thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫,  ১০ মহররম ১৪৪০

প্রতিবাদের ভাষা : ১৫ আগস্ট থেকে ৩ নভেম্বর

২০১৪ নভেম্বর ০৩ ১৫:০৪:০০
প্রতিবাদের ভাষা : ১৫ আগস্ট থেকে ৩ নভেম্বর

নূহ-উল-আলম লেনিন, অতিথি লেখক : ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর রক্তে রঞ্জিত কলঙ্কিত দিন। রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে সেদিন বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের কথা ছিল। কিন্তু ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাকা-টি সংঘটিত হয় সেদিনই অতি প্রত্যুষে। স্তম্ভিত ও হতবিহ্বল জাতি এবং ছাত্র-সমাজ এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার আগেই সামরিক শাসন জারি এবং বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে দেয় খুনিচক্র। ২০ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খোলার প্রথম দিনেই আমরা পূর্ব পরিকল্পনা মতো বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ঝটিকা মিছিল করি। অতঃপর আরও কয়েকদিন মিছিল, প্রতিবাদ, ক্লাসে ক্লাসে বক্তৃতা ও প্রচারাভিযান চালাই। আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল আমরা ঢাকার রাজপথে মিছিল নিয়ে ৩২নং-এ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে শ্রদ্ধা জানাতে যাব। এ লক্ষ্যে আমরা অর্থাৎ তৎকালীন জাতীয় ছাত্রলীগের ব্যানারে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ প্রথমে ২৯ অক্টোবর ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য একটু পিছিয়ে ৪ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু স্মৃতি দিবসের তারিখ পুনর্নির্ধারণ করি আমরা। কাকতালীয়ভাবে আমাদের কর্মসূচি পালনের দিনটির আগের রাতেই অর্থাৎ ৩ নভেম্বর খুনি মোস্তাক চক্রের বিরুদ্ধে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনা অভ্যুত্থান হয়। সেনা অভ্যুত্থান সত্ত্বেও আমাদের পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি পালনে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকি। ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি দিবস’ পালন উপলক্ষে ব্যাপক সাংগঠনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি আমরা গোপনে লিফলেট ছাপাই, বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকা শহরে দেয়াল লিখন করি এবং হাতে লেখা পোস্টারও কোথাও কোথাও লাগানো হয়।

বঙ্গবন্ধু স্মৃতি দিবসের লিফলেটের শিরোনাম ছিল ‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’। তারিখ পরিবর্তনের জন্য দুই দফায় এই লিফলেটটি ছাপতে হয়। প্রথম দফায় ২৯ অক্টোবর, আর দ্বিতীয় দফায় ৪ নভেম্বরের তারিখ দিয়ে। লিফলেটটি ছিল খুবই ছোট আকারের। আমরা চেয়েছি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি দিবসের কর্মসূচি নিয়ে ব্যাপক ছাত্রসমাজের কাছে যেতে। শুরুতে ৫০ হাজার লিফলেট ছাপা হয় সংগ্রামী ছাত্র সমাজের নামে। কিন্তু কর্মীরা চাইছিলেন আরও বেশি লিফলেট। তাই আরও ৫০ হাজার ছাপা হয়। এই লিফলেটটি ছাপা হয় পুরনো ঢাকার পূর্ববঙ্গ প্রেসে। এর দায়িত্বে ছিলেন শওকাত হোসেন ও কাজল ব্যানার্জি। শওকত তখন ঢাকা নগর ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক। জাতীয় ছাত্রলীগ ঢাকা নগরের কাজ পরিচালনার জন্য ৯ জনের যে টিম করা হয়, তারও সদস্য ছিলেন তিনি। জগন্নাথ হল ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কাজল ব্যানার্জি ছিলেন কৃতী ছাত্র। পূর্ববঙ্গ প্রেসের মালিকের ছেলে লিফলেট ছাপার কাজে খুবই সাহায্য করেন। তখন বোর্ডের বই ছাপা হচ্ছিল সেখানে। তিনি নিজে গভীর রাতে বোর্ডের বই ছাপা বন্ধ করে আমাদের লিফলেটটি ছেপে দেন।

