thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

চাইন্দাউ মারমা ও হ্লাম্রামং মারমার দুঃসহ জীবন

২০১৪ ডিসেম্বর ০৮ ১৫:৩৯:১৩
চাইন্দাউ মারমা ও হ্লাম্রামং মারমার দুঃসহ জীবন

চাইন্দাউ মারমা ও হ্লাম্রামং মারমা খাগড়াছড়ির দুই বীরাঙ্গনা নারী। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও পায়নি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ন্যূনতম সহায়তা। এমনকি জুটেনি বয়স্ক ভাতাও। চরম দুঃসহ যন্ত্রণা আর অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে খাগড়াছড়ির জেলার মহালছড়ি ছিল উত্তাল। ২৭ এপ্রিল পাকিস্তানী সেনাদের সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধে সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের শহীদ হলে মহালছড়ির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় শত্রুদের হাতে। শুরু হয় সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার। পাকিস্তানী সেনারা হামলে পড়ে মা-বোনদের ওপর। তাদেরই দুজন মহালছড়ি উপজেলার থলিপাড়ার চাইন্দাউ মারমা ও বাবুপাড়ার হ্লাম্রামং মারমা। পাকিস্তানী সেনারা এই দুই নারীকে ধরে পাশবিক নির্যাতন চালায়। এর মধ্যে চাইন্দাউ মারমার ওপর চলে প্রায় ৪-৫ মাস ধরে নির্যাতন।

মহালছড়ির থলিপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, বীরাঙ্গনা চাইন্দাউ মারমা জরাজীর্ণ একটি ঘরের উঠোনে বসে আছে। দেখে বললেন, অগাসা (সালাম)। কেমন আছেন জানতে চাইলে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলেন, ‘ভাল নাই, অসুস্থ। খাবারের অভাব। বাড়ি থেকে বের হতে পারছি না, ভিক্ষা করেই তো খাই।’

’৭১-এর দিনগুলোর কথা জানতে চাইলে প্রথমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কী লাভ।’ তারপর বলেন, ‘বয়স তখন ১৪-১৫ হবে। বিয়ে হয়নি। একদিন বিকেলে (তারিখ মনে নেই) একদল পাকসেনা এসে আমাকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর টানা ৪-৫ মাস মহালছড়ি, মাটিরাঙা, গুইমারা ও রামগড়ে আটকে রেখে দিনের পর দিন পাশবিক নির্যাতন চালায়। বেশ কয়েকবার পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। এক পর্যায়ে রামগড়ে একটি কক্ষে আমাকে রেখে পাকিস্তানী সেনারা পালিয়ে যায়।’

তিনি জানান, শত্রুর কবল থেকে মুক্তির পর অথুই নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার। তবে সন্তান হয়নি। কিন্তু স্বামীও আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে মারা গেছেন। সেই থেকে ছোট ভাই থৈচাপ্রু মারমার দেওয়া একটি ঘরে তার বসবাস। সারাদিন ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করে যা পান তা দিয়ে কখনো খেয়ে আবার কখনো না খেয়ে দিনযাপন করেন।

কোনো সরকারি সাহায্য পেয়েছেন কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে চাইন্দাউ মারমা বলেন, ‘গত বছর ৩০ কেজি চাউল পাইছিলাম। এ ছাড়া আর কোনো সাহায্য ভাগ্যে জুটেনি।’

হ্লাম্রামং মারমার সঙ্গে একই উপজেলার বাবুপাড়ায় কথা হয়। কুশল বিনিময়ের পর তিনি জানান, স্বামী সাথোয়াই মারমা আর এক সন্তানকে নিয়ে তার সুখের সংসার ছিল। একদিন সন্ধ্যার দিকে পাকিস্তানী সৈন্যারা তাকে ধরে নিয়ে যায়। রাতভর তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে পরের দিন সকাল ৮টার দিকে ছেড়ে দেয়। এ নিয়ে বহুদিন প্রতিবেশীদের নানা কটূক্তি শুনতে হয়েছে। একদিন স্বামীও মারা গেলেন। তারপর ছেলের দেওয়া একটি চায়ের দোকানই এখন তার বেঁচে থাকার সম্বল। সারাদিন চা বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়ে কোনো রকমে দিন চলে যায়।

মহালছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লাব্রেচাই মারমা বলেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধে মহালছড়ি পতনের পর পাকসেনারা চাইন্দাউ মারমা ও হ্লাম্রামং মারমাকে তুলে নিয়ে নির্যাতন চালিয়েছে। অথচ এই দুই বীরাঙ্গনা স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃত পায়নি। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে দেন-দরবার করেও ব্যর্থ হয়েছি।’

খাগড়াছড়ি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মো. রইছ উদ্দিন বলেন, ‘মহালছড়ির দুই বীরাঙ্গনার বিষয়টি এতদিন গোপনে ছিল। বিষয়টি জানার পর যাচাই-বাছাইয়ে সত্যতা পাওয়া গেছে। এখন তাদের পুনর্বাসনে যাবতীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. মাসুদ করিম বলেন, ‘মহালছড়িতে দুই বীরাঙ্গনা আছেন শুনে তাৎক্ষণিক একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে সত্যতা যাচাইয়ে পাঠানো হয়। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিসহ পরিপূর্ণভাবে পুনর্বাসনে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে তালিকাভুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে নাম পাঠানো হয়েছে।’

(দ্য রিপোর্ট/এইচএমপি/এমসি/সা/ডিসেম্বর ০৮, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ আয়োজন এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ আয়োজন - এর সব খবর