thereport24.com
ঢাকা, রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

দড়ির উপর পাতলাদা

২০১৪ জুলাই ২৭ ২২:৩২:৫৯
দড়ির উপর পাতলাদা

মনি হায়দার
পাতলা দা পায়ের উপর পা তুলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। মুখ নড়ছে অনবরত। মুখে পান। পানের পিক ফেলার জন্য উঠে পিক ফেলে আবার চেয়ারে বসতে গেলে পাতলা দা হঠাৎ চেয়ারসহ মেঝেতে আশ্রয় নেয়। আশ্রয় নিয়েই কঁকিয়ে ওঠে— ওরে ওরে আমার কোমর ভাঙ্গছে...

পাতলা দা’র আর্তনাদে আমরা পড়ি কি মরি দৌড়ে পাতলা দা’র কাছে যাই। সবাই মিলে তাকে কোলে নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়ি। কারণ— তাকে রাখব কোথায়? তার বসবার চেয়ার— আমরা যাকে সম্মান জানিয়ে ময়ূর সিংহাসন বলি। অবশ্য বলি— আড়ালে। সামনে বললে ...। পাতলা দা’র চেয়ারের ডান পাশের হাতল নেই। পেছনের দু'টো পায়ার একটা পায়া নেই। নেই পায়াটা পাতলা দা কয়েকটি ইট জোড়া লাগিয়ে বানিয়ে নিয়েছে। আমাদের জুরাইনের গর্ব, ইন্টারন্যাশনাল পাঞ্জা লড়িয়ে, কুংফু কারাতের ব্লাক বেল্ট মাস্টার মিস্টার পাতলা খান কেন ভাঙ্গা এবং হাতলবিহীন চেয়ারে উপবেশন করে সেটা আমাদের কাছে বিরাট এক রহস্য। এই রহস্যর জট খুলবার জন্য সাগর একদিন সাহসের সঙ্গে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেছিল— পাতলা দা?

বল।— তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই—

কর।

তুমি কেন এই ভাঙ্গা আর হাতলবিহীন চেয়ারে বসো?

বসি আমি, তোদের অসুবিধা কী?

না, তুমি একজন জগৎবিখ্যাত মানুষ। লক্ষ লক্ষ মানুষ তোমাকে চেনে। কত রাজা বাদশা দেখার জন্য আসে— সবাইকে তুমি এই ভাঙ্গা চেয়ারে বসে সাক্ষাৎ দাও। এতে কি তোমার ইয়ে মানে মান-সম্মান থাকে? আমরা তোমার সাগরেদ— লোকেরা নানা কথা বলে।

পাতলা দা’র মুখে চিকন হাসি— কী বলে রে?

সে সব পরে বলব— আগে ভাঙ্গা চেয়ারে বসো কেন সেটা বল।

পানের পিক ফেলে পাতলা দা’ আয়েশ করে বসে— শোন, তোরাইতো বলিস আমি এ দেশের একজন ইন্টারন্যাশনাল নাগরিক। আমি সাদাসিদে জীবনযাপন করতে চাই— দেশ-বিদেশের রাজা বাদশারা এসে এই হাতলহীন ভাঙ্গা চেয়ারে আমাকে বসতে দেখে অবাক হয়। হয় না?

আমরা মাথা ঝাকাই— হ্যাঁ, হয়।

তারা দেশে ফিরে গিয়ে আমার এই চেয়ারের কথা তাদের লোকের কাছে অবাক বিস্ময়ের সঙ্গে বলে। বিনা খরচে আমার কেমন একটা প্রচার হয়ে যাচ্ছে দেশে এবং বিদেশে। এখন বল আমার বুদ্ধিটা কেমন?

পাতলা দা’র কথা শেষ হতে পারে না— সজারু চট করে পাতলা দা’র পায়ের ধুলো মাথায় নেয়— সত্যি পাতলা দা, তোমার বুদ্ধির কোনো তুলনা হয় না!