ঢাকা নগর ছাত্র ইউনিয়নের নেতা খোন্দকার শওকাত জুলিয়াসও প্রচুর লিফলেট ছাপার ব্যবস্থা করেন সূত্রাপুরে তার এক আত্মীয়ের প্রেস থেকে।

বঙ্গবন্ধু স্মৃতি দিবসের লিফলেটসহ পুলিশের হাতে ১ নভেম্বর ধরা পড়েন শওকাত হোসেন ও কাজল ব্যানার্জী। ২ নভেম্বর এজি অফিস এলাকায় লিফলেট বিতরণ করতে গিয়ে গ্রেফতার হন চামেলীবাগের ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী সিদ্দিক। তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। কিন্তু কোন প্রেসে লিফলেট ছাপা হয়েছে, কোথায় রাখা হয়েছে, কারা বিতরণ করছে, এ সম্পর্কে পুলিশ তাদের কাছ থেকে কিছুই জানতে পারেনি। পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে গিয়ে তাদের ওপর দুই দিন দুই রাত একটানা অত্যাচার চালানো হয়। নখে সুঁচ ঢোকানো হয়। খেতে দেওয়া হয় শুধু পচা ডাল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্মৃতি দিবসের কর্মসূচি সফল করতে কী ধরনের প্রস্তুতি চলছে, কঠিন নির্যাতনের ভেতরেও তারা সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র মুখ খোলেন নি। যদিও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার সুবাদে শওকাত হোসেন ও কাজল ব্যানার্জি অনেক কিছুই জানতেন।

তারা জেলে কাটান এক মাস ১৬ দিন। তাদের মামলা চলে পাক্কা দু’বছর।

বঙ্গবন্ধু স্মৃতি দিবসের কর্মসূচি প্রচারের জন্য আমরা কয়েকটি টিম গঠন করি। এদের কাজ ছিল ক্লাস চলার সময় বক্তৃতা দেওয়া এবং লিফলেট বিতরণ করা। কলাভবনের জন্য গঠিত টিমে ছিলেন কাজী আকরাম হোসেন, প্রয়াত রবিউল আলম চৌধুরী, শহীদুল আলম বাদল, মৃণাল সরকার, মুকুল বোস, বাহালুল মজনুন চুন্নু, জামাল উদ্দিন আফগানি, আবদুল মান্নান খান, রকিবুর রহমান, কাজী ইকবাল, জাহিদুল বারী ও নূরুল ইসলাম প্রমুখ।

বিজ্ঞান ভবন এবং সায়েন্স এনেক্স ভবনের টিমে ছিলেন অজয় দাশগুপ্ত, খ ম জাহাঙ্গীর, নিয়াজ আহমদ অপু ও হাবিবুর রহমান হাবিব প্রমুখ। ঢাকা নগরের বিভিন্ন কলেজে প্রচার চালানোর জন্য গঠিত টিমে ছিলেন সৈয়দ নূরুল ইসলাম, কামরুল আহসান খান, আবদুর রউফ, শওকাত হোসেন, খোন্দকার শওকাত জুলিয়াস, কামাল মজুমদার, রউফ শিকদার, সিদ্দিকুর রহমান, মুহাম্মদ ইউনুস ও ডাবলু প্রমুখ।

এ ছাড়া বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবীদের ৪ নভেম্বরের কর্মসূচিতে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানোর জন্যও ভিন্ন একটা টিম কাজ করে চলে।

প্রতিদিন ছাত্রদের টিমগুলো ক্লাস চলাকালে বক্তৃতা দেয়। আমরা শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে ক্লাসে ঢুকতাম এবং ক্লাসের কাজে বিঘœ ঘটানোর জন্য ক্ষমা চেয়ে নিতাম। গভীর আবেগ সিঞ্চিত আমাদের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল বঙ্গবন্ধু ছিলেন স্বাধীনতার মহানায়ক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা তাকে চ্যান্সেলর হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শেখ কামালকে। সুলতানা খুকি ছিলেন বাংলাদেশের কৃতী অ্যাথলেট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব। মাত্র কয়েকদিন আগে তার বিয়ে হয়। সে তো কোনো দোষ করেনি। শিশু রাসেলও কোনো দোষ করেনি। এই হত্যাকা- ছাত্র-সমাজ মেনে নিতে পারে না। তাই আমরা ৪ নভেম্বর বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গিয়ে ফুল দেব, তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাব। আমরা যাব মৌন মিছিল নিয়ে। কারও সঙ্গে কোনো সংঘাতে যেতে চাই না। মিছিলে কেউ বাধা দিক, এটাও আমরা চাই না।

