thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৩ আশ্বিন ১৪২৫,  ৮ মহররম ১৪৪০

তারেক মাসুদের তিন চরিত্র ওয়াহিদ সুজন

২০১৪ আগস্ট ১৩ ১৫:২২:৫৩
তারেক মাসুদের তিন চরিত্র ওয়াহিদ সুজন

তারেক মাসুদের মৃত্যুবার্ষিকীর কথা স্মরণ হতে মনে প্রশ্ন আসে, তারেক মাসুদ কার কাছে ফিরবেন? এ প্রশ্ন আচানক কোনো বিষয় নয়। এ প্রশ্নের উত্তর তাদেরই মধ্যে আছে, তারেক সেলুলয়েডের পর্দায় যাদের কথা বলেছেন। বা যাদেরকে পথ দেখাতে চেয়েছেন। তারেকের চলচ্চিত্র শিক্ষামূলকও বটে। সার্বিকভাবে বললে, সব চলচ্চিত্রই শিক্ষামূলক। কোনোটা হালকা চালে, আর কোনোটা একটু মোটাদাগে। এই যা! তবে এটা স্বীকার করে রাখা ভালো- তারেক মাসুদ বাংলাদেশকে নতুন একটা চলচ্চিত্র ভাষা দিয়েছেন। অনুপ্রাণিত করেছেন নতুন প্রজন্মকে।

যাদের কথা মনে পড়ছে- আনু, সোহেল ও রুহুল। এরা তারেকের তিনটি পূর্ণ কাহিনীচিত্রের (মাটির ময়না, অন্তর্যাত্রা ও রানওয়ে) প্রধান চরিত্র। প্রথমজন নিতান্ত বালক, বাকি দুইজন তরুণ। অর্থাৎ, তাদের ভবিষ্যত নির্ধারণও করে এ চলচ্চিত্রগুলো। মানে তারেক তাদের কোথাও নিয়ে যেতে চান। কোথায়? এটা ভাবতে গিয়া আবহমানতার ধারণা আসে। কারণ, তারেকের সিনেমায় এ প্রিকন্ডিশান জারি লক্ষনীয়। যেটা অনেকটা আইডিয়াল ওয়ার্ল্ডের মতো। এমন কিছু যাতে মাটির সোদা গন্ধ, শ্বাশত বলে একটা বিষয় থাকে। প্রকৃতই এমন কিছু থাকে কী? প্রকৃতই থাকে কী এটা জটিল বিষয় অথবা ‘থিঙ্ক ইটসেলফ’ অর্থে হয়ত জানা যায় না। তারপরও আমরা খুঁটি গেড়ে একটা দশায় থাকি। সে দশা দিয়ে অন্য আরও অনেক কিছু ব্যাখ্যা করতে চাই। সে অর্থে আমার কথাগুলোও একটা দশায় আপতিত।

ধরা যাক, মাটির ময়নার আনুর কথা। তার আশেপাশে এতএত কথামালা, মোটিফ ছড়ানো- যাকে আমরা লোকজ বলি। একে আবহমানতার দোহাই দিয়া একটা অবস্থা আকারে জারি রাখতে চাই। সেখানে ধর্মকে প্রশ্ন করা হয়। যার মাধ্যমে করা হয়- নৌকাবাইচ, জারিগান, পুঁথিপাঠ অথবা মাটির ময়না। হাঁ মাটির ময়না, তারেক দার্শনিকতায় ধরা পড়ে না- জগতে আসলে আমরা সকলেই মাটির ময়না। অতিধার্মিক বাপের খপ্পরে পড়ুক অথবা সূফি তরিকায়- যে কোনোটাই। কথা হলো কোনো ছলে তারে আমারে নিজের দশায় নিমন্ত্রণ করি। সেখানে হাজির হয় উদারতার ইসলাম ও জঙ্গীপনার ইসলাম নামে ভাগাভাগি।

আদতে সর্বহরণকারী আবহমানতার সংস্কৃতিতে উদারতা কখন হাজির হয় বা বিশ্ব গণতান্ত্রিক নিউ লিবারেল পরিসরে। যখন আপনি কারো মতকে দমন করতে পারেন না। কারণ এ সব মতাদর্শ টিকে থাকে ভাষা, চিন্তা অথবা আত্মার গহীনে। যেটারে লোকে প্রগতির নামে খারিজ করে, ঐতিহ্যের নামে খারিজ করে। কিন্তু খোদ বিষয়টাই বিদ্যমান অবস্থারে পাল্টাতে সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করে। যার ইতিহাস বহুবৈচিত্র্য ও জটিল। বাংলাদেশের আর্টফিল্মের তরিকায় একপক্ষের পাকিস্তান চাওয়ার মধ্য দিয়ে তাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। এমনকি পাকিস্তান চাওয়ার মধ্যে নানান পক্ষের বিষয় ছিল। পুরোটা মুসলমানী ব্যাপার বলে দেখানোর চাল তো পুরানা। এটা স্রেফ উদাহরণ। আমরা দাবি এ নয় যে, তারেকের ইসলাম বোঝাপড়া এখানে আটকে আছে।

