thereport24.com
ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫,  ১২ মহররম ১৪৪০
মুহম্মদ আকবর

দ্য রিপোর্ট

ভানুকে বিবস্ত্র অবস্থায় খুঁজে পায় তার বাবা

২০১৪ ডিসেম্বর ১১ ১৭:৫৮:২৭
ভানুকে বিবস্ত্র অবস্থায় খুঁজে পায় তার বাবা

বীরাঙ্গনা ভানু খাতুনের জন্ম সিরাজগঞ্জের ফকির পাড়া গ্রামে। এখন আর সেই বাপের ভিটার কোনো চিহ্ন নেই। পুরো গ্রামটাই নদীর জলে ভেসে গেছে। বর্তমানে জন্মভিটার অদূরে একটা প্রজেক্টে জরাজীর্ণ অস্থায়ী ঘরে বাস করেন তিনি। সঙ্গে আছেন এক ভাই আর পাড়া-প্রতিবেশী। ভাইয়ের সঙ্গে কারণে-অকারণে শ্রদ্ধা ভালোবাসার আদান-প্রদান হলেও প্রতিবেশীর সঙ্গে তার কোনো সখ্য হয়নি। কোনো দিন হবেও না যেন। বেদনা-হতাশায় অনেক পথ পাড়ি দিয়েছেন ভানু খাতুন তাই তার আর জীবনকে রাঙানোর পরিকল্পনা নেই। তিনি মনে করেন কোনোমতে বেঁচে থাকতে পারলেই হল।

ভানু খাতুনের সঙ্গে সম্প্রতি কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১৮ বছর। চারদিকে তখন প্রবল যুদ্ধ চলছে। পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে মানুষের ঘর বাড়ি; এমনকি মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্নও হারিয়ে যাচ্ছে। সিরাজগঞ্জের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ঘরপোড়া মানুষের আহাজারি। সে সময় ভানু দরিদ্র বাবা-মা আর ভাই বোনদের সঙ্গে থাকতেন।

যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে ভানু খাতুন বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে এখানে সেখানে পলাইয়া থাকতাম। একদিন কয়েকজন রাজাকার এসে বলল আমাদের আর বাইরে থাকতে হবে না। গ্রামের মানুষের জীবন রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবে রাজাকাররা। পাকবাহিনী এখানে আর আসবে না। কিন্তু দীর্ঘদিনের চেনা সেই গ্রামের মানুষরূপী শয়তানগুলোই যে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে এবং নতুন রূপে আক্রমণের পরিকল্পনায় মেতে উঠবে তা আমরা জানতাম না।’

ভানু জানান, এক বিকেলে রাজাকারদের সহায়তায় পাক হানাদারদের কবলে পড়েন তিনি ও তার পুরো পরিবার। তার মা তাকে আগলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত পারেননি। তিনি প্রবল নির্যাতনের শিকার হন। রাজাকার আর হানাদাররা ক্ষত-বিক্ষত করে পুরো শরীর। ধর্ষণের পর যেন আর কোনো দিন দাঁড়াতে না পারে সে জন্য হাতে এবং শরীরের নানা স্থানে গুলি করে। উপর্যুপরি এমন নির্যাতনে শরীরের বিভিন্ন অংশের মাংস গা থেকে ঝরে পড়ে। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকেন ভানু খাতুন।

এক সময় ভানুকে বিবস্ত্র অবস্থায় খুঁজে পায় তার বাবা কালাচান শেখ। সারা পৃথিবীর শোক বুকে নিয়ে বোবা কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বাবা। মেয়ের দেহ গায়ের গামছা দিয়ে ঢেকে গ্রামের মানুষদের কাছে নালিশ দেন কালাচান শেখ। তার মাথায় ছিল না যে, দেশে তখন কোনো অভিভাবক নেই। একটা অরাজক পরিস্থিতি চারদিকে। যখন কেউ কারো নয়। নিষ্প্রাণ একটি বাড়ির আঙ্গিনায় মেয়ের মাথায় পানি ঢালতে থাকেন বাবা। এক সময় জ্ঞান ফিরে ভানুর।

দেশ স্বাধীন হয়, মানুষ আবার ফিরে যায় নিজ নিজ ঘরে। কিন্তু অনেকেরই ফেরা হয় না। ভানুও অন্তহীন বেদনা নিয়ে ঘরে ফিরে। কিন্তু অন্য দশটা মানুষের মতো তার জীবনে কোনো রঙ আসে না। বিয়ে করে আনন্দময় জীবনের অলিগলিতে বিচরণের স্বাদ আহলাদ কোনোদিনই জন্মেনি তার। ৬৩ বছর বয়সে আজও চরম একাকিত্ব নিয়েই বাস করছেন ভানু খাতুন।

কোনো স্বীকৃতির মোহ ভানু খাতুনকে টানে না। সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছেও তার কোনো চাওয়া নেই। তবে তিনি মনে করেন, ত্যাগের মূল্যায়ন করা শিখতে হবে। তা না হলে এই দেশে কোনো দিনই শান্তি আসবে।

(দ্য রিপোর্ট/এমএ/এইচএসএম/এইচ/ডিসেম্বর ১১, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ আয়োজন এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ আয়োজন - এর সব খবর



রে