বক্তব্য রাখার সময় কারও কারও গলা ভারি হয়ে উঠত। চোখ হতো অশ্রুসিক্ত। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া দেখা যেত। পিনপতন স্তব্ধতার ভেতর এক গাঢ় বেদনার সুর অনুরণিত হতো।

কোনোভাবেই ছাত্র বা শিক্ষকদের তরফ থেকে কোনো বাধার সম্মুখীন হইনি আমরা। বিরূপ মন্তব্যও কেউ করেনি। যদিও এ ধরনের আশঙ্কা আমরা করেছিলাম।

কবি বেগম সুফিয়া কামাল, পল্লী কবি জসীমউদ্্দীন, শিল্পী কামরুল হাসান, অধ্যাপক কবীর চৌধুরীসহ অনেকের কাছে গিয়ে অনুরোধ জানানো হয় ৪ নভেম্বরের মিছিলে শামিল হবার জন্য। চট্টগ্রামে অধ্যাপক আবুল ফজলের কাছে গিয়েও বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচিতে যোগ দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

তাদের সবাই আমাদের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে সাজেদা চৌধুরী, মোহাম্মদ ফরহাদ, মতিয়া চৌধুরী, পঙ্কজ ভট্টাচার্য, সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক, মঞ্জুরুল আহসান খান, আনোয়ার চৌধুরী প্রমুখ সক্রিয়ভাবে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি দিবসের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করেন। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও সিপিবির নেতাকর্মীরা যাতে ছাত্রদের এই কর্মসূচিতে দলে দলে শামিল হন, সে জন্য তারা উদ্যোগ নেন।

শ্রমিকদের মধ্যেও প্রচার চালানো হয়। মোর্শেদ আলী, শহীদুল্লাহ চৌধুরী, মুনীরুজ্জামান, আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ সিপিবি সমর্থক ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এবং শ্রমিক লীগের মাহমুদুর রহমান বেলায়েতও এ ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নেন।

২৩ অক্টোবর আদমজীর শ্রমিক নেতা সায়েদুল হক সাদুকে গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদে শ্রমিকরা ২৭ অক্টোবর থেকে আদমজী জুট মিলে ধর্মঘট শুরু করেন। এই সংবাদ আমাদের জন্য ছিল উৎসাহজনক।

আমাদের ৪ নভেম্বরের কর্মসূচির অনুকূলে প্রস্তুতি চালানোর সময়ই মোশতাক সরকার বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাসভবনে কী কী সম্পদ আছে, তার তালিকা প্রকাশ করে। তিন সদস্যের একটি টিম ৩০ অক্টোবর জানায়, শেখ মুজিবের বাড়িতে ১৫ আগস্টে ছিল ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকার ধনরতœ। মোশতাক চক্র ভেবেছিল, এই তথ্য প্রকাশের ফলে বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর নানা মহল থেকে বলা হয়, তিনি এবং তার পরিবারের সদস্যরা কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। ৩২ নম্বরের বাসভবন নগদ অর্থ ও অলঙ্কারে ঠাঁসা। শেখ কামাল ও শেখ জামালের বিয়েতে ট্রাঙ্কভর্তি স্বর্ণের গহনা উপহার পাওয়া গেছে। অথচ কামাল ও জামালের বিয়ে হয়েছিল খুবই অনাড়ম্বরভাবে।

কামালের বিবাহ-উত্তর সংবর্ধনায় নতুন গণভবনে আয়োজন করা হয়েছিল কেবল চা-চক্রের। কেউ যেন কোনো রকম উপহান না দেন, সে জন্য বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে আগের থেকেই অনুরোধ করা হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে প্রাপ্ত সম্পদের তালিকা সংবাদপত্রে প্রকাশ হওয়ায় আমরা আমাদের বক্তব্যের অনুকূলে একটা ভালো পয়েন্ট পেয়ে যাই। বঙ্গবন্ধুর পরিবার যে দেশের এক কণা সম্পদও লুটপাট করেন নি, মোশতাকের তদন্ত টিমের রিপোর্ট থেকে তারই প্রমাণ মেলে।