ভাষা, চিন্তা বা আত্মার গহীন থেকে যাকে দমন করা যায় না, তারে খানিকটা উদারতার মোড়ক দেখাইতে হয়। বলতে হয়, দেখ তোমার ইতিহাসের মধ্যে এই ব্যাপারগুলো আছে। এ থাকার সিদ্ধান্ত তোমার না, আমার। ফলে, আমাদের নিজের কথাগুলোই অন্যরে বলতে হয়, এটা তোমার কথা।

তখন সেই মতাদর্শরে আমার মতো করে হাজির করে বলতে হয়- এটা হলো উদারতা। বাংলাদেশের পরিসরে কেন উদার ইসলামরে হাজির হইতে হয়। ধরেন তারেক মাসুদদের যে সাংস্কৃতিক বলয়ে বেড়ে উঠা (স্নাতক পর্যায়ে) সেখানে তো কোনো অর্থে ইসলাম হাজির ছিল না। বা অতি সাম্প্রতিক গুড়িয়ে দেওয়া ছবির আর্ট বা আজিজ মার্কেট। সেটারে যদি আবহমান বাঙালিত্ব ধরা হয়- সেখানে মুসলমান ধার্মিকতা হাজির নাই। বরং, আশির দশক জুড়ে টুপি দাড়িওয়ালা বলতে তুই রাজাকারের জিগির ছিল। ইসলাম এখানে প্রতিক্রিয়াশীলতা অর্থেও বিরাজমান। তাইলে, তারেককে আসলে সেদিকে আগাইতে হইলো যাদের ‘না থাকা’র মধ্য দিয়ে থাকাটা প্রবল হয়ে উঠবে। তাই নিজের জীবনের অছিলায় সে ঘরের খবর নিতে গেছেন। তিনি সিধাসিধা বুঝতে পারছেন- ইসলামরে মোকাবেলা না কইরা আগানো যাবে না।

সেখানে বাঙালির বইলা একটা ইসলামী তরিকা হাজির করতে গেছেন। সেখানে বেইনসাফের বিরুদ্ধে ইসলামের ভূমিকা হাজির থাকার কথা না। নাইও। ইসলাম ইতিহাসের মধ্যে কোনো মৌলিক বচন দিয়া আগাইয়া গেছে তার কথাও নাই। ফলে তারেক মনের পশু কোরবানি, গুটিকয়েক বাউলিয়ানা বা শহুরের আধ্যাত্মিকতাপনার উত্তর দিতে পারেন- কিন্তু ইসলাম প্রশ্নের আশেপাশে দিয়ে যায় না। মোকাবেলা করতে পারে নাই। নিতান্ত জাগতিক অর্থে এ বোঝাপড়াও অনৈতিহাসিক। ফলে তারেক আনু বইলা নিজের কাছে ফিরতে পারেন, আনু পিতারে ভাঙ্গতে পারেন- এরপরে কী হবে তার উত্তর দিতে পারেন না। সে অর্থে তারেক আনুর কাছে ফিরতে পারেন না, যদি না আনুরে এ সব প্রশ্নের ভেতর না নিতে পারেন। পারেন নাই, কারণ ইসলামের কোনো মৌলিক জায়গায় তিনি প্রশ্ন তুলেন নাই। বোরাক মেটাফোর বা কওমি মাদ্রাসার শান্তিবাদী হুজুরের (!) মধ্যে ইসলাম আটকে থাকে।

তবে অন্তর্যাত্রার সোহেল! ব্রিটেনে বড় হওয়া সোহেল। সে কিনা বাবার মৃত্যুর পর দেশে ফিরে দেশ-বিদেশের কালচার নিয়া দ্বন্ধে পড়ে। তো, সোহেলরে তারেক শুনাইয়া দেন আনুশেহ-বুনোর ফিউশান। ব্রিটিশ শিশুদের কবর দেখে, উড়িয়াদের গান শুনে। কিন্তু সোহেলরে কোনো লাইন দিতে পারে না। ফিউশানরে তারেক রিজেক্ট করতে পারেন নাই, পারার দরকার আছে বলে মনে হয় না। তবে সেখানে নিজের বলে আবহমানতার গন্ধ থাকতে পারে- আদতে সেটা কোনো ভাবের রিপ্রেজেন্ট করে না, দৈন্যতারে ডাইকা আনে। সে ডাক তারেক হয়ত অভিবাসীদের নিয়ে সিনেমা করা ফান্ড পাইয়া বুঝতে পারছেন অনেকখানি। কিন্তু তিনি সোহেলের কাছে কেন ফিরবেন। তার তো সেখানে ফিরার তাড়া থাকার কথা না।

