thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

শত প্রলোভনেও সৈয়দ নজরুল মাথা নত করেননি

২০১৪ নভেম্বর ০৩ ১৪:৫৫:১৪
শত প্রলোভনেও সৈয়দ নজরুল মাথা নত করেননি

সৈয়দ সাফায়েতুল ইসলাম, অতিথি লেখক : ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলখানায় আমার বাবাকে যখন হত্যা করা হয় তখন আশরাফ (সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম) ও মঞ্জু লন্ডনে পড়াশোনা করে। সে সময় শরীফ একদম ছোট ছিল; আমার বোন লিপি ও রূপাও তখন খুব ছোট। তারা কিছুই বুঝে না। আমিই একমাত্র বড় যে বুঝি।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর মা একদিন বললেন, বঙ্গবন্ধুর খুনি খোন্দকার মোশতাক তোর বাবাকে ফোন করেছে। মাকে আবার সে বোন বলে ডাকত। মা ফোন ধরলে মোশতাক বলেন, তুমি আশরাফের বাবাকে একটু ডেকে দাও। মা বলেছিলেন, যা বলার আমাকে বলেন।

খোন্দকার মোশতাক বললেন, আশরাফের বাপকে বলেন আমি তার সমস্ত পুরস্কার দেব। আমার সাথে কো-অপারেট করতে।

মা বললেন, অসম্ভব। আমি তোমার সঙ্গে কথাও বলব না, আমি ফোনও দেব না। তিনবার ফোন করেছে। তিনবারই ফোন ধরেছে আমার মা। ফোনে মোশতাক বলেন, আশরাফের বাপের তো ভয়াবহ পরিণতি হবে। তুমি তাকে বল আমার সাথে যেতে। আর্মিদের আমি কন্ট্রোল করতে পারছি না। আসলে ওর যা প্রাপ্য তার চাইতে বেশি সুযোগ-সুবিধা আমি দিব।

মা বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, খোন্দকার মোশতাক ফোন করেছিল, আপনি কী করবেন? বাবা বলেন, আমি ওর সাথে কথাও বলব না, এখান থেকে নড়বও না। যারা বঙ্গবন্ধুসহ সারা পরিবারকে মেরে ফেলেছে। আমি কী করে বঙ্গবন্ধুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করব?

তিনবার যখন বাবা রেসপনস করে নাই; খোন্দকার মোশতাকের ফোনও ধরে নাই। এর মধ্যে বাবার নামে মিথ্যা মামলা দেয়। বাবাকে জেলখানায় নিয়ে যায়।

এরই মধ্যে আমি অক্টোবরের ছুটিতে ঢাকায় এসেছিলাম। ছুটিতে এসে মাকে বললাম, আমি বাবাকে দেখতে যাব। মা বললেন, আমিও যাব। অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহের শেষের দিকে আমি আর মা জেলখানায় গিয়েছিলাম। বাবা এলেন। বাবাকে সেদিন খুবই হাস্যোজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। পরনে পায়জামা-পাঞ্জাবি, হাতে সিগারেট। এসে বললেন যে, স্মৃতিকথা লিখছি কাজে লাগবে। আমি উৎসাহ দিয়ে বলেছিলাম লিখে যান, যুদ্ধের সময় কী ঘটনা ঘটেছে অনেকে জানে না, অনেকের মধ্যে মিথ্যা প্রচার আছে; অনেকের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি আছে। আপনি, তাজউদ্দিন, মুনসুর আলী কিংবা কামারুজ্জামান সাহেব কী করেছেন তা মানুষের জানা দরকার। আপনি এগুলো লিখে যান। বাবা বলেন, লিখতেছি। তুই এক কাজ করিস আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখিস। এ সব নিয়ে আলোচনা করছিলাম। এক পর্যায়ে বাবা মাকে বললেন, তুমি চলে যাও। আমি একা সাফায়াতের সঙ্গে কথা বলব। আসলে আমাদের জন্য আধাঘণ্টা সময় নির্ধারণ ছিল।

মাকে সরিয়ে দিয়ে আমার কানে কানে বাবা বলেছিলেন, ‘আমাদের মেরে ফেলবে।’ এটা তিনি বললেন এত ঠাণ্ডা মাথায়। দেখলাম তিনি খুব শান্ত।

আমি বললাম, কেন মেরে ফেলবে?