৪ নভেম্বরের মিছিল সফল করে তোলার জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের একটা দল গড়ে তোলা হয়। তাদের সঙ্গে আমরা দীর্ঘ আলোচনা করি। সিদ্ধান্ত হয়, মিছিলকে সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নিতে হবে। যে কোনো ধরনের উসকানির মুখেও ধৈর্য ধারণ করতে হবে, পুলিশের হামলায় মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে আবার সংগঠিত করে এগুতে হবে। মোট কথা, যে কোনো উপায়ে হোক, আমরা পৌঁছাব বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে।

মিছিলের জন্য বঙ্গবন্ধুর কয়েকটি প্রতিকৃতি আঁকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগের ছাত্র মিজান, সুধীর ও মানিক। মিছিলের ব্যানার এবং ফেস্টুনও তারাই তৈরি করেন।

৩ নভেম্বর সকালে আমরা ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান হয়েছে শুনতে পাই। এ খবরও আসে যে সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াউর রহমান বন্দি হয়েছেন। কিন্তু খুনি খন্দকার মোশতাক কি ক্ষমতাচ্যুত, ফারুক-রশীদ-ডালিম, চক্র কোথায় ইত্যাকার প্রশ্নে আমরা ছিলাম আন্দোলিত। উত্তর পাবার যে উৎস, সেই রেডিও বাংলাদেশ সম্পূর্ণ নীরব। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের ঘোষণা যে রেডিওতে দেয়া হয়, সেই রেডিও এবং টেলিভিশন তবে কার দখলে?

সেনাবাহিনীতে অনেকেই খুনি চক্রের বিরুদ্ধে, আর্মির চেইন অফ কমান্ড ফিরিয়ে আনার পক্ষেও অনেকেই এমন কথা ঘন ঘন শোনা যাচ্ছিল। তবে কি খালেদ মোশাররফের এই কু সে লক্ষ্যেই করা হয়েছে? মোশতাককে রাষ্ট্রপতি রেখেই কি তিনি অগ্রসর হবেন? বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা তিনি নেবেন? তার ভাই রাশেদ মোশাররফ আওয়ামী লীগের নেতা এবং সংসদ সদস্য। কিন্তু খালেদ মোশারফের যোগাযোগ পিকিংপন্থি রাজনীতিবিদদের সঙ্গে! তিনি কোন পথ বেছে নেবেন?

এ ধরনের নানা প্রশ্ন ছিল। আর ছিল গুজব। রাজপথে সেনাবাহিনীর গাড়ির আনাগোনা ছিল আগের তুলনায় বেশি। রেডিও বাংলাদেশ ও টেলিভিশন সংঘটিত অভ্যুত্থানের প্রশ্নে একেবারেই নীরব।

ঢাকা জেলখানার আশপাশের লোকজন জানান, তারা ২ নভেম্বর গভীর রাতে জেলের ভেতরে প্রচ- গোলাগুলির শব্দ শুনেছেন। কয়েকজন নেতাকে নাকি সৈন্যরা এসে মেরে ফেলেছে। কাদেরকে মারা হয়েছে? কারা মেরেছে?

৪ নভেম্বরের সংবাদপত্রে এসব প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া গেল না। ঢাকার সেদিনকার সংবাদপত্রে রাজনৈতিক কোনো খবরই ছিল না।

পরিস্থিতি ছিল পুরোমাত্রায় বিভ্রান্তিকর। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করি। কিন্তু তাদের কাছ থেকেও স্পষ্ট করে কোনো কিছু জানা গেল না। ৩ নভেম্বর সকালে জাতীয় ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ বিশ্ববিদ্যালয় মধুর ক্যান্টিনের সভায় সিদ্ধান্ত নেন, পরিস্থিতি যাই হোক, সংগ্রামী ছাত্র-সমাজের নামে আহূত বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি অপরিবর্তিত থাকবে।

আমরা দলে দলে ভাগ হয়ে চলে যাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্লাসে এবং শহরের কলেজগুলোতে।

