thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

ধর্ষণের পর শরীরে দেওয়া হয় সিগারেটের ছ্যাঁকা

২০১৪ ডিসেম্বর ০৬ ১৯:২০:৩১
ধর্ষণের পর শরীরে দেওয়া হয় সিগারেটের ছ্যাঁকা

একাত্তরে যুদ্ধ চলাকালে রেজিয়া বেগম স্বামীসহ থাকতেন রাজধানীর কাঁঠালবাগানে। প্রতিদিনই অলিতে-গলিতে সে সময়ে পড়ে থাকত কোনো না কোনো লাশ। অবহেলায় পড়ে থাকত মৃত মানুষগুলো কিন্তু কোথাও নেই তাদের স্বজনরা। প্রাণভয়ে যে যার মতো পালিয়েছেন।

সেই প্রতিকূল সময়েও রেজিয়া বসতভিটা ছেড়ে পালিয়ে যাননি। রেজিয়া কেবল জানতেন বেঁচে থাকতে হলে কাজ করতে হবে। তাই তো মৃত্যু অবধারিত জেনেও রেজিয়া ছুটেছিলেন কাজের সন্ধানে। সঙ্গে তার স্বামীও ছিল।

ঘর থেকে কিছুদূর এগুতেই দু’জন দেখেন হানাদার বাহিনীর গাড়ি। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী হিসেবে হানাদাররা দু’জনকেই তুলে নেন গাড়িতে। মিনিট দশেক জিজ্ঞাসাবাদের পর পাকিস্তানী সৈন্যরা নিশ্চিত হলেন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে রেজিয়া ও তার স্বামীর কোনো যোগসূত্র নেই। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর রেজিয়ার সামনেই গাড়ি থেকে লাথি দিয়ে ফেলে দেয় স্বামীকে। মাথায় আঘাত পেয়ে স্বামী লুটিয়ে পড়েছেন পিচঢালা পথে। ধীরগতিতে চলছে গাড়ি, রেজিয়া তখনও শুনতে পান স্বামীর ব্যথাতুর আর্তনাদ।

এতদিন যে মানুষটির সঙ্গে রেজিয়ার সমগ্র অস্তিত্ব সেই মানুষকে দূরে রেখে রেজিয়া যাওয়া শুরু করেছেন ভয়াবহ কোনো গন্তব্যে। এ সব ভাবতেই ভাবতেই গাড়িতে জ্ঞান হারান তিনি।

জ্ঞান ফিরে ভেবেছিলেন চোখ মেলে হয়তো স্বামীকেই দেখবেন। রেজিয়া দেখতে পান স্বামীর বদলে ভয়ানক এক অচেনা মানুষ। পাকবাহিনীর হাতে কিছুদিন বন্দী থাকার পর একজনের সহায়তায় ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসেন এই নারী। রওনা দেন গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাটের পথে।

কিন্তু গ্রামে যাওয়া হয়নি রেজিয়ার। কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা পার হতেই আবারও পড়েন হানাদারদের খপ্পরে। সমস্ত চেষ্টা করেও রেজিয়া নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। পাঁচজন সৈন্য লোভের থাবা ফেলেন তার শরীরে। ধর্ষণের পর শরীরে দেওয়া হয় জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা। ক্ষত-বিক্ষত হয় রেজিয়ার দেহ।

অতীত স্মৃতিচারণ করে রেজিয়া দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘অমানবিক নির্যাতনের পরও আমি বেঁচেছিলাম স্বাধীনতা দেখব বলে। এতকিছুর পরও মনোবল হারাইনি। শেষ আশ্রয় হিসেবে অনেকের মতো যোগ দিই হেমায়েত বাহিনীতে। প্রতিশোধের নেশায় হত্যা করি বেশ কয়েকজন নরপিশাচকে।’

স্বাধীনতার পর রেজিয়া ফিরে আসেন পুরনো সেই ভিটায়। এসে দেখেন ভাঙা ভিটায় বসবাস করছেন এক পাগল মানুষ। পাগল মানুষটিও ফ্যাল ফ্যাল করে চোখ রাখেন রেজিয়ার দিকে। কারো মুখ থেকেই কোনো বের হলো না।

জানা গেল- হানাদারদের আঘাত আর স্ত্রীকে হারিয়ে পাগল হয়েছেন রেজিয়ার স্বামী। এরপর ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়েও ভালো করা যায়নি তাকে। কিছুদিন পরই মারা যান তিনি।

রেজিয়ার জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তার ঘোর অন্ধকার। যে অন্ধকার কাটেনি স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরও। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বয়স্কভাতা পেয়ে কোনোমতে কাঁঠালবাগানের পুরনো সেই ভিটা আঁকড়ে আছেন রেজিয়া। কিন্তু আজও মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।

দ্য রিপোর্টকে রেজিয়া আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘যুদ্ধে তো সব হারিয়েছি। এখন কেবল ভালোভাবে বাকি দিনগুলো বেঁচে থাকতে চাই। আমাকে আর কত অপেক্ষা করতে হবে?’

(দ্য রিপোর্ট/এমএ/একে/আরকে/ডিসেম্বর ০৬, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ আয়োজন এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ আয়োজন - এর সব খবর