thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ৯ কার্তিক ১৪২৭,  ৭ রবিউল আউয়াল 1442

সরকারি কর্মচারীদের আবাসন সংকট কাটছে না

২০১৩ ডিসেম্বর ০৩ ১৭:৪১:৩২
সরকারি কর্মচারীদের আবাসন সংকট কাটছে না

জোসনা জামান, দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক : রাজধানীতে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সংকট কাটছে না। এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও মাঝ পথে তা থেমে গেছে। এ সংক্রান্ত দুটি বড় প্রকল্পের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে ভৌত অবকাঠামো বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা সচিব ভুঁইয়া সফিকুল ইসলাম দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘এ প্রকল্প দুটির ব্যাপরে আপডেট আমার জানা নেই। তবে এ কথা বলতে পারি নির্বাচনের মাধ্যমে আগামি সরকার না আসা পর্যন্ত প্রকল্প অনুমোদনের কোন সুযোগ নেই। তাই এই সময় আর কিছু করারও নেই।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ সূত্র জানায়, আবাসন সংকট কাটাতে ঢাকার আজিমপুর সরকারি কলোনি এবং মতিঝিল সরকারি কলোনিতে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ জন্য ২০০৯ ও ২০১০ সালে দুটি পৃথক প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছিল পরিকল্পনা কমিশনে।

প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নের ফলে সরকারি চাকরিজীবিদের প্রকট আবাসিক সমস্যা সমাধান, জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হওয়া, সরকারি চাকরিজীবিদের জীবন যাত্রার মান বৃদ্ধি, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। শেষ পর্যন্ত কাজের কাজ কিছুই হয়নি। চলতি বছরই (২০১৩) এ দুটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণ করতেই শেষ হয়ে গেছে বর্তমান সরকারের মেয়াদ।

সূত্র জানায়, সরকারি চাকরিজীবিদের ঢাকা শহরে আবাসন সমস্যা অত্যন্ত প্রকট। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ আবাসন পরিদপ্তর চাহিদা অনুযায়ী আবাসন সমস্যার সমাধান করতে পারছে না। ফলে বাধ্য হয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের অধিকাংশ তাদের সক্ষমতার বাইরে অধিক মূল্যে ব্যক্তি মালিকানাধীন নিন্মমানের ভারা বাড়িতে থাকতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন তারা আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন অন্যদিকে তেমনি সামাজিকভাবে নানা সমস্যার সম্মুখীন হওয়ায় কর্মদক্ষতা হ্রাস পাচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে সরকার আবাসন সংক্রান্ত বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বললেও তার প্রতিফলন ঘটেনি।

সূত্র জানায়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সংকট মেটাতে আজিমপুর সরকরি কলোনিতে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত একটি প্রকল্পের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায় গৃহায়ন গনপূর্ত মন্ত্রণালয়। এটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১৭ কোটি ৯৬ লাখ ২৩ হাজার টাকা। বলা হয়েছিল আজিমপুর সরকারি কলোনির মধ্যে কিছু ছোট আয়তনের খালি জায়গা রয়েছে। যেখানে অধিক সংখ্যক আবাসিক ভবন নির্মাণের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। তাই আজিমপুর সরকারি কলোনিতে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ৩৬০টি ফ্ল্যাট বিশিষ্ট (প্রতিটি ১ হাজার বর্গফুট) ৬টি ১৬তলা ভবন এবং ১ হাজার ১৪০টি ফ্ল্যাট বিশিষ্ট (প্রতিটি ৮০০ বর্গফুটের) ১৯টি ১৬তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এছাড়া ২৪টি পুরাতন জরাজীর্ন ভবন ভেঙ্গে সেই স্থানে ২৫টি ১৬তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হবে। এইসব জরাজীর্ন ভবনে বর্তমান ৩৯২টি ফ্ল্যাটের পরিবর্তে নতুন ভাবে নির্মিতব্য ২৫টি ১৬তলা ভবনে দেড় হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে।

প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের সাইট প্ল্যানে ১৩ দশমিক ৯০ একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে আবাসিক ঘনত্ব বিদ্যমান প্রতি একর জায়গায় ২৮টি ফ্ল্যাটের স্থলে প্রতি বর্গ একর জায়গায় ১৭০টি ফ্ল্যাটের সংস্থান হবে। আবাসিক ভবন নির্মাণকালে ভূমিকম্প, ঝড়ঝঞ্জা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণসহ আনুষাঙ্গিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য আলোচ্য প্রকল্পে বিদ্যুৎ স্যানিটারী, অভ্যন্তরীন রাস্তাসহ আনুষাঙ্গিক নির্মাণ কাজ অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর মোট ৪২৩ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরে অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব করা হয়েছিল। ২০১১ সালের ৬ জানুয়ারি এ প্রকল্পের উপর প্রকল্প মূল্যায়ণ কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভার সিদ্ধান্ত মতে প্রকল্পের ব্যয় কমিয়ে ৪১৭ কোটি ৯৬ লাখ ২৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করে পুনরায় ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। ওই সময় এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের উদ্যোগও নেয়া হয়েছিল। অনুমোদন পেলে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ শেষ করার কথা ছিল গৃহায়ণ ও গনপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের।

কিন্তু ওই বছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) চরম অর্থ সংকট দেখা দিলে একনেক অনু বিভাগ অনুমোদনের জন্য একনেকে উপস্থাপন না করে প্রকল্পটি ফেরত পাঠায়। এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রকল্পটি ছোট খাট কিছু সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানো হলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে অজ্ঞাত কারণে তা আর ফেরত আসেনি।