পাতলা দা’র মুখে গর্বিত হাসি। সজারু যেহেতু পাতলা দা’র পায়ের ধুলো মাথায় নিয়েছে— এখন আমরা না নিলে পাতলা দা’র শত্রু বনে যেতে হবে। অতএব আমরাও এক এক করে পাতলা দা’র পায়ের ধুলো মাথায় নিলাম। পাতলা দা’র মুখে বিরাট হাসি।

অনেকক্ষণ ধরে ইগলু ডান হাতে বাম গাল চুলকাচ্ছে। এই চুলকানোর মানে হচ্ছে সে একটা কিছু বলতে চায়। ওর দিকে তাকায় পাতলা দা— তুই কী বলবি বল, উজবুক কোথাকার!

না, মানে আমাদের ডেকেছ কেন?

হায় হায়— তোদের কেন ডেকেছি, এখনও বলিনি? পাতলা দা বেশ বিচলিত হয়ে ওঠে।

আমি ঝেড়ে একটা কাশি দিয়ে বলি— না, এখনও বলোনি। আমরা ঝাড়া সাড়ে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি।

পাতলা দা আকাশ থেকে পড়ল যেন— বলিস কি? আমি তোদের দাঁড় করিয়ে রেখেছি এতক্ষণ ধরে? তোরা আমাকে ক্ষমা করে দিস। তবে হ্যাঁ— পাতলা দা শরীরের পুরো ভার ছেঁড়ে দেয় তার মযূর সিংহাসনের উপর, এইবার তোদের যে খবরটা দেব— সেটা শুনলে তোদের মন ভীষণ ভালো হয়ে যাবে। বলব?

কি আশ্চর্য— সাগর অনেকটা রাগের সঙ্গে বলে— সেই কখন থেকে তুমি দাঁড় করিয়ে রেখেছ, আর এখন... সাগর কথা শেষ করে না।

ইগলু আবার ডান হাতে বাম গাল চুলকায়— ঠিক আছে, এখন বলো।

আমি একটা সার্কাস পার্টি বানাব— পাতলা দা’ খুব পাতলা স্বরে কথাটা বলে। আমরা তিনজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে তিনজনে একসঙ্গে তাকাই পাতলার মিটিমিটি হাসি মুখের দিকে।

তোরা আমার কথা বুঝতে পারিস নি, না?

আমরা তিনজনে একসঙ্গে মাথা নাড়াই। পাতলা দা’র মুখের মিটিমিটি হাসি এবার আকর্ণ বিস্তৃত হয়— আমি জানতাম তোদের মতো আলুবাখারার মাথায় আমার এই সব ইন্টারন্যশনাল আইডিয়া ঢুকবে না। পাতলা দা গভীর দুঃখে বিশাল একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে দাঁড়ায়, তার দীর্ঘশ্বাস আর একটু দীর্ঘ হলে হয়তো আমরা ভষ্ম হয়ে যেতাম। আমরা ভয়ে নিরীহ চমচমের মতো দাঁড়িয়ে থাকি—

শোন, গত মাসে আমাদের জুরাইনে ‘দি মাকাল ফল সার্কাস পার্টি’ এসেছিল না? সেই সার্কাসে কত কিছু না দেখাল— তোরাতো দেখেছিস। দেখেছিস না?

দেখেছি— আমি জবাব দেই। সে সব দিয়ে আমরা কি করব?

শোন গাধার কথা! পাতলা দা হঠাৎ অনেকটা উদাস হয়ে আমাদের সামনে পায়চারী শুরু করল। আমার পিঠে ইগলু একটা রাম চিমটি কাটে। আমি চিৎকার করতে গিয়ে থেমে যাই, কারণ— পাতলা দা একেবারে আমার সামনে দাঁড়িয়ে। কিন্তু পাতলা দা আমার দিকে না তাকিয়েই আপন মনে কথা বলতে লাগল— শোন, তোরাই আমার সাগরেদ, বন্ধু। তোদের কাছে আমার দুঃখের কথা সহজেই বলতে পারি। আমিতো জীবনে অনেক কিছু হওয়ার চেষ্টা করেছি কিন্তু কিছুই হতে পারিনি। এইবার আমার শেষ চেষ্টা—

