thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
মুহম্মদ আকবর

দ্য রিপোর্ট

স্যাঁতসেঁতে বস্তিতে ঘুমান কানন

২০১৪ ডিসেম্বর ০৯ ১৯:০৪:৪০
স্যাঁতসেঁতে বস্তিতে ঘুমান কানন

বরিশালের গৌরনদী থানার পতিহার গ্রামে বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধা কানন বেপারীর জন্ম। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১১ বছর। অনটনের সংসারে যাতে কিছু বাড়তি অর্থ সমাগম হয় সেজন্য চলে যান নারিকেলবাড়ির পিসতুত ভাইয়ের বাড়ি। সেখানে চার্চে কাজ করে যা পেতেন তাই পাঠিয়ে দিতেন বাবার কাছে। অর্থ সংকটে খাঁ খাঁ করা পরিবারে সামান্য টাকা পেয়ে তার বাবা যে কত আনন্দ পেতেন সে বর্ণনা দিতে প্রাণোচ্ছল হন কানন বেপারী।

একটু পরেই চেহারা মলিন করে বলতে শুরু করেন একাত্তরের ভয়াবহ দিনগুলোর কথা। যেদিন তাকে সর্বশান্ত করে রাজাকার ও পাকবাহিনীর কয়েকজন।

জীবনের সবচেয়ে বেদনার কথা জানাতে গিয়ে বীরাঙ্গনা কানন বেপারী বলেন, ‘তখন ফাদার চার্চে ছিলেন না। আমরা কয়েকজন মুক্তিবাহিনীর জন্য খাবার তৈরি করছি। হঠাৎ একজন এসে আমার কাছে চা দিতে বলে। আমিও না করতে পারি নাই। বড় যত্ন করে আমি চা এগিয়ে দিতে যাই। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ওরা ধরে নৌকায় তুলে নেয়। তারপর...।’

নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলতে শুরু করেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘বড় চেনা মানুষগুলোই আমার সবচেয়ে ক্ষতি করে। যাদের সাথে প্রতিদিন দেখা হতো, আসার যাওয়ার পথে আদাব-নমস্কার দিতাম তারাই আমার সম্ভ্রম কেড়ে নিয়েছে। তখন থেকে আজ অবধি শত চেষ্টা করেও মানুষের প্রতি বিশ্বাস জন্মাতে পারিনি। আশপাশের পবিত্র মুখগুলোর দিকে তাকালেও কেন হাজারো শঙ্কায় আমার বুক জর্জরিত হয়।

যুদ্ধ যখন তার সবকিছুকে এলোমেলো করে দেয় তখন প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হন কানন বেপারী। আশপাশের অন্যদের মতো প্রতিদিনই নানা কৌশলে রাজাকার আর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে ধ্বংস করার কাজে লিপ্ত থাকেন। ভয় মৃত্যু সবকিছুকে উপেক্ষা করে চলে আরেক যুদ্ধ। কোমলমতি কানন বেপারীরা নামেন শত্রু হত্যার প্রত্যয়ে। নিজেরা সশস্ত্র যুদ্ধ করার পাশাপাশি মুক্তিবাহিনীকে (হেমায়েত বাহিনী) সহায়তাও করেন।

এভাবে একের পর এক ঘটনার মধ্য দিয়ে সবশেষে বিজয় অর্জিত হয়। বিশ্বের বুকে উঁচু করে উড়তে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।

কানন বেপারী বলেন, ‘তখন পেছনের সবকিছু ভুলে বিজয় মিছিলে আমরা সবাই অংশ নেই। প্রথম কয়েকদিন বিজয়ের গৌরব বেশ সানন্দে কাটলেও পরে শুরু হয় নানা অপকৌশল। বাংলাদেশ সৃষ্টির গৌরবোজ্জল ইতিহাস থেকে আমাদের নাম মোছার নিরন্তর চেষ্টা। বলা যায় আজ অবধি সেই গৌষ্ঠী সফল। ব্যর্থতার দায় কাঁধে নিয়ে আমরাই বরং বেঁচে আছি।’

দেশ স্বাভাবিক হলে কানন বেপারীর বিয়ে হয়। প্রথমে কিছুই জানত না তার স্বামী । পরে জানা জানি হলে শুরু হয় নানা ধরনের কথা। এক সময় বাধ্য হয়ে আলাদা হয়ে যান কানন। তিনি বলেন, ‘শুনেছি সে এখন বউ বাচ্চা নিয়ে আলাদা সংসারে বেশ ভালোই আছে। আর আমি দিনে অন্যের বাসায় কাজ করি, রাত হলে বস্তির স্যাঁতসেঁতে ঘরে ঘুমাই।’

দিন আর রাতের সন্ধিক্ষণে কখনো আর আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয় না। দিন যেতে যেতে অনেক চলে গেছে তবুও রাষ্ট্রের গৌরবোজ্জল খাতায় উঠেনি কাননের নাম। হয়তো উঠবে না মহাকালের খাতায়ও। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কেবল একটি প্রাণের অবসান হবে। রবে না কিছুই।

(দ্য রিপোর্ট/এমএ/এইচএসএম/এইচ/ডিসেম্বর ০৯, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ আয়োজন এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ আয়োজন - এর সব খবর