৪ নভেম্বর সকাল থেকেই বটতলায় ছাত্র-ছাত্রীরা সমবেত হতে থাকেন। সাধারণ ছাত্রদের সঙ্গে পূর্ববর্তী কয়েকদিনের যোগাযোগ ভালো ফল দেয়। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও কর্মীদেরও অনেকে উপস্থিত হন। বিভিন্ন শ্রমিক অঞ্চল থেকে আসেন শ্রমিকরা।

বটতলা হয়ে যায় ছাত্র-জনতায় পরিপূর্ণ। সে দিনের সেই ঐতিহাসিক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ইসমত কাদির গামা, নূহ-উল-আলম লেনিন, মাহবুব জামান, কাজী আকরাম হোসেন, অজয় দাশগুপ্ত ও মমতাজ হোসেন প্রমুখ। বঙ্গবন্ধুর একটি বিরাট প্রতিকৃতি এবং ব্যানার নিয়ে আমাদের মিছিল শুরু হয় দুপুর ১২টার দিকে। আগেই নির্ধারিত ছিল আমরা মিছিলে কোনো স্লোগান দেব না। নীরবে হেঁটে যাব বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে। আমাদের দৃঢ়পণ ছিল, কোনো বাধা মানব না।

কলাভবনের গেট থেকে ছাত্র-জনতার মিছিল বিনা বাধায় বের হয়। কিন্তু নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির কাছে পুলিশ, বিডিআর ও সেনাবাহিনী আমাদের গতিরোধ করে। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলে তাদের সঙ্গে বাদানুবাদ। একপর্যায়ে তারা মিছিলে হামলা চালাবার জন্য উদ্যত হয়। তারপরও ছাত্র-জনতা পিছু হটেন নি। শেষ পর্যন্ত মিছিলকারীদের দৃঢ় মনোভাবের কাছে বাধাদানকারীরা হার মানে। উঠে যায় ব্যারিকেড। আমরা এগিয়ে চলি আর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হতে থাকে। সায়েন্স ল্যাবরেটরির কাছ থেকে বড় একটা সমাবেশ আমাদের মিছিলের সঙ্গে যুক্ত হয়। কলাবাগান মাঠে অপেক্ষায় ছিল আরেকটি সমাবেশ। তারাও শামিল হয় মিছিলে। এদের মধ্যে ছিলেন খালেদ মোশাররফের মা।

নীলক্ষেতে পুলিশ-বিডিআর ও সৈন্যদের সঙ্গে যখন উত্তপ্ত বাদানুবাদ চলছিল, তখন একজন পুলিশ অফিসার মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমকে ডেকে বলেন, খালেদ মোশাররফ টেলিফোন লাইনে আছেন। আপনাদের সঙ্গে কথা বলবেন। নীলক্ষেত ফাঁড়ির টেলিফোন লাইনে দুজনের মধ্যে কথা হয়। সেলিম বলেন, পরিবারের কোনো সদস্য মারা গেলেও মানুষ শোক প্রকাশ করে। বঙ্গবন্ধুর জন্য শোক প্রকাশ করা ও শ্রদ্ধা জানানোর অধিকার সবারই আছে। এটা করা উচিতও। আপনিও আমাদের মিছিলে আসুন। খালেদ মোশাররফ বলেন, আমি তো যেতে পারব না। তবে আমার মা হয়তো যাবেন। আর সৈন্যরা আপনাদের বাধা দেবে না। কিন্তু সিভিল প্রশাসন তো আমি দেখি না।

৩২ নম্বর সড়কে প্রবেশের আগে সৈন্য ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা আমাদের আরও কয়েকবার বাধা দেয়। পথে পথে ছিল মেশিনগান নিয়ে সৈন্যদের টহল।

বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনের সড়ক ও আশপাশের এলাকা তখন লোকে লোকারণ্য। প্রায় সবাই ছিলেন অশ্রুসজল। এই নিষিদ্ধ বাড়ির সামনে এসে আবেগ দমন করা ছিল সত্যিই অসম্ভব। বাড়ির দেয়ালে ছিল বুলেটের চিহ্ন।

পুলিশ আমাদের ভেতরে যেতে না দেয়ায় অনেকেই ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তাদের বুঝিয়ে শান্ত করা ছিল আমাদের জন্য খুবই কঠিন ব্যাপার। বস্তুত বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের মানুষের মন থেকে যে মুছে ফেলা যায়নি, এই বিশাল মিছিলই তার সুস্পষ্ট প্রমাণ।

