাদলু আর এমনটি করবে না।

পরদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে বাবুয়ার সঙ্গে পথে দেখা। সে রাস্তায় লাটিম ঘুরাচ্ছিলো। আমাকে দেখে বললো, তেরা চিড়িয়া বহুত আচ্ছারে... বাদাল। আমিও বললাম, তেরা বকরি বাচ্চিভি বহুত আচ্ছা, বাবুয়া... । বাবুয়া হাসল, আমিও হাসলাম।

আমি ওর নাম রাখতে চেয়েছিলাম টাট্টু খান। যেহেতু দেখতে সে টাট্টু-ঘোড়ার বাচ্চার মতো। ওই নামে ডেকেছিলামও কয়েক দিন। কিন্তু আমার পিঠাপিঠি বড়বোন কানিজ, সে ওকে ধলুয়া বলে ডাকতে লাগল। ওর গায়ের রঙ যেহেতু শাদা, সেহেতু এই ধলুয়া নামটাই সবাই লুফে নিলো। সেই থেকে আমার প্রিয় ছাগল-বাচ্চা টাট্টু খান হয়ে গেল ধলুয়া।

এই ধলুয়া আমাদের পরিবারে এমন অনিবার্য স্বজন হয়ে ওঠে যে আমরা তাকে ছাড়া এক মুহূর্ত ভাবতে পারি না। বাবা অফিস থেকে ঘরে ফিরেই ডাকবেন, কই ধলুয়া...। ধলুয়া ছুটে গিয়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যা-ব্যা করে ডাকতে শুরু করবে। অবশ্য মা তাকে ডাকলে সে ম্যা-ম্যা করে ডেকে ওঠে। এটা এক আশ্চর্য ব্যাপার। আমরাও ছাগল-ছানাটির মতো মাকে ম্যা-ম্যা করে ডাকতাম দুষ্টুমি করে। মা রেগে গিয়ে বলতো, তোদের চেয়ে ওই ছাগল-বাচ্চা অনেক সভ্য। আমরা হাসতাম তখন। আমি বলতাম, হ্যাঁ, মা! সেটা জানি বলেই তোমাকে ম্যা-ম্যা বলে ডাকি। তোমার সভ্য ছাগল-বাচ্চা আমাদের শিখিয়েছে। মা আর কী বলবে! হেসে নিজের কাজে চলে যেতো।

ওই ছানাটিকে নিয়ে আমাদের দিন কাটতো মহা আনন্দে। বড় ভাইয়া, বিস্কুট কিনে আনত ওর জন্য। বাবা আনত কাঁঠাল পাতা। বড় আপা ওকে দুধ-কলা মেখে ভাত খাওয়াতো। মেঝো বোন কানিজ, মানে শেফালি, সে খুব তেঁতুল আচার খেতো। ছানাকে আদর করে ওই আচার খাইয়ে বলতো, খা, আমার সোনার হরিণ ধলুয়া সোনামনি! আর আমি ছিলাম ওর সবচেয়ে বড়ো সেবক। শীতের দিনে কম্বলে ওর শরীর মুড়িয়ে বেঁধে দিতাম। স্বাস্থ্যের একটু উনিশ-বিশ দেখলে পশু-ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতাম।

দিন আমাদের ভালোই চলছিলো। এক বছর যেতেই বুঝলাম, ধলুয়া ছেলে-ছাগল। আমাদের মনে দুঃখ-দুঃখ ভাব। আহা... ওটা যদি মেয়ে-ছাগল হতো, ওরও ছানা হতো। তা এই দুঃখভাব পরে থাকে নি। ধলুয়া বড়ো জাতের ছাগল। খান-পাঠানের জাত। লম্বা হচ্ছে দিন-দিন। কান দুপাশে ঝুলে পড়ছে। শিং গজিয়েছে বেশ বাঁকানো এবং চোখা মতন। খাসবাংলায় ওটা রামছাগল। আহা বলাই হয়নি, ওটার গায়ের রঙ ধধবে শাদার ওপর খয়েরি ফোঁট-ফোঁট। যেন নতুন জাতের কোনো হরিণ।