পাতলা দা এবার তার দৃষ্টি আমাদের উপর রাখে— তোরা থাকবি আমার সঙ্গে? পাতলা দা’র কণ্ঠে মিনতি।

আমরা হাসব না কাঁদব— বুঝতে পারছি না। এই কি আমাদের পাতলা দা? যার সাহস আর শক্তি জগৎখ্যাত— যার ভয়ে পৃথিবী প্রায় কাঁপে, সেই লোক কি না— এইভাবে আমাদের কাছে মিনতি জানায়?

তুমি কি করতে চাও— সেটা আগে বলো— ইগলুর নরম কণ্ঠ।

আগেইতো বলেছি— আমি একটা সার্কাস পার্টি গড়ব। আমাদের সার্কাস লক্ষ্মণ দাস সার্কাস পার্টি। ছোটবেলায় মামাবাড়ী পিরোজপুরে লক্ষ্মণ দাস সার্কাস পার্টির সার্কাস দেখেছিলাম। সে পার্টি এখন আর নেই কিন্তু স্মৃতিটাকে নামের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখতে চাই।

সবই বুঝলাম কিন্তু এত ভয়ানক জীবজন্তু পাবে কোথায়? প্রশ্ন করে সজারু।

পাতলা দা তার ময়ূর সিংহাসনে বসে মৃদু হাসে— সেটা আমি গত তিন মাস ধরে ভেবেছি। ভেবে ভেবে সমস্যার সমাধানও অনেকটা করে ফেলেছি।

কি সমাধান করেছ? আমি জানতে চাই।

আফ্রিকায় আমার অনেক বন্ধু আছে— মনে নেই তোদের, বছর কয়েক আগে আমি পাঞ্জা লড়তে কেনিয়া এবং প্রশিক্ষণ দিতে মালাবী, উগান্ডা, জাম্বিয়া গিয়েছিলাম। সেখানে তখন আমার অনেক ভক্ত হয়েছিল। ওরাতো আমাকে ওদের দেশের স্থায়ী নাগরিক হওয়ার জন্য আবেদন এবং নিবেদন করেছিল। কিন্তু তোদের মায়ায় থাকিনি, চলে এসেছি। আমি না থাকলে তোদের কী হবে! কে তোদের পাহারা দেবে? এখন যদি ওদের কাছে এ সব জীবজন্তু চেয়ে পাঠাই, ওরা তিন দিনের মধ্যে জাহাজ, ট্রাক, ঠেলাগাড়ি বোঝাই করে পাঠিয়ে দেবে, বুঝেছিস?

আমরা উত্তেজনায় কাঁপতে থাকি। আফ্রিকার গভীর অরণ্যের জীবজন্তুর মালিক হওয়া কি কম? দুনিয়াশুদ্ধ লোক কিছুটা অবাক, কিছুটা আশ্চর্য, খানিকটা বিস্মিত না হয়ে পারবে না। তা ছাড়া জুরাইনের লোকজন, যারা আমাদের একটু ইয়ে চোখে দেখে, তারা কেবল তাজ্জব না— মহাতাজ্জব হয়ে যাবে। ওদের একটা উপযুক্ত শিক্ষা দেয়ার সুযোগ পাওয়া গেছে— ভেবে যখন শিহরিত হচ্ছি, ঠিক তখন বিড়ালের কণ্ঠে মসিবতের ঘণ্টা বাজালো সজারু।

পাতলা দা, তোমার আইডিয়াটা চমৎকার— এক কথায় অসাধারণ। কিন্তু—

বিকট চোখে তাকায় পাতলা দা— তোর মাথায় আবার কিন্তু এল কেন?