বাবা বললেন, ওরা জেলখানার মধ্যে অনেক প্রলোভন দেখাচ্ছে আমাদের। মেরে ফেললে মেরে ফেলুক। তাতেও আমার কোনো আপত্তি নেই। তোরা তো ভবিষ্যতে মাথা উঁচু করে থাকতে পারবি।

আমি বললাম, আপনি সিউর যে, মেরে ফেলবে।

বাবা বললেন, হ্যাঁ, আমি সিউর, ওরা মেরে ফেলবে।

আমি বললাম, আপনি কোথা থেকে খবর পেলেন।

বাবা বললেন, আমি যেখান থেকেই খবর পাই না কেন, আমি খবর পেয়েছি। আমি নিশ্চিত আমাকে মেরে ফেলবে। আর কাকে মারবে আমি জানি না।

আমি বললাম- তা হলে আমি কি করব, ইন্ডিয়া পালিয়ে যাব।

বাবা বললেন, তুমি যেও না, তুমি যেখানে আছ ওখানেই থাক। ওখানে তোমার প্রটেকশন অ্যারেঞ্জ করা আছে। এটা কোথা থেকে বললেন আমি ঠিক নিশ্চিত না।

আমি বললাম, মাকে নিয়ে কী করব? শরীফ, লিপি, রূপা ওদের কোথায় পাঠাব?

বাবা বললেন, ওদের ময়মনসিংহে পাঠিয়ে দাও। ঢাকায় তো আমার বাড়ি নাই। জমিজমা যা আছে তোমার দাদার। আমার তো কিছুই নাই। তোমার দাদার জমিজমা দিয়ে তোমার মায়ের চলবে। আর পারলে তুমি কিছু সাহায্য করো।

আমি বললাম, ঠিক আছে। আপনি ঠাণ্ডা থাকেন আর পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারলে কইরেন।

বাবা বললেন, এখানে যতবার প্রলোভন আসছে, প্রস্তাব আসছে, প্রত্যেকবার আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছি। এখন আর ওই স্টেজে নাই, যে প্রলোভন আসবে। এই কথা বলার পর বললেন, তোমরা চলে যাও। আমাকে আর ডিস্টার্ব করো না। আমি তোমাকে যেটুকু বলেছি সেটা পালন করার চেষ্টা করবে।

আমি তারপর চলে এলাম। আমি মাকে এসব কিছুই বলিনি। মাকে বললাম, আপনি ধৈর্য ধরেন সবকিছুই ঠিক হয়ে যাবে। আমি বিএমএতে আছি কিছু হলে খবর দিবেন। চলে যাবার পর আমার সাথে আর যোগাযোগ হয়নি। তখন টেলিফোনের ব্যবস্থা ভাল ছিল না।

৩ নভেম্বর রাতে আমি স্বপ্ন দেখলাম বাবাকে মেরে ফেলছে। গুলি করছে, আর বেয়োনেট দিয়ে খোঁচাচ্ছে। স্বপ্ন দেখার পর আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমার ফোর্সমেট গনি আর ফরিদকে বললাম, আমার বাবাকে মেরে ফেলছে। তারা বলল, কোনো চিন্তা করো না, আল্লাহ যা করার করবে। আমরা কর্নেল শফিকুল্লাহর সঙ্গে কথা বললাম। ঊনি বললেন, কোনো চিন্তা করিস না। ঢাকায় কি হয়েছে কিছুই বললেন না।