তা আমাদের সেই সুখ বেশিদিন টেকেনি। আমরা আমাদের প্রিয় ধলুয়াকে রক্ষা করেতে পারিনি। আমাদের এই দেশটা তো তখন পাকিস্তানের একটা প্রদেশ ছিলো। সবাই বলতো পূর্ব পাকিস্তান। আর একটা অংশের নাম পশ্চিম পাকিস্তান। সে তো তোমরা সবাই জানো। যারা জানো না, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস পড়লেই ব্যাপারটা স্পষ্ট বুঝতে পারবে। সালটা ১৯৭০। সাধারণ নির্বাচন দেশে। আমাদের নেতা, বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর দল আওয়ামী লীগ। বাঙালির দল এটা। ভোটের মার্কা নৌকা। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, অবাঙালি, মানে বিহারীরা ততোই রাগে-ক্ষোভে ফুলে উঠছে। ওরা জানে, নৌকা মার্কা জিতলে শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী হবেন। তাহলে ওদের মাতব্বরি মিইয়ে যাবে। শুধু তাই-ই না, এই বাঙালিদের পূর্বপকিস্তানটাই হয়তো ওদের দেশের সঙ্গে আর থাকবে না। এমন ভাবার যথেষ্ট কারণও ছিলো। কারণ, পশ্চিমা অবাঙালিরা তখন আমাদের শোষণ করতো, শাসন করতো। পীড়ন করতো। অবহেলা করতো। ভালো চাকরি, উচ্চশিক্ষা, মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার ইত্যাদি থেকে তারা আমাদের প্রচণ্ডভাবে বঞ্চিত করতো। এজন্য বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে ছয়দফা নামে একটা দাবিনামা ঘোষণা দেন। তাতে ছিল বাঙালির স্বায়ত্বশাসনের দাবি। স্বায়ত্বশাসন মানে ভালোভাবে বাঁচার অধিকার। মানে, অনেকটা স্বাধীনতাপ্রাপ্তির মতো। এজন্য পাকিস্তানিরা ভাবতো শেখ মুজিব দেশের হর্তাকর্তা হলে বাঙালি স্বাধীনতা চাইবে। এ কারণেই বিহারী এবং ওই পাকিস্তানি অবাঙালি শাসকদের কাছথেকে সুবিধা পাওয়া কিছু ধর্মকেন্দ্রিক দলের লোকজন বাঙালিদের ওপর অত্যাচার শুরু করতে থাকে। তারা লুটপাট, ভাঙচুর, নির্যাতন এবং হত্যা শুরু করে।

বাবা বললেন, না, আর এখানে থাকাটা নিরাপদ নয়, আমরা কেঊ কিছু টের পাওয়ার আগেই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো। অনেকের বাড়ি লুট করেছে, অনেককে হত্যাও করেছে। আমাদের ওরা রেহাই দেবে না। এর মধ্যে হঠাত দেখি আমাদের ধলুয়া নেই। কোথায় গেলো সে? বাবা বললেন, খুঁজে লাভ নেই। খুঁজতে গিয়ে শেষে আর এক বিপদ হবে। আমি কাঁদতে থাকি। বোনরা কাঁদে। মায়ের চোখের কোণে অশ্রু জমে চিকচিক করতে থাকে। বাবা বললেন, দুঃখ করো না। যদি বাঁচি ধলুয়ার মতো আরো একটা সুন্দর ছাগল-ছানা পুষবো আমরা।

রাতে একজন খবর দিলো, তোমাদের বকরি-ছানা জবাই করে আমজাদ বিহারী বন্ধুদের নিয়ে ভোজ দিয়েছে।

বাবা বললেন, যাকগে, আমরা এজন্য কাউকে কিছু বলতে চাই না। বাবা মাকে বললেন, কাল ভোরের আজানের পরপরই আমরা চলে যাবো। বাসা ঠিক করে এসেছি। সঙ্গে কিছু নিতে হবে না, ঘরে তালা ঝুলিয়ে চলে যাবো। জানি এসব কিছুই আর আমরা পাবো না।

মা নিলেন একটা ব্যাগ, আর বাবার হাতে একটা স্যুটকেস। আমরা খালিশপুরের অনেক মায়া জড়ানো বাড়িটিতে সবকিছু ফেলে রেখেই বিহারীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে এলাম অন্য নতুন ভাড়া বাসায়।

তারপর তো ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধ। নয়মাসের রক্তস্রোতে ভেসে গেলো কতো জীবনের গল্প, কতো দুঃখ-শোক, কতো আত্মত্যাগ এবং সৃষ্টি হলো বাঙালির অহংকার আর বীরত্বের স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র। আমরা পেলাম প্রিয় দেশ। প্রিয় স্বাধীন পতাকা। পেলাম কণ্ঠভরা মাতৃভাষার গগন-উজাড়ী মুক্তির গান।

তারপর তো জীবন পালটে গেলো আমদের। নতুন দেশ। নতুন উচ্ছ্বাস। নতুন স্বপ্ন। নতুন ভাবনা। স্বাধীনতার জন্য কত নিকট স্বজন হারিয়েছি। সম্পদ হারিয়েছি। যা কিছু হারিয়ে গেছে, গেছে। না হারালে কি বড়কিছু পাওয়া যায়! বুঝি সবই। বুঝেও কেন এখনো সেই প্রিয় ছাগল-ছানা ধলুয়াকে ভুলতে পারি না, জানি না। তাকে এখনো আমি স্বপ্নে দেখি। কখনোবা একাকী আনমনে বসে থাকলে হঠাত ধলুয়াকে দেখতে পায়। চোখে নয়, মনে। সে আমার মনের চোখে ভেসে ওঠে। অদ্ভুত সুন্দর কান নাচিয়ে সে যেন আমার দিকেই ছুটে আসছে ...।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

ছেলেবেলাপুর এর সর্বশেষ খবর

ছেলেবেলাপুর - এর সব খবর



রে