thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

‘কাব্য ভাবনাকে সংগীতে রূপ দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ’

২০১৪ আগস্ট ০৬ ১৭:২৯:৫৯
‘কাব্য ভাবনাকে সংগীতে রূপ দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ’

ড. আ ব ম নুরুল আনোয়ার একাধারে শিক্ষক, গবেষক ও ক্রীড়া বিশেষজ্ঞ। কৈশোর বয়স থেকেই তিনি গান ও ক্রিকেট চর্চাকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ১৯৮০ সালে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলনি পরিষদের প্রতিষ্ঠা থেকেই একনিষ্ঠ কর্মী। বর্তমানে জাতীয় পরিষদের অন্যতম সহ-সভাপতি। ক্রিকেটে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ব্লু’ উপাধি পেয়েছেন। তিনি ১৯৮১-৯০ সালে বিসিসিবির নির্বাহী সদস্য ছিলেন। সাহিত্য ও সংগীত চর্চা তাকে সংযোগ করে দিয়েছে কিংবদন্তী সংগীত গুরু শৈলজারঞ্জন মজুমদার, শান্তিদেব ঘোষ, বিজয়কৃষ্ণ ভট্টাচার্য, মিথুন দে, কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রমুখের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ দিবসে তার জানা -অজানা নানা বিষয় নিয়ে দ্য রিপোর্ট-এর একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন ড. আ ব ম নুরুল আনোয়ার । সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক মুহম্মদআকবর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে আপনার উচ্চারণ জানতে চাই।

‘বাংলা ভাষা গোষ্ঠীকে বিশ্বের দরবারে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যে যেসকল মানুষ বাঙালি সংস্কৃতির পক্ষে থেকেছে তাদের মধ্যে রাজা রাম মোহন অন্যতম। ঘরমুখো বাঙালির তখন কোন আন্তর্জাতিক পরিচয় ছিল না। সেটা প্রায় ১৭৫০ সালের কথা। তারপর দারকানাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর- এই প্রক্রিয়াটার সর্বশেষ ধাপে এসে যিনি হাল ধরলেন তিনি হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ।

রবীন্দ্রনাথের কোন ফর্মাল স্কুলিং ছিল কী না?

রবীন্দ্রনাথের কোন ফর্মাল স্কুলিং ছিল না। পর পর সাত-সাতটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়েও কাজ হয় নি। কোনটাতে দু’ মাস কোনটাতে ছয় মাস- এক সময় স্কুলে যাওয়াই বন্ধ করে দেন। এসব বিবেচনায় তাকে পাঠানো হয় বিলেতে কিন্তু সেখানেও ছয় মাসের বেশি টিকেনাই। তার কোন বৃত্তি আর থাকল না।

শিল্প ও সাহিত্যাঙ্গনে বিচরণ কীভাবে হলো ?

সেসময় তিনি কিছু গান লিখেন, তার বড় ভাই সেগুলো আদর করে ছাপিয়ে দেন। তার পিতা এবং তার ভাইদের মতো ব্রহ্ম সংগীতের সাথে সম্পৃক্ত হন এবং গান রচনা করেন। ব্রহ্ম সমাজে অংশগ্রহণ করেন। তার প্রথম দিকের গান এবং কবিতা সুধী জনের দৃষ্টি কারে। সবার মধ্যে অন্য রকম এক প্রতিভা হিসেবে সবার কাছে ধরা দিতে থাকে।

তখন নাকি বঙ্কিমচন্দ্র খুব প্রশংসা করেছিলেন...