৪ নভেম্বর আমার দুই কাজিন গেটের মধ্যে এসে দাঁড়িয়ে আছে। সব স্টাফরা আমাকে খুব আদর করত। তারা এসে বলল, স্যার আপনার দুই কাজিন এসেছে। আমি বললাম, কমান্ডেন্ট কিছু না বললে আমি কেমনে কী করব। তারা বলল, আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। কমাডেন্ট তাদের দুজনকে অফিসে নিয়ে গেলেন এবং ১ ঘণ্টা পর আমাকে খবর দেওয়া হলো। স্টাফ এসে বলল, স্যার, আপনাকে যেতে খবর দিয়েছে। যেয়ে দেখি, কমান্ডেন্ট জেনারেল মান্নাফ, জেনারেল সাদেক, কর্নেল বদরুল ও আমার দুই কাজিন বসা। আমি বুঝতে পারলাম এরা যখন আমাকে নিতে আসছে, তখন আর আমার বাবা বেঁচে নেই। আমি বললাম, স্যার আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমি পরিস্থিতি সামাল দিতে জানি। আমি যে কোনো পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়ি না। স্যার আমাকে আপনি ঢাকা যেতে দেন। তিনি বললেন- তুমি যে ঢাকায় যাবে তোমার নিরাপত্তা কোথায়?

৪ নভেম্বর সকাল বেলা ঢাকায় গেলাম। ঢাকায় এসে দেখি মা-বোনদের কান্নাকাটি। মা কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, অস্থির অবস্থা। মাকে এক কোণায় ডেকে নিয়ে বললাম, আপনি সৈয়দ পরিবারের স্ত্রী। সারাজীবন বাবা সংগ্রাম করেছেন। বাবা কয়দিন ক্ষমতায় ছিলেন? আপনার বিয়ে হয়েছে ১৯৫০ সালে। ১৯৫০ সালের পর বাবা কবে ক্ষমতায় ছিল? আপনি এত ভেঙে পড়ছেন কেন? আপনি সোজা না হলে তো শরীফ, লিপি, রূপা এরা তো দাঁড়াতে পারবে না। আপনি সোজা হোন, শক্ত হোন।

মা বললেন, ময়মনসিংহ গেলে খাব কী?

আমি বললাম, আমাদের বাড়িতে যে জমি আছে তাতে খাবার ব্যবস্থা হবে। বাদবাকি আমি যা পারি সার্পোট দেব।

৫ কিংবা ৬ নভেম্বর রাতের বেলায় হঠাৎ করে কেউ একজন এসে বলল, ওদের বাসা (তেজগাঁও) থেকে একটু দূরে রেললাইনে আর্মির পিকআপ থেকে কি একটা ফেলে গেছে। তেজগাঁও থেকে একদিন পর আমার মামা ও এক কাজিন বাবার মৃতদেহ নিয়ে আসে। শুনেছি বাবার মৃতদেহ নাকি ফুলে গিয়েছিল। যিনি ধুয়েছিলেন তার কাছে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কোথায় কোথায় গুলি, বেয়োনেট দিয়ে আঘাত করেছে। তিনি বলেছিলেন, নাভির নিচে বেয়োনেট এবং এসএমজি দিয়ে ব্রাশ ফায়ার করেছে। (আমি যা স্বপ্নে দেখেছিলাম) দু-একটা গুলি বুকে লেগেছিল।

মৃতদেহ আনার পর আরমানিটোলার মাঠে জানাজার পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ভীষণ রকম সোচ্চার হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি চিন্তা করেছিল রমনায় তিন নেতার মাজারের পাশে এই তিন নেতার (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ ও মুনসুর আলী) কবর খোঁড়া হয়েছিল। উল্লেখ্য, কামারুজ্জামানের মৃতদেহ আগেই রাজশাহী নিয়ে গিয়েছিল।

জানাজা শেষে আর্মির একটি পিকআপ এসে মৃতদেহগুলো ছিনতাই করে নিয়ে যায়। আমার কাজিন আসাদুজ্জামান ও কিবরিয়া পিকআপের পেছন পেছন দৌড়ে বনানী কবরস্থানে চলে আসে। তারা পিকআপটিকে বনানী কবরস্থানে ঢুকতে দেখে। তারা সেখানে ঘাপটি মেরে বসে দেখে যে, ওনাদের কবর দেওয়া হচ্ছে। সেখানে ওনাদের কবরে আর্মি প্রটেকশন পাঠিয়েছে। কোনটা বাবার কবর তা তারা শনাক্ত করতে পারেনি। দাফনের সময় তাদের (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, মুনসুর আলী) পরিবারের কেউই ছিলেন না।

