thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৬ রবিউস সানি ১৪৪০

আবদুর রাজ্জাক

২০১৪ অক্টোবর ২৩ ০৮:১৩:২৮
আবদুর রাজ্জাক

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক : চিত্রশিল্পী, ছাপচিত্রী, ভাস্কর ও শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক ২০০৫ সালের ২৩ অক্টোবর যশোরে মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশের ভাস্কর্য শিল্পের বিকাশধারা তার হাত ধরেই সমৃদ্ধ হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের শিল্পকলার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ও নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রেখেছেন।

আবদুর রাজ্জাক ১৯৩২ সালে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার ভেদরগঞ্জ থানার দিগর মহিশখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সাদর আলী ও মা রিজিয়া বেগম। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক সবার ছোট। তিনি ১৯৪৭ সালে ফরিদপুর হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৪৯ সালে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। স্কুল জীবন থেকেই চমৎকার দক্ষতায় জলরঙের নিসর্গ-দৃশ্যাদি আঁকতেন।

আবদুর রাজ্জাকের ছবি আঁকা দেখে বড় ভাই নিয়ে যান তৎকালীন আর্ট ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের কাছে। তার ছবি দেখে শিল্পাচার্য মুগ্ধ হন। আবদুর রাজ্জাক ভর্তি হন আর্ট ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় ব্যাচে। সতীর্থ হিসেবে পেয়েছিলেন আবদুর রশীদ, কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, জুনাবুল ইসলাম, একরামুল হক ও ইমদাদ হোসেন প্রমুখকে। প্রথম বর্ষ থেকেই আবদুর রাজ্জাক ক্লাসে প্রথম হতেন। ১৯৫৪ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় রাজ্জাক, রশীদ চৌধুরীসহ অন্য আন্দোলনকারীরা রাত জেগে বাংলা ভাষার দাবিতে পোস্টার আঁকতেন।

স্নাতকের পর কিছুদিন তিনি ঢাকার সরকারি গবেষণা সংস্থা ম্যালেরিয়া ইনস্টিটিউটে আর্টিস্ট ও মিউজিয়াম কিউরেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরপর প্রতিযোগিতামূলক ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়তে যান এবং ১৯৫৭ সালে মাস্টার অব ফাইন আর্টস ডিগ্রি (এমএফএ) লাভ করেন। আবদুর রাজ্জাকই ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম ছাত্র যিনি চারুকলায় মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

দেশে ফিরে আবদুর রাজ্জাক ১৯৫৮ সালে ঢাকার সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৩ সালে ভাস্কর্য বিভাগের দায়িত্ব দেন শিল্পাচার্য। প্রিন্ট-মেকিং, পেইন্টিং ও ড্রয়িংয়ে তিনি পারদর্শী ছিলেন। নতুন এ দায়িত্ব পেয়ে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন ও ভাস্কর্য বিভাগ গড়ে তোলেন। তার হাতেই গড়ে উঠেছে এ দেশের আধুনিক ভাস্কর্য চর্চার একগুচ্ছ প্রতিভাবান তরুণ শিল্পী।

১৯৮৩ সালে তিনি কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটসের অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন। তার সময়েই এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত হয় ও ইনস্টিটিউটে রূপান্তরিত হয়। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩ সালে ৬০ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন নিয়মে অবসর নিয়ে দু'বছরের জন্য পুনঃনিয়োগ গ্রহণ করেন। এরপর দুই বছর এবং পরে আরও এক বছর অধ্যাপনা করেন। আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য অনুষদে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে ড্রয়িং ও ডিজাইন শেখাতেন।

ছাত্রাবস্থা থেকেই জলরং ও তেলরং ছিল তার প্রিয় মাধ্যম। তবে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে গিয়ে প্রিন্ট মিডিয়ামে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেন। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি প্রিন্ট-মাধ্যমে শিক্ষক হিসেবে পান বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রিণ্টমেকার প্রফেসর মরিসিও লাসানস্কিকে। প্রিন্টমেকিংয়ে রাজ্জাকের দক্ষতা ছিল অসামান্য এবং সেখানে ছাত্র থাকা অবস্থাতেই উত্তর আমেরিকার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। এ ছাড়া সেখানে টেম্পেরা টেকনিক ও ভাস্কর্যে শিক্ষা লাভ করেন। সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র থাকাকালীন তিনি আর্ট গ্রুপের প্রদর্শনীতে অংশ নেন। ১৯৬৭ সালে একক প্রদর্শনী নিয়ে ইরান ও তুরস্ক ভ্রমণ করেন। এ ছাড়া যৌথ প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে ভারত, চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ অন্যান্য দেশের প্রদর্শনীতে অংশ নেন। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে আঁকা ঢাকা বিষয়ক ৮৫টি ছবি নিয়ে ১৯৯৫ সালের জানুয়ারি মাসে চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভিন্নমাত্রার একটি একক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেন।

আবদুর রাজ্জাকের আঁকা উল্লেখযোগ্য ছবি হলো- সোয়ারীঘাট, নৌকা নির্মাণ, আত্মপ্রতিকৃতি, অভ্যন্তর, বাগান, জলাশয় ও মুসা খানের মসজিদ। ভাস্কর্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- শাহীন, জাগ্রত চৌরঙ্গী (জয়দেবপুর চৌরাস্তার সড়কদ্বীপে অবস্থিত), কম্পোজিশন, নারী মুখমণ্ডল ও খাড়া-গড়ন।

সুদীর্ঘ শিল্পী জীবনে আবদুর রাজ্জাক ঢাকা আর্ট গ্রুপ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ ভাস্কর সমিতি, বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ প্রভৃতি শিল্পকলা সম্পৃক্ত বিভিন্ন সংগঠনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দেশ-বিদেশে অসংখ্য চিত্র প্রদর্শনীর নির্বাচক মণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে শিল্পকর্মের সামগ্রিক স্বীকৃতি স্বরূপ জাতীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠতম পুরস্কার একুশে পদকে ভূষিত হন। একই বছর বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মান লাভ করেন।

১৯৬২ সালের দিকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের ভাতিজি মুস্তারী বেগমকে বিয়ে করেন। এ দম্পতির দুই ছেলে ও এক মেয়ে।

সূত্র : গুণীজন।

(দ্য রিপোর্ট/ডব্লিউএস/এএল/অক্টোবর ২৩, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

এই দিনে এর সর্বশেষ খবর

এই দিনে - এর সব খবর