ঠিক, বঙ্কিমই সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করেছিলেন সেটা উল্লেখ করার মতো। আসলে মনীষার প্রশ্নে বঙ্কিমের তো আর তুলনা হয় না! তিনি বলতে শুরু করেন রবি নামে যে ঠাকুর বাড়ির ছোট ছেলে সে তো সাংঘাতিক ব্যাপার। অন্য রকম এক প্রতিভা। এবং আগামী প্রজন্মের এক বিশিষ্ট মানুষ হয়ে রবি আসছে সেটা তিনি এটা বুঝেই ফেলেছিলেন প্রায়।

যাক, ফিরে আসি রবীন্দ্রনাথের বৃত্তি না থাকার বিষয়ে । আচ্ছা আপনার কী মনে হয় যে তার কোন রকম বৃত্তি না থাকার জন্যেই তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদলে পাঠিয়েছিলেন?

শিলাইদহে তার বড় ভাইদের সাথে ১৮৭৫ সালের দিকে আসেন, তখন খুব বেশি দিন থাকেন নাই কিন্তু পরে তার বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে আবার আসেন দুই তিন মাস থাকেন। প্রথমবারের মতো মালজোড়া গানের সাথে পরিচিত হন। বলা হয়ে থাকে সে সময় তিনি লালন ফকিরকেও দেখলেন। দেখলেন মানুষের জীবনের আদর্শগুলো কীভাবে সুরে ও বাণীতে পরিপূর্ণ একটি গানের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সে বিষয়টা তাঁকে খুব আকর্ষণ করে।

তখনকার সময়ের বাউলদের জীবন-জীবিকা কেমন ছিল বলবেন কী?

বাউলদের এমন একটা অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হতো যে কোনো নিম্ন বর্গের হিন্দুও এত ঘৃণ্য নয়। বাউলদের কেউ দেখতে পারে না, বসতে দেয় না। বাউল মরে রাস্তা ঘাটে পড়ে থাকে- খবর রাখে না কেউ। এমন নির্দয় আচরণ রবীন্দ্রনাথের মধ্যে ভাবনার সৃষ্টি করে। যার প্রমাণ ছিন্নপত্রগুলোর মধ্যে পাওয়া যায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কত সালে বিয়ে করেন?

১৮৮৮-৮৯ হবে। পূর্ববঙ্গে ঠাকুর বাড়ির এক কর্মচারীর কন্যাকে।

শিলাইদহের জমিদারির দায়িত্ব কীভাবে পান রবীন্দ্রনাথ।

১৮৮৯ সালে সে দায়িত্ব পান। তাকে চিঠি দিয়ে শিলাইদহে জমিদারি তদারকির জন্য পাঠান। তার বাবা চিঠিতে আরও লেখেন, তুমি সেটা ভালভাবে করবে এর সফলতার ভিত্তিতে তোমার প্রমোশন হবে। এই বলে রেজিস্ট্রেশন করে লেখালেখি করে চাকরির মতো তাকে সেখানে পাঠানো হয়। দায়িত্ব নেন শিলাইদহ, পতিসর ও শাহজাদপুরের। এ সব অঞ্চলে তিনি ঘোরাফেরা করতে লাগলেন। এ সময়েই তিনি জনপদের মানুষ দেখলেন। জনপদের মানুষ বলতে গ্রামের মানুষ, মাঝি এবং নানা স্তরের ধর্ম-বর্ণের মানুষ। তাদের জীবনবোধ, জীবনাচার দেখলেন এবং গল্পে আবদ্ধ করলেন। এ বিষয়ে প্রমথনাথ বললেন, রবীন্দ্রনাথই প্রথম ব্যক্তি যিনি এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনাচারকে সাহিত্যে অন্তর্ভুক্ত করলেন। আরেকটা উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো আকাশ, মানুষ ও প্রকৃতির প্রতি মুগ্ধ হয়ে এ সময় গান লিখতে থাকেন। অসংখ্য গান। এটা এমন একটা অধ্যায় যার মধ্য দিয়ে আমরা আজকের রবীন্দ্রনাথকে পেয়েছি।