অপর প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর মতিঝিল সরকারি কলোনিতে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ করার কথা ছিল। এ প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২৩ কোটি ৫৮ লাখ ১১ হাজার টাকা। এ প্রকল্পটিও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় চূড়ান্ত অনুমোদেনের জন্য উপস্থাপনের কথা ছিল। অনুমোদন পেলে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের কাজ শেষ করতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতায় গণপূর্ত অধিদপ্তর।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, রাজধানীর মতিঝিল সরকারি কলোনিটি ৫০ দশকের প্রথমদিকে নির্মিত হয়। এ কলোনির তিনটি জোনে সর্বমোট ১৭২টি ভবনে মোট ২ হাজার ৫১৫ টি ফ্ল্যাট রয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এ সকল ভবন প্রায় জরাজীর্ন হয়ে পরেছে। বিশেষভাবে হাসপাতাল জোনের ৯টি এইচ টাইপ ভবনের ৩৬০টি ফ্ল্যাট সম্পুর্ণরুপে ভগ্নদশায় পতিত হয়েছে। এ ৯টি ভবনের জন্য ১৬টি ফ্ল্যাট বিশিষ্ট একটি ভবন ইতোমধ্যেই ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। অবশিষ্ট যেসব ভবনে সরকারি চাকরিজীবিরা বসবাস করছেন তাদের অন্যত্র আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে তারা এসব ভবনে বসবাস করছেন। ভবনের কাঠামোদিক বিবেচনা করলে অবশিষ্ট ৮টি ভবনই সম্পুর্ণরুপে বসবাসের অনুপযোগী। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে স্থাপত্য অধিদপ্তরের সরবরাহকৃত নকশা অনুসরনে বিদ্যমান জরাজীর্ণ ৮টি ভবন অপসারণ করে সেই স্থানে ৪টি ২০তলা বিশিষ্ট নতুন ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি প্রনয়ন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এ সকল ভবনে বসবাসকারী কর্মচারীদের অনুকুলে হাইকোটের ২টি বৈধ স্থগিতাদেশ রয়েছে। আদেশে উল্লেখ রয়েছে বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ করা যাবে না এবং গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। নতুন ভবন নির্মাণের পূর্বে হাইকোটের এ আদেশ প্রতিপালন করা হবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ ছিল। প্রস্তাবিত ভবনসমূহ পিডব্লিউডির দখলকৃত সরকারি জায়গায় নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাই ভূমি ক্রয় বাবদ কোন অর্থ ব্যয় হবে না। প্রকল্পের ব্যয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের ২০০৮ সালের জুন মাসের রেট সিডিউল অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া প্রকল্পের আওতায় নির্মিতব্য ভবন সমূহের লিফট এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান জনবল দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে বলে ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়। প্রকল্পের প্রতিটি ভবনে অগ্নিকান্ডের সময় জরুরী নির্গমনের জন্য ৩টি সিড়ির প্রস্তাব ও প্রতিটি ভবনের নিচতলায় কমিউিনিটি সার্ভিস এবং গাড়ী পার্কিং এর ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ প্রকল্পটির উপর ২০০৯ সালের ৭ মে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্তসহ ওই বছরের ২৮ মে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে অনুষ্টিত এডিপি পর্যালোচনা সভার সিদ্ধান্ত মতে প্রকল্পের ডিপিপি মোট ১২৪ কোটি ৫৫ লাখ লাখ ব্যয় ধরে পুর্নগঠণ করে ২০১০ সালের ৩১ মে পুনরায় পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। এ প্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ৬ জানুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনে দ্বিতীয়বার প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত মতে প্রকল্পের ব্যয় ১২৩ কোটি ৫৮ লাখ ১১ হাজার টাকা নির্ধারণ করে প্রকল্পের ডিপিপি পুর্নগঠন করা হয়েছে।

এ প্রকল্পের আওতায় মূল কার্যক্রম ছিল ৪ টি ২০ তলা ভবনে ৬০০ বর্গফুটের ৬০৮ টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা। প্রতিটি ভবনে অভ্যন্তরীণ বিদ্যুতায়ন, গ্যাস সংযোগ, বহিঃপানি সরবরাহ, সাইট অফিস, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, অগ্নি নির্বাপক, উচ্চ মান সম্পন্ন লিফট, মটর পাম্প, ইন্টারকমসহ ৩০০ কেভিএ অটো স্টার্ট ডিজেল জেনারেটর ক্রয় ইত্যাদি কার্যক্রম অর্ন্তভুক্ত ছিল।

এ প্রকল্পটির বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, প্রকল্পটির বিষয়ে সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে এসেছে। এ প্রেক্ষিতে মতিঝিল সরকারি কলোনির নির্ধারিত স্থান পরিদর্শন করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে এখনো জরাজীর্ণ ভবনে সরকারি কর্মচারীরা বসবাস করছেন। তাদের সরানো যাচ্ছে না। এ অবস্থায়ই বর্তমানে প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণের কাজ স্থগিত হয়ে আছে। অন্যদিকে সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ায় বর্তমান অবস্থায় একনেক বৈঠকও আর বসছে না।

(দ্য রিপোর্ট/জেজেইড/এমসি/ডিসেম্বর ০৩, ২০১৩)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

অর্থ ও বাণিজ্য এর সর্বশেষ খবর

অর্থ ও বাণিজ্য - এর সব খবর