thereport24.com
ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫,  ১৩ মহররম ১৪৪০

সত্যজিতের চোখে রবীন্দ্রনাথ

২০১৪ আগস্ট ০৬ ০১:২৪:৩৮
সত্যজিতের চোখে রবীন্দ্রনাথ

দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক : ‘রবীন্দ্রসৃষ্ট শব্দ, সঙ্গীত ও কাব্যের ঐতিহ্য; চিন্তা ও আদর্শের ধারা, তার রচনা ও গানের সুরে রয়েছে আমাদের আজ ও আগামীকে সঞ্চালিত করার অসীম ক্ষমতা।'- রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রের শুরুতে ধারাভাষ্য হিসেবে এ কথাগুলোই ব্যবহার করছিলেন প্রবাদপ্রতিম চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়।

বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতি পুরোপুরিই দাঁড়িয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসাধারণ কৃতিত্বের ওপর ভর করে। তার রচিত উপন্যাস ও ছোটগল্প নিয়ে যুগে যুগে সেলুলয়েড কিংবা মঞ্চে উপস্থাপিত হয়েছে সিনেমা, দৃশ্য ও শ্রুতি নাটকসহ অপরাপর উপস্থাপনা।

বাংলা সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরই যার নাম উচ্চারিত হওয়া উচিত তিনি হলেন সত্যজিৎ রায়। সত্যজিৎ রায়কে চলচ্চিত্র কিংবা সেলুলয়েড জগতের রবীন্দ্রনাথ বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না।

তাই এক কিংবদন্তির ভাবনায় আরেক কিংবদন্তি কেমন ছিলেন, তা জানতে নিশ্চয়ই আগ্রহী সাহিত্যসহ সকল সেলুলয়েডপ্রেমীরাও।

বালক সত্যজিতের বয়স যখন ১০, তখন পৌষমেলা দেখার জন্য শান্তিনিকেতন গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন মা সুপ্রভা রায়। নতুন অটোগ্রাফের খাতা কেনা হয়েছে। ছোট্ট সত্যজিতের ভীষণ শখ, প্রথম আটোগ্রাফটা নেবেন রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে। এক সকালে মায়ের সঙ্গে সত্যজিৎ চলে গেলেন উত্তরায়ণে। পারিবারিকভাবে ঠাকুর পরিবার আর রায় পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিনের সুন্দর সম্পর্ক ছিল। সত্যজিতের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন। আর পিতা সুকুমার রায় ছিলেন বিশ্বকবির পরম স্নেহভাজন।

১০ বছরের বালক সত্যজিৎ রায়, যাকে মানিক নামেই রবীন্দ্রনাথ চিনতেন, বিশ্বকবির সামনে কিছুটাইতস্তত ভঙ্গিতে অটোগ্রাফের খাতাটা নিয়ে দাঁড়াতেই কবি পরম স্নেহে কাছে টেনে নেন তাকে। জানতে চাইলেন, খাতা নিয়ে সে কেন এসেছে? বালক মানিক খাতাটা এগিয়ে দিয়ে তার ইচ্ছার কথাটা ব্যক্ত করলেন। কবি তার দিকে কিছুক্ষণ তাকালেন। তারপর পরম স্নেহে বললেন, ‘এটা থাক আমার কাছে; কাল সকালে এসে নিয়ে যেও।’

কবির আদেশ অনুযায়ী মানিক পরদিন কবির বাড়িতে গেলেন। টেবিলের উপর চিঠি-পত্র, খাতা-বইয়ের ডায়েরি। তার পেছনে বসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মানিককে দেখতেই তার ছোট্ট বেগুনি খাতাটা খুঁজতে লাগলেন সেই ভিড়ের মধ্যে। মিনিট তিনেক হাতড়ানোর পর বেরোলো খাতাটা। তারপর সেটা তাকে দিয়ে মা সুপ্রভা রায়ের দিকে চেয়ে বললেন, ‘এটার মানে ও আরেকটু বড় হলে বুঝবে।’ খাতা খুলে বালক সত্যজিৎ আট লাইনের ভুবনজয় করা কবিতাটা দেখল। বিশ্বকবির ঘর থেকে বের হয়ে উত্তরায়ণের সামনের যে বিশাল আমগাছ, তার নিচে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে আবৃত্তি করতে লাগলো-

বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা
দেখিতে গিয়েছে সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশির বিন্দু॥

একটানে আটটি লাইন আবৃত্তি করে কিছুক্ষণ থামল সে। তারপর দম নিয়ে লাইনগুলোর নিচের শব্দগুলো উচ্চারণ করল- ৭ই পৌষ ১৩৩৬ শান্তিনিকেতন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ততক্ষণ মা এসে পেছনে দাঁড়িয়েছেন। জানতে চাইলেন লাইনগুলোর মানে বুঝেছে কি-না। সে তখন অল্প মাথা ঝাঁকিয়ে জানাল, ‘কিছুটা’।

আসলে তখন কবিতাটি কিছুটা বুঝলেও হয়তো ১০ বছরের এ বালক এটা কখনই বুঝতে পারেননি যে, তিনি নিজেই আরেক রবীন্দ্রনাথ হতে চলেছেন। তবে বালক বয়সেই বিশ্বকবির এ আটটি লাইন মনের অজান্তেই গভীরভাবে ধারণ করেছিলেন। ফলে ফর্মে আন্তর্জাতিক হলেও বিষয়ে প্রচণ্ডমাত্রায় দেশজ হতে পেরেছেন আর একটানে বাংলা চলচ্চিত্রকে বিশ্বের চলচ্চিত্র কাতারে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন।

১৯৪১ সালে কলকাতা শহরে যেন সত্যি সত্যিই বাংলার সূর্যের প্রয়াণই ঘটেছিল। শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণই যেন নয়; বাংলা সংস্কৃতির রবিই যেন অস্তমিত হয়েছিল সেদিন।

‘এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার দেহের নিরাকরণ ঘটলেও তিনি পেছনে রেখে গেলেন এক মহান ঐতিহ্য, দাহের কোনো আগুনই যাকে আজ অবধি গ্রাস করতে পারেনি। এই ঐতিহ্য হলো- রবীন্দ্রসৃষ্ট শব্দ, সঙ্গীত ও কাব্যের ঐতিহ্য; চিন্তা ও আদর্শের ঐতিহ্য। তার সৃষ্ট রচনা, গানে, সুরে রয়েছে আমাদের আজ এবং আগামীকে সঞ্চালিত করার অসীম ক্ষমতা।’- এমন কথাই সত্যজিৎ রায় তার রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রের (Rabindranath Tagore) শুরুতে ধারাভাষ্য হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

সত্যজিৎ রায় রবীন্দ্রনাথের চারটি ছোটগল্প ও একটি উপন্যাস- সমাপ্তি, মণিহারা, পোস্টমাস্টার, নষ্টনীড়, ঘরে বাইরে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে সত্যজিৎ নির্মিত তিন কন্যা শুধু রবীন্দ্র কাহিনীনির্ভর চলচ্চিত্রেই নয়; সর্বভারতীয় সিনেমার ক্ষেত্রেও এক অনবদ্য শিল্প নিদর্শনরূপে ইতিহাস হয়ে আছে।

(দ্য রিপোর্ট/পিআর/আইএফ/এজেড/আগস্ট ০৬, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জলসা ঘর এর সর্বশেষ খবর

জলসা ঘর - এর সব খবর



রে