অনেকেই ফুল রাখলেন বাড়ির গেটে। অনেকে ছুঁড়ে দিলেন ভেতরে। মোনাজাত পরিচালনা করেন মওলানা জেহাদি। এ সময়ে তিনি নিজে কাঁদছিলেন। উপস্থিত অন্য সবাই কাঁদছিলেন।

কিন্তু ৪ নভেম্বর দুপুরেও সবাই জানতাম না বঙ্গবন্ধুর ঘাতকরা ২ নভেম্বর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও কামারুজ্জামানকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের দিকে চলমান মিছিলের সময় সিপিবি নেতা মোহাম্মদ ফরহাদ চার নেতার মৃত্যু সংবাদ জানিয়ে ছাত্র নেতৃবৃন্দকে খবর পাঠান। সংবাদবাহক শেখর দত্তর কাছ থেকে খবরটি জানতে পেরে নূহ-উল-আলম লেনিন মিছিলের পুরোভাগে থাকা মুজাহিদুল সেলিমকে জানান এবং শোক মিছিল না হওয়া পর্যন্ত এই সংবাদ প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের আশঙ্কা ছিল এই সংবাদ হয় তো ভীতির সঞ্চার করবে। বঙ্গবন্ধুর বাসভবন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার সময়ে এই মর্মান্তিক সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে।

এই চার নেতা ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীরনায়ক। মোশতাকচক্র যে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বই মুছে ফেলতে চায়, এটা ১৫ আগস্ট কেন, তারও আগ থেকে আমরা সেটা জানতাম। তাই বলে জেলখানার ভেতরে ঢুকে বন্দী চার জাতীয় নেতাকে এভাবে হত্যা করা! পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যরা ১৯৭১ সালে যেভাবে বাঙালিদের প্রকাশ্যে নির্বিচারে হত্যা করেছে, জেলহত্যা তার চাইতেও বেশি নারকীয় বর্বরতা।

খুনিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে যে নেতৃত্বহীন করে ফেলতে চায়, এই ঘটনার ভেতর দিয়ে সেটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

জেলহত্যার খবর শুনে ছাত্রনেতাদের অনেকেই মুষড়ে পড়েন। পরিস্থিতি আমাদের জন্য আরও ভয়ানক রকমের প্রতিকূল হয়ে ওঠে। সবকিছুই ঢাকা পড়ে যায় অনিশ্চয়তার অন্ধকারে। কিছুক্ষণ আগেও ছাত্র নেতাদের কেউ কেউ ভাবছিলেন খালেদ মোশাররফ বঙ্গবন্ধুর ঘাতক ফারুক-রশীদ-ডালিম-চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে দেশ হয়তো আবার সাংবিধানিক ধারায় ফিরে যাবে। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে হয়তো উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া হবে। ফিরে আসবে স্বাধীনতার ধারা। অবসান ঘটবে হত্যা ও কুয়ের রাজনীতির। রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ দেশকে সাংবিধানিক ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে তৎপরতা চালাচ্ছিলেন।

কিন্তু খুনিরা দেশকে এ কোথায় নিয়ে গেল?

বঙ্গবন্ধুর বাসভবন থেকে ফেরার পথেই জাতীয় ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ বিকেলে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সমাবেশটি হয় বেশ বড়। ওখান থেকেই জেলহত্যার প্রতিবাদে ৫ নভেম্বর সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সমাবেশ শেষে নূহ-উল-আলম লেনিনের নেতৃত্বে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি শেষ হয় বায়তুল মোকাররমে গিয়ে। রাতে পাড়ায় পাড়ায় মিছিল হয় এবং হরতালের সমর্থনে স্লোগান দেওয়া হয়। নূহ-উল-আলম লেনিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা দেন মাহবুবজামান, ইসমত কাদের গামা, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, কামরুল আহসান খান প্রমুখ ছাত্র নেতা। এভাবেই ৪ নভেম্বর ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি দিবসের’ কর্মসূচি পালিত হয়।

[নূহ-উল-আলম লেনিন ও অজয় দাশগুপ্ত রচিত ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড : প্রতিবাদের প্রথম বছর’গ্রন্থ থেকে সংকলিত]

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ আয়োজন এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ আয়োজন - এর সব খবর



রে