পরে আমরা জানতে পেরেছি মাঝখানে বাবার, এক পাশে তাজউদ্দিন ও আরেক পাশে মুনসুর আলী সাহেবের কবর। ডা. কবির (মরহুম) নামের একজন এসব খবরগুলো রাখতেন। পুলিশ ও আর্মির কারণে আমরা যেতে পারিনি। মাস দুয়েক পরে আমি কবরস্থানে যাই এবং কবরটি শনাক্ত করে বেড়া দেই।

আমরা নেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যার (শেখ হাসিনা) কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ তিনি তার পরিবারের সদস্যদের কবরগুলোর জায়গা যখন শনাক্ত করে কিনলেন, তখন সাথে সাথে আমার বাবার কবরের জায়গাটাও কিনলেন। ওটা উনার সম্পত্তি আমাদের সম্পত্তি নয়। ২০০০ সালে আমার মা যখন মারা যান তখন বনানীতে আমরা জায়গা খুঁজছিলাম। তখন উনি (শেখ হাসিনা) এসে বললেন, না, চাচীর কবর হবে চাচার কবরের ওপরে। তখন বললাম, আপনি আমাদের পরিবারের মুরব্বি যা সিদ্ধান্ত দিবেন তাই হবে। পরে ধর্মীয় বিধান দেখলাম, আড়াই কিংবা ছয় মাস পর কবরের ওপরে কবর দেওয়া জায়েজ আছে, অসুবিধা নেই। উনি (শেখ হাসিনা) নির্দেশ দিলেন যে, চাচীর কবর হবে ওখানে। তা হলে সবার দোয়া পাবে। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সতের জনের কবর ও তিন নেতার কবর এক সাথে। জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তাতে চাচী সবার দোয়া পাবে। আমরা এখন মাঝে মাঝে সেখানে যাই। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো শত প্রলোভন ও শত ভীতি প্রদর্শন সত্ত্বেও বাবা ও তার সহকর্মীরা মাথা নত করেন নাই। বঙ্গবন্ধুর প্রতি যে প্রেম, ভালবাসা, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতাবোধ তাদের (সৈয়দ নজরুর ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, মুনসুর আলী ও কামারুজ্জামান) মধ্যে ছিল তারা কিন্তু তা ভুলেন নাই। আমার মনে আছে, ১৯৬৯ সালে যখন আওয়ামী লীগের সব নেতারা অ্যারেস্ট হলেন তখন পল্টনে জনসভায় বঙ্গবন্ধুর চেয়ার খালি (বঙ্গবন্ধু তখন জেলে) বাবা পাশে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন। আরও কয়েকজন বসা। কতটুকু শ্রদ্ধা ওই সময় ছিল। বাবার মৃত্যুর পর আমি আর্মিতেই ছিলাম। আমার প্রটেকশন ছিল। তার মধ্যে কর্নেল শফিকুল্লাহ একদিন এসে বললেন, শাফায়েত তোমার এখানে থাকা ঠিক হবে না। রাতের বেলায় তোমায় আমি অন্য জায়গায় নিয়ে রাখব। তারপর লালমাই পাহাড়ের অনেক দূরে একটা গুহার মতো ছিল। ওইখানে তিন দিন আমাকে গায়ে কম্বল দিয়ে বসিয়ে রেখেছিলেন। তিন দিন পর আমি ফিরে আসি। তখন ফরিদ ও কিবরিয়া আমার রুমমেন্ট। তাদের কাছে আর্টিলারি ইউনিটের একটা দল এসেছিল আমার খোঁজে। তারা ওদের কাছে জিজ্ঞাসা করেছিল, ক্যাডেট সাফায়েত কোথায়? ফরিদ বলেছিল, সে বাইরে গেছে।

এর মধ্যে হঠাৎ করে আশরাফ লন্ডন থেকে দেশে চলে আসে। তখন তাকে নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। তাকে কেমনে বাঁচাই। তাকে বিদায় করব কীভাবে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আশরাফ ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আজ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

লেখক : সৈয়দ নজরুল ইসলামের বড় ছেলে

সৌজন্যে : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মুখপত্র উত্তরণ

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ আয়োজন এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ আয়োজন - এর সব খবর