তারেকের সবচেয়ে নিখুঁত কাজ ‘মাটির ময়না’ আর চিত্তাকর্ষক ও কৌতুকোদ্দীক কাজ ‘রানওয়ে’। একে মাটির ময়নার দূরবর্তী দশা আকারে দেখা যাইতে পারে। তবে আমি দেখি না। কারণ রানওয়ের জঙ্গীপনার ইতিহাস বড়ই খাপছাড়া। একজন মানুষের জঙ্গী হয়ে উঠার জায়গা পরিষ্কার না। যা আরও অপরিচ্ছন্ন করে সিনেমাটার শেষ দৃশ্য। রুহুল নামের নিম্নবিত্তের পোলা, যেখানে আরিফ ভাইয়ের পাল্লায় পড়ে জঙ্গী হইয়া যায়। সে শেষমেষ ফিরে আসে। মা দুধ দিয়া মুখ ধোয়াইয়া দেয়। তারপর ‘টেবুলা রাসা’র মতো রুহুলের মন শূন্য হইয়া যায়। এটা আসলে কোন দশা! আমরা জানি না। তারেক হয়ত জানতেন বলে মনে করতেন। তাই রানওয়ের শেষদৃশ্যটা এমনভাবে সাজাইছেন। হাঁ, তারেকের মধ্যে একটা ইন্টারেস্টিং জিনিস ছিল- এ গণতন্ত্র, মডারেট ইসলাম এ সবরে উদারতার অছিলায় হাজির করার সততা। এগুলারে সরলভাবে ডিল করার সরলতা। রানওয়ে মুভির একটা দৃশ্য খুবই ইন্টারেস্টিং। এখানকার জঙ্গী আরিফ ভাই- একসময় মডারেট গণতন্ত্রী; ইসলামী রাজনীতি করতেন। তো, তার প্রাক্তন রাজনৈতিক সঙ্গী ও স্ত্রী আইসা তারে জেরা করে ক্যান গণতন্ত্রের লাইন ছাড়ছে। আরিফ ভাই বলেন, গণতন্ত্রের রাজনীতি দিয়া ইসলাম কায়েম হবে না। বউও তারে ছাইড়া কথা বলে না। তখন মনে হইছিল মডারেট ইসলাম একটা সেফ পজিশনে আছে। কিন্তু দুনিয়া দেখেন- এখন পুরানা মডারেটের ভাত নাই। তারে আরও উদার হইতে হবে। প্রগতির দোহাইয়ে মাদ্রাসা বা ধর্মের প্রশ্নে কথা তোলা সহজ। তারা কেন বিজ্ঞানবাদী না বা ভোকেশনাল ট্রেনিং নেই না, তা বলা সম্ভব। কিন্তু যে পাঠাতনের উপ্রে দাড়াইয়া এ সব প্রশ্ন, তারে প্রশ্ন করবে কে? অথবা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সুবিধাগুলা সব সময় কারা পাইয়া আসছে? বাংলাদেশের ইতিহাস, বিশ্ব রাজনীতি, আরব বসন্ত, শাহবাগের গণজাগরণ, গণতন্ত্রের দৈনদশা, অনির্বাচিত সরকার এবং তার দেশী-বিদেশী সমর্থন, জাতীয়তাবাদের ফ্যাসিবাদীরূপ, গণমাধ্যম নীতিমালা বা ৫ মে’র মতিঝিলের হেফাজত দমন এ সব একদম সরল ঘটনা না। এর মধ্যে গভীর বিদ্বেষ ও শত্রু খোঁজার তাড়া আছে। যার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। সাহিত্যে দেখেন, শিল্পে দেখেন, প্রগতিশীলতায় দেখেন; পাবেন। তাই আশা জাগানিয়া চরিত্র হইলেও আদতে আনু, সোহেল বা রুহুল টেবুলা রাসা হইয়া জীবন শুরু করতে পারেন না। তাদের বিশ্ব ইতিহাসের কতো কতো প্রশ্নের ভিতর দিয়া যাইতে হবে- সে খোঁজ আমরা রাখি না বা স্রেফ গায়েব করে দিই।

সে দিক থেকে তারেক একটা দিক তো দেইখা গেছেন। তিনি আসলে যাদের কথা বলছেন- তাদের কাছে ফিরবেন না। কারণ, যে ইনসাফের আকাঙ্খায় নিজেরে সপে দিছে, সে কখনও রানওয়ের বয়ান নিবে না। আমরা নিব। কারণ, আমি অন্যের মত, বাহাসরে শুনতে রাজি না। অন্যের মত পর্যালোচনার তাড়া আমার নাই। তার সম্পর্কে আমার সরল একটা বয়ান আছে, তারে আমি উদারতার বাণী শুনায়। তারেক মাসুদ তার চলচ্চিত্রের চরিত্রের মাধ্যমে বার বার ফিরবেন।

[লেখকের নিজস্ব ভাষারীতি ও শব্দ চয়ন অবিকৃতভাবে প্রকাশিত]

লেখক : সাংবাদিক

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

মুক্তমত এর সর্বশেষ খবর

মুক্তমত - এর সব খবর



রে