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।

এটা একটু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিক্ষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ অনেক কাজ করেছেন। তিনি নিজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেননি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিরুদ্ধে তিনি লিখে গেছেন। লিখেছেন তোতা কাহিনী, ছুটির মতো লেখা। তিনি বলেছেন, শিক্ষা যেন হাসপাতালে রোগীর ট্রিটমেন্টের মতো না হয়। এজন্য স্কুলে বাইরে কীভাবে পড়ানো যায়, প্রকৃতির সাথে কিভাবে মিশানো যায় । যে শিক্ষার প্রভাবে মানুষগুলো মানুষ হয়ে উঠবে এতসব ব্যাপারে তিনি ভাবতেন। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনা নিয়ে অনেক বলার আছে সেটা সীমাবদ্ধ সময়ে বলা সম্ভব নয়। তবে এ বিষয়ে পাঠ জরুরি।

কৃষিভাবনা?

রবীন্দ্রনাথের জীবনের আরেকটা পার্ট হলো কৃষি ভাবনা। কৃষি সমস্যা, গ্রামোন্নয়ন সমস্যাকে তিনি গভীরভাবে দেখতে লাগলেন। চিন্তা করতে থাকেন এসব অবস্থা থেকে কীভাবে উন্নয়ন ঘটানো যায়। কালিগ্রাম পরগনার গ্রামোন্নয়নের জন্যে সাত-আটশ গ্রামকে তিনি এক করে ফেলেন। সেখানের শিক্ষা, খাদ্য, চিকিৎসা এসব ব্যবস্থা করার পাশাপাশি তাদের ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানের জন্য তিনি কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। ধীরে ধীরে তিনি সমবায়ের দিকে ধাবিত হন এবং এ বিষয়ে তিনি একটি বই রচনা করে ফেলেন। সে বইয়ে কীভাবে সমবায় পদ্ধতিতে মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের কাজ করা যায় সে সব বিষয় তিনি উপস্থাপন করেন। কষ্টের কথা, গ্রামে চিরকালই কিছু দুষ্ট মানুষ ছিল যার ফলে একদল নীতিবিরুদ্ধ লোক রবীন্দ্রনাথের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তার স্থানে অটটু থেকেছেন। যা ছিল অত্যন্ত দুরূহ। শুধু এক কাজেই ব্যস্ত ছিলেন না, একদিকে সাধনায় লেখা পাঠিয়েছেন, দেশ ভ্রমণ করেছেন।

আবার তার গানের কথায় আসা যাক। রবীদ্রনাথের গানকে কেন অন্য গানের চেয়ে আলাদা বলতে হয়। এ বিষয়ে যদি আমাদের অবগত করতেন?

রবীন্দ্রনাথের গান শুনলে খেয়াল করবেন তার গানে বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সঞ্চিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ রাগ সংগীত শুনেছেন, চর্চা করেছেন, কীর্তন শুনেছেন। তিনি তার গানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গানের বৈচিত্র্যকে ধারণ করেছেন কিন্তু তারপরও তার গান শুনলে মনে হবে এ রবীন্দ্রনাথের গান। কোন গান শুনলে মনে হবে যেন রাম প্রসাদের গান কিন্তু এও মনে হবে যেন রবীন্দ্র্রনাথের গান। কাব্যের অনুভূতি তাকে যে সুরে টেনে নিয়ে গেছে তিনি সেই সুরে গান করেছেন। তার মূল কথা হলো তার কাব্য ভাবনাকে তিনি সংগীতে রূপ দিয়ে মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন। ভাষা এবং সুরকে তিনি সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এক কথায় তার সব গানেই রয়েছে পরিশীলিত রূপ।

রবীন্দ্রনাথকে জানার ব্যাপারে তরুণদের উদ্দেশে যদি কিছু বলতেন...

যারা রবীন্দ্রনাথকে জানতে চান তারা যদি কেবল বিনোদনের জন্য রবীন্দ্রসংগীতকে বেছে নেন তাহলে সেটা হবে রবীন্দ্রনাথের গানের অবমূল্যায়ন।

(দ্য রিপোর্ট/এমএ/এনআই/আগস্ট ০৬, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর