thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫,  ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

‘তারেক মাসুদ জানতেন তিনি কী চান’ (ভিডিওসহ)

২০১৪ আগস্ট ১৩ ১৪:৫৭:২৩
‘তারেক মাসুদ জানতেন তিনি কী চান’ (ভিডিওসহ)

তানভীর আলম সজীব শিল্পী, সুরকার ও সংগীত পরিচালক। ফটোগ্রাফি তার শখের কাজ। কানাডা থেকে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং-এ নিয়েছেন উচ্চতর শিক্ষা। গানই তার ধ্যান, গানই তার জ্ঞান। বিজ্ঞাপন, নাটক, চলচ্চিত্র সঙ্গীতে কণ্ঠ দেওয়া, সঙ্গীত পরিচালনা এ সব কাজের মধ্যেই ডুবে থাকেন নজরুল সঙ্গীতে দীক্ষিত এই মানুষটি। তিনি কাজ করেছেন তারেক মাসুদের সঙ্গেও। ‘রানওয়ে’ চলচ্চিত্রে সজীবের মিউজিক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। তারেক মাসুদ সম্পর্কে বললেন নানা কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক আদিত্য রুপু

তারেক মাসুদের সঙ্গে যে কাজগুলো করেছেন ...

তারেক মাসুদের সঙ্গে আমার প্রথম কাজ একুশের ওপর। একটা প্রামাণ্যচিত্র ছিল সেটা। এর পর কাজ করি এসএম সুলতানের ওপর নির্মিত ‘আদমসুরত’ প্রামাণ্যচিত্রে। আদমসুরতের সাউন্ড কারেকশনের কাজ করেছি। আদমসুরতের লাস্ট টাইটেল প্রসঙ্গে তারেক মামা হুট করে একদিন এসে বলল, ‘অ্যাই, এন্ডিং টাইটেলে তুমি একটা গান গাও তো। আমিও তানপুরাটা নিয়ে খালি গলায় গেয়ে দিলাম গানটা। তবে এর পর এখন পর্যন্ত আদমসুরত আমার দেখা বা শোনা হয় নাই। রানওয়ের পুরো কাজটিই আমি করেছি। আবহসঙ্গীত ছিল, গান ছিল। মানে টোটাল অ্যারেঞ্জমেন্ট আমার।

তারেক মাসুদ কেমন মানুষ ছিলেন?

তারেক মাসুদ আমাকে চেনে আমি যখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি তখন থেকে। উনি মূলত আমার মামার ফ্রেন্ড। এ কারণে আমিও তাকে মামা বলে ডাকি। তারেক মামা, মিশুক (মুনীর) মামা এরা আমাকে ছোটবেলা থেকেই চেনে। আর তারেক মাসুদ-ক্যাথরিন মাসুদকে আমি তাদের প্রেমের সময় থেকেই চিনি। সেই যখন তারা কাঁঠালবাগানের একটা ফ্ল্যাটে থাকত। আমি ১৯৮১ বা ৮২ সালের কথা বলছি। তারা তখন আড্ডাবাজি করছে। কাজ করছে। কাজ নিয়ে পরিকল্পনা করছে। ‘মুক্তির গান’-এর অনেক আগে থেকেই এই জুটিকে আমি চিনি। মিশুক মামাকেও আমি একই সময় থেকেই চিনি। আমার মামার নাম আলী মোর্শেদ নোটন। নেসার হোসেন, শিশির ভট্টাচার্য, ওয়াকিল আহমদ, তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর এরা সবাই আমার মামা। কেননা, এরা সবাই আমার নোটন মামার বন্ধু। এরা সবাই বাসায় দল বেঁধে আড্ডা দিত। এদের সঙ্গে ছোটবেলায় আমি মনোপলি খেলতাম। আমার বাবা এস এম নুরুল আলমের কাছে ছোটবেলায় গানের শিক্ষা পেলেও মামারাই হচ্ছে আমার আর্টকালচার ভাবনার প্রেরণা। আর্ট কলেজে তারা যখন বড় বড় আল্পনা করত রাত জেগে, আমি হয়ত সকালে রিকশা নিয়ে পৌঁছে শাহবাগ মোড়ে নেমে হেঁটে গিয়ে দেখতাম তারা বসে বসে চা খাচ্ছে। এমন ছিল সম্পর্ক। ব্যক্তি তারেক মাসুদ অসাধারণ। অসম্ভব ঠাণ্ডা এবং ভাল মানুষ। আবার প্রোডাকশনে গেলে চরম মেজাজি। আবার অনেক মিশুক ছিলেন। মিশুক মামাও একই রকম। তারা দু’জনই এক রকম ছিলেন।

চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ কেমন?

ওয়ান অব দ্য প্রফেশনাল পার্সন আই হেভ এভার সিন। প্রফেশনালিজম আর প্যাশন ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। প্যাশনটাকে যারা প্রফেশনালিজমে কনভার্ট করতে পারে তারাই তারেক মাসুদ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোনটা তোমার প্রফেশনালিজম। যেটা তোমাকে করে তুমি তোমার খাবার যোগাড় কর, যা তোমাকে পেটে ভাত দেয়।

তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রের শিল্পবোধ বা নন্দনতত্ত্ব কিভাবে দেখবেন?

আমার কাছের একজন মানুষ আছেন। আমার মেন্টর বলা যেতে পারে, অনুপ ভট্টাচার্য়। তার কাছে অনেক আগে আমি একবার জানতে চেয়েছিলাম, ‘লোকজন আমার এত পিছু লাগছে কেন?’ তিনি বলেছিলেন, ‘বাবা, লোকজন যখন তোকে নিয়ে বা তোর কাজ নিয়ে কথা বলবে তখন বুঝতে হবে তুই কিছু একটা ঠিক করছিস।’ উই আর ডুয়িং সামথিং রাইট। ইউ আর ডুয়িং সামথিং ডিফ্রেন্ট দ্যান আদারস্।

তার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কখনও মতের অমিল হয়েছে কি না?

কখনই না। সে খুব সহজেই বোঝাতে পারত। কেননা সে নিজে সেটা বুঝত। সে জানত সে কি চাচ্ছে। আমি এখন পর্যন্ত এমন অনেকের সঙ্গে কাজ করেছি যারা কি চাচ্ছে আমাকে বোঝাতে পারছে না। কিন্তু তারেক মামার সঙ্গে এমনটি কখনই হয়নি। আবার না বোঝারও কতগুলো কারণ থাকতে পারে। আমারও সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু তারেক মামা পারত। একজন মানুষ যত জানবে, একটা বিষয়ে যত স্পষ্ট ধারণা থাকবে, সে অন্যজনকে সে বিষয়ে খুব সহজেই বোঝাতে পারবে। তারেক মাসুদ হয়ত আমার চেয়ে মিউজিক ভাল বুঝত না! কিন্তু সে কি জানে সে কী চায় সেটা আমাকে ঠিকঠাক বুঝাতে পারত। একজন সফল ডিরেক্টরের শুধু ফ্রেম বুঝলে চলবে না। তাকে গল্প, লাইট, মেকাপ, প্রপস, কস্টিউম, মিউজিক সবই বুঝতে হবে। মিউজিকটা কোথায় যাবে, কোথায় গ্যাপ রাখতে হবে। গ্যাপ কিন্তু বিরাট টেকনিক। কখন দর্শকের মিউজিক লাগবে, কখন দর্শক মিউজিক ছাড়াই ভাল থাকবে এগুলো বুঝতে হবে। তারেক মাসুদ পুরোটাই বুঝত।

তারেক মাসুদের নির্মিতব্য ‘কাগজের ফুল’-এ আপনার কাজ করার কথা ছিল?

হ্যাঁ। কাজটি এখনও আমিই করব। এ ব্যাপারে মামা আমাকে নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। ক্যাথরিন মাসুদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। আমি এরই মধ্যে কাজ শুরুও করে দিয়েছি। তারেক মামা এই ছবির মিউজিকের জন্য কিছু মিউজিক দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘ওমুক ওমুক সময়ের মিউজিক তুই শুনতে থাক।’ সে ওই সময়কার কিছু রেফারেন্স আমাকে দিয়ে গেছে যে সময়কার গল্প নিয়ে কাগজের ফুল নির্মাণ হবে। ভাবা যায়, কতটা সাংগঠনিক মানুষ ছিলেন তিনি।

তাদের জন্য মনের কোথাও বেদনা ভর করে?

বেদনা কি না জানি না। যার জিনিস সে নিয়ে চলে গেছে। সেটা নিয়ে আমার কোনো ক্ষোভ নাই। আমার কষ্ট হল— বড্ড অসময়ে তারা চলে গেল। তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর দু’জনই ব্যতিক্রম কিছু করতে এসেছিলেন পৃথিবীতে। এই দুই মানুষকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আমি একটি গান বানিয়েছি। ‘খুঁজব কোথায় বল তোমাদের আমি আজ এত মানুষের ভিড়ে, জানি আর পাব না তোমাদের কাউকেই চলে গেলে সব মায়া ছেড়ে।…’

(দ্য রিপোর্ট/এআর/এইচএসএম/আগস্ট ১৩, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জলসা ঘর এর সর্বশেষ খবর

জলসা ঘর - এর সব খবর