অবাক ব্যাপার— পাতলা দা’কে একটুও ভয় না পেয়ে জবাব দেয় সজারু— সার্কাস পার্টিতে কেবল জীবজন্তুই থাকে না। নানারকমের খেলাও থাকে। সে সব খেলা না থাকলে লোকে আমাদের সার্কাসকে সার্কাস না বলে বলবে চিড়িয়াখানা।

পাতলা দা’র মুখে উজ্জ্বল হাসি— ময়ূর সিংহাসনে বসে পা নাড়াতে নাড়াতে বলে— নারে ভোমলা, আমাদের সজারু সাহেবের মাথায় কেবল খাটি গোবর না, বেশ পাকা বুদ্ধিশুদ্ধিও আছে দেখছি।

এতক্ষণে ইগলুর মুখ ফোটে— পাতলা দা, সজারুতো ঠিক বলেছে। এই যে মাসখানেক আগে আমাদের জুরাইনে যে সার্কাস পাটি এসেছিল— তোতলাতে শুরু করে ইগলু— কি যেন নাম ছিল! কি যেন...

দি মাকাল ফল সার্কাস পার্টি— আমি বলি।

ঠিক— তো সেই সার্কাস পার্টিতে কতকিছু দেখেছি। একটা খেলাতো আমার খুব ভালো লেগেছিল। আমি বাসায় বেশ কয়েকদিন প্র্যাকটিসও করেছি।

উত্তেজনায় পাতলা দা সটান দাঁড়িয়ে যায়— কোন খেলাটারে?

ঐ যে মাথায় কলসী ভরা পানি নিয়ে হাঁটা, দৌড়ানো, মাটিতে শুয়ে থাকা...

পাতলা দা আচমকা জড়িয়ে ধরে ইগলুকে— ভেরি গুড। তুই দেখি আমার আগেই কাজ শুরু করে দিয়েছিস। তোকে দি লক্ষ্মণ দাস সার্কাস পার্টির জেনারেল ম্যানেজার বানিয়ে দিলাম— কেমন, খুশি তো?

ইগলুর চোখে মুখে হালকা লজ্জা রাঙা হাসির ছটা দেখতে পাই আমরা। সেই সঙ্গে একটু ঈর্ষাও অনুভব করি। সার্কাস পার্টির যাত্রার আগেই ইগলুর ম্যানেজারের চাকরী পাকা! আমাদের জন্য আর কি থাকল? যাও থাকল সবই ওর আন্ডারে। মনের দুঃখ মনে চেপে আমরা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করি। আমাদের দুঃখটা বোধহয় পাতলা দা বুঝতে পারে। তাই অমায়িক হেসে মধুর কণ্ঠে বলে— শোন, তোদের দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই। দি লক্ষ্মণ দাসের সার্কাস পার্টিতে অনেক লোক লাগবে— যেমন ধর, তোদের একজনকে দেব বাঘ— মানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারদের গার্ডিয়ান বানিয়ে। একজনকে দেব বনের রাজা সিংহ সাহেবদের প্রেসিডেন্ট বানিয়ে, কাউকে দেব জঙ্গলের পাহাড় অর্থাৎ হাতীদের হর্তাকর্তা বানিয়ে। তখন তোদের কাছে কত লোক আসবে— অনুনয় বিনয় করে বলবে— ভাই সাহেব, আপনার বাঘের পিঠে একটু চড়াবেন? তোদের দিকে লোকজন পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকবে—

পাতলার কথায় আমাদের দুঃখ নিমিষে হাওয়া। বরং আমরা ইগলুর চেয়ে অনেক ভালো পদ পেয়েছি। বাঘ-সিংহ দেখতে হলে ওর আমাদের অনুমতি লাগবে, বাছাধন— তাতে তুমি যতবড় ম্যানেজারই হও না কেন?

সবইতো হলো— কিন্তু আসল কাজটাতো হচ্ছে না— গম্ভীর কণ্ঠে বলে ইগলু।

কোন কাজটা? পাতলা দা সামান্য বিরক্ত।

সার্কাস পার্টির খেলাধুলা—

ঠিক বলেছিস। কিন্তু ঘাবড়ানোর কিছু নেই। তোরা কাল সকালে আমাদের পুরোনো বাড়িতে আসিস।

সেখানে গিয়ে কি হবে? জানতে চায় সাগর।

আয় সকালে, তখন দেখতে পাবি। হাই তোলে পাতলা দা— আমার ভীষণ ঘুম পেয়েছে। তোরা বাসায় যা— কাল দেখা হচ্ছে—

আমরা গভীর আনন্দ নিয়ে বাসায় ফিরলাম। সারা রাত উত্তেজনায় ঘুমুতেই পারলাম না। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি— আমি দি লক্ষ্মণ দাস সার্কাস পার্টির বাঘ ডিপার্টমেন্টের হেড গার্ডিয়ান। আমার কথায় আর ইশারায় সুন্দরবনের বাঘ উঠছে, বসছে, ঘাস খাচ্ছে, পানি পান করছে। যখন ইচ্ছে— বাঘের পিঠে চড়ে হাওয়া খাচ্ছিস সুন্দরবনের এ মাথা থেকে ও মাথায় দৌড় দিচ্ছি, মাঝে মধ্যে বাঘ মহিষ-হরিণ আর সিংহের মধ্যে দৌড় প্রতিযোগিতার আযোজন করছি— এক অদ্ভুদ আনন্দে আর শিহরণের মধ্যে কোনোভাবে রাত কাটিয়ে সকালে পাতলা দা’র পুরোনো বাড়িতে গিয়ে হাজির এবং চক্ষু চড়কগাছ। বাড়ির সামনে বিরাট উঠান, উঠানের পরে বিশাল পুকুর। সব জুড়ে প্রচুর মানুষ— সবাই গোল হয়ে কি যেন দেখছে! কাছে গিয়ে দেখি পাতলা দা’কে ঘিরে জটলা। পাতলা দা দু’তিনজনকে মাটিতে শুইয়ে কি সব বোঝাচ্ছে। আমাকে দেখে দাঁতমুখ বাঁকা করে খেঁখিয়ে ওঠে— এই তোর সকালে আসা? সবাই এসেছে সকালে আর তুই এসেছিস আটটায়?

কি করে বলি— সকাল আটটাও সকাল। বললে লোকগুলোর সামনেই আমাকে... না থাক, চুপ থেকে হজম করলাম সকালের বকা মানে -নাস্তা। প্রতিবাদ করলে দি লক্ষ্মণ দাস সার্কাস পার্টির বাঘ সমাজের মামা হতে পারব না। পাতলা দা কান ধরে তার সার্কাস থেকে বের করে দেবে। বইতে পড়েছি — বড় কিছু পেতে হলে অনেক কিছু ছাড় দিতে হয়। সুতরাং কথাটি নয়। আমার অবস্থা দেখে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ফিকফিক হাসছে- সজারু, ইগলু আর সাগর।

শোন, দয়া করে পাতলা দা আমার দিকে ক্ষমা ঘেন্না করে তাকায়— পুকুর পারে যা। আমি আসছি—

আমি বাঘের মতো ছুটতে শুরু করি পুকুরের দিকে। আমার পেছনে পেছনে সাগর, ইগলু আর সজারু। দৌড়ে পুকুরপারে পৌঁছে হাপাতে হাপাতে তাকাই— পুকুর ঘিরে চারপাশে প্রচুর লোক। পুকুরের মাঝ বরাবর একটা চিকন দড়ি টানানো।

দড়ি দিয়ে কী হবে?

পাতলা দা দড়ির উপর হাঁটবে, দৌড়াবে, রান্না করবে— বলে ইগলু।

বলিস কি? আমার কেমন অবিশ্বাস্য লাগছে।

অবিশ্বাসের কী হলো? পাতলা দা’র হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে আমাকে সাগর। সেই কাক ডাকা সকালে আমরা এসেছি। তারপর থেকে পাতলা দা একের পর এক তার ক্রীড়াশৈলী দেখাচ্ছে। দেখেতো চোখ ছানাবড়া—

প্রতিবাদ করে ইগলু— ক্রীড়াশৈলী না— সার্কাস শৈলী নাম রেখেছে পাতলা দা।

ঠিক বলেছিস— বলে সাগর।

রাগে আমার তালু ফেটে যাচ্ছে— এদিকে এতসব হয়ে গেল আর আমি কি না শেষ নবাবের মতো পরে পরে ঘুমুচ্ছিলাম? নিজেকে কোনোভাবে শান্ত করে জিজ্ঞেস করলাম— কী কী শৈলী দেখালো পাতলা দা?

গলা বাড়ায় সজারু— প্রথমে দেখালো পা দু’টো উপরের দিকে দিয়ে এক হাতে নাচ, ত্রিফলা বর্শার খেলা— খেলাটার সময়ে ভয়ে আমাদের চোখ বন্ধ হয়ে এসেছিল। তারপর একটা চিকন লাঠির উপর প্রথমে দুই পায়ে পরে এক পায়ে দাঁড়ানো—

এতসব পাতলা দা শিখল কখন? আমি জানতে চাই।

সেটা একটা রহস্য —গম্ভীর গলায় জবাব দেয় সাগর।

আমাদের দিকে আসছে পাতলা দা। তার পোশাক একদম চেঞ্জ। চোঙ্গা প্যান্টের সঙ্গে পাতলা হাওয়াই শার্ট, মাথায় বিশাল ক্যাপ, হাতে বাঁশের লম্বা লাঠি। তার পেছনে কয়েক হাজার মানুষের মিছিল। পাতলা দা দ্বিগবিজয়ী মহানায়কের মতো হেঁটে আসছে। বাতাসে লম্বা চুল উড়ছে— কী যে ভালো লাগছে!

পাতলা দা আমাদের সামনে দিয়ে হেটে সিঁড়ি বেয়ে দড়ির কাছে যায়। চারপাশের লোকজনের দিকে করুণা এবং নায়কোচিত চোখে তাকিয়ে, সামান্য হাত নেড়ে হাতের লম্বা বাঁশটি নিয়ে দড়ির উপর দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। অবাক বিস্ময়ে দেখছি আর ভাবছি পাতলা দা’র এই আশ্চর্য সাহস আর... পাতলা দা একেবারে দড়ির মাঝখানে চলে গেছে। লোকজন তালি দিচ্ছেতো দিচ্ছেই। তালি থামছে না। আমার ভাবনা থেমে গেছে... হা মুখে তাকিয়ে পাতলা দা’র এক শ’ একাদশতম আশ্চর্য র্কীতি দেখছি পলকহীন চোখে। পাতলা দা’ও লোকজনের আনন্দের আতিশয্যে দু’হাতে তালি দিতে চাইল, সঙ্গে সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষায় তার হাতের বাঁশটি হঠাৎ নিচে পরে চারদিকে পানি ছড়িয়ে দেয়। পাতলা দা ভারসাম্য হারিয়ে হঠাৎ দু’দিকে প্রচণ্ডভাবে দুলতে থাকে। সব লোকজন পাতলা দা’র দুলুনিকে অন্যরকম খেলা মনে করে দ্বিগুণ উৎসাহে তালি দিকে থাকে। কিন্তু আমরাতো বুঝতে পারছি পাতলা দা নিচের পুকুরে পরলে— পুকুরের মাছ রক্ষা করার জন্য পেতে রাখা গাছের বড় বড় ডালের সূচালো ফালে গেঁথে যাবে। পাতলা দা প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে— কিন্তু দড়ি তার দুলুনি ক্রমশ বাড়াচ্ছে— সেই সঙ্গে বাড়ছে দড়ির উপর পাতলা দা’র দুলুনি…

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

ছেলেবেলাপুর এর সর্বশেষ খবর

ছেলেবেলাপুর - এর সব খবর